Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবিতার আয়ুষ্কাল — নজরুলের বিদ্রোহী : রফিকুর রশীদ বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হেলালগীতি : ড.মুন্সি আবু সাইফ সোনাম ওয়াংচুক — গান্ধিবাদী অনশনের ঐতিহ্য : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নুসরাত সুলতানা-র ছোটগল্প ‘ইনকিউবেটর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্পেন — রবীন্দ্রনাথ কখনও এখানে খেতে আসেননি : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জাতি সংঘের চিঠি : নির্বাচন কমিশন ও ভারত সরকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি ডালিয়া — ডায়েট ফ্রেন্ডলি রেসিপি : রিঙ্কি সামন্ত ছানি অপারেশন কোথায় ও কখন করা উচিত : ডা. তনুশ্রী চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অপারেশন লোটাসের ইতিবৃত্ত : দিলীপ মজুমদার ওড়িশার পঞ্চদশ শতকের মহাকবি সরলা দাসের কোটিপূজাই আজ খুঁটিপূজা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ঢেউ-এর দোলায় তসলিমা নাসরিন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রথ নিয়ে বাংলা প্রবাদ ও তার সামাজিক তাৎপর্য : অসিত দাস মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘গোধূলির চিতায়’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ এনকাউন্টার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৬৩ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

১০. অন্যদের বিচার-বিবেচনায় সহায়তা করার এবং আমার নিজস্ব মতামতের ভিত্তি তুলে ধরার উদ্দেশ্যে, আমি ১৫৮২-র আকবরের রাজত্বকালে টোডর মলের (Turyu Mull) প্রথম নথিভুক্ত বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে ১৭৬৩-র কাসিম আলীর (Cossim Ally — প্রচলিত ভাষ্যে মীর কাশিম) সময়কার রাজস্ব নির্ধারণ পর্যন্ত বাংলার রাজস্বের বিবর্তন পর্যালোচনা করব। মিস্টার গ্রান্টের ‘অ্যানালিসিস’ বা বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উপস্থাপিত তথ্যাবলিকে আমার পর্যবেক্ষণের ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে, এর একটা সারসংক্ষেপ সংযুক্ত করা হলো (পরিশিষ্ট নং ১)। এই সারসংক্ষেপ এবং এ বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করার সময়, এমন কিছু তথ্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন যা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে।

১১. ধারণা করা হয় যে, টোডর মল, কানুনগো এবং অন্য নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে রায়তদের (কৃষকদের) প্রদত্ত খাজনার হিসাব সংগ্রহ করে বাংলার যে বন্দোবস্ত তৈরি করেছিলেন, তা ‘তুমার জমা’ (Tumar Jumma — ‘তুমার জুমা’ শব্দটি দুটি ফার্সি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত: ‘তুমার’ (تومار) অর্থ খাজনা-তালিকা বা রেন্ট-রোল, এবং ‘জুমা’ (جمع) অর্থ মোট বা সমষ্টি। তাই, ‘Tumar Jumma’ মানে হলো ‘মোট রাজস্বের তালিকা’ বা ‘খাজনা-নির্ধারণী মূল নথি’। মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে (১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে) তাঁর রাজস্বমন্ত্রী রাজা টোডরমল বাংলার জমির একটি সর্বপ্রথম ও সুসংহত জরিপ ও রাজস্ব নির্ধারণ করেন। এই নির্ধারিত রাজস্বের তালিকাকেই ‘তুমার জুমা’ নামে অভিহিত করা হতো। রাজস্বের মান: এটি ছিল বাংলার জন্য নির্ধারিত মূল বা আসল রাজস্ব (Assul Jumma) – পরবর্তীতে আরোপিত বিভিন্ন অতিরিক্ত করকে (আবওয়াব) এর থেকে আলাদা করে গণনা করা হতো। জমিদারির ভিত্তি: জমিদারদের সঙ্গে চুক্তি (পট্টা ও কবুলিয়াত), জমি বিক্রয় বা হস্তান্তর, এবং বংশানুক্রমিক অধিকার (আলতামগা) সবকিছুর ভিত্তি ছিল এই তুমার জুমা। আঞ্চলিক বিভাজন: ‘তুমার জুমা’-র পাশাপাশি ‘তকসিম জুমা’ (Tukseem Jumma) নামে আরেকটি নথি ছিল, যা দেখাত যে কোন জমিদারি বা অঞ্চলে এই রাজস্বের কী পরিমাণ ভাগ পড়ছে। গত কিস্তির ৯ নম্বর পয়েন্টে শোর বলেছেন গ্রান্টের মত ছিল বর্তমান রাজস্ব মুঘল আমলের মূল তুমার জুমা থেকে অনেক কম (under-assessed), তাই কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, মুঘল আমলে রাজস্ব নির্ধারণের মূল লক্ষ্য ছিল জমির উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আর শোরের মত — গ্রান্টের এই ঐতিহাসিক তত্ত্বের বিরোধিতা করে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেন। তিনি মনে করতেন, মুঘল আমলের তুমার জুমা আর ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষের পরবর্তী বাংলার বাস্তব অবস্থা এক নয়। তিনি গ্রান্টের পরিসংখ্যানকে ‘কাগজে কলমে’ নথি বলে উড়িয়ে দিয়ে সতর্ক করেন যে রাজস্ব বৃদ্ধি করলে কৃষকদের ওপর অত্যাচার বাড়বে — অনুবাদক) নামে পরিচিত। এই রাজস্ব নির্ধারণের উপাদানগুলোকে ‘তকসীম’ (Tukseem — মূলত সাম্রাজ্যের রাজস্ব বন্দোবস্তের অধীনে বিভিন্ন প্রদেশ, সরকার এবং পরগনা স্তরে জমির আয় এবং রাজস্বের বণ্টন বা বিভাজনকে বোঝায়। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তাঁর রাজস্বমন্ত্রী রাজা টোডরমল ভূমি জরিপ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে রাজস্ব নির্ধারণের যে সুনির্দিষ্ট তালিকা বা রেন্ট রোল তৈরি করেন, তা ‘তকসীম জমা’ নামে পরিচিত ছিল। জমি পরিমাপ করে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হতো। অঞ্চল এবং জমির উর্বরতা অনুযায়ী রাজস্বের হার নির্ধারণ করা হতো। রাজস্ব কর্মকর্তা (Kanungo) কানুনগোরা এই তকসীম বা বিভাজনের বিবরণী যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করতেন, যা জমির মালিকানা হস্তান্তর এবং খাজনা আদায়ের মূল ভিত্তি ছিল। এই তকসীম হিসাবের মাধ্যমেই মুঘল আমলে জাবতি (Zabti) ও দহশালা (Dahsala) ব্যবস্থার সাহায্যে নির্দিষ্ট জমির জন্য রাজস্ব নির্ধারণ করা হতো — জাবতি ছিল জমির পরিমাপ ও খাজনা নির্ধারণের মৌলিক কাঠামো, আর দহশালা ছিল বিগত ১০ বছরের গড় ফলন ও মূল্যের ভিত্তিতে খাজনা হার নির্ধারণের পদ্ধতি। এটা ‘টোডর মল বন্দোবস্ত’ নামেও পরিচিত। — অনুবাদক) বলা হতো; এর অন্তর্ভুক্ত ছিল কেবল বৃহত্তর আঞ্চলিক বিভাগের রাজস্বের অংশই নয়, বরং গ্রাম এবং — সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী — আলাদা আলাদা রায়তের দেওয়া রাজস্বও। অস্পষ্টতা এড়াতে, টোডর মলের প্রবর্তিত এবং পরবর্তীতে নাজিমদের বাড়ানো ‘তুমার জমা’র কথা উল্লেখ করার সময় আমি সর্বদা ‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যাসেসমেন্ট’ বা ‘মানক রাজস্ব নির্ধারণ’ পরিভাষা ব্যবহার করব।

১২. ভূমি ও ভূমি-রাজস্বের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: প্রথমত, প্রাচীনকালে এ দেশের ভূমি ‘খালসা’ (Khalsa) এবং ‘জাগির’ (Jaghire) — এই দুই নামে চিহ্নিত হতো। প্রথমকে ‘রাজকোষের ভূমি’ (Exchequer lands) হিসেবে অনুবাদ করা যেতে পারে; আর দ্বিতীয় — যা মনসবদার বা সরকারি কর্মকর্তাদের ভরণপোষণের জন্য নির্দিষ্ট ছিল — তাকে ‘বরাদ্দকৃত ভূমি’ (Assigned lands) হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই দুয়ের সমষ্টিই রাষ্ট্রকে রাজস্ব প্রদানকারী সমগ্র ভূমিকে গঠন করে। দ্বিতীয়ত, ভূমি-রাজস্বের ক্ষেত্রে ‘আসল’ (assul) বা মূল রাজস্বের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য; ‘আবওয়াব’ (Abwab) — অর্থাৎ পরবর্তীতে মূল রাজস্বের ওপর আরোপিত খাজননার বিপরীতে ‘আসল’-কে মানক রাজস্ব নির্ধারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। আমার ধারণা, ‘সায়ের’ (sayer) — যার অর্থ শুল্ক এবং পরিবর্তনশীল আদায় — এই খাতগুলোর যেকোনো একটা বা উভয়ের অন্তর্ভুক্ত।

১৩. ১৫৮২ সালে টোডর মলের (Tury Mull) সময়কাল থেকে জাফর খানের সময়কাল পর্যন্ত — অর্থাৎ ১৪০ বছরের ব্যবধানে — বাংলার রাজস্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল মাত্র ২৪,১৮,২৯৮ টাকা। এই অর্থের মধ্যে জাফর খানের আরোপিত ২,৫৮,৮৫৭ টাকার একটি আবওয়াবও অন্তর্ভুক্ত ছিল; আর বাকি অংশ এসেছিল ভূমির সম্পদ বা উৎপাদনক্ষমতা যাচাই-বাছাইয়ের (investigations) মাধ্যমে। আমি এখানে কেবল এভাবেই অর্জিত রাজস্ব বৃদ্ধির কথা বলছি; নতুন ভূখণ্ড সংযুক্তির ফলে যে অতিরিক্ত এলাকা যুক্ত হয়েছিল, তার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির।

১৪. যদি আমরা ধরে নিই যে শুরুতে টোডর মলের (Tury Mull) করা রাজস্ব নির্ধারণ পরিমিত ছিল, তবে পরবর্তীকালে উল্লিখিত বৃদ্ধিকে অত্যধিক বলে মনে হবে না। টোডর মল ও জাফর খানের আমলের মধ্যবর্তী সময়ে দেশটির সমৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল; কারণ বাণিজ্যের নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়েছিল এবং সামগ্রিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। আকবরের আমলে নগদ অর্থের যে তুলনায় ঘাটতি ছিল, পরবর্তীকালে নতুন সব পথের মাধ্যমে তা প্রচুর পরিমাণে দেশে প্রবেশ করেছিল। পক্ষান্তরে, আমরা সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে স্বীকার ও প্রশংসা করি যা রাজস্ব আদায়ের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল এবং প্রজাদের নিজেদের শ্রম ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার সুফল ভোগ করার সুযোগ দিয়েছিল। এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে এ কারণে যে এটি একটি সর্বজনস্বীকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

১৫. তথাপি, এই রাজস্ব বৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে পরিমিত মনে হলেও, জাফর খানের চাপানো ১৪,৩১,১৩৬ টাকার অংশটুকু অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপে আদায় করা হয়েছে। খুব কম সংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া জমিদারদের রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং জমি ও ফসলের পরিমাণ যাচাই-বাছাইয়ের কাজে তাঁর নিজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়োজিত করা হয়েছিল। বকেয়া রাজস্ব আদায়কারী ইজারাদার এবং নিজেদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশে বাধ্য করার লক্ষ্যে জমিদারদের ওপর যে কঠোর নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা ছিল অমানবিক আর লজ্জাজনকও। ব্যক্তিগত লাঞ্ছনা ও শারীরিক নির্যাতনের পরেও ক্ষান্ত না হয়ে জনগণের ধর্মের ওপর চরম অবমাননা করা হয়েছিল। মলমূত্র ও নানাবিধ আবর্জনায় পূর্ণ গর্তকে জমিদারদের কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হতো এবং ব্যঙ্গাত্মকভাবে সেগুলোকে হিন্দুদের স্বর্গ ‘বৈকুণ্ঠ’ (Bykout) নামে অভিহিত করা হতো। জানা যায় যে, জাফর খান রাজস্ব আদায়ের কাজে কেবল বাঙালি হিন্দুদেরই নিয়োগ করেছিলেন; এর বিশেষ কারণ ছিল এই যে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে তাদের অনিয়ম বা গোপন সম্পদের কথা স্বীকার করানো সহজ ছিল এবং তাদের ভীরু স্বভাবের কারণে কোনো বিদ্রোহের আশঙ্কা ছিল না। এছাড়া, তিনি বকেয়া রাজস্বের দায়ে অভিযুক্ত জমিদারদের স্ত্রী-সন্তানসহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেছিলেন বলেও কথিত আছে [আমার পলাশীর পূর্বে ৫০ বছরের বাংলায় দেখিয়েছি — ধর্মান্তরকরণের বক্তব্য মিথ্যা। কিছু হয়ে থাকলে নগণ্য — অনুবাদক]। অথচ এই ব্যক্তিকেই মুসলিম ইতিহাসবেত্তারা ন্যায়পরায়ণ ও প্রজ্ঞাবান হিসেবে প্রশংসা করেছেন! এটিই ছিল সেই প্রশাসনের কার্যকলাপ, যাকে মিস্টার গ্রান্টের ভাষায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনার এক নতুন ও গৌরবোজ্জ্বল যুগের সূচনা হিসেবে অভিহিত করা হয়।

১৬. জাফর খানের পদক্ষেপের ধরন দেখে মনে হয় — হয়তো তখন দেশের ওপর তার সাধ্যের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত কর বা রাজস্ব ধার্য করা হয়েছিল; অথবা তিনি ও তাঁর প্রতিনিধিরা দেশের সুপ্ত সম্পদ বা আয়ের উৎসগুলো খুঁজে বের করতে অক্ষম ছিলেন; কিংবা শেষ পর্যন্ত, নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য তিনি যা জেনেছিলেন তা গোপন রেখেছিলেন।

১৭. আমি পরবর্তী দুটি ধারণা বা অনুমান প্রত্যাখ্যান করছি নিচের কারণগুলোর জন্য: অর্থব্যবস্থাপনায় জাফর খানের প্রমাণিত দক্ষতার কারণেই তিনি ‘দেওয়ান’ পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন; এবং তিনি জানতেন যে তাঁর সুনাম ও পদে টিকে থাকা নির্ভর করছে তাঁর প্রচেষ্টার সাফল্যের ওপর — যে প্রচেষ্টা তিনি অসাধারণ দক্ষতা, উদ্যম ও অধ্যবসায়ের সাথে দেশের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে নিয়োজিত করেছিলেন।

১৮. তাঁর পদক্ষেপ বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল; সম্রাটের পুত্রের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে তাঁর প্রশাসনের সূচনা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগে সংস্কার সাধনের মাধ্যমে তা পরিচালিত হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা, আয় কমিয়ে ছিলেন এবং সেই সাথে তাঁদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাও হ্রাস করেছিলেন; হতাশদের অপপ্রচার, ঈর্ষাপরায়ণদের ষড়যন্ত্র এবং সবার অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানের সমর্থনে তিনি তাঁর নিষ্ঠা ও সততার ওপরই নির্ভর করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কোনো জালিয়াতি বা অসততা থাকলে তা তাঁর বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগের সুযোগ করে দিত, যা তাঁর শত্রুরা অত্যন্ত সফলভাবে কাজে লাগাত।

১৯. একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, দেওয়ান ও সুবাদার হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকালে জাফর খান নিজের জন্য ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেছিলেন — যার উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে বাংলার প্রকৃত রাজস্ব তাঁর ধার্য করা পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এই ধারণার ভিত্তি কেবলই অনুমাননির্ভর, তাই এর থেকে টানা সিদ্ধান্তে আমি সম্মত হতে বাধ্য নই। মৃত্যুর সময় তাঁর সম্পত্তির যে মূল্য সর্বজনবিদিত ছিল (মিস্টার গ্র্যান্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী), তা ছিল ৬০,৯৩,২২৭ টাকা; আর যদি কোনো প্রমাণ ছাড়াই আমরা ধরে নিই যে এই অর্থ তাঁর মোট সম্পত্তির অর্ধেক মাত্র, তবুও সেই অর্থের একটি বড় অংশ তাঁর নিজস্ব ‘জাগির’ থেকে অর্জিত হয়ে থাকতে পারে। আবার আমি এটাও অস্বীকার করব না যে, অননুমোদিত উৎস থেকেও হয়তো কিছু অর্থ আদায় করা হয়েছিল। তাঁর মিতব্যয়িতা ও কৃপণতার স্বভাব এই অনুমানের প্রথম অংশটিকে কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা দেয়।

২০. তবে প্রথম ধারণাটিও আমি কোনো শর্ত বা সীমাবদ্ধতা ছাড়া মেনে নিচ্ছি না; তবে আমি বরং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাই যে, কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও জাফর খান দেশের ভবিষ্যৎ কল্যাণ ও সমৃদ্ধির কথা বিবেচনায় রেখেছিলেন; এবং উৎপাদনের যে অংশটুকু তাঁর নজরে এসেছিল, তার একটি বড় অংশ সরকারি কোষাগারে জমা করার সময় তিনি এমন কোনো কাজ করেননি যা উৎপাদনের মূল উৎসকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাঁর কার্যকলাপ সম্পর্কে আমার অভিমত হলো (যার নিষ্ঠুরতা মানবিকতার দৃষ্টিতে অবশ্যই নিন্দনীয়) — যখন তিনি দেওয়ান হিসেবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন, তখন অর্থব্যবস্থার সর্বস্তরে চরম বিশৃঙ্খলা ও শিথিলতা বিরাজ করছিল; আর তাঁর লক্ষ্য ছিল নিরবচ্ছিন্ন কঠোরতা অবলম্বনের মাধ্যমে সংস্কার ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা; এবং একই উপায়ে ভবিষ্যতে বিশৃঙ্খলা ও শিথিলতার পুনরাবৃত্তি রোধ করা।

২১. জাফর খানের উত্তরাধিকারী সুজা খানের ধারণা ছিল যে, তাঁর পূর্বসূরির দাবিগুলো দেশের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়নি কিংবা তাঁর ব্যবস্থাপনার ফলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়েছিল; কারণ, এর অল্প কয়েক বছর পরেই তিনি আরও ১৯,১৪,০৯৫ টাকা অতিরিক্ত কর বা রাজস্ব ধার্য করেন। তবে জাফর খানের নামের সাথে যে তীব্র ঘৃণা ও নিন্দার ছাপ স্থায়ীভাবে জড়িয়ে আছে, সুজা খানের প্রশাসনের ক্ষেত্রে তেমনটি দেখা যায় না। তিনি জমিদারদের কাজে নিয়োজিত করেছিলেন এবং তাঁদের অনেকের হাতেই তাঁদের ভূমির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

২২. মারাঠা আক্রমণের প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে আলিবর্দি খানের ধার্য করা কর বা রাজস্বের পরিমাণ খুব একটা সহায়ক ছিল না। এই অর্থের পরিমাণ ছিল ২২,২৫,৫৫৪ টাকা। টানা দশ বছর ধরে তিনি যেসব যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, সেগুলোর ব্যয় নির্বাহের জন্য জমিদারদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ সম্ভবত তাঁকে এই ধারণা দিয়েছিল যে, তাঁর প্রয়োজনে বাড়তি যে অর্থের প্রয়োজন, তা প্রদানের সক্ষমতা তাঁদের রয়েছে।

২৩. কাসিম আলী তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে — যা মূলত ১৭৬০ সালের নভেম্বরে শুরু হয়ে ১৭৬৩ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় — রাজস্ব বৃদ্ধির যে দাবি করেছিলেন, তা মূলত তাঁর নিজের পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির আশঙ্কায় তাড়িত ছিল। আমি পরবর্তীতে তাঁর কার্যকলাপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব; তবে এখানে কেবল এটুকু উল্লেখ করছি যে, নতুন কর আরোপ এবং জমিদার, ফৌজদার ও জায়গিরদারদের সম্ভাব্য মুনাফা বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে তিনি একবারে ৭৪,৮১,৩৪০ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন।

২৪. জাফর খানের প্রশাসনের পরবর্তী সময়ে ধার্য করা এসব কর বা রাজস্বের সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন