৫২. চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য : দুর্ভিক্ষের চিত্রকর
ছবি আঁকা শখ ছেলেটির। বড় হয়ে চিত্রকর হতে চায়। কিন্তু বাড়ির বড়রা মানতে চান না। মোক্তার-ডাক্তার হোক ছেলে, সবাই চান। জন্ম তার চব্বিশ পরগণার নৈহাটিতে। বাবা চাকরি করেন চট্টগ্রামে, তাই তাকে সেখানে থাকতে হয়েছিল। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি স্কুল থেকে পাশ করে ভর্তি হল চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে।
ছবির ভাবনাটা মাথায় আছে। কুরে কুরে খাচ্ছে মাথা। গেল সে কলকাতা আর্ট স্কুলে। ছবি আঁকার পাঠ নেবে বলে। নিল না তারা। ঠাঁই হল না শান্তিনিকেতনের কলাভবনে। একদিন সে সরাসরি চলে গেল নন্দলাল বসুর কাছে। নন্দলাল তার ছবি দেখতে চাইলেন। আকুল আগ্রহে সে ব্যাগ থেকে ছবি বের করে দেখাতে লাগল।
দেখে নন্দলাল বললেন, ‘তোমার তো শেখা হয়ে গেছে বাপু। নতুন করে কি আর শিখবে?’
এটা নিন্দা না প্রশংসা? কিংবা প্রশংসার ছলে নিন্দা? যাকে বলে ব্যাজস্তুতি অলংকার।
আসলে সে ছেলে মহাভারতের একলব্যের মতো। একলব্যরা জন্মান যুগে যুগে। সে তখন গুরু ছাড়াই নিজের সাধনা শুরু করে দিল। সফলও হল একদিন।
এই ছেলের নাম চিত্তপ্রসাদ (১৯১৫-১৯৭৮)। শুধু চিত্তপ্রসাদ? পদবী নেই? আছে। পদবীটা – ভট্টাচার্য। কিন্তু তিনি পদবী ব্যবহার করতেন না। ‘বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ’ বলে নিজের পরিচয় দিতে আপত্তি তাঁর। বর্ণভেদ, জাতিভেদে তাঁর ঘৃণা।
তখন চল্লিশের দশক। এসে গেছে পঞ্চাশের মন্বন্তর। চারিদিকে হাহাকার। কলকাতার রাস্তা-ঘাটে থিক থিক করছে গ্রাম বাংলার বুভুক্ষু মানুষের দল। নিরন্ন মানুষের আর্তনাদে চিত্তপ্রসাদের মনে আলোড়ন জাগল। কিছুদিন আগে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে এসেছেন। লাভ করেছেন সদস্যপদ। শ্রেণিবৈষম্যের উৎস জেনেছেন মার্কসবাদ পড়ে। শুধু তো পড়া নয়, সংবেদনশীল মন ছিল তাঁর। তাই ঠিক করে নিলেন দুর্ভিক্ষের ছবি আঁকবেন। সে ছবি হবে আয়না। ইংরেজ শাসক সেই আয়নায় দেখবে নিজেদের রক্তলাঞ্ছিত মুখ।
থাকেন তখন কলকাতার কলাবাগান অঞ্চলে। একটা দোতলা বাড়িতে (৮৮বি কি?)। ঠিক করে দিয়েছেন ছাত্র ফেডারেশনের সহকর্মীরা। সেখান থেকে চলে যান বন্যা ও দুর্ভিক্ষক্লিষ্ট মেদিনীপুরে। ঘুরে বেড়ান গ্রামে গ্রামে। সাদা-কালো রঙের ছবি এঁকে চলেন। সে ছবি ছাপা হয় ‘জনযুদ্ধ’এ, ‘পিপলস ওয়্যারে’। লিনোকাট অবলম্বনএ আঁকেন ছবি। কেননা এই মাধ্যমে কম খরচে সারা দেশময় ছড়িয়ে দেওয়া যাবে ছবি। সুশোভন অধিকারী বলেছেন, ‘ লিনোকাটের ক্ষেত্রে চিত্তপ্রসাদ ছাড়া এত বড় মাপের আরেকজন শিল্পীর নাম সহসা স্মরণে আনা শক্ত। এসব ছবিতে জীবনের সপ্রাণতা, তার গতি ও ছন্দের তুলনা হয় না। সাদা কাগজের পটে তুলি বা কলমের মতোই অবলীলায় লিনোর ওপরে টুলসের অনায়াস স্বচ্ছন্দ বিচরণ মাঝে মাঝে আমাদের চোখে অবিশ্বাস্য ঠেকে।’
মন্বন্তরপীড়িত গ্রামের ক্ষুধার্ত মানুষের ছবি নিয়ে প্রকাশিত হল HUNGRY BENGAL. এইসব ছবি কথা বলে। তাই বিব্রত হয়ে ওঠেন ব্রিটিশ শাসক। (Hungry Bengal art during femine)
তেভাগারও ছবি এঁকেছিলেন তিনি। একটা ছবিতে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ … একপাশে এক কৃষক রমণী ধান কাটছে …আর এক পাশে আর এক নারী আঁটি বাঁধছে … তাদের পাহারা দিচ্ছে এক বলিষ্ঠ কৃষক। আর এক ছবিতে কাস্তে-হাতুড়ি ঝাণ্ডা পুঁতে চলছে জমির সীমা নির্ধারণে, ধান কাটছে কৃষক নারী, আঁটি বেঁধে মাথায় তুলে চলে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে। আর এক ছবিতে লাঠিহাতে পুলিশের প্রতিরোধ। ‘দুর্ভিক্ষের কবলে মেদিনীপুর’, ‘দুর্ভিক্ষের কবলে কন্টাই (কাঁথি)’ — এসব ছবি অসাধারণ। কালি-তুলিতে আাঁকা ছবিগুলিতে বিবর্ণ গ্রাম, বুভুক্ষু মানুষ, সুদখোর মহাজনের দরজায় অসহায় মানুষ, মৃত মানুষের খুলি, হাড়-গোড়, অভাবের তাড়নায় ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রয় চমৎকার ফুটে উঠেছে।
১৯৪৬ সাল। চিত্তপ্রসাদের দুর্ভিক্ষের ছবিগুলি চোখে পড়ল তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক পি সি জোশীর। তিনি চিত্তপ্রসাদকে নিয়ে গেলেন মুম্বাই। থাকতেন শ্রমিকপট্টির এক জীর্ণ ঘরে। অংশগ্রহণ করতেন কমিউনিস্ট পার্টির কাজে। কিন্তু ১৯৪৯ সালে সরে এলেন পার্টির কাছ থেকে। তাই বলে মার্কসবাদকে পরিত্যাগ করেন নি। হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন :
‘চিত্তপ্রসাদের মতো প্রতিভাধর কমিউনিস্ট কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ার বুকভরা উদ্দীপনা নিয়ে আসা সত্বেও এবং শেষ পর্যন্ত পার্টিসঙ্গে পরিহারের কথা বললেও তিনি ছিলেন মনে-প্রাণে একান্ত অবিচল সাম্যবাদী।’ (চিত্তপ্রসাদ স্মরণে)
৩৩ বছর তিনি ছিলেন মুম্বাইতে। অ্যালবাম, ছবি, কার্ড, এসব বিক্রি করে কোনমতে চলত তাঁর জীবন। অসুস্থ অবস্থায় চলে আসেন কলকাতায়। ভর্তি হন রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানে। সেখানেই তাঁর নিরুচ্চার মৃত্যু। প্রতিভার অপমৃত্যুই বলা যায়।
একদিন কবিতার বয়ানে চিত্তপ্রসাদকে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র লিখেছিলেন :
ওরে রে প্রকাণ্ড-কাণ্ড প্রমত্ত মাতাল,
তোমার বিচিত্র পত্রের হৃদয় — চাতাল,
স্নেহ-লিপ্ত পিচ্ছিল প্রণয় নির্যাসে।
অনুরাগ-রক্তচ্ছটা বিচ্ছুরিত প্রাণের আকাশে।
তোমার বেদনা বুঝি উজ্জীবিত শিল্পের গভীরে
আমারও বেদনা জেনো পুঞ্জীভূত চেতনার তীরে …
অসাধারণ!