স্বাধীনতা লড়াইয়ের সময় কংগ্রেসের ইংরেজিবিদ্য বাবু, নেতারা দেশের শেকড় খুঁজতে বেরিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন সিউড়িতে এই সেরপাইয়ের। তাঁরা এর ইংরেজি নাম দিয়েছিলেন সিউড়ি বোল।
সেরপাইয়ের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বাংলার মাপনচর্চা। সেরপাই শুধু এখন মধ্যবিত্তের ঘর সাজানোর এক পণ্যমাত্র।
বাংলার জ্ঞানভাণ্ডারে যে সব মাপন একক রয়েছে, সের থেকে পাই, তাঁর দুটি শব্দাংশ। অঙ্ক কষা, সভ্যতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ঔপনিবেশিক পশ্চিম যে মানুষদের অশিক্ষিত, অজ্ঞ, মুর্খ ইত্যাদি নামে ভূষিত করে আদিবাসী, অন্ত্যজ ইত্যাদি বর্গে বর্গীকৃত করেছে— লৌকিক বা পাগান বলে তথাকথিত মূলস্রোত (কাকে বলে?) থেকে বিতড়িত করে তাঁদের জাদুঘরীয়তায় রূপান্তরিত করার আগ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছে, সভ্যতার ঊষা কাল থেকেই তারাই কিন্তু অঙ্কের, গণনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন — সে সাধারণ মাটি বা পাথরের বাড়ির স্থাপত্যের কাজই হোক, সমুদ্রে নৌকো চালাবার কাজই হোক বা চাষের কাজে আবহাওয়া মাপনের কাজই হোক, বা তাঁত চালাবার কাজই হোক। এই মাপনের দক্ষতা বা তাঁদের বিষয়ে জ্ঞানচর্চার কাজগুলি নিয়ে বিশদে খুব আলোচনা না হলেও, কয়েকটা যে ছুটকো ছাটকা আলোচনা হয় নি এ কথা বলা যাবে না।

কিন্তু বাস্তবে যে আলোচনাটা প্রায় বিন্দুমাত্রই হয়নি, অন্তত এই পোড়া বাংলায়, তা হল মেয়েদের অন্তপুরের মাপন পদ্ধতি এবং তার বৈচিত্র্য। অন্তত বছর ছয়েক আগে লেখকের সঙ্গে একটি চলচ্চিত্র সাক্ষাৎকারে জয়া মিত্রদিদি বলেছিলেন, মেয়েরা সমাজের পুষ্টিধারক — কোন শস্য পুড়িয়ে খেতে হবে, কোনটিবা কাঁচা, কাকে আবার সেদ্ধ করে, বা কাকে নানা পদ্ধতিতে গুঁড়ো করে সেবন করতে হবে সেই অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ কাজটি মানব সভ্যতার ঊষাকাল থেকে সমগ্র মানবজাতির জন্য ধন্যবাদহীনভাবে করেছিলেন বলেই আজ মানুষ মানুষ হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার কাজটি করতে গিয়ে কত মহিলা বিষ শস্য খেয়ে প্রাণ দিয়েছেন, কত মহিলা অসুস্থ হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। একই সঙ্গে তাঁদের সেই সব শস্যকে মাপন করতে হয়েছে। সেই মাপনের কাজে ব্যবহৃত পাত্র বিভিন্ন একালায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। সেই মাপনগুলি আধুনিক কালে রূপান্তরিত হয়েছে সেরপাইতে। সের থেকে পাই পর্যন্ত এই হিসেব করার কাজটি করতেন মহিলারা।
বীরভূমের সিউড়ির কাছের গ্রাম লোকপুর খ্যাত সেরপাই-এর জন্য। এই গ্রামেরই ভোলানাথ কর্মকার শুধু বাংলাই নয়, ভারতের নানান স্থানে বেশ নাম কুড়িয়েছেন সেরপাই তৈরির জন্য। ভোলানাথ এই শিল্পটি শিখেছেন তাঁর শ্বশুর মশাই কার্তিক কর্মকারের কাছ থেকে। আর যেহেতু লৌকিক শিল্পীদের পরিবারও সাধারণভাবে তাঁদের নানান কাজে হাত লাগান। সেরপাই তৈরিতে ভোলানাথের স্ত্রী রুমা আর কন্যা পুতুলও যথেষ্ট দক্ষ কিন্তু তাঁরা ভোলানাথের সহকর্মীরূপেই বেশি কাজ করতে উৎসাহী।

আগে আমকাঠ দিয়ে তৈরি হত সেরপাই, এখন হয় সেনাঝুরি দিয়ে। নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী কেটে যে পাত্র বা খোনাটি তৈরি হয়, তার নাম ডোল। একে ঘসে মসৃণ করা হয়। ভুষো কালি, শিরিষ আঠা আর রজন দিয়ে কালো রং করা হয়। এর পর নকশা তৈরির পালা।
এর পর বাইরে তৈরি হয় পিতলের কারুকাজ, পিতলের পাত কেটে। পিতলের পাতের নকশার জন্য রয়েছে পুরোনো দিনের ফর্মা। নতুন সময়ে নতুন নতুন নকশারও প্রচলন হচ্ছে। তবে পুরোনোগুলো দেখতে কিন্তু বেশ সুন্দর। ফর্মা থেকে নকশা তুলে পাত কেটো ভ্রমর আর ফাইল দিয়ে সেই নকশা ফুটিয়ে তারপর এটি লাগানো হয় ডোল জুড়ে। এর পর পালিশ। তৈরি হল সেরপাই।
বাংলায় পরম্পরার মাপন দ্রব্য তৈরি হত যে অঞ্চলে যে সব দ্রব্য পাওয়া যায় সেগুলি দিয়ে। যেমন কাঠ, বেত, বাঁশ, ধাতু, প্রভৃতি। বাংলার নানান উতপাদক এই উপাদানগুলি থেকে অনিন্দ্যসুন্দর নানান পরিমাপক বস্তু তৈরি করেছিলেন বাংলার মায়েরা। তাঁরা এই মাপযন্ত্রগুলি নিয়ে অন্তঃপুর সামলাতেন।
নিচের যে মাপন যন্ত্রের ছবি দেখা যাচ্ছে, সেটি ডোকরা পদ্ধতিতে তৈরি প্যাঁচা আকারের। দুটি অংশ। একটি মাথা – যেটি ঢাকনা দেওয়া হয়। অন্যটি তার ধারক বা পেট, যেখানে নানান রকমের দ্রব্য থাকে এবং মাপন করে দেওয়া হয়। ‘অথচ এই সেরপাই, তথাকথিত ‘সিউড়ি বোলস’ দুই দশক আগেও পুরুলিয়া, বাঁকুড়া মেদিনীপুরের গ্রামে এবং শহরেও নিত্য প্রচলিত ছিল। বেত, সাধারণ কাঠ, দস্তা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হত নিত্যব্যবহার্য্য সেরপাই। পাঁচ-ছ’বছর আগেও পুরুলিয়া শহরের হাটে বিক্রি হতো। বাজারে চলতি সের তরাজুর বদলে অল্প পরিমাণ ধান-চাল, মুড়ি চিড়েমাপার ঘরোয়া কাজে এইসব মাপপাত্রগুলি বেশি জনপ্রিয় ছিল, বিশেষত মেয়েদের কাছে। হাট থেকে এগুলির প্রধান ক্রেতা ছিলেন তাঁরাই। মেয়েদের নিজস্ব বেচাকেনা ব্যবস্থায় সের আর পাই নামে এই তিন কিম্বা চারটি এককের সেটই অন্যান্য মাপন একক হিসাবে বেশি জনপ্রিয় ছিল। অবসর সময়ে বসে মেয়েরাই এগুলো তৈরিও করতেন।’

ডোকরা পদ্ধতির উৎপাদকেরা ছিলেন সাধারণত যাযাবর—আজ তাঁদের এই চরিত্র পালটে দেওয়া হয়েছে সরকারি উদ্যোগে। সেই পরিবর্তনের ছায়া পড়েছে তাঁদের উতপাদন প্রক্রিয়া এবং তাঁদের উৎপাদিত বস্তুর গড়নে। তো এই পরিযায়ী ডোকরা উৎপাদকেরা যারা মোমছাঁচ গলানো পদ্ধতিতে ধাতুর নানান দ্রব্য উৎপাদন করতেন, তাঁরা যখন কোনো গ্রামের সীমানার বাইরে তাঁদের ভ্রাম্যমান গলন চুল্লি নিয়ে পৌঁছোতেন কয়েক দিনের জন্য, তখন গ্রামীণদের মধ্য থেকে তাগিদ আসত তাঁদের অকেজো বা ভেঙ্গে যাওয়া নানান ধাতু দ্রব্য থেকে বাড়ির নানান কাজের তৈজসপত্র বানিয়ে নেওয়ার। এটি ধারণ পাত্র হিসেবেও ব্যবহার হয়।