
গুল মারা বিষ ঝাড়া
বঙ্গজয়ের নীল নকশায় আছে গুল মারা ও বিষ ঝাড়া।
মিথ্যা কথা বলাকে আমরা গুল মারা বলি। ছোট গুল আর বড় গুলের পার্থক্য আছে। এই বড় গুলকেই বলে ফেক নিউজ। আর বড় গুল মারার ব্যাপারে বড় শরিক বিজেপি। অন্য দল যে গুল মারে না, তা নয়। তবে তাদের গুল মারার যন্ত্রপাতি বা মেশিনারি যথেষ্ট নয়। বিজেপির মতো শক্তিশালী আইটি সেল, হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নেই।
গুল মারার ব্যাপারে কয়েকটি উদাহরণ দেব। প্রথম উদাহরণ আর জি করের। সেখানে এক কর্মরতা মহিলা ডাক্তারের হত্যাকাণ্ড। একটি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ল সমাজ মাধ্যমে। তদন্তের আগেই আমরা পেয়ে গেলাম তদন্তের রিপোর্ট। সে ভিডিয়োয় দেখানো হল ঘটনাটা কি ভাবে ঘটেছিল। ভিডিয়োর পরে এলো একটা অডিয়ো। ‘আমি সোমা বলছি’। অদৃশ্য সেই সোমা যেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। কি ভাবে কি হলো, সবই জানেন তিনি। জলের মতো পরিষ্কার হত্যাকাণ্ড। অথচ এঁরা কেউ তদন্তকারীদের কাছে গিয়ে বললেন না কেন যা জানেন! সেটাই রহস্য।
খবর রটে গেল ধর্ষিতা নারীর শরীর থেকে ১৫০ গ্রাম বীর্য পাওয়া গেছে। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! নেট সার্চ করে দেখা গেল একবার যৌন মিলনে একজন পুরুষের যৌনাঙ্গ থেকে ২/৫ মিলিগ্রাম বীর্য নির্গত হতে পারে। ১৫০ গ্রাম বীর্য পেতে হলে অন্তত ১০০ জন পুরুষের দরকার। তার মানে, বহু জনের হাত যে আছে সেটা প্রমাণ করার জন্য ১৫০ গ্রাম বীর্যের আমদানি। বলা হল নিহত নারীর পেলভিক বোন আর কলার বোন ভেঙে গেছে। এটাই বলপ্রয়োগের ব্যাপারটিকে মান্যতা দেবার জন্যই পরিকল্পিত। কিন্তু ময়না তদন্তের রিপোর্টে প্রকাশ পেল যে ভেঙেছে কার্টিলেজ, কলার বা পেলভিক বোন নয়। খবর রটিয়ে দেওয়া হল রাজ্যের এক মন্ত্রীর ছেলে এই ঘৃণ্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত। পরে জানা গেল এক নামের দুই ব্যক্তিকে গুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর জি করের ইন্টার্ন শুভদীপের বাবা মন্ত্রী নন, তিনি এক প্রাথমিক স্কুলের নিরীহ শিক্ষকমাত্র।
ভাইরাল একটি ভিডিয়ো। সে ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে এস আই আরের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের রোহিঙ্গারা বিক্ষোভ করছেন। পরে জানা গেল ভিডিয়োটি আসলে বাংলা দেশের ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার, সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন।
একটি পুরানো ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে দাবি করা হল পশ্চিমবঙ্গে রোহিঙ্গারা হিন্দুদের মারধোর করছেন। পরে প্রমাণ হল, ভিডিয়োটি আসলে ২০১৭ সালের দার্জিলিংএর ঘটনা — গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থকরা বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের উপর হামলা করছেন।
এক ফেসবুক পোস্টে বলা হল তৃণমূল সরকারের আমলে রোহিঙ্গারা হিন্দুদের উপর অত্যাচার করছেন। পরে তদন্তে দেখা গেল ওই ছবিতে ব্যবহৃত দৃশ্যগুলি বাংলাদেশের পুরানো কিছু ছবি।
২০২১ সালে এই রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন হয়। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্যে প্রকাশ যে ভুয়ো খবর ছড়ানোর তালিকার শীর্ষে আছে পশ্চিমবঙ্গ। ২০২৬ সালের হিসেব আমরা এখনও পাইও নি। সেটা যে ২০২১ সালের তুলনা্য় অনেক বেশি, তাতে সন্দেহ নেই।
এবার আসুন বিষ ঝাড়ায়।
বিয ঝাড়া হলো ঘৃণা ভাষণ বা হেট স্পিচ।
‘সেন্টার ফর স্টাডি অব সোসাইটি অ্যাণ্ড সেকুলারিজম’ — বা সি এস এস এসের একটি সমীক্ষা। সমীক্ষাটি করা হয়েছে ‘দ্য ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস’, ‘দ্য হিন্দু’, ‘ইনকিলাব’, ‘সাহাফত’ প্রভৃতি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। এই সমীক্ষায় প্রকাশ : ২০২৩ সালে ৩৩টি ঘৃণাভাষণ নথিভুক্ত হয়েছিল কিন্তু ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে হয় ১২২। আবার এই ১২২টি ঘৃণা ভাষণের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। ঘৃণা ভাষণ ছড়িয়েছেন অমিত শাহ, প্রহ্লাদ জোশি, গিরিরাজ সিং, দিলীপ ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারী, নিশিকান্ত দুবে, প্রজ্ঞা ঠাকুর প্রভৃতিরা। ৯ অন্যান্য দলের নেতরা যে একেবারেই ঘৃণা ভাষণ থেকে শত হাত দূরে, তা নয়। তবে সংখ্যায় একম উজ্জ্বল নন ১২২টি ঘৃণা ভাযণের মধ্যে ১১২টি মুসলমানদের বিরুদ্ধে, ৩টি হিন্দুদের বিরুদ্ধে, ১টি দলিতদের বিরুদ্ধে, ১টি শিখদের বিরুদ্ধে। ১২২টির মধ্যে মহারাষ্ট্রে ৩৮টি, উত্তরপ্রদেশে ২৩টি, ঝাড়খণ্ডে ৯টি, পশ্চিমবঙ্গে ৮টি, অসমে ৭টি, বিহারে ৭টি, গুজরাটে ৬টি ঘৃণাভাযণ দেওয়া হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি ৪০টি, অমিত শাহ ১৫টি, যোগী আদিত্যনাথ ১২টি, হিমন্তবিশ্ব শর্মা ১২টি, দেবেন্দ্র ফডনবিশ ৫টি ঘৃণাভাষণ দিয়েছেন।
চক চক করিলেই সোনা নয়
এবার আসা যাক এস আই আরের কথায়। প্রধান অস্ত্র সেটাই। অঙ্গ-বঙ্গ- কলিঙ্গ তথা ভারত জয়ের। কিন্ত যেভাবে ব্যাপারটাকে উপস্থাপিত করা হল, মনে হল, দেশের উপকারের জন্যই এই ব্যবস্থা।
অত্যন্ত নিরীহভাবে বলা হল :
প্রতি বছরই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করে নির্বাচন কমিশন। নতুন নাম নথিভুক্ত করার পাশাপাশি মৃত ও অবৈধ ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু কমিশন মনে করেছে ওই প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ এবং ‘নিবিড়’ নয়। নাম তোলা এবং বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক গলদ থেকে গেছে। এস আই আর করে সব ভোটারের নাম নথিভুক্ত করা হবে। নিশ্চিত করা হবে দুটি বিষয় : এক] কোনও বৈধ ভোটারের নাম যেন বাদ না যায়। দুই] একজনও অবৈধ ভোটার যেন তালিকায় না থাকেন। পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় শেষবার আমূল বিশেষ সংশোধন হয়েছিল। গত ১০/১৫ বছরে গোটা দেশে এই কাজ আর করে নি কমিশন। এখন সংশোধন করার প্রসঙ্গে কমিশনের বক্তব্য, এস আই আর করার জন্য নির্দিষ্ট কোন দিনক্ষণ নেই। প্রয়োজন মনে হলে করা হয়।
প্রয়োজন মনে হলে করা হয় ‘নিবিড়’ সংশোধন।
কে প্রয়োজন মনে করে?
এর আগের অধ্যায়ে আমরা দেখেছি অঞ্জলি ভরদ্বাজের আর টি আই এর উত্তরে কমিশন জানিয়েছেন যে এস আই আরের নির্দেশ কমিশনের নয়।
তবে কার?
কে মনে করেছে যে বাংলাদেশ এবং মায়নামার থেকে ভারতে ঢোকা প্রায় এক কোটি অনুপ্রবেশকারী বা ঘুসপেটিয়া রাজ্যের ভোটার তালিকায় আছেন। কে মনে করেছেন এ কথা — কমিশন না বিজেপি?
এনুমারেশন ফর্ম নিয়ে যাবেন বুথ লেভেলের অফিসারেরা। সেই ফর্ম (অনেকটা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ১৪ পাতার ফর্মের মতো) পূর্ণ করে দিতে হবে ১১টি নথি। সময় অল্প। চাপ বিপুল। মানুষ বিভ্রান্ত। বুথ স্তরের আধিকারিকরা গলদঘর্ম।