৫৪. পরবর্তী হিসাবটিতে (নং ৩) সেই বন্দোবস্তের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে যা তিনি প্রকৃতপক্ষে ওই জেলায় সম্পন্ন করেছিলেন; স্বাভাবিকভাবেই, পূর্ববর্তী বিবরণের তুলনায় এতে প্রায় প্রতিটি খাতের পরিমাণ ভিন্ন। তবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এতে জমিদারদের সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থ কিংবা রায়তদের পারিশ্রমিক বা জীবিকা নির্বাহের জন্য বরাদ্দকৃত জমি পুনরায় বাজেয়াপ্ত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি — অথচ পূর্ববর্তী বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে এগুলি আয়ের উৎসের (assets) অন্তর্ভুক্ত ছিল; তা সত্ত্বেও, তিনি ২৭,৪২,৫৫২ সিক্কা রুপি (S.R.) সমপরিমাণ দৃশ্যমান তহবিলের সন্ধান পেয়েছিলেন।
কিস্তি ২০-র ৫৪ পয়েন্টে উল্লিখিত পরিশিষ্টের ৩ নং তালিকা
দিনাজপুরের হাস্তবুদ (ভূমি ও সম্পদের জরিপ), ১১৬৯ বঙ্গাব্দ (১৭৬২-৬৩ খ্রিস্টাব্দ)
ঠিকাদার রামনাথ বাড়ৈর প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী রাজস্ব বন্দোবস্ত, আদায় ও উদ্বৃত্তের বিবরণী
১. মূল রাজস্ব ও আবওয়াব (অতিরিক্ত কর)
খাত টাকা আনা পয়সা
আসল জুমা (মূল খাজনা) ৭,২২,৮০২ ১২ ১৯ ৩
আবওয়াব (স্থায়ী কর) ১১,২৩,৫১৬ ২ ৬ ৩
হাসবুল-ওসুলি (আনুমানিক আদায়) ২১,৩৭৭ ৫ ১১ ০
নজরানা-মুকরি (নির্ধারিত উপহার কর):
১১৬৬ বঙ্গাব্দ ৯১,২৫৯ ২ ১১ ১
১১৭৬ বঙ্গাব্দ ১,৫৪,২০৮ ৬ ১০ ০
মোট কর ২,৪৫,৪৬৭ ৯ ১ ১
আসল ও আবওয়াবের মোট ১৩,৯০,৩৬১ ১ ২ ০
২. অতিরিক্ত কর (নজরানা-হাল ও শার্ফ)
খাত টাকা আনা পয়সা
নজরানা-হাল (৫ মাসের কর) ২,৮২,২৮১ ০ ১৯ ২
শার্ফ সিক্কা (প্রতি রুপিতে
১.৫ আনা হারে বাট্টা) ২,২৪,৪৬৫ ১১ ৩ ১
মোট ৫,০৬,৭৪৭ ১২ ২ ৩
৩. সায়ার (শুল্ক ও অন্যান্য কর)
খাত টাকা আনা পয়সা
আসল (মূল সায়ার) ১,১৪,৮৪৯ ৬ ১৫ ৩
আবওয়াব (সায়ারের ওপর কর) ১২,৬১৯ ১ ১৮ ১
শার্ফ (প্রতি রুপিতে ১.৫ আনা) ১১,৯৫০ ৩ ৭ ০
মোট মাহাল ও সায়ার ১,৩৯,৪১৮ ১২ ১ ০
৪. আদায়-ব্যয় (সেরিঞ্জামি) ও নিট রাজস্ব
বিবরণ টাকা আনা পয়সা
মোট মাহাল ও আবওয়াব ২৭,৫৯,৩২৯ ৬ ২ ৫
বিয়োগ: সেরিঞ্জামি (আদায়-ব্যয়) ৭৮,৩৪২ ৬ ১০ ১
অবশিষ্ট ২৬,৮০,৯৮৬ ১৫ ১৫ ১
চুয়ান/আহুক (ভবন নির্মাণ ব্যয়ের জন্য কর) ৩৮,৩৭৭ ৫ ১৯ ০
১১৬৯ বঙ্গাব্দের মোট জুমা ২৭,১৯,৩৬৪ ৫ ১৪ ১
৫. পূর্ববর্তী বছরের উদ্বৃত্ত
খাত টাকা আনা পয়সা
১১৬৭ বঙ্গাব্দের উদ্বৃত্ত (নগদ) ৫,৪৮৬ ৮ ১৫ ০
আদায়ের উদ্বৃত্ত ১৭,৭০১ ৩ ১৯ ০
মোট জুমা ও উদ্বৃত্ত ২৩,১৮৭ ১২ ১৪ ০
৬. আদায় ও নিট আদায়
বিবরণ টাকা আনা পয়সা
মোট আদায় ২২,৫৫,৩২৮ ১৩ ৮ ০
বিয়োগ: স্বল্পতা (কম ওজন) ১,৪৪,৯৯৩ ৩ ৩ ০
নিট আদায় ২০,১০,৩৩৫ ১০ ৫ ০
উদ্বৃত্ত ৭,৩২,২১৬ ৮ ৩ ১
৭. আদায় ও উদ্বৃত্তের ব্যাখ্যা
বিবরণ টাকা আনা পয়সা
নিট আদায় (স্বল্পতা বাদে) ২০,১০,৩৩৫ ১০ ৫ ০
বিয়োগ: ঠিকাদারের চুক্তি অনুযায়ী আদায়-ব্যয় ৭৮,৩৪২ ৬ ১০ ১
উপ-ঠিকাদারদের বন্দোবস্তে অন্তর্ভুক্ত ৬,৪৪,৩৬৯ ১৫ ০ ০
বিয়োগম: বাদ-বাকি – – – –
রামনাথ বাড়ৈর দ্বারা পরিশোধিত ও কর্তনকৃত ১,৮১,৮৫৯ ০ ০ ০
নিট আদায় ১৫,৩৬,০৩৩ – – –
রাজস্ব পরিশোধের জন্য ধার ১,০৯,৯৪৮ ১২ ৯ ৩
সিক্কা রুপিতে আদায় – – – –
চুয়ান খাতে আদায়ের পার্থক্য ৯,৪৫১ ০ ০ ০
উভয় হিসাব অনুযায়ী নিট আদায় ২০,১০,৩৩৫ ১০ ৫ ০
৮. ঠিকাদারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী উদ্বৃত্ত
কারণ টাকা আনা পয়সা
রায়তদের পলায়নের কারণে ঘাটতি ২,০১,৩৮০ ৬ ০ ০
সায়ারের হিসাবকৃত আদায়ে ঘাটতি ৩৩,১৪০ ৬ ০ ০
হাসবুল-ওসুলি (আনুমানিক আদায়) এ ঘাটতি ১২,৯৯২ ৪ ০ ০
নজরানা-হাল পরিশোধে রায়তদের অস্বীকৃতি ২,৩৫,৬৮৩ ১০ ০ ০
মোট উদ্বৃত্ত (ব্যালেন্স) ৭,৩২,২১৬ ৮ ৩ ১
৯. উদ্বৃত্তের সমন্বয়
খাত টাকা আনা পয়সা
গুইরে বলান্নি (জমি পুনরুদ্ধার কর) ১,০০,০০০ ০ ০ ০
জমিদারদের সম্পত্তি বিক্রি ৪৮,৫৪০ ৭ ৬ ৩
সম্পদের ঘাটতি ৩,০১৫ ১৩ ২ ৩
মোট নিট উদ্বৃত্ত ৮,৮৩,৭৭২ ১২ ১২ ৩
বিয়োগ: ধার করা অর্থ ১,০৯,৯৪৮ ১২ ৯ ৩
সমন্বিত উদ্বৃত্ত ৭,৭৩,৮২৪ ০ ৩ ০
[অনুবাদকের জোড়া উল্লিখিত তালিকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট – দিনাজপুরের হাস্তবুদ (ভূমি জরিপ) ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। এই তালিকা ১৭৬২-৬৩-র দিনাজপুর জেলার রাজস্ব কাঠামোর সম্পূর্ণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে এবং ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির জটিলতা ও কৃষক-শোষণের প্রক্রিয়া উন্মোচন করে। এর মূল বৈশিষ্ট্য —
১. রাজস্বের বহুস্তরীয় কাঠামো: এই তালিকায় রাজস্বের তিনটি স্তর দেখা যায় — আসল জমা (মূল খাজনা), আবওয়াব (স্থায়ী কর), এবং নজরানা-হাল, শার্ফ, কুচ্ছা বলান্নির মতো অতিরিক্ত কর। মোট রাজস্ব (২৭,৫৯,৩২৯ টাকা) মূল খাজনার (৭,২২,৮০২ টাকা) তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি — যা কৃষকদের ওপর বিরাট বোঝা নির্দেশ করে।
২. ঠিকাদারি প্রথার জটিলতা: রামনাথ বাড়ৈ (ঠিকাদার) রাজস্ব চুক্তি গ্রহণ করলেও তিনি আদায়-ব্যয় (সেরিঞ্জামি) ও অন্যান্য খরচ বাবদ বিপুল অর্থ কর্তন করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রায়তদের পলায়ন, নজরানা-হাল পরিশোধে অস্বীকৃতি ইত্যাদি কারণে ৭,৩২,২১৬ টাকা উদ্বৃত্ত রয়ে গেছে — যা প্রমাণ করে যে কৃষকরা নির্ধারিত রাজস্ব দিতে অসমর্থ ছিল।
৩. হাস্তবুদের কৌশলগত ব্যবহার: মীর কাসিম রামনাথ বাড়ৈর তৈরি হাস্তবুদ (সম্পদের হিসাব) ব্যবহার করে তাকে চুক্তি নিতে বাধ্য করেছিলেন। এই কৌশলটি পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলেও ব্যবহৃত হয় – যেখানে স্থানীয় হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে রাজস্ব বৃদ্ধি করা হতো।
৪. ফিফথ রিপোর্টের প্রাসঙ্গিকতা: এই নথিটি ফিফথ রিপোর্টের ৪৮-৫২ পৃষ্ঠায় সংরক্ষিত ছিল, যা জেমস গ্র্যান্ট ও জন শোরের মধ্যে রাজস্ব-বিতর্কের ভিত্তি তৈরি করে। গ্র্যান্ট এই ধরনের তথ্য ব্যবহার করে যুক্তি দেন যে বাংলার রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব; অন্যদিকে, শোর এই করগুলোকেই কৃষক-শোষণের প্রমাণ হিসেবে দেখান।
৫. দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: এই রাজস্ব কাঠামোই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) ভিত্তি তৈরি করে, যা কৃষকদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আর্থিক ভিত্তি নির্মাণ করে। দিনাজপুরের এই হাস্তবুদ তাই শুধু একটি রাজস্ব হিসাব নয় — এটি উপনিবেশিক শোষণ-কাঠামোর এক জীবন্ত দলিল, যা দেখায় কীভাবে পরিসংখ্যান, কর ও ঠিকাদারি প্রথার মাধ্যমে কৃষকদের শ্রমের উদ্বৃত্ত লুণ্ঠন করা হয়েছিল।]
৫৫. তাঁর সমস্ত দক্ষতা ও প্রচেষ্টার পরেও, আদায়করা অর্থের পরিমাণ (সিক্কা রুপিতে) ছিল মাত্র ২০,১০,৩৩৮ রুপি; ফলে হিসাব নং ৩ অনুযায়ী বকেয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭,৩২,২১৬ রুপি। ২০,১০,৩৩৮ রুপির এই মোট অঙ্ক থেকে আমাদের পুনরায় আদায়-সংক্রান্ত খরচ বাদ দিতে হবে… ১,৮৭,৮০৯ — যার ফলে সরকারের প্রাপ্ত নিট অর্থের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৮,২২,৫২৬ রুপি; তাঁর প্রদেয় নির্ধারিত অর্থের সাথে এই প্রাপ্ত অর্থের পার্থক্য হলো ৮,৮৩,৪৯৩ রুপি। এই বকেয়া অর্থের একটি অংশ — ১,০৯,৯৪৮ রুপি — পরিশোধ করা হয়েছিল এমন অর্থের মাধ্যমে যা এই উদ্দেশ্যেই ধার করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫৬. ইজারাদারকে এই বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে অথবা এর কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছিল; তিনি তাঁর বন্দোবস্ত, আদায়করা অর্থ এবং বকেয়ার বিস্তারিত হিসাব দাখিল করেন। তাঁর ব্যর্থতা থেকে উদ্ভূত সন্দেহের বশবর্তী হয়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে সেই হিসাব পরীক্ষা করা হয়।
৫৭. তাঁর ব্যাখ্যা ছিল কৌতূহলোদ্দীপক, গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান যে, রায়তরা বাস্তবিকভাবে সেই জমি পুনরায় বাজেয়াপ্ত করার বিষয় মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল, এই জমি তাদের পারিশ্রমিক ও জীবিকা নির্বাহের জন্য বরাদ্দ ছিল; এবং যদিও বছরের শুরুতে তারা ‘নজরানা-মহল’ (Nuzzeranahal) বাবদ নতুন কর দিতে সম্মত হয়েছিল, তবুও তিনি দেখেন যে তা আদায় করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। এছাড়া তিনি এমন সব রায়তের একটি তালিকাও পেশ করেন যাদের ভিটা-মাটি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল; তাদের বকেয়া খাজনার পরিমাণ ছিল ২,৩৩,৭৪৬ রুপি ১৪ আনা ১৫ গণ্ডা।
৫৮. এই তথ্য-বিবরণী থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তের জবাবে যদি এমনও বলা হয় যে, ইজারাদারের হিসাবপত্র ছিল মিথ্যা আর বানোয়াট এবং তিনি যা পরিশোধ করেছিলেন তার চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করেছিলেন — এই প্রেক্ষিতে আমার [শোরের] উত্তর হলো: সাধারণ নীতি অনুযায়ী এ ধরনের যুক্তির যতই গুরুত্ব থাকুক না কেন, বন্দোবস্তের বিস্তারিত বিবরণই সেগুলোর যথাযথ খণ্ডন হিসেবে যথেষ্ট; যতক্ষণ না তা বাতিল করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হচ্ছে।
৫৯. সমগ্র সুবার সামগ্রিক হিসাব থেকে দেখা যায় যে, এই বন্দোবস্তের সময় সংশ্লিষ্ট জেলায় বকেয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৪৬,৩৯৫ টাকা। নতুন ও অত্যধিক কর আরোপের ক্ষেত্রে যে সতর্কতার প্রয়োজন ছিল, তা উপেক্ষা করা হয়েছিল; তাই বন্দোবস্তের পুরো অর্থ আদায় না হওয়াটা বিস্ময়কর নয়। ইজারাদার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন; আয়ের প্রতিটি উৎস খতিয়ে দেখা হয়েছিল এবং কোনো সম্ভাব্য আয়ের উৎসই বাদ রাখা হয়নি। আমি তাঁর আদায়করা অর্থের বিস্তারিত বিবরণ পরীক্ষা করেছি এবং দুই শতাধিক ছোটখাটো কর বা আদায়ের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছি; এগুলোর প্রকৃতিই ছিল জবরদস্তিমূলক এবং এগুলি কোনোভাবেই স্বাভাবিক রাজস্ব আদায়ের উৎস হতে পারত না বা হওয়া উচিত ছিল না।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ