Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্পেন — রবীন্দ্রনাথ কখনও এখানে খেতে আসেননি : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জাতি সংঘের চিঠি : নির্বাচন কমিশন ও ভারত সরকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি ডালিয়া — ডায়েট ফ্রেন্ডলি রেসিপি : রিঙ্কি সামন্ত ছানি অপারেশন কোথায় ও কখন করা উচিত : ডা. তনুশ্রী চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অপারেশন লোটাসের ইতিবৃত্ত : দিলীপ মজুমদার ওড়িশার পঞ্চদশ শতকের মহাকবি সরলা দাসের কোটিপূজাই আজ খুঁটিপূজা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ঢেউ-এর দোলায় তসলিমা নাসরিন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রথ নিয়ে বাংলা প্রবাদ ও তার সামাজিক তাৎপর্য : অসিত দাস মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘গোধূলির চিতায়’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ এনকাউন্টার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শুনুন নেতাজি সুভাষ, শুনছেন — : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস মাড়ির অসুখ থেকে সাবধান সুগার ও প্রেগন্যান্সিরা! হতে পারে ক্যান্সার : ডাঃ পিয়ালী চট্টোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৯১ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

‘পঞ্চম প্রতিবেদন’-এর (Fifth Report) পরিশিষ্টগুলো ভারতের রাজস্ব-ব্যবস্থা নিয়ে যারা বিশেষভাবে অধ্যয়ন করেন তাদের কাছে যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলার ইতিহাস ও ভূগোলের শিক্ষার্থীদের জন্যও এগুলো তথ্যের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হিশেবে গণ্য হওয়া উচিৎ। নিজস্ব নথিপত্রের ভিত্তিতে গ্রান্ট (Grant) যেসব সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন সেটা যে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছিল এ কথা বলা যাবে না; এবং যারা বিষয়টি নিয়ে সময় নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাদের অধিকাংশই মিস্টার অ্যাসকোলির (Mr. Ascoli) মতের সাথে একমত হবেন যে — “গ্রান্টের যুক্তির সবচেয়ে দুর্বল দিকই হলো তাঁর এই প্রচেষ্টা যে, তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন মুঘল আমলে নির্ধারিত রাজস্বের পরিমাণ ছিল এমন এক বাস্তবসম্মত অঙ্ক যা প্রকৃতপক্ষে আদায় করা সম্ভব ছিল।” (অ্যাসকোলি: পূর্বোল্লিখিত গ্রন্থ, ৪৭। অ্যাসকোলি ৪৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে, “বন্দোবস্তের পদ্ধতিগুলোতে ব্যক্তিগত চক্রান্তের কোনো অবকাশ ছিল না।” লর্ড টেইনমাউথের পুত্র লিখেছেন: “রাজস্ব বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের জন্য দুর্নীতির ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করেছিল; এবং কেউ কেউ জমিদারদের খাজনা কম নির্ধারণের বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিল। ঢাকায় এই একটিমাত্র অভিযানেই মিস্টার শোর — তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী — সহজেই তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদে ১,০০,০০০ ডলার যুক্ত করতে পারতেন।” মেমোয়ার অফ দ্য লাইফ (Memoir of the Life), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৫। তবে, “কেউ কেউ বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিল” — এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি) তবে গ্রান্টের সিদ্ধান্তগুলো যেমনই হোক না কেন, বাংলা ও বিহারের কোনো নির্দিষ্ট জেলার অতীত ইতিহাস পুনরুদ্ধারের কাজে হাত দিলে সেই অঞ্চলের ইতিহাস-গবেষকদের তাঁর রচিত গবেষণাপত্রগুলোর শরণাপন্ন হতেই হবে।

১৭৭৫-৭৬ সালের বৃহৎ রাজস্ব বিতর্কে ফ্রান্সিস বিমূর্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির আলোচনা করেছিলেন এবং স্টুয়ার্ট, স্মিথ, মন্তেস্কিউ ও জ্যেষ্ঠ মিরাবোর উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর মতামতকে জোরালো করতে। ভারতে থাকাকালীন ফ্রান্সিস এই দেশ আর তার অধিবাসীদের প্রতি খুব কম আগ্রহ দেখিয়েছেন, বলা ভাল তাদের নিয়ে যে তার খুব প্রত্যক্ষ আগ্রহ ছিল সেটা তার যাপনে মনে হয়নি বলেই মনে হয়। একবার তিনি কৃষ্ণনগর পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন, যেখানে তিনি রাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন; কিন্তু সাধারণত ফ্রান্সিস হুগলি, বারাসত বা সুখসাগরে মিঃ ক্রফটসের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর উদ্যানের চেয়ে বেশি দূরে যেতেন না। ফ্রান্সিসের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো ফরাসি ফিজিওক্র্যাট ধারার (অ্যাডাম স্মিথের ‘ওয়েলথ অফ নেশনস’ ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত হওয়ায় ফ্রান্সিসের মতামতকে প্রভাবিত করার জন্য তা অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল; তার মতামত সম্ভবত কুয়েসনে, মিরাবো, তুরগো প্রমুখের মতো ফরাসি উৎস থেকে উদ্ভূত হয়েছিল)। এই ধারার মতবাদ হলো, সমাজকে পরিচালনাকারী আইনগুলো শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় সত্য, যা ভারত বা ইংল্যান্ড, টিম্বুকটু বা প্যারিস — যেখানেই হোক না কেন, সংশোধন বা পরিমার্জন করার চেষ্টা করাটা মূর্খতা এবং সর্বনাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্বজনীন বা আন্তর্জাতিক তত্ত্বের প্রতি উৎসাহে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফ্রান্সিস সূক্ষ্ম স্থানীয় অনুসন্ধানের বিরোধী ছিলেন এবং ভারতীয় অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা মতামতকে সামান্যই গুরুত্ব দিতে আগ্রহী ছিলেন (ফ্রান্সিস ১৭৭৯ সালে লিখেছিলেন: “মিঃ হেস্টিংস আক্ষরিক অর্থেই এবং একচেটিয়াভাবে একজন গুণীজন। তার মাথায় বা হৃদয়ে একটিও নৈতিক বা রাজনৈতিক নীতি নেই। এই চরিত্রের একটি স্বাভাবিক ফল হলো, যখন তিনি সর্বোত্তম কিছু করতে চান, তখন তিনি তার নির্মাণকাজ চূড়া থেকে বা মনোরম দৃশ্যযুক্ত কোনো জায়গা থেকে শুরু করেন এবং ভিত্তির কথা ভাবেনই না, যতক্ষণ না ভিত্তির অভাবে পুরো ইমারতটি ভেঙে পড়ে। আরেকটি হলো, তিনি নিজেকে অসুবিধা থেকে মুক্ত করতে অসাধারণভাবে পারদর্শী, যা তিনি সামান্য সাধারণ জ্ঞান এবং তার সূক্ষ্ম বিচক্ষণতার দশ ভাগের এক ভাগ দিয়েই এড়াতে পারতেন। আমি নিশ্চিত নই যে, সাধারণ মানুষের সাথে চলার মতো কোনো সরল পথের চেয়ে গোলকধাঁধার জটিলতাকে বেছে নেওয়ার পেছনে তার অহংকার জড়িত কিনা। ‘আমি সাধারণ নীতি ঘৃণা করি’ একটি সাধারণ উক্তি।” “তাঁর সাথে নীতিবাক্য।” পার্কস ও মেরিভেল, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, খণ্ড ২, পৃ. ৮ট)। সামাজিক অর্থনীতির যে তত্ত্বগুলোকে আমরা বর্তমান যুগে গোঁড়া তত্ত্ব হিসেবে বর্ণনা করব, সেগুলোর উপর নির্ভর করে ফ্রান্সিস ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপনে যতটা সাবলীল ছিলেন, প্রাদেশিক অভিজ্ঞতার প্রতি ততটাই অবজ্ঞাপূর্ণ ছিলেন। তিনি বারবার বলতে ক্লান্ত হতেন না যে মূল মুঘল কর নির্ধারণ ছিল খুবই কম, এবং তা এমন ব্যক্তিদের উপর আরোপ করা হয়েছিল যাদেরকে তিনি জমিদারদের সাথে এক করে দেখতেন। মিঃ ভিনসেন্ট স্মিথ, তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ ‘আকবর দ্য গ্রেট মোগল’-এ যথার্থই বলেছেন যে আকবরের রাজস্ব বন্দোবস্ত ছিল অত্যন্ত কঠোর। “আকবর এক-তৃতীয়াংশ দাবি করেছিলেন, অর্থাৎ ভারতীয় ও পারস্যের অনুপাতের দ্বিগুণ… আকবর জমিদার শ্রেণীর অস্তিত্ব স্বীকার করেননি। তিনি প্রকৃত চাষীকে সহনীয় জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ফসলের অংশটুকু রেখে বাকিটা রাষ্ট্রের জন্য নিয়ে নিতেন।” (স্মিথ: আকবর দ্য গ্রেট মোগল, পৃ. ৩৭৭-৭৮। “আকবরের সময়ে চাষের জমি এখনকার তুলনায় অনেক কম ছিল, কিন্তু রুপির বিনিময় হার ২৫ শিলিং ৩ পেন্স ধরে আকবরের ফসলের অংশের মূল্য ছিল ২০,০০০,০০০ ডলার।” ঐ, পৃ. ৩৭৯। কাশ্মীরে আকবর ফসলের অর্ধেক নিতেন। আওরঙ্গজেবের রাজস্ব বিধিমালা সম্পর্কে জানতে, জার্নাল অফ দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল-এর দ্বিতীয় খণ্ড, ৬ষ্ঠ সংখ্যা (নিউ সিরিজ)-এ যদুনাথ সরকারের একটি প্রবন্ধ দেখুন। এছাড়াও দেখুন টমাস: দি রেভেন রিসোর্সেস অফ দ্য মুঘল এম্পায়ার।)

পর্ব টিকা ১+২

কিস্তি ১৩র ১ নং টিকায় ক্রফটের পরীক্ষামূলক বাগান আলোচনা করেছি; ২ বং টিকায় ফ্রান্সিসের ফিজিওক্র্যাটিক দর্শন — ‘সংস্কার’ ও ‘উন্নয়ন’-এর আসল চেহারা বোঝার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করছি —

প্রথম টিকা

ক্রফটের পরীক্ষামূলক বাগান : লুঠের পরীক্ষাগার থেকে দেউলিয়াত্বের পথ

হুগলি নদীর তীরে সুখসাগর (Sukh Sagar) বাগান নদীয়া জেলার আজকের চাকদহের কাছে নির্মাণ করেন চার্লস ক্রফট। তাঁর এই পরীক্ষামূলক বাগান আঠারো শতকের শেষার্ধে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কৃষি-বাণিজ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষার অনন্য প্রতীক। এটি কেবল একটি বোটানিক্যাল উদ্যান ছিল না — বরং ছিল ঔপনিবেশিক অর্থনীতির এক পরীক্ষাগার, যেখানে ব্রিটিশ পুঁজির স্বার্থে বাংলার মাটি, জল ও শ্রমকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ক্রফট ছিলেন কোম্পানির একাউন্ট্যান্ট জেনারেল – সুখসাগরের উর্বর ভূমিতে আখ চাষ আর রাম উৎপাদনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। তার লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট — ওয়েস্ট ইন্ডিজের দাসশ্রম নির্ভর চিনি আর রামের ওপর কোম্পানির নির্ভরতা কমানো এবং বাংলার মুক্তশ্রম ভিত্তিক উৎপাদনকে বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু এই ‘উন্নয়ন’ ও ‘পরীক্ষা’-এর মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ছিল বাংলার কৃষি কাঠামো ও জনজীবনকে ধ্বংসের এক পরিকল্পিত চেষ্টা।

ক্রফটের পরীক্ষা: কৃষি ‘উন্নয়ন’ নাকি ‘লুঠের নতুন কৌশল’?

বাণিজ্যিক ফসলের পরীক্ষাগার — ১৭৮৪-তে ক্রফট ও তার অংশীদার লেনক্স সুখসাগরে চিনি কল স্থাপন করেন। এই উদ্যোগকে কোম্পানি ‘উন্নয়নমূলক পরীক্ষা’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল — বাংলার কৃষি কাঠামোকে খাদ্যশস্য উৎপাদন থেকে বাণিজ্যিক ফসলের দিকে সরিয়ে নেওয়া, যাতে বাংলার উর্বর জমি ব্রিটিশ কারখানার কাঁচামাল উৎপাদনে রূপান্তরিত হয়; স্থানীয় কৃষকদের জোর করে আখ ও অন্যান্য নগদ ফসল চাষে বাধ্য করা — যা পরবর্তীতে বাংলায় খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়; ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিকল্প হিসেবে বাংলাকে ‘উপনিবেশিক প্ল্যান্টেশন’-এ রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা — যেখানে ‘মুক্তশ্রম’-এর নামে কৃষকদের শোষণ করা হবে।

রাম উৎপাদন : সামরিক চাহিদা পূরণ থেকে বিশ্ববাণিজ্য — ক্রফটের বাগানে উৎপাদিত রাম কোম্পানির সেনা ও জাহাজের জন্য সরবরাহ করা হত। কিন্তু এটি শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না — বাংলার রাম সেন্ট হেলেনা, অস্ট্রেলিয়া, হামবুর্গ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হত। ১৭৯৬-৯৭-য় শুধু হামবুর্গ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯০,০০০ গ্যালনের বেশি বাংলার রাম পাচার বা রপ্তানি করা হয়েছিল। এই বাণিজ্যকে ঘিরে চোরাচালান ও কর ফাঁকির এক বিশাল কাঠামো গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মহাদেশীয় ইউরোপ ও আমেরিকায় বাংলার রাম পৌঁছাত — এবং এই পাচারের একটি বড় অংশ ছিল কোম্পানির চুপচাপ সমর্থনে।

দুর্নীতি, দেউলিয়াত্ব ও পতন – ক্রফটের অবসানের ইতিহাস

অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও কোম্পানির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব — ক্রফটের পতনের গল্প শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় — ছিল সমগ্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এক আয়না। কোম্পানির পরিচালকদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, স্টক জবিং ও আর্থিক দুর্নীতি তখন চরমে পৌঁছেছিল। স্যার জর্জ কোলব্রুক ১৭৭২-এ কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি দুর্নীতি আর স্টক জবিং-এর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি কোম্পানির আর্থিক অবস্থা গোপন রাখার চেষ্টা করেছিলেন যাতে তার স্টক মার্কেটের লেনদেন সুবিধাজনক হয়। ক্রফটের মতো অনেক কোম্পানি কর্মচারীই এই দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

ক্রফটের বিনিয়োগ ও দেউলিয়াত্ব

ক্রফট সুখসাগার ও অন্যান্য উদ্যোগে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করেছিলেন। ১৭৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তার আর্থিক পতন ঘটে। এর পেছনে কারণ —

১. কোম্পানির অস্থিতিশীল আর্থিক অবস্থা — ১৭৭০-এর দশকে কোম্পানির শেয়ারের দাম পড়ে যায়, হাজার হাজার পাউন্ডের বিল অব এক্সচেঞ্জ অপরিশোধিত থেকে যায়।

২. বাংলায় দুর্ভিক্ষ ও রাজস্ব সংকট — ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষে বাংলায় প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যায়, অথচ কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ বাড়াতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানির রাজস্ব আদায়ও ব্যাহত হয়।

৩. ওয়েস্ট ইন্ডিজের চিনির প্রতিযোগিতা — বাংলার চিনি ও রাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের পণ্যের তুলনায় উচ্চ শুল্ক-এর মুখোমুখি হয়েছিল (ওয়েস্ট ইন্ডিজের চিনিতে ২৫% শুল্ক, বাংলার চিনিতে ৩৭%)। কোম্পানি এই বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়।

ক্রফট যখন দেউলিয়া হয়ে পড়েন, তখন তার ‘উন্নয়নমূলক’ পরীক্ষাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সুখসাগরের বাগান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, আর ক্রফটের নাম ইতিহাসের কুয়াশায় মিলিয়ে যায়।

ক্রফটের পরীক্ষার আদর্শিক উত্তরসূরি — লেফটেন্যান্ট প্যাটারসন

ক্রফটের পতনের পরও বাংলায় চিনি ও রাম উৎপাদনের স্বপ্ন পুরোপুরি মারা যায়নি। ১৭৯২-তে লেফটেন্যান্ট জন প্যাটারসন সোনামুখীতে একটি ডেল প্ল্যান্টেশন স্থাপনের জন্য কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেন। প্যাটারসনকে ৬,০০০ বিঘা (প্রায় ২,০০০ একর) জমি ১২ বছরের জন্য করমুক্ত দেওয়া হয়। কোম্পানি তার জন্য যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সরঞ্জাম শুল্কমুক্ত আমদানির ব্যবস্থা করে। এটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে — ক্রফটের পরীক্ষার ধারা অব্যাহত ছিল, শুধু রূপ বদলেছিল।

ক্রফটের পতন: সাম্রাজ্যের আদর্শিক মুখোশ উন্মোচন

ক্রফটের গল্প আমাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় —

১. ‘উন্নয়ন’ ও ‘পরীক্ষা’-এর মুখোশ — ক্রফটের সুখসাগর বাগানকে ‘বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা’ ও ‘উন্নয়নমূলক উদ্যোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হত। কিন্তু এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বাংলার কৃষি কাঠামোকে ধ্বংস করে ব্রিটিশ বাণিজ্যের স্বার্থে পুনর্গঠন করা — যার ফলশ্রুতিতে বাংলায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়, দুর্ভিক্ষ হয়, আর কৃষকরা ঋণগ্রস্ত ও ভূমিহীন হয়ে পড়ে।

২. দুর্নীতি ও শোষণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক — ক্রফট যেমন কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়েন, তেমনি সমগ্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই ছিল দুর্নীতি, স্টক জবিং ও শোষণের এক সুসংহত কাঠামো — যেখানে ‘উন্নয়ন’ ছিল শোষণের অজুহাত, আর ‘লাভ’ ছিল একমাত্র লক্ষ্য।

৩. মুক্তশ্রম বনাম দাসশ্রমের ভণ্ডামি — ক্রফট ও প্যাটারসনের উদ্যোগগুলো ‘দাসশ্রম’-এর বিকল্প হিসেবে ‘মুক্তশ্রম’-এর কথা বললেও, বাংলার কৃষকদের অবস্থা ছিল প্রায় দাসতুল্য — তাদের জোর করে নগদ ফসল চাষে বাধ্য করা হত, ন্যায্য মূল্য দেওয়া হত না, আর তারা ঋণের ফাঁদে পড়ে চিরকালের জন্য কোম্পানি ও জমিদারদের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে পড়ত।

টিকা ২

কিস্তি ১৩-র ১ নং টিকায় ক্রফটের পরীক্ষামূলক বাগান আলোচনা করেছি; এবং এই ২ টিকায় ফ্রান্সিসের ফিজিওক্র্যাটিক দর্শন — ’সংস্কার’ ও ‘উন্নয়ন’-এর আসল চেহারা বোঝার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করছি —

২. ফ্রান্সিসের ফিজিওক্র্যাটিক দর্শন — ‘শাশ্বত সত্য’ নাকি ‘সাম্রাজ্যের অজুহাত’?

ফিজিওক্র্যাটিক দর্শন কী? ফ্রান্সিস ফরাসি ফিজিওক্র্যাট দার্শনিক – কোয়েনে, মিরাবো, তুর্গোর তত্ত্বে প্রভাবিত ছিলেন। ফিজিওক্র্যাটদের মূল বক্তব্য ছিল — ‘প্রকৃতির নিয়ম’ laws of nature শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয়। সমাজ ও অর্থনীতিও সেই প্রাকৃতিক নিয়মে চালিত হয়। তাই সেই নিয়মের সঙ্গে মানানসই নীতি গ্রহণ করাই কর্তব্য, আর তা পরিবর্তন বা প্রশমিত করার চেষ্টা করা মূর্খতা ও ধ্বংস ডেকে আনে।

ফ্রান্সিসের ফিজিওক্র্যাটিজম — কী বোঝায়?

ক. ‘শাশ্বত সত্য’-এর সাম্রাজ্যবাদী ব্যবহার — ফ্রান্সিস মনে করতেন — যে নিয়ম ইংল্যান্ডে প্রযোজ্য, তা ভারত, টিম্বাক্টু বা প্যারিসে-ও সমানভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনের ‘প্রাকৃতিক’ ও ‘শাশ্বত’ কোনো ন্যায্যতা নেই — বরং ফ্রান্সিস ফিজিওক্র্যাট দর্শন ব্যবহার করে ব্রিটিশ শাসনকে ‘প্রাকৃতিক’ ও ‘অপরিবর্তনীয়’ বলে প্রচার করতে চাইতেন। এর নিহিতার্থ — সংস্কারের বিরোধিতা — কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক সংস্কার (যেমন — কৃষকের অধিকার, খাজনা কমানো, স্থানীয় শিল্প রক্ষা) প্রকৃতিবিরুদ্ধ, তাই তা করা উচিত নয়; লেসে ফেয়ারের আড়ালে লুঠ — বাজার ও প্রকৃতির ‘শাশ্বত নিয়ম’-এর নামে ব্রিটিশ পণ্যের অবাধ প্রবেশ, ভারতীয় শিল্প ধ্বংস, ও কৃষকদের ঋণগ্রস্ততা — এগুলো সবই ‘প্রাকৃতিক’ বলে চালিয়ে দেওয়া; উপনিবেশিক স্থিতাবস্থা রক্ষা — ফ্রান্সিস ফিজিওক্র্যাটিজমকে ব্যবহার করতেন ব্রিটিশ শাসনের কোনো পরিবর্তনকে আটকাতে, কারণ তিনি জানতেন যে কোনো প্রকৃত সংস্কারই শেষ পর্যন্ত লুঠের কাঠামোকে দুর্বল করবে।

খ. ‘নিয়ম’ কার জন্য? — ফিজিওক্র্যাটরা বলতেন, ‘প্রকৃতির নিয়ম’-কে মানতে হবে। কিন্তু কে সেই ‘প্রকৃতি’ নির্ধারণ করত? — ইংল্যান্ডের বণিক-শিল্পপতিরা। ফ্রান্সিসের চোখে ‘প্রাকৃতিক’ ছিল — বাংলার কৃষকের কম দামে ফসল বিক্রি করা; তাঁতির বিনা প্রতিবাদে বেকার হওয়া; হকারের নীরবে বাজার ছেড়ে দেওয়া। অর্থাৎ যা ব্রিটেনের স্বার্থে ছিল, তাই ছিল ‘প্রাকৃতিক’। যা তার বিপরীত ছিল, তা ছিল ‘অপ্রাকৃতিক’ ও ‘মূর্খতা’।

গ. হান্টার-ফ্রান্সিস-শোর — একই সাম্রাজ্যের তিন মুখ

  • হান্টার ছিল ‘উদার’ মুখোশ, যিনি কৃষকের কথা বলে আসলে কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতেন।
  • শোর ছিল ‘সংস্কারক’ মুখোশ, যিনি জমিদারি কাঠামো তৈরি করে রাজস্ব নিশ্চিত করতেন।
  • ফ্রান্সিস ছিল ‘দার্শনিক’ মুখোশ, যিনি ‘শাশ্বত সত্য’-এর নামে সব সংস্কারকে অবৈধ ঘোষণা করতেন।

তিনজনই একই সাম্রাজ্যের তিনটি ভিন্ন অস্ত্র — একজন বলে ‘সংস্কার করো না’, অন্যজন বলে ‘সংস্কার করো কিন্তু আমার মতো’, তৃতীয়জন বলে ‘সংস্কারই প্রকৃতিবিরুদ্ধ’। শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যের স্বার্থই জয়ী হয়।

৩. ফ্রান্সিসের ফিজিওক্র্যাটিজম বনাম অ্যাডাম স্মিথ

পাঠক হয়তো জানেন, অ্যাডাম স্মিথের ‘দি ওয়েলথ অফ নেশনস’ (১৭৭৬) প্রকাশের সময় ফ্রান্সিস ভারতেই ছিলেন। ফ্রান্সিসের দর্শন ফরাসি ফিজিওক্র্যাটদের থেকে এসেছে, যারা ভূমিকেই সম্পদের একমাত্র উৎস মনে করতেন, আর শ্রমের গুরুত্ব কমিয়ে দিতেন। অ্যাডাম স্মিথ অবশ্য শ্রমকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু স্মিথও উপনিবেশবাদী ছিলেন — তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ‘লুঠেরা’ বললেও, তিনি মুক্তবাণিজ্যের নামে ভারতীয় বাজার খোলার পক্ষেই ছিলেন। ফ্রান্সিস আর স্মিথের মধ্যে পার্থক্য —

দিক                                       ফ্রান্সিস (ফিজিওক্র্যাট)                                                    অ্যাডাম স্মিথ

সম্পদের উৎস                       ভূমি                                                                                শ্রম

দর্শন                                     প্রকৃতির শাশ্বত নিয়ম                                                      বাজারের অদৃশ্য হাত

উপনিবেশ                             প্রকৃতির অংশ, তাই অপরিবর্তনীয়                                   লুঠের ব্যবস্থা, কিন্তু মুক্তবাণিজ্য কাম্য

সংস্কার                                 বিরোধী                                                                         শুধু মুক্তবাণিজ্য-সংস্কার সমর্থন

ফ্রান্সিসের দর্শন ছিল আরও রক্ষণশীল, আর স্মিথের ছিল আরও ‘উদার’ — কিন্তু দুজনেই শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সম্পদ লুঠের পক্ষে দাঁড়ালেন।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন