ভারতের বিচার ব্যবস্থা আর স্বাধীন নয়। এ কথা বলছেন সারাফিন ধনানি। ‘ভারতের বিচার ব্যবস্থা আর স্বাধীন নয়’ –এই বিযয়ে তাঁর একটি তিন পর্বের দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ‘লফেয়ার’ পত্রিকায়। সারাফিন ধনানি ল’ফেয়ার ইন্সটিটিউটের লিগ্যাল ফেলো। তিনি পূর্বে এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মানবাধিকার বিষয়ক রাষ্ট্রদূতের অধীনে এবং নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মার্কেটস গ্রুপে কর্মরত ছিলেন। ওয়েলেসলি কলেজ থেকে স্নাতক হন, স্ট্যানফোর্ড ল স্কুল থেকে জেডি ডিগ্রি লাভ করেন। সেখানে তিনি স্ট্যানফোর্ড ল রিভিউ-এর সিনিয়র আর্টিকেলস এডিটর ছিলেন।
সারাফিনের মতে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সরকারের স্বৈরাচারী ভূমিকার প্রতিষেধকের কাজ করে বিচার ব্যবস্থা। কিন্তু ভারতবর্ষে ২০১৪ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বিচার ব্যবস্থার কাঠামোটিকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সারাফিনের মতে :
‘মোদি সরকার বিচারপতি নিয়োগে অস্বীকৃতি জানিয়ে, যুগান্তকারী মামলার ফলাফলে প্রভাব খাটিয়ে, আদালতে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন করে এবং বিচারপতিদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে পুঁজি করে চতুরতার সঙ্গে বিচার বিভাগের কাঠামোটি ভেঙে দিয়েছে। আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাই প্রকল্পের বিষয়ে আদালতের ব্যবস্থাপনা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে শাসক দলের দায়ের করা মামলাগুলি বিচার বিভাগের কাঠামো ভেঠে ফেলার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। …. দুর্ভাগ্যবশত ভারতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অবক্ষয় হল স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হওয়ার একটি গুরুতর দিক যা পশ্চিমা গণমাধ্যম বহুলাংশে উপেক্ষা করেছে। বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল এই গণতন্ত্র এখন ক্ষমতার ভারসাম্যের এক দুর্বল ব্যবস্থার সঙ্গে লড়াই করছে, যেখানে আদালতগুলো কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে।’
গত ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য তারই প্রমাণ।
প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা দুর্নীতি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ইত্যাদি দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে ককরোচ পার্টি অব ইণ্ডিয়া। যন্তর মন্তরে ধরনায় বসেছেন দলের কর্মীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন মানবাধিকার কর্মী সোনাম ওয়াংচুক। তিনি অনশন শুরু করেছেন ছাত্রদের দাবিতে। দাবি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত চলবে তাঁর অনশন। এর মধ্যে সরকারের নির্দেশে পুলিশ তাঁকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে গেছে সরকারি হাসপাতালে। ফলে উত্তাল হয়ে উঠেছেন ককরোচ পার্টির সমর্থকরা। সংসদ ভবনের দিকে তাঁদের যাত্রা। পুলিশের বাধাদান। না, শুধু বাধা নয়, আক্রমণ, হামলা।
কিন্তু আমাদের বিচার বিভাগ?
‘টাইমস অব ইণ্ডিয়া’র খবর অনুযায়ী গত ২২ জুলাই বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে (বেঞ্চে সূর্যকান্ত ছাড়া ছিলেন জয়মাল্য বাগচী ও ভি মোহনা) শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশি হামলা ও নির্যাতনের বিষয়টি উথ্থাপন করা হয়। শিক্ষার্থীদের পক্ষের আইনজীবী নির্যাতনের ভিডিয়ো দেখাতে চাইলে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন :
‘আমাদের সময় নষ্ট করবেন না। আমরা কোন ভিডিয়ো দেখতে চাই না।’
ন্যায়সঙ্গত কোন বিষয়ে প্রতিবাদ করার ফলে সরকারি নির্যাতনের ভিডিয়ো শোনার বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে ‘সময় নষ্ট করা’! কি রকম অবলীলাক্রমে বললেন প্রধান বিচারপতি! এই বিচারপতির ব্যঙ্গমূলক বক্তব্যই জন্ম দিয়েছিল ককরোচ বা তেলাপোকা পার্টিকে। এই বিচারপতি শুনতে চাইছেন না ভারতের সাধারণ মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়।
বিচারই ছিল শেষমেষ আশ্রয়। মানুষ যদি সেই আশ্রয় চ্যুত হয় তাহলে বাকি থাকে পথ :
‘পথে এবার নামো সাথী, পথেই হবে এ পথ চেনা’
অত্যন্ত সময়োচিত প্রতিবেদন।
শেষ খবর আসছে ক্রমশঃ বাড়ছে প্রতিবাদীর সংখ্যা।অন্ধ ভক্তদের মতে অবশ্য এসব সামান্য বিষয় নিয়ে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র।
বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা!