
সংকোশ নদীতে সূর্য ডুবছে। কচ্ছপেরা ধানগাছের অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আছে। এইসব কচ্ছপ এখন একটু শক্তমতো মাটি পেলেই পাড়ে উঠে ডিম পাড়তে শুরু করবে। অনেকগুলি শেয়াল ডাকল দক্ষিণের মাঠে। একটা দুটো জোনাকি জ্বলল জলার ধারে। জোনাকিরা অন্ধকারে ডানা মেলে উড়তে থাকল। পাখিদের শেষ দলটা গ্রামের উপর দিয়ে উড়ে গেল। নির্জন এবং নিরিবিলি এইসব গ্রাম, মাঠ। অন্ধকারেও টের পাওয়া যায়। মাথার উপর দিয়ে পাখি উড়ে যাচ্ছে। সনাতন কাকা জানে ওরা কোথায় যায়। ওরা বোবা পীরের দরগাতে যায়। পীরের দরগায় বুড়া বটগাছটায় ওরা রাত যাপন করে। শীতের পাহাড় নেমে এলে ওরা তখন দক্ষিণের বিলে চলে যাবে। সনাতন কাকা এবার উঠে পড়ল। বাচ্চুর চায়ের দোকানে বিকাল বেলায় এসে এককাপ চা আর খবরের কাগজটা নিয়ে সে বসে পড়ে তারপর খুঁটে খুঁটে সব কটা পাতার খবর পড়া শেষ করে এই পকেট সেই পকেট হাতড়ে ঠিক সাড়ে তিনটাকা বের করে তারপর প্রতিদিনের মতোই দুইটাকার বিড়ি কিনে চায়ের দামে পঞ্চাশ পয়সা কম দিয়ে হাঁটতে শুরু করবে আর বাচ্চু পিছন থেকে বলতে থাকবে প্রতিদিন কম দিলে হয় নাকি কাল থেকে আপনি আর আইস্যন না কাকা, মাগনা পত্রিকাও পড়বেন তিনঘন্টা ধরে জায়গা দখল করে বইস্যা থাকবেন আর চায়ের দামের বেলায় কম দেবেন সেটা আর হবে না। সনাতন কাকা হাসতে হাসতে বিড়িতে আগুন ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বাড়ির রাস্তা ধরবেন এটা প্রতিদিনের ঘটনা।
আমি ঈশ্বর চন্দ্র দাস। সনাতন কাকার পাশের বাড়িটাই আমার। শহর থেকে কাজ করে যখন ফিরি এ অঞ্চলে কোন মানুষের সাড়া শব্দ থাকে না। নীরবে যেন একটা মাঠ গাভীন গরুর মতো অন্ধকারে শুয়ে থাকে। পথ ধরে তারাদের সাথে কথা বলে বলে আমি বাড়ি ফিরি। প্রতিদিন কষ্ট করে যাওয়া আসা করতে আমার ইচ্ছে করে না বহুবার ভেবেছি শহরে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবো কিন্তু যতবার ভেবেছি ততবারই মন সায় দেয়না। এই ভিটার টান ছাড়তে পারিনা। সনাতন কাকা প্রায়ই বলে শহরে গিয়ে কি করবে শহরই তো গ্রামের কাছে আসছে তা ছাড়া শহরে গিয়ে রোজ রোজ বৌকে মারতেও পারবেনা বাপু। আমার কোন বদ অভ্যাস নেই, মদ গাঁজা বিড়ি কিছুই খাইনা এমন কি কখনো শখ করে এককুচি সুপারিও মুখে দিয়ে দেখিনি কিন্তু সারাদিন পরে মধ্যরাতে বাড়ি ফিরে আমার যে কি হয় কারণে অকারণে বৌকে না মারলে আমার ভালই লাগেনা। দীর্ঘ সময় সাড়া শব্দহীন শুয়ে থাকা গ্রামটা বৃন্দার কান্নায় ঠিক জেগে ওঠে। আগে সনাতন কাকা গ্রামের কেউ কেউ চিৎকার চেচাঁমিচি করে আমাকে থামাতো বৃন্দাকে বুকে জড়িয়ে গ্রামের বউরা আমাকে অভিসম্পাত করতো। এখন সবার সহ্য হয়ে গেছে কেউ আর বাড়ি আসেনা মারপিট থামাতে বরং বৃন্দার কান্না গ্রামে অ্যালামের কাজ করে। বৃন্দার কান্না শুরু হলে অনেক বাড়ির বৌ ঝিরা উঠে প্রাতঃকর্ম সেরে ঘর দোর ঝেড়ে মুছে স্নানে যায়।
আজ অঘ্রান মাসের তিন তারিখ, রবিবার। সকাল দশটা বিশ, বন্ধুর দোকান থেকে একটা খবরের কাগজ কিনেছিলাম। ওখানে একজন মানুষ সম্পর্কে একটা নিবন্ধ পড়েছিলাম যাকে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করার সাড়ে তিনঘন্টা পড়ে বেঁচে উঠেছে। লোকটির বয়স ছিল বাহান্ন বছর। তিনি ছোট্ট এক শহরতলীতে থাকতেন। খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। ছোট্ট একটা ভাড়ার ঘরে একা থাকতেন। তার সংসারে আর কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ তিনি সোফার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যান। সম্ভবত হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। পড়ে যাওয়ার কতক্ষণ পর তার মৃত্যু হয়েছিল কেউ বলতে পারেনি। লোকটির আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না যারা নিয়মিত তার ওখানে যাতায়াত করত। ফলে তার মৃতদেহ উদ্ধার করতে সপ্তাহখানেক লেগে যায়। তাকে যখন হাসপাতালে নেয়া হয় তখন তার সারা শরীর ঠান্ডাতে জমে কাঠ হয়েছিল। ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন এবং ময়নাতদন্তের জন্য লাশকাটা ঘরে লাশ নেয়া হলে সাড়ে তিনঘন্টা পরে লোকটি আচমকা দুটি কাশি দিয়ে অনেকক্ষণ জলের নীচে থাকার পরে মানুষ যেভাবে শ্বাস টানতে টানতে জলের ওপরে উঠে আসে ঠিক তেমনি ভাবে লোকটি লাশকাটা ঘরে উঠে বসে আর লাশকাটা ঘরে যারা ছিল তারা ভূত দেখছে ভেবে দৌঁড়ে পালায়।
আমার অদূরে বসে থাকা সনাতনকাকাকে নিবন্ধটা পড়ে শোনাচ্ছিলাম। ছুটির দিনগুলোতে আমি আর সনাতন কাকা বিশেষ কোনো নিবন্ধের ওপর আমাদের আগ্রহ থাকলে তা নিয়ে আমরা মত বিনিময় করি।
“লাশকাটা ঘরে তারপর কী হলো?”
“কাগজে কিছু লেখেনি।”
“দুনিয়ার সব জায়গার কাগজ একই ধরনের। যা তুমি জানতে চাও তা লিখবে না কখনো।”
সনাতন কাকা পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ঠোঁটে গুঁজে ম্যাচ জ্বালাল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সনাতন কাকা বলল, “যা আমি জানতে চাই তা হলো, পরে লাশকাটা ঘরে ঐ লোকের কী হয়েছিল? তোমার কী ধারণা?”
সকালের সূর্য সরিষা ফুলের জমিতে পড়ে চকচক করছে হলুদ রং। প্রকৃতি সেজেছে অপরূপ সাজে। প্রজাপতির দল ছুটে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে। মৌমাছির ভনভনানিতে মুখরিত সরিষার বিস্তৃত মাঠ। গুঞ্জনরত মৌমাছিগুলোর দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য মনে হলো, মৃত্যুর সাড়ে তিনঘন্টা পরে বেঁচে ওঠা নিশ্চয় সরিষা ফুলের সৌন্দর্যের চেয়েও সুন্দর, দুর থেকে ভেসে আসা শঙ্খচিলের কর্কশ চিৎকার মৌমাছির গুঞ্জনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার চৈতন্য বাস্তব আর অবাস্তবের প্রান্তসীমায় ঘুরে বেড়াতে লাগল। মনে হলো, কোথায় ছিলাম আমি? এখানেই বা কী করছি? অবস্থাটা ঠিক অনুধাবন করতে পারলাম না। দীর্ঘ একটা শ্বাস নিলাম। আকাশের দিকে তাকালাম, তারপর সনাতন কাকার দিকে ফিরে বললাম, “ওই ব্যাপারে আসলে আমার কোনো ধারণাই নেই।”
“ব্যাপারটা নিয়ে ভাবো একবার। তুমি যদি সেই মৃত লোকটি হতে, তাহলে কেমন লাগতো তোমার?”
আমি বললাম, “আমার নিশ্চয় তখন মনে হতো একটা দীর্ঘ ও পরিতৃপ্ত ঘুম থেকে উঠেছি, লাশকাটা ঘর ও লোকগুলোর দৌঁড়ঝাপ চিৎকার চেঁচামিচি দেখে ভাবতাম ওরা কারা আমি এখানে কেন কিংবা মৃত্যুর সাড়ে তিনঘন্টা পরে বেঁচে উঠেছি শুনতে পারলে আনন্দ হতো।” আমার কথায় হাসল না সনাতন কাকা, বিড়িতে দীর্ঘ টান দিয়ে ধীরে ধীরে ধোয়া ছাড়তে লাগল।
“মৃত্যুর সাড়ে তিনঘন্টা পরে বেঁচে উঠার ঘটনাটা আমাকে একটা কথা মনে করিয়ে দিল। বেশ কয়েকবছর আমি সন্ন্যাসী হবো বলে জায়গায় জায়গায় মন্দিরে মসজিদে ঘুরে বেরিয়েছি তখন এক ইমাম ও পন্ডিতের মুখে বিষয়টা শুনেছিলাম। তোমাকে বলেছিলাম নাকি যৌবনে পাঁচবছর আমি নিরুদ্দেশ ছিলাম? কোন এক জায়গায় ইমামের মুখে শুনেছিলাম আল বাকারার এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন “কিরূপে তোমরা আল্লাহকে অবিশ্বাস করছ? অথচ তোমরা মৃত ছিলে, অতঃপর তিনিই তোমাদেরকে জীবিত করেছেন, পুনরায় তিনি তোমাদেরকে মৃত করবেন এবং পুনরায় তোমাদেরকে জীবিত করা হবে। তারপর তোমারা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে।” আর পন্ডিত বলেছিল পুনর্জন্ম বা জন্মান্তরবাদ হল দার্শনিক বা ধর্মীয় ধারণা যে জীবের অ-ভৌত সারাংশ জৈবিক মৃত্যুর পরে ভিন্ন শারীরিক আকারে বা শরীরে নতুন জীবন শুরু করে। পুনরুত্থান হল অনুরূপ প্রক্রিয়া যা কিছু ধর্ম দ্বারা অনুমান করা হয়েছে যেখানে আত্মা একই দেহে জীবিত হয়ে ফিরে আসে।” বলল সনাতন কাকা। আমাদের এই আলোচনা দুপুর গড়িয়েও চলছিল কিন্তু দুপুরের খাবারের জন্য আলোচনা খ্যান্ত দিতে হলো অবশেষে।
প্রতিদিনকার মতো নয় আজকের বিকাল। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। বাচ্চু একটু পর পর রাস্তায় তাকিয়ে দেখছে, পচিঁশ বছর সে এইখানে চায়ের দোকান দিয়েছে রোদ ঝড় বৃষ্টি বছরের বার মাস এমন কোনদিন বাদ যায়নি যেদিন সনাতন কাকা তার দোকানে আসেনি। যত রাগারাগি হোক কথা কাটাকাটি হোক আগের দিন সন্ধ্যায় পরের দিন বিকালে সনাতন কাকা ঠিক এসে খবরের কাগজ নিয়ে বসে যাবেই কিন্তু আজ সনাতন কাকার দেখা নেই। বাচ্চুর কেমন জানি অস্বস্তি হচ্ছে। চুলার খড়ি বের করে ঝাপটা একটু নামিয়ে বাচ্চু হাঁটা ধরলো সনাতন কাকার বাড়ির দিকে পথে রসুলের সাথে দেখা। রসুল যখন জানতে পারলো বাচ্চু সনাতন কাকার খোঁজে সনাতন কাকার বাড়ি যাচ্ছে তখন বিস্ময়ে জানালো সপ্তাহখানেক হলো ঈশ্বর বাড়ি ফেরেনি শহর থেকে তাই সনাতন কাকা আজ ভোরে গিয়েছিল শহরে, রবিবার দিন শহরে তো সব বন্ধ ঈশ্বরের কাজও বন্ধ থাকে অনেক খোঁজ করতে করতে সকাল দশটায় একটা ভাড়াবাড়ি থেকে ঈশ্বরকে মৃত উদ্ধার করে সনাতন কাকা, ঈশ্বরের লাশ নিয়ে হাসপাতালে যাবার পর ঈশ্বরকে মৃত ঘোষণা করে ডাক্তার লাশকাটা ঘরে পাঠায় আর সেখানে লাশ নিয়ে যাবার পরে ঈশ্বর নাকি বেঁচে উঠেছে সনাতন কাকা মৃত্যু থেকে বেঁচে ওঠা ঈশ্বরকে নিয়ে এই ফিরলো বলে।
সন্ধ্যা পেরিয়ে ঘড়ির কাটায় তখন রাত দশটা অজ্ঞাত কোনো স্থান থেকে বাচ্চুর কানে সনাতন কাকার কণ্ঠস্বর ভেসে এল-বাচ্চু চারদিকে তাকায়। তার কাছে মায়া মনে হয়। সে দেখতে পেল পাথর ছড়ানো মাঠ, ছোট ঝোপঝাড় আর সনাতন কাকার সাথে ঈশ্বরের ছায়া। পকেট হাতড়ে সনাতন কাকা দুটি দুই টাকার কয়েন বের করে ধরেছেন।
রাত এখন তিনটা। ঘড়ির দিকে তাকায় বড় বৌ। তার মনে হলো ঈশ্বরের মৃত্যুতে, কয়েকদিন ধরে কোন মারপিট নেই, কান্নাকাটি নেই, দীর্ঘশ্বাস ফেলে খোলা জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকায় সে। চাঁদটি ঠাণ্ডা পাথর, বছরের নানা হাঙ্গামায় এর ছাল বাকল যেন কে খেয়ে ফেলেছে। এর উপরিভাগের ছায়া যেন বা একটা কর্কট, তার বিচ্ছিরি খুড় বিস্তার করে আছে। যেন চাঁদের আলো মনের সঙ্গে চাতুরি করছে।
আরেকটু ঘুমিয়ে নেবার চেষ্টা করল বড় বৌ। পারল না। পূব-আকাশে আলো না ফোটা পর্যন্ত চাঁদের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল। তখনই হঠাৎ ঈশ্বরের বাড়ি থেকে কান্নার বদলে ভেসে এলো বৃন্দার হাসির শব্দ বড় বৌ গত বিশ বছরে যা কখনো শোনেনি। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা সে, ভাল করে কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে — বৃন্দার হাসির মাঝে সে ঈশ্বরের গলাও শুনতে পায়।
দারুণ গল্প! শুভেচ্ছা গল্পকারকে..