| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বার্ধক্যের নিঃসঙ্গ ছায়া: একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও অবসাদ : যশোবন্ত রায় মনসার ঢেলাফেলা পার্বণ মনসাভক্তদের একচক্ষু দেবীকে নিবেদনের লোকাচার : অসিত দাস সংকট সমাধান ও সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার এখন বারাণসী যেতে মন চায় না : বিজয় চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কারানল : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দৃশ্যমান দুর্যোগের বাইরে জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর সংকট : নিকোলাস বিশ্বাস রামবাগানের ইন্দুবালা : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ গণমানুষের কবি সুকান্ত : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার স্বাধীনতা তুমি কার : সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মনসার ঢেলাফেলা পার্বণ মনসাভক্তদের একচক্ষু দেবীকে নিবেদনের লোকাচার : অসিত দাস

Reporter
অসিত দাস / ৭৫ Views জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

চচ্চড়ি চলে গেল। আসছে অরন্ধন, দশহরা। বলাবাহুল্য সবই মনসার পূজা এগুলো। শাকরাখা আর ঢেলাফেলা পার্বণও আছে।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ ‘ঢেলা’ শব্দের একটি অর্থ আছে ‘বহির্গত চোখের তারা’। ‘ঢেলা বেরনো’ লব্জের অর্থ ‘চোখের ঢেলা বাহির হওয়া’। ‘দ্বিজ বংশীদাসের মনসার পাঁচালীতে ‘দুই চক্ষে ঢেলা’ পঙক্তিটি আছে। দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’য় আছে ‘চক্ষে নামবে ঢেলা’।

“এই সোণারায়কে কে করিবেক হেলা।

গলায় গবপুল নামব, চক্ষে নামব ঢেলা।।”

তিন-চারশ বছর আগে চোখের তারা বা ভাঁটাকে ঢেলা বলা হত।

চোখ বা অক্ষিগোলক দেবী চরণে নিবেদন করার প্রথা পৌরাণিক যুগ থেকেই আছে।

অকালবোধনের সময় দেবী দুর্গার আরাধনার সময় রামচন্দ্র ১০৮টি পদ্মের একটি কম পড়লে নিজের একটি চোখ উপড়ে দেবীর চরণে নিবেদন করেছিলেন। মতান্তরে দেবীকে উৎসর্গ করতে উদ্যত হয়েছিলেন, দেবী নিজেই তাঁকে নিরস্ত করেন, বলেন, ‘বিজয়ী ভব’।

বিষ্ণুকে নিয়েও পৌরাণিক কাহিনী আছে একটি। শিবকে তুষ্ট করতে সহস্র পদ্ম নিবেদন করছিলেন তিনি, একটি পদ্ম কম পড়ায়, তাঁর নিজের একটি চোখ দান করতে চেয়েছিলেন।

কন্নড় পৌরাণিক আখ্যানে নিজের চোখ উপড়ে নিবেদন করার আর একটি উদাহরণ আছে।

কন্নপ্পা ছিলেন এক শিবভক্ত। শিবের প্রতি কন্নপ্পার ভক্তি শুরু হয়েছিল এক বিশেষ সময়ে। যখন তিনি বনে শিকার করার সময় বায়ুলিঙ্গ দেখেন। এটি হল বায়ুরূপ শিবের প্রতিমূর্তি। তিনি শিবের সেই প্রতিমাটিকে তাঁর সাধ্যমত সবকিছু নিবেদন করতেন, যার মধ্যে ছিল তাঁর মুখের জল এবং তাঁর শিকার করা মাংস। এই কাজ ব্যতিক্রমী ও অপ্রচলিত হলেও, শিকারীর আন্তরিকতা এবং নির্মল হৃদয়ের জন্যে শিব তা গ্রহণ করেছিলেন। কন্নপ্পা একবার লক্ষ্য করেন যে লিঙ্গমটির একটি চোখ থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বিনা দ্বিধায়, কন্নপ্পা রক্তপাত বন্ধ করার জন্য নিজের একটি চোখ উপড়ে লিঙ্গমটির উপর স্থাপন করেন। যখন লিঙ্গমটির অন্য চোখ থেকেও রক্তক্ষরণ শুরু হয়, কন্নপ্পা তাঁর অবশিষ্ট চোখটি নিবেদন করার জন্য প্রস্তুত হন। তিনি যাতে সঠিকভাবে তাঁর চোখটি স্থাপন করতে পারেন তা নিশ্চিত করার জন্য, তিনি তাঁর পা দিয়ে সেই স্থানটি চিহ্নিত করেন। ভক্তির এই কাজে মুগ্ধ হয়ে, শিব আবির্ভূত হন এবং তাঁকে থামিয়ে দেন, তাঁর উভয় চোখ ফিরিয়ে দেন এবং তাঁকে মোক্ষ প্রদান করেন।

মনসার সঙ্গে চোখের সম্পর্ক কী? অনেকেই জানেন, একদিন শিব মনসাকে দেখে কামার্ত হয়ে বিবাহ করতে চাইলে মনসা তাঁকে জানান যে এটা কোনওমতেই সম্ভব নয়, কারণ তিনি মনসার পিতা। শিব তা না মেনে মনসাকে স্বগৃহে নিয়ে যান। শিবের পত্নী চণ্ডী তখন মনসাকে সপত্নী ভেবে প্রচণ্ড ক্রোধে মনসার একটি চোখ নষ্ট করে দেন বিল্বপত্র বা শলাকা দিয়ে। তাঁর ক্রোধানলে মনসার চোখ পুড়ে গিয়েছিল, না তিনি শলাকা দিয়ে মনসার একটি চোখ উৎপাটিত করেছিলেন, সে নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে চণ্ডী যে ক্রোধের বশে মনসার একটি চোখ নষ্ট করে দেন সেটি পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে চলে আসছে। মনসার নাম হয় চ্যাঙমুড়ি ‘কানী’।

ঢেলাফেলা নামটি কোথা থেকে এসেছে, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় না। অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে ‘ঢেরা-ফেলা’-র অপভ্রংশ ভেবেছেন। কিন্তু কেউ ভেবে দেখেননি, মনসার একটি নামই হতে পারে ‘ঢেলাফেলা’। মনসার একটি নয়নের তারা বা ঢেলা চণ্ডী শলাকা দিয়ে ঘোচা মেরে বের করে এনেছিলেন বা উপড়ে ফেলেছিলেন — তাই লোকমুখে মনসার আর এক নাম হয়েছিল ঢেলাফেলা দেবী (অর্থাৎ যে দেবীর চোখের ঢেলা উপড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে)। এইভাবে রাঢ়বঙ্গে মনসার পরিচিতি হয়েছিল একসময় ‘ঢেলাফেলা’ হিসেবে। তাই ঢেলাফেলা পার্বণ আর কিছুই নয়, মা মনসার পার্বণ।

আবার উদগ্র মনসাভক্তের চক্ষুনিবেদন হিসেবেও দেখা যেতে পারে ‘ঢেলাফেলা’-কে। যেখানে ভক্ত নিজেই দেবী মনসাকে নিজের একটি চোখ দান করছেন দেবীর থানে গিয়ে। তবে বাস্তবে চোখ ওপড়াচ্ছেন না, প্রতীকী মাটির ঢেলা অর্ঘ্য হিসেবে দিচ্ছেন মা মনসাকে।  তাই প্রথা বা পার্বণটির নামই হয়ে গেল ঢেলাফেলা পার্বণ।

বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় সর্পদেবী মনসা। মধ্যযুগের লোককাহিনী বিষয়ক মনসামঙ্গল কাব্যের তিনি প্রধান চরিত্র। প্রতিটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর গাথা-কাহিনীর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে রয়েছে সর্প-সংশ্লেষ। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিস, ক্রিট, ফিনিশিয়া, স্ক্যান্ডিনেভিয়া প্রভৃতি দেশে সর্পপূজার প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০-৩০০০ অব্দের সুমেরিয় শিল্পকলার নিদর্শনে দুটি পেচানো সাপের প্রতীকী উপস্থাপনা দেখা যায়। মিশরের ফারাওদের প্রতীক ছিল সাপ এবং ঈগল। এছাড়া তাদের ভূদেবতার মাথা ছিল সর্পাকৃতির এবং তিনি ছিলেন সকল সাপের অধিষ্ঠাতা দেবতা। হরপ্পা সভ্যতার সিলে সর্প-মানবের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে গ্রিকবীর আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারতে আসা সঙ্গীদের বর্ণনায় ভারতবর্ষে সর্পপূজার জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আলেকজান্ডার যখন ভারতে একের পর এক নগর অধিকার করছিলেন তখন তিনি কোনো এক স্থানে অন্যান্য পশুর সঙ্গে বৃহদাকৃতির সাপকে গুহার মধ্যে আবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। অথর্ববেদে প্রথমবারের মতো ঘৃতাচী নামক কিরাত কন্যার সর্পবিষ নাশের ক্ষমতার বর্ণনা পাওয়া যায়। গৃহ্যসূত্রে সর্পদংশন থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায় সে উপায় বর্ণিত হয়েছে — বর্ষাকালে চার মাস মাটিতে শয্যা নিষিদ্ধ, শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা রাতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উঁচু শয্যা এবং কয়েক মাস পরে অগ্রহায়ণ পূর্ণিমায় প্রত্যাবরোহন নামক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আবার ঘরের মেঝেতে শয্যা যাপন শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে সর্পদংশন থেকে রক্ষা পেতে শ্রাবণ-পূর্ণিমা থেকে অগ্রাহায়ণ-পূর্ণিমা পর্যন্ত প্রত্যহ সাপের উদ্দেশে বিভিন্ন ভোগ দেওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে।

জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু সম্প্রদায় দেবী মনসার পূজা আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে পালন করে। বর্ষার প্রকোপে এ সময় সাপের বিচরণ বেড়ে যায়, তাই সাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভক্তকূল দেবীর আশ্রয় প্রার্থনা করে। এছাড়া ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততির জন্য সর্পদেবীর ভক্ত তাঁর দ্বারস্থ হয়। মনসা একজন লৌকিক দেবী। তবুও তার অসাধারণ জনপ্রিয়তার কারণে হিন্দু সমাজের সকল সম্প্রদায় তাকে দেবী হিসেবে মর্যাদা দেয়। আদি পুরাণগুলিতে মনসার কোনো উল্লেখ নেই। অপেক্ষাকৃত নবীন পুরাণ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ও দেবীভাগবত পুরাণে মনসার উল্লেখ রয়েছে। মধ্যযুগের সাহিত্যকর্ম মনসামঙ্গল কাব্যে মনসার মাহাত্ম্য নিয়ে রচিত হয়েছে নানা গাথা কাহিনী।

মনসার সৃষ্টির বিষয়ে পুরাণ ও মঙ্গলকাব্যে রয়েছে দু’ধরণের ভাষ্য। পুরাণের ভাষ্য অনুযায়ী ব্রহ্মার নির্দেশে কশ্যপ মুনি সর্পবিষনাশক মন্ত্র রচনাকালে ধ্যানমগ্নাবস্থায় মন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আবির্ভাব ঘটে এবং তার মন থেকে আবির্ভাব ঘটায় দেবীর নাম হয় মনসা। পরবর্তী সময়ে তাকে বিয়ে দেওয়া হয় জরৎকারু মুনির সঙ্গে। মহাভারতে কশ্যপ ও কদ্রুর বিয়ে এবং তাদের ঘরে সহস্র সর্পের জন্ম সে সঙ্গে জরৎকারু ঋষির সঙ্গে সর্পরাজ বাসুকির বোন জরৎকারুর বিয়ে এবং আস্তিক মুনির জন্মলাভের কাহিনী বিবৃত হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে আস্তিক মুনি রাজা জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞ হতে মাতৃকুলকে রক্ষা করেন অর্থাৎ নাগবংশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে। মহাভারতে মনসা নামক কোনো সর্প দেবীর উল্লেখ নেই। তবে এ কাহিনী ঈষৎ পরিবর্তিত হয়ে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ও দেবীভাগবতম পুরাণে জরৎকারু স্ত্রী স্বনাম্নি জরৎকারুর স্থান দখল করেছে মনসা। পুরাণের কাহিনী অনুযায়ী মনসা কশ্যপ মুনির কন্যা। তিনি জন্মের পর কৈলাসপর্বতে গিয়ে হাজার বছর আরাধনা করে মহাদেবের কাছ থেকে দিব্যজ্ঞান লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে, কশ্যপ মুনি কন্যা মনসাকে জরৎকারু ঋষির নিকট সম্প্রদান করেন। কোনো এক সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় ঘুমন্ত স্বামীকে উপাসনার জন্য জাগালে, জরৎকারু ক্রোধান্বিত হয়ে স্ত্রী পরিত্যাগে উদ্যত হলে মনসার কাতর আহবানে বিষ্ণু, মহাদেব, কশ্যপ মুনির নিকট উপস্থিত হয়ে স্ত্রী পরিত্যাগে জরৎকারুকে নিবৃ্ত্ত করতে ব্যর্থ হয়। তবে নিজ ধর্ম রক্ষার্থে মনসার গর্ভে পুত্র উৎপাদনের আদেশ করেন দেবতাগণ। জরৎকারু দেবতাদের অনুরোধ রক্ষা করতে মন্ত্রবলে মনসার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করেন। সন্তানের নাম রাখা হয় আস্তিক, যিনি রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ থেকে মাতৃকূল রক্ষা করেন। পুরাণে এভাবেই মনসার কাহিনী বিবৃত হয়েছে। পুরাণে মনসাকে কশ্যপ ও জরৎকারুর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ফলে তিনি মর্যাদা লাভ করেন।

অন্য এক কাহিনীতে, মঙ্গলকাব্যের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে মনসা ও চাঁদ সওদাগরকে কেন্দ্র করে। পৃথিবীতে মনসার পূজা প্রচলনের প্রধান বাধা চাঁদ সওদাগর। চাঁদ শিব উপাসক তাই সে নিম্নবর্গের উপাস্যকে অর্ঘ্যদানে অনাগ্রহী। কিন্তু চাঁদ সওদাগর যতটা অনাগ্রহী মনসা ততটাই আগ্রহী কারণ চাঁদের পূজা না পেলে ধরণীতে তার পূজা প্রতিষ্ঠিত হবে না। চাঁদের স্ত্রী মনসার উপাসক, মনসা চাঁদের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য একে একে তার ছয় ছেলেকে বাণিজ্য জাহাজসহ সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়। সর্বশেষ সন্তান লখিন্দরকে মনসার নির্দেশে বাসরঘরে সর্প দংশন করে। পুত্রবধূ বেহুলা স্বামী লখিন্দরের লাশ কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে নদী পথ ধরে দেবপুরের উদ্দেশ্যে গমন করে এবং নানা বিপদ-আপদ পেরিয়ে অবশেষে নৃত্যগীতে দেবতাদের তুষ্ট করে। মহাদেব ও অন্যান্য দেবতাদের নির্দশে মনসা চাঁদ কর্তৃক ধরণীতে পূজার শর্তে লখিন্দরের জীবন সেই সঙ্গে চাঁদের অন্যান্য পুত্রদের সপ্তডিঙ্গাসহ ফিরিয়ে দেয়। বেহুলা ও চাঁদের স্ত্রী শুলকার পুনঃপুনঃ অনুরোধে অবশেষে চাঁদ মনসাকে পূজা দিতে রাজি হয় এবং মর্ত্যলোকে প্রতিষ্ঠিত হয় মনসা পূজা।

মঙ্গলকাব্যে শিবের কন্যা হিসেবেও দেখানো হয়েছে মনসাকে। বাংলায় শিব এক অতিসাধারণ হতদরিদ্র দেবতা যিনি কুঁড়েঘরে বাস করেন, যার সঙ্গে সমুদ্র মন্থনে প্রাপ্ত গরল পানকারী ত্রিশূলধারী পৌরাণিক শিবের অনেক পার্থক্য। বাংলায় শিব সাধারণের আপনজন হিসেবে ‘প্রভু’ ও গোঁসাই’ হিসেবে পরিচিত — যার প্রতীক লাঙল। মঙ্গলকাব্যের এ কাহিনীর মধ্যে লুকিয়ে আছে সাধারণের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয় এক দেবীর অনেক প্রচেষ্টার পর উচ্চবর্গের স্বীকৃতি আদায়ের বিবরণ। কোনো কোনো মনসামঙ্গল কাব্যে মনসার আরেক নাম সিদ্ধযোগিনী।

মনসা নামটির উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে নানা মত — কারো মতে, ভারতের কানাড়া অঞ্চল থেকে ‘মনে-মাঞ্চাম্মা’ নামক দেবীর নাম থেকে মনসা নামটি এসেছে, কারো মতে মহীশূরের ‘মুদামা’ নামক দেবীর নাম থেকে নামটি বাংলায় এসেছে। আবার কারো মতে ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরাঞ্চল প্রদেশের ‘মনসা’ দেবী বা মধ্যপ্রদেশের কোল উপজাতীয়দের ‘মনসা দেও’ নামক দেবতার নাম থেকে এসেছে নামটি। মনে-মঞ্চাম্মা’র অস্তিত্ব বাস্তবে নেই, সে এক অদৃশ্য সাপিনীর নাম, এ সাপিনীর উপর দেবীত্ব আরোপ করে বছরে একদিন নাগপঞ্চমীর দিনে পূজা নিবেদন করা হয়, তার কোনো প্রতিমা নির্মিত হয় না। মুদামা অর্ধ-নারী অর্ধ-সর্প আকৃতির প্রতিমা এবং নিম্নবর্গ কর্তৃক পূজিত কিন্তু সমাজের উচ্চকোটিতে পৌরাণিক চরিত্র সর্পরাজ বাসুকি জনপ্রিয়। পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরাঞ্চল প্রদেশের মনসা কোনো উল্লেখযোগ্য দেবী নয় আর মনসা দেও কোনো দেবী নয়, দেবতার নাম। ফলে বাংলার জনপ্রিয় দেবী মনসার নাম এসব অপ্রধান দেবী থেকে আসার সম্ভাবনা কম। মনসা দ্রাবিড় সভ্যতাবাহিত এদেশেরই দেবী।

মনসার নানাপ্রকার প্রস্তর, ব্রোঞ্জ ও পোড়ামাটির প্রতিমা পাওয়া গেছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। মূর্তিগুলোর অধিকাংশ চার বা দুই হাত বিশিষ্ট। উপবিষ্ট অবস্থায় উপস্থাপিত মনসার একপাশে স্বামী জরৎকারু অন্যপাশে ভাই ও নাগরাজ বাসুকি, কখনো কোলে সন্তান আস্তিক। মাথায় সাত ফনাযুক্ত মুকুট। ডান হাত ফলাঞ্চলিহস্ত, বাম হাতে কোলে আস্তিক কখনো বা সাপ থাকে। চার হাত বিশিষ্ট মনসার ক্ষেত্রে উপরের দুহাতে পানপাতা এবং নিচের ডানহাত ফলাঞ্চলিহস্ত ও বাম হাতে আস্তিক। ব্যতিক্রমও দেখা যায় কোনো প্রতিমায়। রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের চার হাত বিশিষ্ট মনসা প্রতিমাটি যোগাসনে উপবিষ্ট-নিচের ডানহাতে জপমালা, উপরের ডান হাতে সাপ এবং নিচের বা হাতে পান্ডুলিপি ও উপরের বা হাতে ঘট।

বগুড়ার মঙ্গলকোটে পাওয়া গেছে মনসার আদিতম প্রতিমা; দুহাত বিশিষ্ট প্রতিমাগুলির ডান হাত ফলাঞ্জলিহস্ত ও ডান হাতে কোলে আস্তিককে ধরে আছে। কোনটিতে আস্তিকের সঙ্গে ঘটের উপস্থিতি চোখে পড়ে। মাথায় সর্পফণা বিশিষ্ট মুকুট রয়েছে। গুপ্তযুগের এ প্রতিমাগুলির সময় ৫/৬ শতক। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে আটচল্লিশটিরও বেশি মনসা প্রতিমা আবিষ্কৃত হয়েছে। এ ছাড়াও মনসামঙ্গল কাব্যে বর্ণিত মনসার সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকটি চরিত্রের নামে বগুড়া জেলার প্রত্নক্ষেত্রের নাম পাওয়া যায়। যেমন, বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর, নেতাই ধোপানির পাট, ওঝা ধনন্তরীর ভিটা, চাঁদের বাড়ি, চাঁদের ধাপ, গোদার ধাপ — ফলে ধারণা করা হয় এ অঞ্চলে মনসা কাল্ট অনেক গভীরে প্রোথিত এবং উত্তরবঙ্গ থেকেই মনসা দেবীর উৎপত্তি।

অনেকে ভাববেন, ঢেলা আবার ফেলা কেন? তাহলে মেরে ফেলা, কেটে ফেলা, পেড়ে ফেলা, বাক্যাংশগুলির কথা মনে করিয়ে দিতে হয়। গ্রামের দিকে ‘কাতলা ফেলা’ বলে একটি লব্জ আছে। এটি আবার ডাকাতদের মুখের ভাষা। সিঙ্গুরের ডাকাতে কালীমন্দিরের এক সেবাইত এটা জানালেন। ‘ঢেলাফেলা’  মনসার একটি পার্বণ। পাশুপত শিবভক্তরা চড়কে যেমন বাণফোঁড়া, কাঁটাঝাঁপ, বঁটিঝাঁপ ইত্যাকার রক্তক্ষয়ী লোকাচার পালন করত, তেমনি উগ্র মনসাভক্তরা নিজের চোখ দেবীর চরণে নিবেদন করতে যেত, তবে তাদের নিরস্ত করা হত। বিনিময়ে একটি মাটির ঢেলা নেওয়া হত। এই প্রিমিটিভ প্রথা পরে বন্ধ হয়ে যায়। এখন মনসাদেবীর থানে মনসা গাছের ডালে  প্রতীকী একটি  মাটির ঢেলা বেঁধে দেওয়া হয়। কিংবা স্থানাভাবে গাছের নীচে ঢেলাগুলো রাখা হত।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev