১৭৮৭-র ২১শে জানুয়ারি জন স্টেবলসের পদে শোর সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য নিযুক্ত হলেন। ১২ই মার্চ তিনি রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনাটি পেশ করেন; এই প্রস্তাবনায় প্রতিটি কালেক্টরের আওতাধীন এলাকাকে আরও সংহত করার লক্ষ্যে জেলাগুলোর সংখ্যা ৩৫ থেকে কমিয়ে ২৩-এ নামিয়ে আনার পরিকল্পনা ছিল। তাঁর এই পরিকল্পনা পরবর্তীকালে গৃহীত হয়েছিল।
ক্যাপ্টেন জন স্টেবলসের প্রতিকৃতি (১৭৪৩/৪৪-১৭৯৫); চিত্র জর্জ রমনি (ডাল্টন-ইন-ফার্নেস, ল্যাঙ্কাশায়ার ১৭৩৪-১৮০২ কেন্ডাল, কামব্রিয়া), তিন-চতুর্থাংশ দৈর্ঘ্য, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইউনিফর্মে একটি তালোয়ার হাতে

এখান থেকে এই খণ্ডে সংকলিত নথিপত্রগুলোর বিষয়বস্তু স্পষ্টভাবে তার মনোভাব তুলে ধরে — নথিগুলো পড়লেই বোঝাযায়, লেখকের ভাবনা। আমি এখানে শোরের কর্মজীবনের পরবর্তী পর্যায়ের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না, তবে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবশ্যই সংক্ষেপে উল্লেখ করছি। পঞ্চম প্রতিবেদনের (Fifth Report) বাংলা বিষয়ক পরিশিষ্টটি শুরু হয়েছে ১৭৮৯-এর ১৮ই জুন শোরের লেখা একটি নথি বা ‘মিনিট’ মিনিট সূত্রে, যার শীর্ষক ছিল “বাংলা প্রদেশসমূহে ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত” বিষয়ক। ১৮ই সেপ্টেম্বর তারিখের দ্বিতীয় নথিতে বিহারের বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত বিষয় আলোচিত হয়েছে। অথচ, ১৭৮৯-এর ২১শে মে ‘কলকাতা গেজেট’-এ নিম্নলিখিত অনুচ্ছেদ প্রকাশ পেয়েছিল –
“আমরা জেনে আনন্দিত হয়েছি যে, আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া পরবর্তী ‘ফসলি’ (Fussily) বছর থেকে বিহার প্রদেশে রাজস্বের চিরস্থায়ী খাজনা নির্ধারণ প্রক্রিয়া কার্যকর হতে যাচ্ছে। যে নীতিমালার ভিত্তিতে এই ব্যবস্থাটি — যাকে এ দেশে সাধারণভাবে ‘রাজস্ব বন্দোবস্ত’ (settlement of revenues) বলা হয়, সেটা প্রকৃতপক্ষে প্রজাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মালিকানাস্বত্ব এবং সরকারের প্রাপ্য খাজনা — নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া; সেই কাজের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করার স্বাধীনতা আমাদের নেই; তবে আমরা এটুকু উল্লেখ করতে পারি যে, এর মূল নীতি ভূমিখণ্ডগুলোর মালিকদের সম্পত্তির ওপর সুনির্দিষ্ট অধিকার স্বীকৃতি দেয়। এই প্রক্রিয়া সেই প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত — যার মতে, এই অঞ্চলের জমিদার আর তালুকদাররা কেবল সরকারি কর্মচারী মাত্র এবং শাসকই হলেন ভূমির একমাত্র প্রকৃত মালিক, যিনি শাসক হিসেবে রাজস্ব আদায়ের পরিবর্তে ভূমির মালিক হিসেবে সেটিকে ইজারা বা বন্দোবস্ত দিয়ে থাকেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। নিজস্ব স্বার্থের তাগিদে ভূমির মালিক তাঁর সাধ্যমতো সম্পত্তির উন্নয়ন ঘটাবেন; কারণ, সরকারের কাছে প্রদেয় অর্থ বেড়ে যাওয়ার ফলে উন্নয়নের সুফল হারানোর কোনো আশঙ্কা তাঁর থাকবে না, কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির হাতে ব্যবস্থাপনার ভার অর্পণ করলে তা রাষ্ট্রের জন্য ভূমির উৎপাদন বাড়াতে অধিক কার্যকর হবে — এমন বিবেচনায় নিজের সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার ভয়ও তাঁকে তাড়া করবে না।” (সিটন-কার, সিলেকশন্স ফ্রম ক্যালকাটা গেজেট, খণ্ড ২, ২১৭-১৮)
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, ১৭৮৯-এর মে মাসেই — অন্তত বিহারের ক্ষেত্রে — যখন একটা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ permanent assessment পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছিল, তখন শোর (Shore) কেন তাঁর দীর্ঘ আর অতিবিস্তারিত প্রতিবেদন বা ‘মিনিট’ minutes প্রণয়নের জন্য এত শ্রম দিয়েছিলেন। এর যথাযোগ্য উত্তর হলো, শোর মূলত ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’বা পরিচালক পর্ষদের সদস্যদের সুবিবেচনার জন্যই এই ধরণের প্রতিবেদন লিখছিলেন; কারণ, এই বন্দোবস্তকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য তাঁদের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। বিহারের ‘দশসালা বন্দোবস্ত’ Decennial Settlement-সংক্রান্ত বিধিমালা ১৭৮৯-এর ১৮ই সেপ্টেম্বর জারি হয় — যেদিন শোর তাঁর দ্বিতীয় প্রতিবেদন পেশ করলেন; অন্যদিকে বাংলার ক্ষেত্রে এই বিধিমালা জারি করা হয় ১৭৯০-এর ১০ই ফেব্রুয়ারি। তবে এ কথাও মনে রাখা জরুরি যে, আনুষ্ঠানিক বিধিমালা জারির আগেই বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন জেলায় এই বন্দোবস্তের প্রক্রিয়াগুলো ধাপে ধাপে গড়ে উঠছিল। স্যার উইলিয়াম হান্টারের ভাষায়, ‘দশসালা বন্দোবস্ত সমগ্র প্রদেশজুড়ে একবারে বা আকস্মিকভাবে per saltum চালু করা হয়নি; বরং প্রতিটি এলাকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জেলাভিত্তিক পদ্ধতিতে তা প্রবর্তন করা হয়েছিল।’ শোরের প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনার পর, ১৭৯২-র সেপ্টেম্বর মাসে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ সিদ্ধান্ত নেয় যে, এই দশসালা বন্দোবস্তকে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
স্যার উইলিয়াম হান্টার লিখেছেন, “তাঁরা এই উদ্যমটা নিয়েছিলেন মিল কথিত ‘অভিজাতসুলভ সংস্কারবশত’ নয়, বরং লর্ড কর্নওয়ালিসের তোলা ব্যাপক অর্থনৈতিক যুক্তির ভিত্তিতে। তারা বাংলা, বিহার, ওডিসা একটা বিশাল ভূ-সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন, যার এক-তৃতীয়াংশ আবাদযোগ্য জমিই ছিল পতিত। আমি স্পষ্টভাবে ‘আবাদযোগ্য জমি’র কথাই বলছি। তারা নিজেরা সেই জমি আবাদের উপযোগী করে তুলতে পারতেন না। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, স্থায়ী মালিকানা আর নির্দিষ্ট খাজনা হারের নিশ্চয়তা ছাড়া অন্য কোনো প্রলোভনই বেসরকারি ব্যক্তিদের সেই জমি আবাদের কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারবে না। দীর্ঘ আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, বাংলার আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি আর উন্নয়নের মহৎ কাজ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে — জমির আবাদযোগ্যতা বাড়াবার চেষ্টার ফলে বা জমির সাথে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো উৎস থেকে ভবিষ্যতে যে বাড়তি রাজস্ব আয় হতে পারত — সেই দাবি ত্যাগ করাই হবে বিচক্ষণ নীতি। তারা মনে করতেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর দেশের বস্তুগত উন্নয়নের ফলে সামগ্রিকভাবে যে রাজস্ব আয় বাড়বে, তাতেই তাদের ত্যাগ সার্থক হবে। তাদের নিজেদের জোরালো ভাষায় বলতে গেলে, তারা নিশ্চিত ছিলেন যে মালিকানার ‘জাদুকরী স্পর্শ’ এমন এক ‘উৎপাদনশীল প্রক্রিয়া’ সচল করে তুলবে, যা সেই সময়ে করা ত্যাগের বিনিময়ে ভবিষ্যতে তাদের বিপুল প্রতিদান দেবে। তৎকালীন সময়ে উপযুক্ত বলে মনে হওয়া অর্থনৈতিক যুক্তির ওপর ভিত্তি করে প্রশাসনিক কোনো বড় সিদ্ধান্ত যদি কখনো নেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটা ছিল বাংলার ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’।”
একটা কথা উল্লেখ না করা অন্যায় হবে যে, কর্তাদের সঙ্গঠন, কোর্ট অব ডিরেক্টর্স সাধারণ ব্যবসায়িক বা প্রশাসনিক রুটিনের ঊর্ধ্বে এক শ্রেয়তর দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিচালিত হয়েছিল। তারা বিশ্বাস করতেন, ‘ঘোষণামূলক ইজারা’ বা পাট্টার ব্যবস্থা চাষিদের সেই একই নিরাপত্তা প্রদান করবে যা একটি অপরিবর্তনীয় ভূমি-রাজস্ব ভূ-স্বামীদের দিতে পারত। তাদের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’-এর ধারণায় নির্দিষ্ট খাজনা এবং নির্দিষ্ট ভূমি-রাজস্ব — উভয়ই ছিল সমানভাবে অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্য উপাদান। এ ধরনের বন্দোবস্ত প্রদেশের উন্নততর শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় যে সহায়তা করবে, সে বিষয়েও তারা অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন। ‘প্রশাসনিক নীতিমালার অনিশ্চয়তা থেকে উদ্ভুত নানাবিধ অশুভ পরিণতির মধ্যে ভূমি-রাজস্ব নির্ধারণের ঘন ঘন পরিবর্তনই যে সবচেয়ে ক্ষতিকর — এ বিষয়ে আমাদের মনে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। এটি সবকিছুকে কেবল সাময়িক ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার স্তরে নামিয়ে এনেছে এবং উন্নয়নের সকল সুদূরপ্রসারী ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি নস্যাৎ করেছে। যেকোনো সময়েই এ ধরনের নীতি অবিবেচনাপ্রসূত হতে পারে, তবে একটি পরাধীন দেশের ক্ষেত্রে — যেখানে বিপুল পরিমাণ বার্ষিক খাজনা বা রাজস্ব দিতে হয় এবং যা তার অনেক প্রাচীন অবলম্বন বা সহায়ক ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত রয়েছে — সেখানে এটি আরও বেশি ক্ষতিকর। এ ধরনের দেশের জন্য বিশেষত এমন এক ব্যবস্থাপনা-পদ্ধতি প্রয়োজন যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক… একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী ইজারার সুপারিশ করা হলেও — নিরাপত্তার খাতিরে তা করা হলেও — আমাদের মতে, তা পূর্ববর্তী প্রথার কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতিকে আংশিকভাবে হলেও জিইয়ে রাখবে; কারণ রাজস্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক সংশোধন কার্যত সাধারণ রাজস্ব বৃদ্ধিরই নামান্তর এবং সেটা একটি চিরস্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আশাকে ধূলিসাৎ করবে; অথচ এই চিরস্থায়ী ব্যবস্থার মাধ্যমেই এমন এক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় যা মানুষকে কঠোর পরিশ্রমে ও উন্নয়নে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।’(হান্টার: পূর্বোল্লিখিত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৮২-৮৪। ‘ঘোষণামূলক ইজারা’ (declaratory leases) ছিল এই পরিকল্পনার অন্যতম বড় একটি বিভ্রান্তি)
১৭৮৯-এর ২৪শে ডিসেম্বর ঘোষণা করা হয় যে, মিস্টার শোর বোর্ডের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মাননীয় সি. স্টুয়ার্ট। ১৭৯০-এ ওয়ারেন হেস্টিংসের বিচার চলাকালে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য প্রদান করবেন। ১৭৯২-এ তাঁকে ‘ব্যারোনেট’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৭৯৩-এর ২৮শে অক্টোবর থেকে ১৭৯৮-এর ১২ই মার্চ পর্যন্ত তিনি ভারতের গভর্নর-জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং শেষোক্ত বছরেই তাঁকে ‘ব্যারন টেনমাউথ’ উপাধি দেওয়া হয়। ইংল্যান্ডে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার পরেও ভারতের প্রতি তাঁর আগ্রহ অটুট ছিল; তিনি ১৮০৭ থেকে ১৮২৮ পর্যন্ত ‘বোর্ড অফ কন্ট্রোল’-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৮০৪-এ তাঁর রচিত ‘লাইফ অফ স্যার উইলিয়াম জোন্স’ (স্যার উইলিয়াম জোন্সের জীবনী) গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ১৮৫৪-র ১৪ই ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মেরিলেবোন চার্চে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের ফলকে উৎকীর্ণ তথ্যে ‘ব্রিটিশ অ্যান্ড ফরেন বাইবেল সোসাইটির সভাপতি’ পরিচয়কেই ‘ভারতের প্রাক্তন গভর্নর-জেনারেল’ পরিচয়ের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে — যা তাঁর নিজের এবং তাঁর পরিবারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেরই পরিচায়ক।
১২তম কিস্তির ২টো টিকা
১। জন স্টেবলস; ২। সাম্রাজ্য লিবারেলিজমের
টিকা ১
জন স্টেবলস — সৈনিক থেকে শাসক — প্রশ্নবিদ্ধ অপ্রচলিত উত্থান
জন স্টেবলসের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল মাদ্রাজের সেনাবাহিনীতে ১৭৬০-এ। ১৭৬৩-র অক্টোবরে বক্সারের যুদ্ধে অংশগ্রহণ নেন এবং ১৭৬৬-তে কলকাতা কাউন্সিলের প্রশংসাঋদ্ধ হয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। সেনাবাহিনীতে স্টেবলসের দ্রুত পদোন্নতিতে প্রশ্ন উঠল। তাছাড়া আইরিশ দার্শনিক এডমান্ড বার্ক প্রশ্ন তুললেন কেন জন স্টেবলসের মত সামরিক থাকবন্দীর অনেক নিচে থাকা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ বেসামরিক পদে উন্নীত করা হল — তাহলে কি সামরিক অভিজ্ঞতাই কি ভারতের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদের একমাত্র যোগ্যতা? তাঁর এই সমালোচনা প্রমাণ করে যে স্টেবলসের পদোন্নতি কেবল ব্যক্তিগত যোগ্যতার প্রতিফলন ছিল না, বরং লন্ডনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার একটি প্রকাশ্য উদাহরণ ছিল।
রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ: হেস্টিংস-বিরোধী থেকে সমর্থকে — জন স্টেবলস তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত বন্ধুত্ব ছিল। প্রথমে হেস্টিংসের সমর্থকদের এক অংশ তাঁকে কাউন্সিলে হেস্টিংসের অনুবগামী হিসাবে দেখেছিল। কিন্তু ১৭৮৩-র অক্টোবরে, তিনি হেস্টিংসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। অনেকেই মনে করেন হেস্টিংসের নীতির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে তিনি নিজেও বিব্রত বা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। এই সময়ে লন্ডনে প্রকাশিত সরকারি নথি Authentic Copy of the Correspondence in India-য় তাঁর নামের পাশে হেস্টিংস ও ম্যাকফারসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম রয়েছে, যা তাঁর কণ্ঠস্বর যে উপেক্ষণীয় ছিল না, তা প্রমাণ করে।

সংস্কৃতি ও জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা — স্টেবলসের পরিচয় শুধু রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ১৭৮৪-এ প্রতিষ্ঠিত এশিয়াটিক সোসাইটির পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় ওয়ারেন হেস্টিংস, জন ম্যাকফারসন ও এডওয়ার্ড হুইলারের সঙ্গে তাঁর নামও পাচ্ছি। ১৭৮৬-এ এক মানচিত্র তাঁর নামে উৎসর্গ করা হয়।
জন স্টেবলস এশিয়াটিক সোসাইটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন — কিন্তু এই ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ আসলে জ্ঞান দখলের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে বৈধতা দেওয়ার কাজ করেছিল। সোসাইটির মাধ্যমে সংগৃহীত পাণ্ডুলিপি, শিলালিপি, ও জ্ঞানকে ব্রিটিশ লাইব্রেরি ও জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা এক ধরনের ‘জ্ঞান লুঠ’। স্টেবলসের মতো ব্যক্তিরা এই লুঠকে ‘সভ্যতার মিশন’-এর অংশ বলে প্রচার করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে তা ছিল উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের একটি হাতিয়ার।
জ্ঞান লুঠের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ — এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকৃত উদ্দেশ্য চুম্বকে জেনে নিই — ধরমপাল ও কপিল রাজ দেখিয়েছেন, উইলিয়াম জোন্স ১৭৮৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল ‘প্রাচ্য জ্ঞান’ আবিষ্কার করা। কিন্তু এই ‘আবিষ্কার’-এর পেছনে ছিল গভীর ঔপনিবেশিক কৌশল —
১. জ্ঞান আবিষ্কার ও সংকলনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা – জোন্স সংস্কৃত শিখতে ব্রাহ্মণ শিক্ষক খুঁজছিলেন — তিনি চাইতেন এমন শিক্ষক, যিনি তাঁর তৈরি প্রশ্নের উত্তর দেবেন, ব্রাহ্মণ্য জ্ঞানের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলোকে সামনে আনবেন না। এর ফলে ভারতীয় জ্ঞানকে একটি ‘নির্দিষ্ট’ কাঠামোয় বেঁধে ফেলা হয়, যেখানে ব্রাহ্মণ্যবাদই হয়ে ওঠে ‘ভারতীয় জ্ঞান’-এর প্রতিনিধি।
২. জ্ঞান-ব্রাহ্মণ সমীকরণের স্থায়িত্ব — জোন্সের ব্রাহ্মণ শিক্ষক হিসেবে বেছে নেওয়ার ভাবনার ফলে যে সমীকরণ তৈরি হয় — ‘ভারতীয় জ্ঞান = ব্রাহ্মণ্য জ্ঞান’ — তা আজও টিকে আছে। এর ফলে অন্য বর্ণের, নারীদের, বা প্রান্তীয় সম্প্রদায়ের জ্ঞানকে ‘অপ্রামাণ্য’ ঘোষণা করা হয়। এই সমীকরণের মাধ্যমেই উপনিবেশ শক্তি তথাকথিত ‘শাস্ত্রীয়’ জ্ঞানের ভিত্তিতে আইন, রাজস্ব ও সামাজিক নীতি তৈরি করে, যা ব্রিটিশ শাসনকে সুসংহত করে। আয়রনি হল, তিনি ব্রাহ্মণ শিক্ষক খুঁজেও পান নি, তাকে বৈদ্য রামলোচনকে বেছে নিতে হয়। তাঁকে তিনি কলকাতায় আনেন। জোন্সের স্ত্রী মারিয়ার আঁকা রামলোচনের একটা ছবি দিলাম — উইলিয়াম জোনসের “স্থানীয় তথ্যদাতা” রামলোচন বসে আছেন পাশ্চাত্য-শৈলীর আরামকেদারায়; ডান হাতে কলম, বাঁ কোলে তালপাতার পুথি। ডানদিকেরটায় তিনি কলম দিয়ে তালপাতায় লিখছেন। ভাবভঙ্গি আত্মপ্রত্যয়ী, বসার ভঙ্গি ঋজু।

৩. জ্ঞান লুঠের ধারাবাহিকতা — ধরমপাল ও কপিল রাজ যেমন দেখিয়েছেন, এই প্রক্রিয়ায় শুধু জ্ঞান দখল হয়নি, বরং ভারতীয় জ্ঞানচর্চার স্বায়ত্তশাসনও ধ্বংস হয়েছে। আজও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আইন, এমনকি সংস্কৃতিচর্চায় সেই উপনিবেশিক কাঠামোর ছাপ স্পষ্ট, যেখানে জ্ঞান লুঠ হয়ে গেছে, আর তার ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান।
স্টেবলসের ভূমিকা — জন স্টেবলস এশিয়াটিক সোসাইটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন — কিন্তু এই ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ আসলে জ্ঞান দখলের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে বৈধতা দেওয়ার কাজ করেছিল। সোসাইটির মাধ্যমে সংগৃহীত পাণ্ডুলিপি, শিলালিপি, ও জ্ঞানকে ব্রিটিশ লাইব্রেরি ও জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা এক ধরনের ‘জ্ঞান লুঠ’। স্টেবলসের মতো ব্যক্তিরা এই লুঠকে ‘সভ্যতার মিশন’-এর অংশ বলে প্রচার করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে তা ছিল উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের একটি হাতিয়ার। উপনিবেশ-বিরোধী চর্চা কেবল অর্থনৈতিক লুঠের বিরুদ্ধে নয়, বরং জ্ঞান লুঠের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম। আমাদের পুনরায় খুঁজে বের করতে হবে প্রান্তীয়, অ-ব্রাহ্মণ্য, ও নারী-কেন্দ্রিক জ্ঞানভাণ্ডারকে, যা উপনিবেশিক কাঠামো intentionally চাপা দিয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ ছিল আসলে এক ধরনের ‘জ্ঞান উপনিবেশ’, যা আজও আমাদের শিক্ষা ও চিন্তার কাঠামোকে প্রভাবিত করে। লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। উপনিবেশের পতন হোক। জ্ঞান লুঠের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পতন হোক। হকার-চাষি-কারিগরদের বিকেন্দ্রীভূত জ্ঞান ও উৎপাদন ব্যবস্থার জয় হোক।
জীবনাবসান ও স্মৃতি — স্টেবলস ১৭৯৫ সালের ৩১ জানুয়ারি নিজ গ্রাম উওনহামে (Wonham, Surrey) মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীকালে ১৮২৩ সালে কলকাতার সাউথ পার্ক স্ট্রিট সমাধিস্থলে আরেক জন স্টেবলসের সমাধি পাওয়া যায়। এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় বহু প্রজন্ম ধরে এই নামটি টিকে ছিল।
জন স্টেবলস ছিলেন সেই ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের এক প্রতিনিধি, যিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজসভায় পদার্পণ করেছিলেন। জন শোরের পূর্বসূরি হিসেবে তাঁর নাম স্মরণীয় হয়ে আছে, তবে তিনি ছিলেন কোম্পানির সেই ‘সামরিক-বেসামরিক’ দ্বৈত চরিত্রের এক জীবন্ত উদাহরণ, যার সাফল্য ও বিতর্ক দুই-ই ব্রিটিশ ভারতের জটিল রাজনীতির স্বাক্ষর বহন করে।
টিকা ২
ফার্মিঙ্গার ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রণয়নে শোরের মিনিট প্রসঙ্গে হান্টারের বন্দোবস্ত প্রসঙ্গে মন্তব্য মূলত লিবারাল এটিটিউড — কিন্তু সত্যিই কি তাই — আমরা পরম পত্রিকার ৪১ সংখ্যায় কুয়েঙ্কা এস্তেবানের প্রবন্ধ অনুবাদ সূত্রে দেখেছি প্রতি বছর বাংলা থেকে এত সম্পদ যেত যে পুঁজিপতিরা সেই সম্পদ বিদেশে বিনিয়োগ করতেন পুঁজিরূপে আর পরে নেপোলিয়ানিক যুদ্ধে বৈদেশিক সমস্ত ঋণ মুক্ত হয় অমিয়কুমার বাগচী কথিত এম্পায়ার ফর প্রফিট প্রফিট ফর এম্পায়ার চরিত্রের ১৯০ বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট নীতি চালানো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য — লিবারাল মুখের পিছনে লুকোনো ছিল আদতে সাম্রাজ্যের মুখোশ – হান্টারদের মত বুদ্ধিজীবি আমলা ব্রিগেডই আদতে সাম্রাজ্যের পঞ্চম বাহিনী হিশেবে কাজ করেছেন।
হান্টার ও শোরের ‘লিবারালিজম’ — আসল চরিত্রটা কী ছিল? ফিফথ রিপোর্ট ও হান্টারের ‘উদার’ আপত্তি – ১৮১২ সালের হাউস অফ কমন্সের পঞ্চম রিপোর্ট (ফিফথ রিপোর্ট) ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ও রাজস্ব নীতি পর্যালোচনার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। জন হান্টার — যিনি একজন ‘উদারপন্থী’ বুদ্ধিজীবী আমলা হিসেবে চিহ্নিত — সেখানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল — ‘ভারতীয় কৃষকদের ওপর জমিদারদের অত্যাচার বাড়বে, রাজস্ব স্থির করে দেওয়া হলে সরকার নিজেই নমনীয়তা হারাবে, আর কৃষকের অবস্থার উন্নতি হবে না।’ আপাতদৃষ্টিতে এটি একজন ‘উদার’, ‘মানবতাবাদী’ আমলার কণ্ঠস্বর — যিনি কৃষকের পক্ষে কথা বলছেন। কিন্তু এই উদারতার পেছনে আসলে কী ছিল?
হান্টারের ‘উদারতা’ — সাম্রাজ্যের মুখোশ — হান্টারের আপত্তি কৃষকের কল্যাণে ছিল না। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল — কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা — স্থায়ী বন্দোবস্তে রাজস্ব স্থির হয়ে গেলে কোম্পানি বাড়তি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ হারাত। অথচ শোরের মডেলে (যা পরে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রূপায়িত হয়) রাজস্ব স্থির থাকলেও জমিদাররা যেহেতু ‘অনুদান’ বা ‘নজরানা’ দিয়ে কোম্পানিকে খুশি রাখত, তাই লুঠের নতুন পথ খুলে যেত; কৃষকের নয়, জমিদারের দালালি — হান্টার চাইতেন রাজস্ব কাঠামো যেন অনিশ্চিত থাকে, যাতে কোম্পানি ইচ্ছামতো কর বাড়াতে পারে, আর সেই বাড়তি করের বোঝা কৃষকের ওপর চাপিয়ে দিয়ে জমিদাররা মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে লাভবান হতে পারে; লিবারাল মুখোশের নিচে সাম্রাজ্যবাদী অস্ত্র — হান্টারের ‘উদার’ বাক্যবাণ ছিল আসলে সাম্রাজ্যের পঞ্চম বাহিনী হিসেবে কাজ করার এক নিখুঁত কৌশল। তিনি যেন বলছেন — ‘আমরা তো কৃষকের কথা বলছি, কিন্তু আদতে আমরা কোম্পানির জন্য আরও বেশি লুঠের পথ খোলা রাখতে চাই।’
শোরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত — লিবারেল নাকি সাম্রাজ্যবাদী? জন শোর (লর্ড টিগমাউথ) ছিলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্যতম স্থপতি। তাঁর যুক্তি ছিল — ‘জমিদারদের স্বত্ব নিশ্চিত করলে তারা কৃষি উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে, রাজস্ব স্থির থাকবে, আর কৃষকও সুরক্ষিত থাকবে।’ এটা দতে এক অতি ‘উদার’, ‘হুইগ’ দর্শন — যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার, বাজার অর্থনীতি, ও স্থায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা কী ছিল? জমিদাররা কৃষি উন্নয়নে বিনিয়োগ করেনি — তারা শুধু খাজনা বাড়িয়েছে, কৃষককে ঋণের ফাঁদে ফেলেছে, আর নিজেরা হয়ে উঠেছে ব্রিটিশ শাসনের রাজস্ব-সংগ্রাহক ও দালাল; কৃষক ভূমিহীন প্রজায় পরিণত হয়েছে — চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কৃষকের জমির মালিকানা কেড়ে নিয়েছে, তাকে জমিদারের কাছে দায়বদ্ধ করেছে, আর দুর্ভিক্ষের সময়ও খাজনা আদায় চলেছে; ব্রিটিশ রাজস্ব নিশ্চিত হয়েছে — প্রকৃতপক্ষে শোরের বন্দোবস্ত ছিল কোম্পানির রাজস্ব নিশ্চিতকরণের এক চমৎকার কৌশল, যেখানে কৃষক-জমিদার দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে ব্রিটিশ শাসন আরও শক্তিশালী হয়েছে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ