
স্বামীজি বলেছেন — ‘চালাকি দ্বারা মহৎ কার্য সাধিত হয় না’।মহৎ কার্য হয়তো সাধিত হয় না কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই স্বার্থসিদ্ধি হয়। তার প্রমাণ দিয়েছিলেন নলিনীকান্ত সরকার। এ নিয়ে একটা মজার গল্প বলি।
নলিনীকান্ত সরকার যখন জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকার সম্পাদনা করতেন। স্বাভাবিকভাবেই সেই সময়কার বিখ্যাত লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা পাওয়ার জন্য তিনি ব্যাকুল থাকতেন। কিন্তু শরৎবাবু নিয়মিত লেখা দেওয়ার ব্যাপারে ভীষণ অলস এবং উদাসীন ছিলেন। নলিনীকান্তবাবু টানা দু-বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার করে শরৎচন্দ্রের বাড়িতে ধর্ণা দিয়েও কোনো লেখা আদায় করতে পারেননি।
‘বিজলী’ পত্রিকার পূজা সংখ্যার লেখা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে শরৎচন্দ্রের প্রতিশ্রুত সময়ে যতবার বাজে শিবপুরে শরৎচন্দ্রের বাড়িতে গিয়েছেন নলিনীকান্ত, ততবারই হতাশ হয়ে ফিরে এসেছেন। এইভাবে ছয়টি মাস ঘুরিয়ে, শেষকালে একখানি চিঠিতে অক্ষমতা জানিয়ে শরৎচন্দ্র লিখলেন, — ‘ভরসা এই যে তোমাদের কাগজও বন্ধ হবে না আর আমিও হয়তো মারা যাবো না। দেহটা একটু সুস্থ হলেই লিখতে শুরু করব।’
এই চিঠিই শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়েছিল ১৯২১ সালের পূজা সংখ্যার বিজলী পত্রিকাতে।
এরপরের বছর পুজো সংখ্যার জন্য আবার অনুরোধ এবার আর প্রতিশ্রুতি আদায় নয়, এবার নলিনীকান্ত একটি মোক্ষম ও রসাত্মক ফন্দি আঁটলেন।একদিন তিনি অত্যন্ত বিষণ্ণ মুখ করে শরৎবাবুর কাছে গিয়ে হাজির হলেন এবং বললেন :

নলিনীকান্ত সরকার ও দাদা ঠাকুর
“দাদা, এই সম্পাদনা করে যে সামান্য মাইনে পাই, তাতে সংসার চলে না। বাধ্য হয়ে একটা প্রাইভেট টিউশনি করতে হচ্ছে। হাওড়ার রামকৃষ্ণপুরে একটি টিউশনি খালি আছে শুনেছি। কিন্তু ভদ্রলোককে আমি চিনি না, আপনি যদি একটু কষ্ট করে আমার সাথে গিয়ে ওনার কাছে সুপারিশ করে দেন, তবে বড় উপকার হয়।”
সহজ-সরল ও পরোপকারী শরৎচন্দ্র তরুণ সম্পাদকের কষ্টের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন এবং তাঁর সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন। নলিনীকান্ত শরৎচন্দ্রকে ধাপ্পা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে এনে একখানি ট্যাক্সি ভাড়া করলেন এবং অস্পষ্ট নানা কথা বলে পটুয়াতোলা লেনের মেসে গিয়ে উঠলেন। “শ্রদ্ধাস্পদেষু” বইতে এর উল্লেখ আছে।
ট্যাক্সি বিদায়ের করে শরৎচন্দ্রকে নিয়ে উঠলেন দ্বিতলের তার নিজের কক্ষতে। কিছুক্ষণ পরে চাকর নিয়ে এলো গরম টোস্ট, ডিম, চা, সিগারেট ও দেশলাই। এরপর একটি রাইটিং প্যাড ও একটি ফাউন্টেন পেন সেখানে রেখে নলিনীকান্ত বললেন, “দাদা চা খেয়ে দয়া করে আমার লেখাটি লিখুন। লেখা না দিলে আপনার নিষ্কৃতি নেই। আমি দরজা বন্ধ করে আরেকটি ঘরে রইলাম। লেখা শেষ হলে আমাকে ডাকবেন দরজা খুলে দেবো।” এরপর সেই ঘরে শিকল এঁটে দেওয়া হল।
বন্দিদশার এই অভিনব ফন্দি দেখে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রেগে যাওয়ার বদলে ভীষণ মজা পেলেন। তিনি ঘরের ভেতর আরাম করে বসে চা-সিগারেট খেলেন এবং টানা তিন ঘণ্টা ধরে একটি চমৎকার ভ্রমণকাহিনী লিখে ফেললেন, যার নাম ছিল — ‘দিন কয়েকের ভ্রমণকাহিনী’।
লেখাটি শেষ করে জানলা দিয়ে নলিনীকান্তের হাতে দিতেই ঘরের তালা খুলে দেওয়া হয়। বাংলা সাহিত্য জগতে লেখা আদায়ের এমন মধুর ও চতুর চক্রান্ত সত্যিই বিরল।
কিন্তু কে ছিলেন এই নলিনীকান্ত সরকার? ১৮৮৯ সালের আজকের এই দিনে (২৮শে সেপ্টেম্বর) মালদহ জেলার কালিয়াচকে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীত জগতের এই বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে সংগীতের স্বরলিপি রচনা, হাসির আড়ালে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলা থেকে শুরু করে ‘বিদ্রোহী’ কবির আজীবন বন্ধু হওয়া — তাঁর জীবন ছিল এক রূপকথার মতো।
বিখ্যাত কৌতুক ব্যক্তিত্ব শরৎচন্দ্র পণ্ডিত (দাদাঠাকুর) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ পত্রিকায় নলিনীকান্ত সরকারের সাংবাদিকতা জীবনের শুরু হয়। পরবর্তীতে দাদাঠাকুরের জীবদ্দশাতেই তিনি তাঁর জীবনীগ্রন্থ ‘দাদাঠাকুর’ রচনা করেন, যা নিয়ে পরে একটি সফল চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছিল (যেখানে ছবি বিশ্বাস নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন)।
‘জঙ্গীপুর সংবাদ’-এর এই প্রাথমিক অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই তিনি পরবর্তীতে কলকাতার মূলধারার সাংবাদিকতায় পা রাখেন। ১৯২০ সালে বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষের উদ্যোগে যখন প্রগতিশীল সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে,তখন নলিনীকান্ত তার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দাদাঠাকুরের গ্রামীণ পত্রিকার আঙিনা থেকে বেরিয়ে এসে ‘বিজলী’র মাধ্যমে তিনি তৎকালীন কলকাতার রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
শুরুতে ‘বিজলী’র একটি বড় অংশ জুড়ে চলচ্চিত্র বা ফিল্ম বিষয়ক আলোচনা থাকত, যা তৎকালীন বাংলা সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে বেশ নতুন ও অভিনব একটি প্রয়াস ছিল। তবে পরবর্তীতে এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক সাপ্তাহিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।মজার বিষয় হলো, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ‘ডি.এম. লাইব্রেরি’ (D.M. Library)-এর বীজ বপন হয়েছিল এই বিজলী পত্রিকার অফিসেই।
কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায়। কিন্তু কবিতাটির অসম্ভব জনপ্রিয়তার কারণে নজরুল-সুহৃদ নলিনীকান্ত সরকার কবিতাটি নিজের সম্পাদিত ‘বিজলী’ পত্রিকায় পুনর্মুদ্রণ করেন। বিজলী পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ছাপা হওয়ার পর ওই সংখ্যার প্রায় ২৯ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল এবং চাহিদা এতোটাই ছিল যে এক সপ্তাহে পত্রিকাটির দুটি সংস্করণ বের করতে হয়েছিল। বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এটি ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ‘বিজলী’ পত্রিকা ছিল নলিনীকান্ত সরকারের সাংবাদিক জীবনের এক স্বর্ণালী অধ্যায়, যার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন প্রগতিশীল সাহিত্য ও বিপ্লবী মানসিকতাকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত গভীর ও আজীবন বন্ধুত্ব ছিল। মূলত নলিনীকান্ত সরকারের আগ্রহ ও উদ্যোগেই নজরুল গ্রামোফোন রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি নজরুলের প্রথম স্বরলিপি সংকলন ‘সুরমুকুর’ (১৯৩৪)-এর স্বরলিপিকার ছিলেন, যেখানে নজরুলের ২৭টি গানের স্বরলিপি রয়েছে। এছাড়া তিনি নিজেও বেতারে নজরুলের বেশ কিছু গান গেয়েছেন। দুই বন্ধুর এক মজার ঘটনা বলি –
নজরুল যখন কলকাতায় থাকতেন, তখন টাকা-পয়সার হিসাব রাখার ব্যাপারে তাঁর কোনো হুঁশ ছিল না। একবার নজরুল তাঁর একটি বইয়ের স্বত্ব বিক্রি করে একসঙ্গে বেশ কিছু টাকা পান। তখনকার দিনে সেই টাকার অঙ্কটা ছিল বেশ বড়। নজরুল টাকাগুলো পকেটে নিয়ে সোজা নলিনীকান্তের কাছে এসে বললেন, “নলিনী, আজ আমরা রাজা! চল, এই টাকাগুলো খরচ করে আসি।” দুজনে মিলে একটি ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করলেন। নজরুল গাড়োয়ানকে বললেন, কলকাতা শহরের যেখানে যত ভিক্ষুক এবং গরিব মানুষ আছে, তাদের খুঁজে বের করতে। নজরুল গাড়িতে বসে দু-হাত ভরে টাকা ছড়াতে লাগলেন, আর নলিনীকান্ত হেসেই আকুল। বিকেল ফুরনোর আগেই নজরুলের পকেট সম্পূর্ণ খালি হয়ে গেল। নলিনীকান্ত যখন জিজ্ঞেস করলেন, “বাড়ি ফিরবি কী করে নজরুল? একটা পয়সাও তো রাখলি না!” নজরুল তখন হা-হা করে হেসে উঠে বলেছিলেন, “আরে, টাকা তো আসার জন্যই আসে, যাওয়ার জন্যই যায়। কিন্তু আনন্দটা তো আটকে রইল আমাদের বুকে!”
তরুণ বয়সে নলিনীকান্ত ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। বৈষ্ণব পরিবারে জন্ম হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি তাঁর টান ছিল। ১৯২১ সালে পুদুচেরিতে (পণ্ডিচেরি) তিনি শ্রী অরবিন্দের দর্শন পান এবং যোগ সাধনায় আকৃষ্ট হন। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে তিনি সপরিবারে স্থায়ীভাবে পুদুচেরি শ্রী অরবিন্দ আশ্রমে চলে যান এবং সেখানেই ১৯৮৪ সালের ১৮ই মে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর লেখা জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্রদ্ধাস্পদেষু, দাদাঠাকুর, হাসির আড়ালে ইত্যাদি।
পরিশেষে বলা যায়, নলিনীকান্ত সরকার কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তাঁর হাসির গান যেমন বাঙালিকে আজীবন আনন্দ যুগিয়েছে, তেমনি তাঁর স্মৃতিকথামূলক লেখাগুলো আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এক স্বর্ণযুগ ও তার দিকপালদের সঙ্গে। নজরুল-শরৎ-রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য এই ক্ষণজন্মা পুরুষের জন্মতিথিতে আমাদের অঙ্গীকার হোক—তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়া। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের আকাশে তিনি এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়ে চিরকাল জ্বলজ্বল করবেন। এই পুণ্য তিথিতে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই সারস্বত সাধককে জানাই আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।