শরতের আকাশটা আজ বড্ড নীল। তুলোর মতো সাদা মেঘগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে আর দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসা কাশফুলের ঘ্রাণটা মাঝেমধ্যে পচা নর্দমার গন্ধ ছাপিয়েও নাকে এসে লাগছে। সোনাগাছির এই সরু গলিতে সূর্য পৌঁছায় না, কিন্তু উৎসবের আমেজ ঠিকই চুঁইয়ে ঢোকে। জানলার ভাঙা কাচ দিয়ে রাস্তার ধারের প্যান্ডেলটার বাঁশ বাঁধার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। শহরজুড়ে পুজোর তোড়জোড় সবে শুরু হয়েছে।
আমিনার ঘরে তখন বিকেলের আবছা আলো। আয়নার সামনে বসে সে নিজের প্রতিচ্ছবিটা দেখছিল। পঁচিশ বছর বয়স, কিন্তু আয়নার মুখটা যেন একশ বছরের পুরনো এক ধ্বংসস্তূপ। এই মুখটাই যখন তেরো বছরের ছিল, তখন উত্তর দিনাজপুরের এক গ্রামে সবুজ শস্যের গন্ধ নিয়ে ঘুরত। তারপর একদিন — সেই পরিচিত ‘চাচা’র হাত ধরে শহরে আসা, আর তারপর এক ঝটকায় অন্ধকার ঘরে বিক্রি হয়ে যাওয়া। মুসলমান ঘরের মেয়ে আমিনা হয়ে গেল ‘রেশমা’। সেই কিশোরী বয়সে যখন প্রথম শরীরের ওপর অন্যের নখ বিঁধেছিল, তখন সে কেঁদেছিল খুব। এখন আর কান্না আসে না, শুধু গলার কাছে একটা তেতো স্বাদ জমে থাকে।
এই গলিতে মানসম্মান নেই, আছে শুধু লেনদেন। কিন্তু আমিনার জীবনেও একবার বসন্ত এসেছিল। সেবার এক যুবক এসেছিল — সুমন। কলেজের ছাত্র, প্রথম প্রথম বড় ভয় পেত। সুমন তাকে শুধু শরীর হিসেবে দেখেনি, অন্তত আমিনা তাই ভেবেছিল। সুমন তাকে গান শোনাত, জীবনানন্দের কবিতা পড়ে শোনাত। আমিনা ভেবেছিল, এই পঙ্কিল আবর্ত থেকে হয়তো তাকে কেউ হাত ধরে টেনে তুলবে। সে তার সঞ্চিত সবটুকু ভালোবাসা সুমনের পায়ে উজাড় করে দিয়েছিল।
কিন্তু যেদিন আমিনা সুমনের হাত ধরে এই গলি থেকে বেরোনোর স্বপ্ন দেখাল, সেদিন সুমনের রূপ বদলে গেল। সুমন হো হো করে হেসে উঠেছিল। সেই হাসিতে কোনো প্রেম ছিল না, ছিল বিষাক্ত বিদ্রুপ। আমিনা আসলে ভুলে গিয়েছিল যে রাতে দেওয়া কথা এই পাড়ায় ভোরের আলোয় টেকে না।
সুমন বললো, “তুমি আমিনা হতে পারো বা রেশমা, কিন্তু দিনের শেষে তুমি তো একটা বাজারের পণ্য। পতিতার আবার ভালোবাসা কিসের? তুমি অপবিত্র, তোমার ছোঁয়া লাগলে আমার বংশের জাত যাবে। তোমার সাথে দু-দণ্ড সময় কাটানো যায়, জীবন কাটানো যায় না।”
পড়শিরা, খরিদ্দাররা, এমনকি সমাজের ভদ্রলোকেরা — সবাই তাকে ‘অপবিত্র’ তকমা দিয়ে হাসাহাসি করেছে। আমিনার মনে হতো, সে বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাপী। এই পাপের বোঝা বয়ে বেড়াতে বেড়াতে তার ঘাড় নুইয়ে আসত। সবাই বলত, ওদের নরকেও জায়গা হবে না।
এমনই এক দিন, যখন বাইরে উৎসব-আসার ব্যস্ততা জেগে উঠছিল, তখন আমিনা তার ঘরের দরজা বন্ধ করল। সারা দিন, ধরে সে একটা চিঠি লিখেছে। তার শেষ চিঠি। শরীরটা ইদানীং দিচ্ছিল না, ভেতরটা কুরে কুরে খাচ্ছিল কোনো এক অজানা রোগ। কিন্তু আজ সে শান্ত।
এদিকে আমিনার ঘর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে পল্লিতে যখন হইচই শুরু হলো, তখন খবর পৌঁছল পুলিশের কান অবধি। শেষ রাতে পুলিশ এসে দরজা ভাঙল। ঘরের কড়িকাঠ থেকে তখন ঝুলছে আমিনার নিথর দেহ। খাটের ওপর পড়ে আছে একটা নীল খাতা। তাতে কাঁপাকাঁপা হাতে লেখা তার শেষ কথাগুলো।
চিঠির বয়ান :—
“আমি জানি, এই সমাজ আমাকে ঘৃণা করে। সুমন বলেছিল আমি অপবিত্র, আমার কোনো ধর্ম নেই, আমার জান্নাত বা স্বর্গ কোথাও কোনো ঠাঁই নেই। আমি মেনে নিয়েছি। আমি সত্যিই পাপী। তাই এই জীবনটা রাখলাম না। তবে আমার একটা শেষ ইচ্ছা আছে। আমি যখন মরে যাব, আমাকে যেন কোনো গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া না হয়। আমার দেহটা যেন এই গলির চৌকাঠের ঠিক বাইরের দিকের মাটিতে কবর দেওয়া হয়। সবাই যাতে আমাকে মাড়িয়ে যেতে পারে। সুমন যাতে তার বন্ধুদের নিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে পায়ের তলায় পিষে যেতে পারে। আমি পাপী, আমি অপবিত্র — তাই মানুষের পায়ের ধুলো মেখেই আমি আমার অস্তিত্ব মিটিয়ে দিতে চাই। আমার ওপর দিয়ে সবাই হেঁটে যাবে, তাদের মনের সব কামনা-বাসনা পূর্ণ করে আমাকে মাড়িয়ে চলে যাবে — এটাই আমার শাস্তি, আর এটাই আমার মোক্ষ।”
আইনি প্রক্রিয়া মিটতে দিন দুয়েক সময় লেগে গেল। লোকেরা হাহাকার করল না, বরং এক ধরনের স্বস্তি পেল। “যাক, আপদ বিদায় হয়েছে।” আমিনার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী গলির চৌকাঠের বাইরের মাটিতেই তাকে দাফন করা হলো। সবাই ভাবল, কী ভীষণ অপরাধবোধ নিয়ে মেয়েটা মরল! নিজেকে এতই তুচ্ছ ভাবল যে সবার পায়ের তলায় পিষ্ট হতে চাইল!
সুমনও সেদিক দিয়ে যাওয়ার সময় আড়চোখে একবার তাকিয়ে মনে মনে হাসল, “উচিত শিক্ষা হয়েছে। অপবিত্রের স্থান তো রাস্তার ধুলোতেই।”
কিন্তু কেউ খেয়াল করল না অন্য একটা বিষয়। পুজোর তখনও বেশ কিছুদিন বাকি। প্রতি বছরের মতো কুমোরেরা প্রতিমার মাটি সংগ্রহ করতে বেরিয়েছে। কুমোরটুলির নিয়ম অনুযায়ী, দেবী দুর্গার মূর্তির জন্য ‘নিষিদ্ধ পল্লীর মাটি’ লাগে। সেই পবিত্র মাটি ছাড়া দশভুজা পূর্ণতা পান না।
এরই মধ্যে প্রতিদিন মানুষের পায়ের ধুলো এসে পড়ল সেই জায়গায়। বৃষ্টির জল গড়িয়ে গেল, রোদ শুকিয়ে দিল, বাতাস উড়িয়ে নিল উপরকার শুকনো স্তর। চৌকাঠের ধারের সেই মাটি ধীরে ধীরে পথের মাটির সঙ্গে একাকার হয়ে গেল। আলাদা করে বোঝার উপায় রইল না কোথায় শেষ হয়েছে রাস্তা, কোথায় শুরু হয়েছিল আমিনার শয্যা।
আমিনা কি সত্যিই নিজেকে শুধু শাস্তি দিতে চেয়েছিল? নাকি তার এই মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার পেছনে ছিল এক গূঢ় আকাঙ্ক্ষা? সে জানত, এই চৌকাঠের মাটিই একদিন মহিষাসুরমর্দিনীর অঙ্গে লেপন করা হবে। যে সমাজ তাকে ‘অপবিত্র’ বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে, সেই সমাজকেই মাথা নত করে এই মাটির সামনে দাঁড়াতে হবে।
সবার পায়ের তলায় পিষ্ট হতে চেয়ে আমিনা আসলে নিজেকে মিশিয়ে দিল সেই আদি শক্তির সঙ্গে। সুমনের ঘৃণা, সমাজের উপহাস — সবই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল সময়ের অলিন্দে। ধুলো ছড়িয়ে গেল বাতাসে, মিশে গেল সেই পবিত্র মৃত্তিকায় যা দিয়ে তৈরি হচ্ছে অকালবোধন।
সবাই যখন মণ্ডপে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দেবে, তখন তারা ঘুণাক্ষরেও জানবে না যে, যেই দেবীর চরণে তারা পুষ্প প্রদান করছে, সেই মৃন্ময়ী মূর্তির মধ্যেই মিশে আছে অপবিত্র তকমা পাওয়া এক মুসলমান নারী — আমিনা। তার মুক্তি কোনো গোরস্থানে ছিল না, তার মুক্তি ছিল এক শাশ্বত একাত্মতায়।
আমিনা হেরে গিয়েও জিতে গেল। সে রয়ে গেল চৌকাঠের ওপারে, কিন্তু অন্তরে রয়ে গেল দেবীত্বের অংশ হয়ে। তার শেষ চিঠিতে লেখা আর্তিটা ছিল আসলে এক নীরব বিদ্রোহ — ঘৃণাকে পবিত্রতায় রূপান্তর করার এক আশ্চর্য খেলা।