
ইসলাম বলে সিরাত হল সেতু। নরক আর স্বর্গের মাঝখানে। সিরাত পেরিয়ে পৌঁছোতে হয় সেই স্বর্গীয় তপোবনে। কিন্তু স্বর্গ কোথায়?
ছবির শুরুতেই পরিচালক টাইটেল কার্ডে নামের নিচেই লিখে দিয়েছেন একথা।
সিনেমাটি তাই যদি ভাবা হয় পরিচালক অলিভার লাক্সে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি বানিয়েছেন তাহলেও ভুল হবে। ছবির মাঝখানে এসে তিনি তাঁর কেন্দ্রীয় চরিত্র লুইসের ছোট বাচ্চা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করেন কী হবে? উত্তর আসে: সন্ন্যাসী, কোন ধর্মের? নেই উত্তর। অর্থাৎ ছবি জুড়ে তিনি খুঁজছেন পথ। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম পেরিয়ে জীবনের পথ। পথ খুঁজেছেন পরিচালক।ছবির নাম সিরাত, যার অন্য আরেক মানে পথ।
খুঁজে কি পেলেন?
শেষ দৃশ্যে এসে নিজেই দিয়েছেন তার উত্তর। জীবন অনন্ত,মৃত্যুর পাশাপাশি জীবন চলে সমান্তরাল। অনির্দিষ্ট তার গন্তব্যে জীবন অন্তহীন। হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে ছোট ছেলেটিকেও চিরতরে হারিয়ে ফেলা, যাঁরা তাঁর সেই খোঁজার সঙ্গী সেই সঙ্গীদের একেক জনের একটার পর একটা মৃত্যু, মৃত লাশের দিকচিহ্ন অনুসরণ করেই জীবনের সন্ধানে এগিয়ে যাওয়া, জীবন মৃত্যুর মুহুর্মুহু দ্বন্দ্বে সংঘর্ষে শেষে জীবনের জয় বাঁচিয়ে রাখে আশা, চরম হতাশা নৈরাশ্য উৎকণ্ঠা পেরিয়ে স্বয়ং মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও জীবনকে বাজি রেখে এগিয়ে যাওয়ার এই ছবি
শুরুই হচ্ছে একের পর এক সারি সারি মিউজিক বক্স গাড়িতে তোলা নিয়ে। তারপরের দৃশ্যে পরিচালক সমস্ত বক্স পাশাপাশি সাজিয়ে ক্যামেরা দাঁড় করিয়ে স্থির করে রাখেন। পর্দাময় রুক্ষ পাহাড়ি খাঁজের সামনে অন্তত দু ডজন নানা মাপের বক্স। ক্যামেরা বেশ কিছুক্ষণ স্থির থাকার পর ফ্রেম বদলে যায়। একদঙ্গল ছেলে মেয়ে নাচছে। তারমধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছে এক কন্যা হারা পিতা। পাঁচ মাস আগে হারিয়ে গেছে। হাতে তার ছবি। একে ওকে জিজ্ঞাসা করে চলেছে। খুঁজছে। চারদিকে অসংখ্য নেশাতুর মানুষ। নেশাতুর মানুষ, সারি সারি মিউজিক বক্স আসলে উন্মাদনার ওষুধ, উন্নত এই সভ্যতা আসলে উন্মত্ত, কেউ নেই এই কন্যা হারা পিতার দিকে একটা মিনিট তাকিয়ে দেখে, সকলেই আচ্ছন্ন, নেশায় (পেশায়?) আচ্ছন্ন সমাজের সময় নেই হারিয়ে যাওয়া কারুর কন্যাকে খুঁজতে পাশে এসে দাঁড়ানোর, কারণ এখানে মানবতাই হারিয়ে গেছে। সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে শাসনের কাঠামোয়। হৃদয় বিবেক মন হারিয়ে সভ্যতা বাঁচতে চায় সেনার আস্যল্ট রাইফেলের আড়ালে।

এসবের মধ্যে বাবা খুঁজে চলে তার হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে।
সে মরুভূমির মধ্যে খুঁজতে এগিয়ে যায়, এদিকে দেশে সেনা ও বিদ্রোহীদের লড়াই শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষ সীমান্তের দিকে পালাচ্ছে। এই ছবি মরক্কো ফিল্ম ডিভিশনের সহায়তায় তৈরি, অর্থাৎ বর্তমান শাসকের কথা বলে ইসলামী প্রতীকের আড়ালে মানবতার খোঁজে, কিন্তু যে শর্ত তার জন্য সবার আগে জরুরি, সেই সাম্য ও সহমর্মিতা? ছবি জুড়ে তার খোঁজ করে চলেন পরিচালক। মক্কায় হজের ছবি ভাঙ্গা টেবিলের উপর টিভিতে, আবহে তার সুর, দৃশ্যান্তর — পর্দা জুড়ে শুধু ক্রাচ নিয়ে এগিয়ে যায় একটি পা, তারপর শুধুই পথ, পথের উপর ধুলো উড়িয়ে চলেছে মিউজিক বক্স ভর্তি গাড়ি, পিছনে আরও দুই বড় ভ্যান, একদল মানুষ চলেছে মরুভূমির ভিতর এক্সকার্সনে, এই অভিযাত্রায় আছে সেই পিতা,তার ছোট্ট বালিকা আরেক কন্যাকে নিয়ে, হারানো কন্যার সন্ধানে।
পরিচালক অলিভার লাক্সে আসলে সম্পূর্ণ গল্পটাকে প্রতীক করে বানিয়েছে। গোটা গল্পের শুরু থেকে শেষ : অন্বেষণ। জীবনকে খোঁজা। তাই সব চরিত্র, পটভূমি, ঘটনা সব সেই অখণ্ড প্রতীকের খণ্ড খণ্ড রূপ। গল্পের উদ্দেশ্যে — জীবনের সন্ধান। মানবতার সন্ধান।চরম আশাবাদী পরিচালক। নেশাচ্ছন্ন সমাজ বা মাইনপোতা মরুভুমির মৃত্যু উপত্যকা যদি নরক হয়, তবে তা পেরিয়ে যাওয়ার সেতু হল জীবনের প্রতি অদম্য টান।
নরক থেকে সেতু পেরিয়ে শেষে যেখানে পৌঁছনো যায় সেটাই স্বর্গ। সেটাই জীবন। জীবনই তপোবন। অর্থাৎ নরক থেকে স্বর্গ সবটাই জীবনের সন্ধানে এক বৃত্তাকার যাত্রা, অন্ধকার থেকে আলোয় পৌঁছনো হল জীবন। জীবন এক যাত্রা। সেই যাত্রা পথে যাত্রী হল মানুষই। এটাই হল এই ছবির অন্তর্লীন বার্তা।
কিন্তু এই অভিযাত্রা অত সোজা নয়।সহজ নয় তার পথ। অসংখ্য বাধা, মায়া, টান পেরিয়ে পৌঁছোতে হয় জীবনের কাছে। সেটা বোঝাতেই তৈরি হয়েছে একটা কাহিনী — কন্যা হারানো এক পিতার কন্যার খোঁজে এক মেরুযাত্রী দলের সাথী হওয়া। মানবতাহীন পৃথিবীতে কেউ কারুর জন্য নয়। কেউ পথ দেখায় না, এমনকি অনুসরণ করতে চাইলেও কেউ আটকে পড়লে পিছু ফিরে তাকায় না। ছবিটা শুরু হয়েছে এভাবেই। কিন্তু শেষ নয়। মরুভুমির যাত্রা পথে আটকে পড়ে সেই বাবা, নাবালক ছেলে। সিনেমার পরিচালক সিনেমাটিকে কালজয়ী করে তোলেন এখান থেকেই একটার পর একটা মোড় রচনা করে। লুইয়ের গাড়ি থমকে যায় খালের সামনে। শেষে একটা ট্রাক নিয়ে তাদের টেনে নিয়ে চলে। ট্রাকে দড়ি বেঁধে টেনে সেই বাবা ও ছেলেকে পার করায় খাল। সহযোগিতা ছাড়া যে মানুষ পারে না বাঁচতে, তার জন্য শক্তিমানকেই বাড়িয়ে দিতে হয় হাত দুর্বলের দিকে, এই ছবি সেই চরম বাস্তব সত্য তুলে ধরে সংলাপহীন দৃশ্যে ট্রাকের ড্রাইভার আসনে বসা পর্যটক দম্পতির ভূমিকায়। ওরা রেভ পার্টি করে বেড়ায়, এসেছে মরুভুমির বুকে পার্টি করতে। নাচতে। এই সূত্রেই তাদের পিছু ধরা, অনির্দিষ্ট অনিশ্চিত এই যাত্রায় এই অসুস্থ কুকুরের সেবার মোটিফ, ক্ষণে ক্ষণে এই ছবি প্রতিটি দৃশ্যের ফ্রেমে ছবিতে শব্দের ব্যবহারে রূপক নির্মাণে মানবতার সন্ধানে এক সুররিয়াল অভিযাত্রা। ক্যামেরা কখনও দর্শকের ভূমিকায় পটভূমি তুলে ধরে, কখনও পরিচালক ক্যামেরাকে ব্যবহার করেন তার কাহিনীর নির্মাণে, কিন্তু দৃশ্য শব্দে মন্তাজে এই ছবি নিজেই একটা চরিত্র, নায়ক নায়িকাহীন ছবিতে সব কুশীলবই ঘুরে ঘুরে আসে মূল ছবির অনুসারী হয়ে। গোটা ছবি একটা প্রশ্ন করে:মানবতার জন্য ইসলাম বামপন্থা, নাকি রাষ্ট্র কে বেশি প্রয়োজন। বাচ্চা ছেলেটিকে জনৈক সহযাত্রী প্রশ্ন করে : তুমি কি কমিউনিস্ট হতে চাও! নাবালক ছেলেটি উত্তর দেয়, না সে সন্ন্যাসী (monk) হতে চায়।খুব জোরালো ধাক্কা দিলেন পরিচালক। ইসলামী সংস্কৃতির পটভূমিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবীতে আগামী প্রজন্ম বেছে নিতে চায় কোনো এক সন্ন্যাসীর পথ,কোন সে ধর্মের সন্ন্যাসী? শান্তির বার্তা চায় ছেলেটি। শান্তির বার্তার সঙ্গে সন্ন্যাসী? তাহলে কি পরিচালক বৌদ্ধ মতেই মুক্তির পথ চাইলেন? উত্তর অস্পষ্ট রেখেই পরের ফ্রেমে সারি সারি সেনা কনভয় আসার দৃশ্য। কথোপকথনে উঠে আসে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা। ছবির দৃশ্য রচনা, সংলাপ, আবহ মিলিয়ে মিশিয়ে এক ধ্রুপদী আলাপ হয়ে প্রশ্ন করে : পৃথিবীর শেষ কোথায়? এই প্রশ্ন তোলে সহযাত্রী। এরপরেই ঘটে যায় ক্লাইম্যাক্স।

লুইস তার ছোট্ট ছেলে এস্তেবানকে নিয়ে খুঁজতে বেরিয়েছিল হারিয়ে যাওয়া বড় মেয়েকে। আচমকা পাহাড়ের খাদে গাড়ি নিয়ে পড়ে গেল এস্তেবান। সেও হারিয়ে গেল চিরতরে।
এরপর অচেনা অজানা সহযাত্রীরা এল এগিয়ে, কিন্তু কে বলবে ছোট্ট বাচ্চাটির মৃত্যুর কথা তার বাবাকে? কেউ পারে না।
সকলেই খুঁজে বেড়ায় হারানো বাচ্চাটিকে। খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে গেল পাহাড়ের নিচে, মরু উপত্যকায়।
মরুভুমির মধ্যে পাগলের মতো খুঁজে চলে বাবা।অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়, সহযাত্রীরা জল খেতে দেয়, তখন সকলেরই মুখে একটাই প্রার্থনা : কেউ যদি সাহায্যের জন্য আসত!
কিন্তু কোথায় কে!
একমাত্র সেই অচেনা সহযাত্রীদের সঙ্গেই তাঁর বাঁচা, ফিরে আসা।
এক পা স্টিলের তৈরি, তাই নিয়েই মরুভুমির মধ্যে মিউজিক বক্স সাজানো, হতভাগ্য কন্যা হারা বাবাকে বসিয়ে রেখে মাঝখানে, স্টিল পায়ে লোকটি সূর্যের দিকে তাকায়, আবহে বেজে ওঠে বিটস, সহযাত্রীরা নাচতে থাকে আদিম উন্মাদনায়। কন্যা হারা প্রার্থনারত বাবাকে আকাশের থেকে হাত গুটিয়ে দেখে জীবন বাঁচতে চায় চরম শোকের মধ্যেও, কিন্তু এসব তো ক্ষণিকের মায়া।
যেখানে আনন্দের অনুসন্ধানে সঙ্গীতের আয়োজন সে তো আসলে মৃত্যু উপত্যকা।
হঠাৎই মাইন বিস্ফোরণ, উড়ে গেল এক সহযাত্রী দম্পতি যাঁদের হাত ধরেই লুইয়ের যাত্রা শুরু। এরপর এক এক করে মাইনে উড়ে যাওয়া।
মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখা, মৃত্যুর সঙ্গে লুকোচুরি, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে বাঁচার পথ খোঁজা।
এই ছবি তমসা, হিংসা, যুদ্ধ, ধ্বংস ও মৃত্যুর একেরপর এক দৃশ্য রচনা করে, কিন্তু শেষে বাঁচার কথা বলে জীবনের পথ খোঁজার কথা বলে।
শেষে তাই মৃত্যুকে জয় করেই ফিরে আসা দেখান পরিচালক অলিভার লাক্সে, আট জনের মধ্যে ফিরলেন তিনজন। মরুভুমির বুক চিরে রেলের ছাদে ফিরছে।
কিন্তু শেষ দৃশ্য কোনো চরিত্র নেই। পর্দা জুড়ে শুধু পাতানো রেল। দু-টি লোহার পাত। একটি জীবন, একটি মৃত্যু। দুটিই পাশাপাশি সমান্তরাল। স্থান কাল পেরিয়ে দিগন্তে মিশে গেছে। এটাই শাশ্বত সত্য। তার উপর দিয়েই ছুটে যায় সভ্যতার গতিযান, মানুষ তারই সওয়ারী ।
কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার জয়ী এবং সাম্প্রতিক কালের অন্যতম সেরা ছবির শিরোপা পাওয়া এই অসামান্য ছবির সমালোচনা লিখতে গিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল: এই ছবি শুধু দেখার নয়।এ এক অভিজ্ঞতা। সত্যিই। সমস্ত জাগতিক পাওয়া না-পাওয়ার উর্ধ্বে উঠে পরিচালক শাশ্বত আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা নিয়ে ক্যামেরায় খোঁজেন জীবনের গন্তব্য। মৃত্যুতেই কি শেষ জীবন? না। মৃত্যুর পরেও অন্য কোনো লোকে পরিচালক জীবনের অন্বেষণ করেন নি। তিনি জীবনের টান অনুভব করছেন। জীবনেই জীবন খুঁজছেন।

এই ছবি নান্দনিক দিক থেকেও অসাধারণ এক মাস্টারপিস। আভা গার্দে মুভমেন্টের পর সিনেমায় ট্রিটমেন্ট বদলে দিয়েছিল ক্যামেরার ব্যবহার। এই ছবি সেই ধারার ছবি। লং-শট এবং একটা স্থানে ক্যামেরাকে বসিয়ে দূর থেকে দৃশ্যের নির্মাণ এই ছবির বিশেষ বৈশিষ্ট্য।পরিচালক সিনেমাকেই চরিত্র হিসেবে নির্মাণ করেছেন, তাই কোনো বিশেষ চরিত্রকে গুরুত্ব বেশি দেন নি। সিনেমার অন্তর্নিহিত অর্থ ও বার্তা ফুটিয়ে তুলতে শট বিভাজনে যতটা ক্লোজ আপ ব্যবহার করেছেন তার চাইতে ঢের বেশি তার নজর পর্দা জুড়ে বিস্তৃত এলাকার দৃশ্য রচনায় মন দিয়েছেন। এখানেই তিনি অসাধারণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। একটার পর একটা ফ্রেম তৈরি ও সম্পাদনায় অসাধ্য সংযম। ছবিতে শব্দের ব্যবহার বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।দৃশ্যের অনেক না বলা কথা ফুটে উঠেছে মৃদু আবহে। সিনেমা শুরু হচ্ছে বড় বড় মাপের সাউন্ড বক্স গাড়িতে তোলা দিয়ে। প্রথম দৃশ্য তোলা হচ্ছে একটা হাতের বিগ ক্লোজ আপ দিয়ে, যে হাত সাউন্ড বক্স তুলে সাজাচ্ছে গাড়িতে। না। এই দৃশ্যে কোনো মানুষের মুখ নেই, সাউন্ড বক্স গুলোকেই ক্লোজ আপে ধরেছেন পরিচালক। মানুষের উদ্দামতার চিহ্ন এই বক্সগুলো। লাক্সে যেভাবে ১৬মিমি (16mm) ক্যামেরায় মরুভূমির রুক্ষ সৌন্দর্য এবং কড়া ইলেকট্রনিক মিউজিকের ব্যবহার করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ক্লোজ আপে ডজন খানেক সাইন্ড বক্স। পরপর পর্দা জুড়ে লং শটে দেখান পরিচালক, তার পরেই জাম্প কাট। অসংখ্য নেশাতুর যুবক যুবতী একসঙ্গে এক জায়গায় নাচছে। ক্যামেরা প্যান করে উপরে উঠে দেখাতে থাকে মরক্কোর রুক্ষ খাঁজকাটা কাটা পাহাড়, সেখানকার মানুষের যাপন চিত্রের প্রতীক হয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। পরিচালক ক্যামেরার ব্যবহারে সর্বদাই রুক্ষ প্রকৃতিকে তুলে এনেছেন, কখনও পাহাড় কখনও মরুভুমির ধূসরতা অভাবী জীবনের আশাহীনতা, কষ্ট, যন্ত্রণা হয়ে চিত্রনাট্যের অংশ হয়ে গেছে। চিত্রনাট্যও অদ্ভুত পরিমিতিতে স্মরণীয় হয়ে রইল। বাবার সঙ্গে দিদির খোঁজে বেরোনো ছোট্ট ভাইয়ের মুখে কোনো কথা নেই, শুধু চোখে তার আশঙ্কা, হতাশা আর সম্ভাবনার খোঁজ। দীর্ঘ সময় পরিচালক এই ছোট্ট এস্তেবানকে পর্দা জুড়ে দেখাচ্ছেন বাবার সাথী হয়ে, অথচ তার মুখে কোনো সংলাপ নেই। সমস্ত ছবিতে মাত্র কয়েকটা সংলাপ তার কণ্ঠে।কেন? আসলে এই চরিত্রটি পরিচালক সৃষ্টি করেছেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটির দিশাহীন প্রজন্মের অসহায়তা ফুটিয়ে তুলতে। সারাক্ষণ নীরব রেখে শুধু কয়েকটা কথা বলিয়েই পরিচালক আগামী পৃথিবীর প্রশ্ন তুলে ধরলেন বাচ্চাটির মুখে, সারা ছবিতে কোথাও কিন্তু তারপর আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেন না, শুধু কাহিনীর মোচড়ে সকলকে দাঁড় করিয়ে দিলেন এই হিংসামত্ত পৃথিবীর মৃত্যু লীলার মুখে, বাঁচতে চেয়ে মানুষ কি করে একটার পর একটা অবোধ পদক্ষেপে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তার অনবদ্য দার্শনিক ব্যাখ্যা রেখে গেলেন পরিচালক উন্মুক্ত মরুভুমির সেটে ক্যামেরাকে স্থির রেখে দর্শকের চোখ করে। প্রকৃতির মধ্যে মানুষের ধ্বংসলীলাই যে মানুষকে অভাবিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেটা কেউ বুঝতেই পারছে না।গোটা বিশ্ব যেন মাইন পোতা ভূমি, মানুষ কোথায় পা রাখবে, কেউ জানে না এরপর বাঁচবে কিনা। চিন্তা ভাবনা করে পথ খুঁজে বারবার সেটাতে মৃত্যুই হচ্ছে। মাইন বিস্ফোরণের দৃশ্যগুলিতেও ক্যামেরা অচঞ্চল। স্থির কোনো কৌণিক বিন্দু থেকে লং শটে তুলে ধরেছেন কার্যত মানুষের অসহায়ত্ব।একটার পর একটা দৃশ্যের সিকোয়েন্স প্রতিষ্ঠা করে গেল অনুচ্চারিত ব্যঞ্জনা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই ছবি আধুনিক সিনেমার নব ধারায় সাম্প্রতিক পরীক্ষা নিরীক্ষার অপূর্ব নিদর্শন। ছবিটি তৈরি ও মুক্তি ২০২৪-২৫ সালে। সেই কারণেই এই সময়ের বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি বলে অস্কারে বিশ্বসেরা ছবির বিভাগে নমিনেশন পেয়েছে।কান চলচ্চিত্র উৎসবে (Cannes Film Festival) জুরি প্রাইজ (Jury Prize) জয়ী এবং অস্কারে ‘সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র’ বিভাগে মনোনীত হয়।
এই ছবি দেখাটা সত্যিই এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
ছবিটি যেমন আধুনিক চলচ্চিত্রের নতুন আঙ্গিক নির্মাণ করেছে তেমনি দেখিয়েছে আধুনিক মানুষ আত্মঘাতী সভ্যতায় কতটা অসহায়।