এক বাংলার দুই বাউলের কণ্ঠ সুমধুর
রবীন্দ্রনাথ শুধু বাউলের পোশাক পরে হাতে একতারা নিয়ে মঞ্চে দেখা দেন নি, শুধু বাউল সুরে গান লেখেন নি (৬৬টি গান), সংগ্রহ করেন নি শুধু বাউল গান, বাউলদের মতো মনের মানুষ (তিনি কি রবীন্দ্রের ‘জীবন দেবতা’?) সন্ধান করে ফেরেন নি; তিনি তাঁর অন্তরকে সিঞ্চিত করে নিয়েছিলেন বাউল দর্শনে, বাউল ধর্মে। বাউল আমাদের দেশে minor religious sect বা গৌণধর্ম। এরকম আরও বহু বহু গৌণধর্ম সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয় তার তত্ত্ব-তলাশ করার চেষ্টা করেছিলেন একবার। ‘বৈষ্ণব ব্রত নির্ণয়’ বইতে ১৩০টি গৌণধর্মের নাম আছে।

এই যে বাউলকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মাতামাতি, এর জন্য অপবাদ শুনতে হয়েছে তাঁকে। তিনি না কি লালন ফকিরের খাতা চুরি করে এনেছিলেন; নোবেল প্রাইজ পাওয়া বই ‘গীতাঞ্জলি’কে তাঁরা লালনের গানের নকল বলতেও দ্বিধা করেন নি। এ সবের পেছনে আবার রাজনীতির প্ররোচনাও আছে। আমার নিজের কথা বললে মারতে আসবে লোকে; তাই সুধীর চক্রবর্তী মশায়ের শরণ নিচ্ছি। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে লালনের কথা কেউ জানত না। ইতিমধ্যে হঠাৎ পূর্ব পাকিস্তানে একটা ইসলামি চেতনা জেগে উঠল। ওঁরা ঠিক করলেন, লালন ফকির বলে একটা লোককে পাওয়া গেছে (যেমন ইকবাল ও নজরুলকে পাওয়া গিয়েছিল)। তার একটা ইসলামিকরণ দরকার। কাজেই ওঁরা ওখানে একটা একাদেমি মতন খুলে ফেললেন। মুহম্মদ মনসুরুদ্দিনের চেষ্টায় তখনকার পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ অনেক টাকা নিয়ে এলেন ঢাকা থেকে। দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়ায় যে আছে, তার নকলে সাদা রঙের ইসলামি সৌধ লালন ফকিরের সমাধির উপর তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিককালে আমার কাছে যে সংবাদ এসেছে, লিখিত খবর যে. ফকিরদের মৌলবাদীরা তাড়িয়ে দিয়েছে এবং লালনের ওই সৌধের মধ্যে বসে প্রতিদিন কুরআনের তেলওয়াত করা হয়। লালন যা চান নি সেটাই করা হয়েছে। পাকাপাকি ভাবে লালনকে ইসলামি করা হয়েছে।’ অথচ বাউলরা যে জাতধর্মের উপরে, লালন যে জাত মানেন না, সে কথা নিজেই তিনি তাঁর গানে বলে গেছেন।
এবার লালনের ঠিকুজি-কোষ্ঠির সন্ধান নেওয়া যাক। না, তাঁর জন্ম ও বংশপরিচয়ের কোন প্রমাণ নেই আমাদের হাতে। শুধু হাতে আছে কুষ্ঠিয়া থেকে প্রকাশিত ‘হিতকরী’ পত্রিকার কিছু বিবরণ। তাও আবার লালনের মৃত্যুর পরে। সে বিবরণ থেকে আমরা পাই : ১৮৯০ সালে ১১৬ ( ১১৭?) বছর বয়েসে মৃত্যু হয় লালনের। তাঁর জন্মস্থানের কথা নেই, কথা নেই তাঁর মা-বাবা-আত্মীয়-বান্ধবের। শুধু আছে ছেঁউড়িয়াতে তাঁর আশ্রমের কথা। ‘হিতকরী’তে আরও লেখা হয়েছে যে লালন কোন বিশেষ ধর্মমতে (মুখ্যধর্ম) বিশ্বাস করতেন না, তাঁর পূর্বজন্ম সম্বন্ধে কিছু বলতেন না, শিষ্যদেরও এ বিষয়ে বলা নিষেধ ছিল। অথচ আশ্চর্যের কথা এই যে প্রায় অজ্ঞাতপরিচয় এই লালনকে নিয়ে অন্তত ৬টা উপন্যাস, ১৫টি জীবনীগ্রন্থ, ২/৩টি কাহিনিচিত্র, এক ডজন পি.এইচ.ডি গবেষণা হয়ে গেছে। লালন হে। ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা’।
এবার আসি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের সাক্ষাৎ নিয়ে। সে আলোচনার আগে মনে রাখতে হবে লালনের মৃত্যু হয় ১৮৯০ সালে। তার আগে রবীন্দ্রনাথ দু-বার এসেছেন শিলাইদহে। তখন তিনি কিশোর।
জলধর সেন কাঙাল হরিনাথের জীবনীতে লিখেছেন, ‘শুনিয়াছি, কবিবর শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিতে লালন ফকির একবার গান করিয়া সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন। প্রাতঃকাল হইতে আরম্ভ করিয়া অপরাহ্ন তিনটা পর্যন্ত গান চলিয়াছিল, ইহার মধ্যে কেহ স্থানত্যাগ করিতে পারেন নাই’। বোঝা যাচ্ছে জলধর সেন নিজে দেখেন নি, এ কথা কারোর মুখে শুনেছেন। কিন্তু কার মুখে শুনেছেন, তা উল্লেখ করেন নি।

শচীন্দ্রনাথ অধিকারী ‘প্রবর্তক’ পত্রিকার ১৩৫১ সনের বৈশাখ সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ লেখেন, তার নাম ‘কবি মিলন’। সে প্রবন্ধে তিনি বলেন লালনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। তাঁর বই ‘পল্লির মানুষ রবীন্দ্রনাথে’ (বৈশাখ, ১৩৫২) তিনি একই কাহিনি পরিবেশন করেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এই বই-এর দ্বিতীয় সংস্করণে শচীন্দ্রনাথ জানান যে লালনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তারপরে এক চিঠিতে আবুল আহসান চৌধুরীকে জানান, “লালন ফকির সম্বন্ধে ‘পল্লির মানুষ রবীন্দ্রনাথে’ যে ফুটনোট আছে, তা সত্যি। উপেনবাবু (উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য) তাঁর ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ গ্রন্থে বহু গবেষণা করে লিখেছেন যে, লালনের মৃত্যু ১৮৯০ খ্রিঃ ১৭ অক্টোবর ১১৬ বছর বয়েসে। রবীন্দ্রনাথ ওই সময়ে জমিদারির ভার পান নি, তাই সাক্ষাৎ হয় নি ধরা যেতে পারে। তবে আমার এই কাহিনি অসত্য নয়, কারণ যার কাছে শোনা.. .. সে ছেঁউড়েরই বুড়ো — সে বাজে কথা বলার লোক নয়। রবীন্দ্রনাথের স্থানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ হবেন . কারণ ওই সময়ে জ্যোতিবাবু ঘনঘন শিলাইদহ যেতেন ও থাকতেন। তাঁকেই প্রজারা ‘বাবুমশাই’ বলত।”
মুহম্মদ মনসুরুদ্দিন রবীন্দ্র-লালনের সাক্ষাতের ব্যাপারে জনশ্রুতির দোহাই দিয়েছেন, বসন্তকুমার পালের ‘মহাত্মা লালন ফকির’ বইয়ে প্রকাশকের নিবেদন অংশে লেখা হয়, ‘নিরক্ষর পল্লিবাসী হইতে আরম্ভ করিয়া আমরা শুনিয়াছি জ্ঞানবৃদ্ধ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত ফকিরের সহিত ধর্মালাপ করিয়া পরিতৃপ্ত হইয়াছেন। শিলাইদহে মহাকবি রবীন্দ্রনাথের সহিত প্রথম যেদিন তাঁহার ভাবের বিনিময় হয়, তাহা জাহ্নবী-যমুনা মহামিলনের ন্যায় রসোচ্ছ্বাসের সঙ্গমতীর্থ রচনা করে’।
এবার আসি রাসবিহারী জোয়ারদারের কথায়। ইনি শিলাইদহের সাধক কবি গোঁসাই গোপালের সংগীত সংগ্রহ করেন। নাম দেন ‘গোপাল গীতাবলি’। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘নদিয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার শিলাইদহ একটি গ্রাম। ঠাকুরবংশের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের পাদস্পর্শে পূত হইয়া গ্রামটির নাম চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়ে। পূত গ্রামটি পবিত্র গঙ্গাসলিলা পদ্মানদীর তীরে অবস্থিত। শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পদ্মার উপরে বজরায় থাকিতেন এবং এখানেই তাঁহার কবিত্বশক্তি প্রকাশ পায়…। সাধক লালন সাঁই প্রভৃতি বহু সাধু দরবেশ ঠাকুর মহাশয়ের সহিত দেখা করিতে আসিতেন। কবি রবীন্দ্রনাথ সাধক লালন সাঁইকে ভালোবাসিতেন ও তাঁহার সুললিত গান একাগ্র মনে শ্রবণ করিতেন’।
লালনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের ব্যপারে রবীন্দ্রনাথ কি বলেছেন? ‘হারামণি’র ভূমিকায় তিনি বলেছিলেন বাউলদলের সঙ্গে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হত। কিন্তু এই বাউল দলে লালন ছিলেন কি না তা স্পষ্ট নয়। বসন্তকুমার পাল লালন জীবনী লেখার সময় রবীন্দ্রনাথের কাছে লালনের ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের হয়ে রবীন্দ্র-সচিব সুধীরচন্দ্র কর ১৯৩৯ সালের ২০ জুলাই যে চিঠি বসন্তবাবুকে লেখেন তাতে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। তিনি লেখেন, — ফকির সাহেবকে তিনি (রবীন্দ্রনাথ) জানতেন বটে কিন্তু সে তো বহুদিন আগে, বুঝতেই পারেন এখন সে সব সুদূর স্মৃতির বিষয় তাঁর মনে তেমন উজ্জ্বল নয়’। এই সব সূত্র ধরে বাংলা সাহিত্যের গবেষক আর ঐতিহাসিকেরা যে যাঁর মতো মত বলেছেন।

লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা হোক বা না হোক, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর দেখা হবার একটা প্রমাণ আছে। ১৮৮৯ সালে তাঁর আঁকা লালনের একটা স্কেচ আছে। তার তলায় লেখা ‘শিলাইদহ, বোট, লালন ফকির ১৮৮৯’।
রবীন্দ্রনাথই আমাদের দেশের প্রথম লোকগীতি সংগ্রাহক। তিনিই প্রথম ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘হারামণি’ নামক ক্রোড়পত্রে লালনের ২০টি গান প্রকাশ করে লালনকে সভ্য সমাজে তুলে ধরেন। তারপর ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীকে দিয়ে লালনের ২টি গানের স্বরলিপি ‘ বীণাবাদিনী’ পত্রিকায় প্রকাশ করান।
এবার খাতা চুরির প্রশ্ন।
ছেঁউড়িয়ায় লালনের আশ্রমের এক শিষ্য ভোলাই শাহ অনেকের কাছে বলেছেন যে রবিবাবু না কি তাঁদের গানের খাতা নিয়ে গিয়েছেন, আর ফেরত দেন নি। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রমাণ হয়েছে রবীন্দ্রনাথ লালনের গান কপি করে এনেছিলেন, মূল খাতা আনেন নি। কৃষ্ণ কৃপালনী এই রকম একটা খাতা পেয়েছিলেন পুরানো বইপত্র বিক্রি করার সময়ে।
এহ বাহ্য আগে কহ আর। লালন ফকিরের গানের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের উপর পড়েছিল। বাউল গান যে দেহজরিপের গান। নিজের মধ্যে পরমকে সন্ধান করা। তাই করেছেন রবীন্দ্রনাথ। লালনের ‘মনের মানুষ’ রবীন্দ্রনাথের ‘মানস সুন্দরী’, ‘জীবনদেবতা’ এবং ‘তুমি’। লালন লিখেছেন —
‘আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে
আমি জনমভরে একদিন না দেখলাম তারে’
রবীন্দ্রনথ লিখলেন —
‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে দেখতে আমি পাই নি’।
ঋণ:
মহাত্মা লালন ফকির/বসন্তকুমার পাল। রবীন্দ্রনাথ ও লালন ফকির/সুধীর চক্রবর্তী। লালন সাঁই-এর সন্ধানে/আবুল আহসান চৌধুরী। রবীন্দ্র-লালন : সাক্ষাতের দ্বন্দ্ব ছন্দ/দেবাশিস তেওয়ারি
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক