
ইদানীং মিডিয়ায় কার দুর্গা কত বড়, তা নিয়ে বেশ তরজা দেখা যাচ্ছে। সজল-শঙ্কু-তেওয়ারী-কেয়াদির এই ঝগড়া বা কাজিয়া যে আসলে আপসের, তা অবশ্য বেশ বোঝা যাচ্ছে। লেবুতলারটা যদি ঝুলন হয়, পার্ক স্ট্রিটেরটাকে সেদিনের ছোকরা বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে! তবে এসব রংতামাশার মধ্যে বৃষ্টিবাদল মাথায় নিয়ে কুমোরটুলির পটুয়ারা নিবিষ্টচিত্তে প্রতিমা গড়ছেন। পুজোর তো আর মাত্র কটা দিন বাকি!
প্রশ্ন একটাই, কুমারটুলি নামটি এল কোথা থেকে? এটির উৎপত্তি সত্যিই কি পটুয়া বা মৃৎশিল্পীদের থেকে, না কুমার তথা ঘোড়ার সহিসদের থেকে?
কুমারটুলির ইতিহাস অনেক পুরনো। কলকাতার বহু সম্ভ্রান্ত লোকের বাস ছিল এখানে। কুম্ভকারদের জায়গা বলে কুমারটুলি নাম, এই ধারণা সর্বাংশে সত্যি নয়।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ আছে, ‘কুমার’ শব্দটির অন্যতম প্রধান অর্থ হল ‘ঘোড়ার সহিস’।
১৭৫২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরদের নির্দেশমাফিক কলকাতার জমিদার জন জেফানিয়া হলওয়েল সাহেব কলকাতার পেশাভিত্তিক স্থানবিভাজন করেছিলেন। মুচিপাড়া, ডোমটোলা, দর্জিপাড়া, আহিরিটোলা, কলুটোলা, পটুয়াটোলা, আর্মানিটোলা, শুঁড়িপাড়া, গোয়ালাপাড়া, কেরানিপাড়া, কুমারটুলি ইত্যাদি অঞ্চলের সৃষ্টি হয়।
যে যে পেশার লোক তাকে তার নির্দিষ্ট অঞ্চলেই থাকতে হবে, এই নিয়ম চালু হল।
কুমারটুলির আদি বাসিন্দা কুম্ভকার বা কুমোর, না কুমার তথা ঘোড়ার সহিস, তা বলা দুষ্কর। ১৭৫৭য় শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রাজা নবকৃষ্ণ দেব কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের কলকাতায় আনেন নিজের বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা তৈরির জন্যে। পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পর লর্ড ক্লাইভ ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন তিনি সেই পুজোয়। সেই সমস্ত মৃৎশিল্পী তথা পটুয়াদের উত্তর কলকাতায় এখন যেখানে কুমোরটুলি, সেই অঞ্চলে নাকি থাকতে দেওয়া হয়। ক্রমশ তারা সংখ্যায় বাড়তে থাকে। কলকাতায় বারোয়ারি পুজোর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণনগর থেকে বহুসংখ্যায় মৃৎশিল্পীর আগমন ঘটতে থাকে। কুমোর আর পটুয়া সমার্থক।দুর্গাপ্রতিমার চাহিদাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কুমার বা পটুয়ার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য প্রতিমাও তৈরি করতে থাকে এই পটুয়ার দল। সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, কালী ইত্যাদি ঠাকুরের মূর্তির চাহিদাও বাড়তে থাকে। তাই প্রতিমাশিল্পীদের মহল্লা হিসেবে কুমারটুলি তথা কুমোরটুলির খ্যাতি উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে।
আবার কলকাতার ঘোড়ার সহিসদের কথাও মনে পড়বে সকলের। সহিসরা ঘোড়ার দেখাশোনা বা রক্ষণাবেক্ষণ করে। কোচোয়ান বা কোচম্যানদের হাতে ঘোড়ারগাড়ির ঘোড়ার লাগাম থাকে। এক ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে টমটম বা টাঙ্গা বলে। দুই ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে জুড়িগাড়ি বলে। সহিসদের কাজ হল হেঁটে হেঁটে ঘোড়ার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা, সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া। তাই তাদের অশ্ববারকও বলে। তাদের ভালো নাম হল কুমার।পুরনো কলকাতার বনেদিবাড়ির লোকজন জুড়িগাড়ি করে বেড়াতে বেরোত, সাহেবরাও তাই। সাধারণ মানুষ টমটমের বা টাঙ্গা চড়তেই অভ্যস্ত ছিল। এছাড়া ব্রুহ্যাম, ল্যান্ডো, গিগ নামের ঘোড়ার গাড়িও ছিল কলকাতায়। রাধারামণ মিত্র তাঁর লেখা বই ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এ লিখেছেন, — “সব রকম গাড়ির নিয়মই ছিল এক, ‘যতগুলো ঘোড়া ,ততগুলো সইস’।”
কলকাতার সিমলার ছেলে নরেন্দ্রনাথ দত্ত তথা বালক স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, বড় হলে তিনি ঘোড়ার সহিস হবেন।
অবন ঠাকুর তো তাঁর লেখায় সমশের কোচোয়ান, রামু কোচোয়ান আর আক্কেল সহিসের কথা বারবার বলেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পলাতকা কাব্যগ্রন্থে ‘মায়ের সম্মান’ কবিতায় লিখেছেন, —
মায়ের সম্মান
অপূর্বদের বাড়ি
অনেক ছিল চৌকি টেবিল, পাঁচটা-সাতটা গাড়ি;
ছিল কুকুর; ছিল বেড়াল; নানান রঙের ঘোড়া
কিছু না হয় ছিল ছ-সাতজোড়া;
দেউড়ি-ভরা দোবে চোবে, ছিল চাকর দাসী,
ছিল সহিস বেহারা চাপরাসি।
— আর ছিল এক মাসি।…
গল্পগুচ্ছের মাস্টারমশায় গল্পে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, সহিসদের কথা —
“ময়দানে প্রবেশ করিতেই মজুমদারের গা কেমন করিয়া উঠিল। হঠাৎ তাহার মনে হইল — কোনো লোক নাই তবু তাহার পাশের জায়গাটা যেন ভরতি হইয়া উঠিতেছে; যেন তাহার আসনের শূন্য অংশের আকাশটা নিরেট হইয়া তাহাকে ঠাসিয়া ধরিতেছে। মজুমদার ভাবিল — এ কী ব্যাপার। গাড়িটা আমার সঙ্গে এ কী রকম ব্যবহার শুরু করিল। “এই গাড়োয়ান, গাড়োয়ান!” গাড়োয়ান কোনো জবাব দিল না। পিছনের খড়খড়ি খুলিয়া ফেলিয়া সহিসটার হাত চাপিয়া ধরিল; কহিল, “তুম্ ভিতর আকে বৈঠো।” সহিস ভীতকণ্ঠে কহিল, “নেহি, সা’ব, ভিতর নেহি যায়ে গা!” শুনিয়া মজুমদারের গায়ে কাঁটা দিয়া উঠিল; সে জোর করিয়া সহিসের হাত চাপিয়া কহিল, — “জলদি ভিতর আও।”
সহিস সবলে হাত ছিনাইয়া লইয়া নামিয়া দৌড় দিল। তখন মজুমদার পাশের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাইয়া দেখিতে লাগিল; কিছুই দেখিতে পাইল না, তবু মনে হইল, পাশে একটা অটল পদার্থ একেবারে চাপিয়া বসিয়া আছে। কোনোমতে গলায় আওয়াজ আনিয়া মজুমদার কহিল, “গাড়োয়ান, গাড়ি রোখো।” বোধ হইল, গাড়োয়ান যেন দাঁড়াইয়া উঠিয়া দুই হাতে রাশ টানিয়া ঘোড়া থামাইতে চেষ্টা করিল — ঘোড়া কোনোমতেই থামিল না। না থামিয়া ঘোড়া দুটা রেড রোডের রাস্তা ধরিয়া পুনর্বার দক্ষিণের দিকে মোড় লইল। মজুমদার ব্যস্ত হইয়া কহিল, “আরে, কাঁহা যাতা।” কোনো উত্তর পাইল না। পাশের শূন্যতার দিকে রহিয়া রহিয়া কটাক্ষ করিতে করিতে মজুমদারের সর্বাঙ্গ দিয়া ঘাম ছুটিতে লাগিল। কোনোমতে আড়ষ্ট হইয়া নিজের শরীরটাকে যতদূর সংকীর্ণ করিতে হয়, তাহা সে করিল, কিন্তু সে যতটুকু জায়গা ছাড়িয়া দিল ততটুকু জায়গা ভরিয়া উঠিল।”
চোখের বালি উপন্যাসে আছে, “মহেন্দ্র। এখনো প্রায়শ্চিত্ত করিবার সময় আছে বিনোদ। আমি যদি আর দ্বিধা না করি, সমস্ত পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাই, তুমি আমার সঙ্গে যাইতে প্রস্তুত আছ?
বলিয়া মহেন্দ্র বিনোদিনীর দুই হাত সবলে ধরিয়া তাহাকে কাছে টানিয়া লইল। বিনোদিনী কহিল, “ছাড়ো, আমার লাগিতেছে।”
মহেন্দ্র। তা লাগুক। বলো, তুমি আমার সঙ্গে যাইবে।
বিনোদিনী। না, যাইব না। কোনোমতেই না।
মহেন্দ্র। কেন যাইবে না। তুমিই আমাকে সর্বনাশের মুখে টানিয়া আনিয়াছ, আজ তুমি আমাকে পরিত্যাগ করিতে পারিবে না। তোমাকে যাইতেই হইবে।
বলিয়া মহেন্দ্র সুদৃঢ়বলে বিনোদিনীকে বুকের উপর টানিয়া লইল, জোর করিয়া তাহাকে ধরিয়া রাখিয়া কহিল, “তোমার ঘৃণাও আমাকে ফিরাইতে পারিবে না, আমি তোমাকে লইয়া যাইবই, এবং যেমন করিয়াই হউক, তুমি আমাকে ভালোবাসিবেই।”
বিনোদিনী সবলে আপনাকে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইল।
মহেন্দ্র কহিল, “চারি দিকে আগুন জ্বালাইয়া তুলিয়াছ, এখন আর নিবাইতেও পারিবে না, পালাইতেও পারিবে না।”
বলিতে বলিতে মহেন্দ্রের গলা চড়িয়া উঠিল, উচ্চৈঃস্বরে সে কহিল, “এমন খেলা কেন খেলিলে বিনোদ। এখন আর ইহাকে খেলা বলিয়া মুক্তি পাইবে না। এখন তোমার আমার একই মৃত্যু।”
রাজলক্ষ্মী ঘরে ঢুকিয়া কহিলেন, “মহিন, কী করছিস।”
মহেন্দ্রের উন্মত্ত দৃষ্টি একনিমেষমাত্র মাতার মুখের দিকে ঘুরিয়া আসিল; তাহার পরে পুনরায় বিনোদিনীর দিকে চাহিয়া মহেন্দ্র কহিল, “আমি সব ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছি, বলো, তুমি আমার সঙ্গে যাইবে।”
বিনোদিনী ক্রুদ্ধা রাজলক্ষ্মীর মুখের দিকে এক বার চাহিল। তাহার পর অগ্রসর হইয়া অবিচলিতভাবে মহেন্দ্রের হাত ধরিয়া কহিল, “যাইব।”
মহেন্দ্র কহিল, “তবে আজকের মতো অপেক্ষা করো, আমি চলিলাম, কাল হইতে তুমি ছাড়া আর আমার কেহ রহিবে না।”
বলিয়া মহেন্দ্র চলিয়া গেল।
এমন সময় ধোবা আসিয়া বিনোদিনীকে কহিল, “মাঠাকরুন, আর তো বসিতে পারি না। আজ যদি তোমাদের ফুরসৎ না থাকে তো আমি কাল আসিয়া কাপড় লইয়া যাইব।
খেমি আসিয়া কহিল, “বউঠাকরুন, সহিস বলিতেছে দানা ফুরাইয়া গেছে।”
বিনোদিনী সাত দিনের দানা ওজন করিয়া আস্তাবলে পাঠাইয়া দিত, এবং নিজে জানালায় দাঁড়াইয়া ঘোড়ার খাওয়া দেখিত।
গোপাল-চাকর আসিয়া কহিল, “বউঠাকরুন, ঝড়ু-বেহারা আজ দাদামশায়ের (সাধুচরণের) সঙ্গে ঝগড়া করিয়াছে। সে বলিতেছে, তাহার কেরোসিনের হিসাব বুঝিয়া লইলেই সে সরকার-বাবুর কাছ হইতে বেতন চুকাইয়া লইয়া কাজ ছাড়িয়া দিয়া চলিয়া যাইবে।”
সংসারের সমস্ত কর্মই পূর্ববৎ চলিতেছে।
তবু যেন সহিসরা কাব্যে উপেক্ষিত।
উত্তর কলকাতায় ঘোড়ার আস্তাবলগুলি ক্রমশ অবলুপ্ত হচ্ছে। তবে ঘোড়াদের জল খাওয়ার বাঁধানো পাত্রগুলো রাস্তার পাশে কোথাও কোথাও চোখে পড়ে।
কুমারটুলি অঞ্চলে অতীতে কলকাতার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির আবাসবাটি ছিল। ১৭০০ সালে কুমারটুলির নন্দরাম সেন কলকাতার প্রথম কালেক্টর নিযুক্ত হন। এঁকে ব্ল্যাক ডেপুটি বলা হত। কুমারটুলিতে বর্তমানে তার নামে একটি রাস্তা আছে। পরবর্তী ব্ল্যাক ডেপুটি গোবিন্দরাম মিত্র এই অঞ্চলে ১৬ একর জমিতে এক প্রাসাদোপম অট্টালিকা নির্মাণ করেন। তাঁর তৈরি ব্ল্যাক প্যাগোডা নামক নবরত্ন মন্দির কলকাতার অন্যতম দ্রষ্টব্য। ১৭৩৭-এর প্রলয়ঙ্কর ঝড়ে তার চুড়ো ভেঙে পড়েছিল।
লৌকিক ছড়ায় উল্লিখিত বনমালী সরকার বাড়ি ঊনিশ শতক পর্যন্ত কুমারটুলিতে অবস্থিত ছিল। কুমারটুলিতে তার নামে একটি বিখ্যাত গলি রয়েছে।
এই সমস্ত নামীদামি ব্যক্তির বাড়িতে ঘোড়ার গাড়ি যেমন মজুত ছিল, ঘোড়ার সহিস ও কোচোয়ানও ছিল। বাগবাজার, শোভাবাজার ও শ্যামবাজারের বনেদিবাড়ির ঘোড়ার গাড়ির সহিসদের আস্তানা ছিল কুমারটুলিতে। কুমার মানে যে সহিসও হয়, তা কলকাতাবাসী ভুলতে বসেছে। তবে নতুন করে জেগে ওঠা ‘কার কত বড়’ কাজিয়ায় ঘোড়ার কোচোয়ান ও সহিসরা যদি একটু জায়গা পেত, তবে আমাদের ভালো লাগত। কথায় আছে দেবী দুর্গা মর্ত্যে এলে গহনা পরেন জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে, নাচ দেখেন শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বাড়িতে আর আহার সারেন কুমারটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে। মিত্র বাড়ির পুরনো সহিসরা সব গেল কোথায়!