৫৪. শক্তি ফিল্মসের শক্তি সামন্ত।
এক বাঙালি সন্তান মুম্বাই গিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খুব নাম করেছেন। তাঁর নাম অশোককুমার (গঙ্গোপাধ্যায়)। সকলে তাঁকে ‘দাদামণি’ বলে ডাকে। সেই অশোককুমারের সঙ্গে একদিন এক বাঙালি যুবক দেখা করতে এলেন। যুবকের ইচ্ছা সিনেমায় অভিনয় করবেন।
অশোককুমার সৌজন্যপরায়ণ মানবদরদী মানুষ। তিনি যুবকের বাড়ির কথা, লেখাপড়া, এইসব কথা জানতে চাইলেন।
পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না ডাকঘরে জন্ম যুবকটির। গ্রামের স্কুলে পড়া শেষ করে তিনি চলে গেলেন উত্তরপ্রদেশের বাদাউঁ শহরে। সেখানে থাকেন তাঁর কাকা। কাকার কাছে থেকে মাধ্যমিক স্তরের পড়াশুনো করবেন। কাকার ছিল বদলির চাকরি। কাকার সঙ্গে তাঁকেও ঘুরতে হল নানা জায়গায়। বাদাউঁ থেকে দেরাদুন। দেরাদুন থেকে কলকাতা।
তাঁর ইচ্ছা ছিল শিক্ষকতা করার। কলকাতায় এসে মিশে গেলেন নাটকের দলে। আসলে তাঁর বন্ধুদের অনেকে নাটকাভিনয় করতেন। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে, তাঁদের নাটক দেখে, যুবকটিও অভিনয়ের প্রেমে পড়ে গেলেন। নাটকের দলে ভিড়ে গেলেন। শুরু হল রিহার্সেল। বাড়ি ফিরতে দেরি হত। তাঁর কাকা মনে করলেন যে বখে যাচ্ছে তাঁর ভাইপো। শুরু করলেন বকাঝকা। বিরক্ত হয়ে উঠলেন যুবকটি। একদিন তিনি কাকার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন পথে।
যেতে হবে মুম্বাই। সেখানে যদি অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া যায়!
মুম্বাই এসে এক সস্তার হোটেলে থাকলেন। আর স্টুডিয়ো পাড়ায় ঢ়ুঁ মারতে লাগলেন। কেউ চেনে না যাকে, তার কি কাজ পাওয়া এত সহজ! এদিকে পয়সা-কড়িরও টানাটানি। খবরের কাগজে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে গেলেন ইন্টারভিউ দিতে। ডাপোলিতে একটা চাকরি পেলেন। শিক্ষকতার চাকরি। জীবিকার মোটামুটি একটা সুরাহা হল। কিন্তু অভিনয়ের কথা ভোলেন নি যুবক। প্রতি শুক্রবার তিনি বেরিয়ে পড়তেন ডাপোলি থেকে। ঘন্টাখানেক লাগত মুম্বাই আসতে।
যুবকের জীবন কাহিনি শুনলেন দাদামণি। যুবকের অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাঁর মন ছুঁয়েছে। তিনি বললেন, আপনি আগে এই সিনেমা জগতটার সঙ্গে পরিচিত হোন। তারপর অভিনয়।
যুবক বললেন, কি করতে হবে আমাকে?
অশোককুমার বললেন, আপনি আগে আমাদের এখানে সহকারী ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করুন। সেখানে অভিনয় দেখার, সিনেমা তৈরির কলা-কৌশল দেখার সুযোগ হবে। তবে হ্যাঁ, মাইনে পাবেন না। খাবার পাবেন, চা-টা পাবেন।
দাদামণির কথা মনে ধরল যুবকের। কাজে লেগে গেলেন তিনি।
যুবকের নাম শক্তি সামন্ত (১৯২৬-২০০৯)।
সহকারী পরিচালকের কাজ করতে করতে বাংলা স্ক্রিপ্ট হিন্দিতে অনুবাদ, ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় চলতে লাগল। ১৯৫৫ সালে পরিচালনা করলেন ‘বহু’। তারপর অবাধ গতি। একের পর এক। সফল বাণিজ্যিক সিনেমা। তৈরি করলেন ‘শক্তি ফিলমস”।
শূন্য থেকে শুরু করে মুম্বাই চলচ্চিত্র জগতের সফল মানুষ। তাঁর পরিচালনায় এক এক করে অনেক :
বহু (১৯৫৫), ইন্সপেক্টর (১৯৫৬), হিল স্টেশন (১৯৫৭), শেরু (১৯৫৭), হাওড়া ব্রিজ (১৯৫৮), ডিক্টেটিভ (১৯৫৮), ইনসান জাগ উঠা (১৯৫৯), জালি নোট (১৯৬০), সিঙ্গাপুর (১৯৬০), ইসিকি নাম দুনিয়া হ্যায় (১৯৬২), নটি বয় (১৯৬২), চিনা টাউন (১৯৬২), এক রাজ (১৯৬৩), কাশ্মীর কি কলি (১৯৬৪), সাওয়ান কি গাথা (১৯৬৬), অ্যান ইভিনিং ইন প্যারিস (১৯৬৭), আরাধনা (১৯৬৯), কটি পতঙ্গ (১৯৭০), পাগলা কঁহি কা (১৯৭০), জানে আনজানে (১৯৭১), অমর প্রেম (১৯৭২), অনুরাগ (১৯৭২), চরিত্রহীন ( ১৯৭৪), আজনবী (১৯৭৪), অমানুষ (১৯৭৫), মেহবুবা (১৯৭৬), অনুরোধ (১৯৭৭), আনন্দ আশ্রম (১৯৭৭), দ্য গ্রেট গাম্বলার (১৯৭৯), খোয়াব (১৯৮০), বরসাত কি রাত (১৯৮১), আযাশ (১৯৮২), আওয়াজ (১৯৮৪), আলাগ আলাগ (১৯৮৫), আর পার (১৯৮৫), অন্যায় অবিচার (১৯৮৫), অন্ধ বিচার (১৯৯০), দুশমন (১৯৯০), গীতাঞ্জলি (১৯৯৩), দেবদাস (২০০২)।
শক্তি সামন্তের শিষ্য প্রভাত রায় লিখেছেন :
‘শক্তিদাকে এখনও আমি খুব মিস করি। শুধু যে তাঁর কাছে কাজ শিখেছি, তা তো নয়। আমার সঙ্গে দাদার একটা আত্মিক সম্পর্ক ছিল। আমি ছিলাম তাঁর পরিবারেরই একজন। এত বছর ধরে কত অজস্র ঘটনার সাক্ষী থেকেছি। দাদার দলে যদি কেউ ভালো কাজ করতেন, তা হলে সকলের সামনে তাঁর প্রশংসা করতেন।
‘মানুষ হিসেবেও শক্তিদা ছিলে অসাধারণ। মুম্বাইএ তখন শুটিং করতে গেলে আমি শুটিংএর সরঞ্জাম নিতাম দাদার ‘নটরাজ স্টুডিয়ো’ থেকে। আমার জন্য দাদা সরঞ্জামের ভাড়ায় বিশেষ ছাড় দিতেন। মুম্বাইএ শুটিং করতে গেলে দাদা জানতেই পারতেন। নিয়ম ছিল তাঁর বাড়িতে গিয়ে রাতের খাবার খেতে হবে।
‘শক্তিদার পরামর্শ মেনে পরবর্তী সময়ে পরিচালক হিসেবে আমি অনেক পরিণত হয়েছি। এখন জানি না, নতুনদের কোনও পরিচালক অনুপ্রাণিত করেন কি না, বা কোনও পরামর্শ দেন কি না!’
শক্তি সামন্ত শিক্ষকতা করেছেন প্রথম জীবনে জানা ছিল না , হয়তো বায়োস্কোপ পরিচালনার খুঁটি নাটি তাই জন্যই নিখুঁত ভাবে প্রভাত রায় সহ অন্য অনেক কে শেখাতে পেরেছেন।