| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সংগীতে মহামায়া মহাকালী : জগৎপতি সরকার

Reporter
জগৎপতি সরকার / ১১৬৮ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

একথা অনস্বীকার্য যে ভারতবর্ষের মাটি হচ্ছে শক্তিসাধনার ক্ষেত্রভূমি। এই সাধনা কখন শুরু হয়েছিল তার প্রাচীনতা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। তবে ঐতিহাসিক প্রমাণে সিদ্ধ যে মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে মানবসমাজ বিশ্বমাতৃত্বের মহাশক্তিতে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। অন্তরে অন্তরে উপলব্ধি করেছিল মহামায়া জগৎজননীর অনতিক্রমণীয় শক্তি। অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডে আমরা পাই, ‘অতি প্রাচীনকাল হইতে সৃষ্টি রহস্যের মধ্যে একটি জননীত্ব (মহাশক্তি) মানবচিত্তকে অধিকার করিয়াছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ তাই সমস্ত সৃষ্টিতত্ত্বের অন্তর্নিহিত প্রেরণা বলিতে এক মহাজননীকে বুঝিত। যিনি রক্ষা করিবেন, পালন করিবেন, স্নেহ করিবেন। তাই বহু যুগের পরপারে যে মানুষ বাস করিত, যাহারা শিক্ষা সভ্যতার ধার ধারিত না, তাহারাও আদিম জীবন পিপাসার তাড়নায় সমস্ত সৃষ্টি শক্তির মূলে সৃজন পালনক্ষম একটি মাতৃ-দেবতার অস্তিত্ব উপলব্ধি করিত। এইরূপ প্রাচীন বিশ্বাস সাধারণত মহাতান্ত্রিক সমাজে উদ্ভুত হইয়াছিল। দ্রাবিড়, নিষাদ, পীতজাতি (কিরাত) প্রভৃতি মাতৃতান্ত্রিক সমাজে তাই দুর্গার অনুরূপ দেবীপূজার আভাস পাওয়া যাইতেছে।’ ভারতবর্ষে বৈদিক পরিমণ্ডলের সাথে সাথে বিভিন্ন উপনিষদ, তন্ত্র, পুরাণ ইত্যাদি শ্রৌত পরম্পরায় মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ ও কর্মকাণ্ডের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন দুর্গা, উমা, হৈমবতী, সতী, চন্দ্রিকা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী প্রভৃতি রূপে মহাশক্তির বর্ণনা করা হয়েছে। এবং সর্বত্রই তিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের আদিভূতা কারণ। যেমন মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘সৃষ্টিরাদৌ ত্বমেকাসিওমোরূপম-গোচরম’ ইত্যাদি। অর্থাৎ হে দেবী, সৃষ্টির আদিতে তমোরূপে তুমিই মাত্র ছিলে। তোমার সেই তমোময় রূপ বাক্য ও মনের আগোচর।

এই মহামায়া আদ্যাশক্তি যিনি বিশ্বপ্রসবিনী। তিনি ভয়ের মাঝে অভয়ারূপিণী, তিনিই কালী, তিনিই মহাদেবী, আবার তিনিই মহাশক্তি। অবশ্য তিনি যাই হোক না কেন, তিনি আজও সংগীতে সংগীতে মুখরিত। ভারতবর্ষের মাটিতে আজও তিনি অনন্ত, অসীম। সংগীতে দেবী দুর্গাও কখনও কালীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। যেমন কৃত্তিবাসের রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডে আমরা পাই:

‘হেন লয় চিতে তোমারে ছলিতে

পঙ্কজ হরিলা কালী।’ ইত্যাদি।

এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলার দশম শতাব্দী থেকে প্রচ্ছন্নভাবে একটা ভক্তিস্রোত চলেছিল। একদিকে শাক্ত আর অন্যদিকে বৈষ্ণব এই উভয় প্রকার ভক্তিরস বাঙালির স্বাভাবিক চিত্তধর্মের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাই কবি জগৎরাম তাঁর অনুদিত রামায়ণে জনকনন্দিনী সীতার চরিত্রে এক মহাশক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। অনুরূপভাবে কাশীরাম দাসের মহাভারত শক্তিসাধনার এক উত্তম প্রকাশ। মহাশক্তির এরূপ আরাধনার আয়োজন ও অনুষ্ঠান এবং সংগীতে তাঁকে স্মরণ বাঙালি ছাড়া আর কোনও জাতি করতে জানেনি। এর জন্যই বলতে হয়, শ্রীভগবানকে মাতৃরূপে সাজিয়ে মাতৃভাবশক্তির পরম পরিতৃপ্তি বাঙালি যেমন লাভ করেছে, তেমন তৃপ্তি আর কেউ পায়নি। বাস্তবিক বাংলা ভাষায় বাঙালির প্রাণের সুর, মনের আশা, হৃদয়ের ভাব শুনতে হলে শাক্তসংগীতের মতন আর অন্য কিছু আছে কিনা জানি না। রামপ্রসাদ সেনের শাক্ত সংগীতে তাই তো আমরা পাই—‘আমার উমা সামান্য মেয়ে নয়। গিরি, তোমারি কুমারী—তা নয়, তা নয়। স্বপ্নে হা দেখেছি গিরি, কহিতে মনে বাসি ভয়। ওহে কার চতুর্মুখ কার পঞ্চমুখ, উমা তাঁদের মস্তকে রয়। রাজরাজেশ্বরী হয়ে হাস্য বদনে কথা কয়।’

ঠিক একইভাবে কালিদাস চট্টোপাধ্যায় ওরফে কালীমির্জা গাইলেন তাঁর নিজের ভঙ্গিতে। তিনি গাইলেন, ‘চঞ্চল চরণে চলে অচল নন্দিনী, তরুণ অরুণ যেন চরণ দুখানি। জননীর হাত ধরা, হাঁটিছে সুধা অধরা, আনন্দে অধীর ধরা, ধন্য ধন্য গনি। অচিন্ত্যাব্যক্তরূপিণী, ভজমন আনুমানি, হিমালয়েরি আলয়ে পরব্রহ্ম সনাতনী। সব সখী সঙ্গে খেলে, কালী কালী বলে, কালিকে গিরি কালিকে হয়েছেন আপনি।’

দীর্ঘজীবন সংগ্রামের বিধ্বস্ত চাঁদসদাগরের চিত্তে এই আপ্তবাক্যের সারবত্তা লক্ষ করা যায় কাব্যের উপান্তে এসে। যখন চাঁদসদাগর তাঁর স্তব বন্দনায় দেবী মনসাকে তুষ্ট করছেন তখন তাঁর মনে আর কোনও ভেদ নেই। তিনি অভিন্নরূপে কল্পনা করছেন সেই মহাশক্তিকে। তাই তো সেখানে দেখি ‘পদ্মাবতী পূজা কর চান্দ সদাগর। একই মূর্ত্তি দেখ সব না ভাবিও আর। যেই জান ভগবতী, সেই বিষহরি। পদ্মার প্রসাদে আমি ভবসিন্ধু তরি।’ এইভাবে সারা মঙ্গলকাব্যে শাক্ত ধর্মের শুধু নয়, একটি শক্তিরূপের নিপুণ অবিচ্ছিন্ন প্রবহমাণতা চোখে পড়ে বারবার। মঙ্গলকাব্যের আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চৌতিশা স্তব। কবিদের কাব্যে দেবীর সনাতনীরূপ চৌতিশা স্তবে সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাই তো মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে আমরা পাই, ‘কালী কপালিনী কান্তা কপালকুণ্ডলা। কালরাত্রি কুন্দমুখী কত জাত কলা। খেদ খণ্ডন করি খলে কর নাশ; খণ্ডিয়া সকল দোষ রাখ নিজ দাস। গিরিজা গণেশ মাতা গতি সবাকার। গোকুল রাখিলে গোপকুলে অবতার’ ইত্যাদি।

যাই হোক, ফিরে আসি সংগীতের কথায়। বিখ্যাত কালীসাধক কমলাকান্ত তাঁর অপূর্ব সংগীতে মহাশক্তির নানান রূপের কল্পনা আজও আমাদিগে বিস্মিত করে। তিনি বর্ধমানের লোক ছিলেন। এখনও বর্ধমান শহরে কমলাকান্তের কালীবাড়ি একটি বিখ্যাত স্থান। নানান মানুষ সেই স্থান দর্শনে আজও সেই মহাশক্তির অসাধারণ শক্তিরূপের কল্পনা করে থাকেন এবং তাঁদের মনের আকুতি একান্ত চিত্তে নিবেদন করে থাকেন দিনের পর দিন। তিনি গাইলেন, ‘আমি কি হেরিলাম নিশি স্বপনে। গিরিরাজ, অচেতনে কত না ঘুমাও হে। এই এখনি শিয়রে ছিল, গৌরী আমার কোথা গেল হে, আধ আধ মা বলিয়ে বিধু বদনে। মনের তিমির নাশি, উদয় হইল আসি, বিতরে অমতৃরাশি সুললিত বচনে’ ইত্যাদি। আমরা এ প্রসঙ্গে মহানাট্যকার শক্তিসাধক গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাম স্মরণ করতেই পারি। তাঁর শাক্তপদাবলীতে আমরা পাই ‘কুস্বপন দেখেছি গিরি, উমা আমার শ্মশানবাসী, অসিতবরণা উমা, মুখে অট্ট অট্ট হাসি। এলোকেশী বিবসনা, উমা আমার শবাসনা, ঘোরননা ত্রিনয়না জলে শোভে বাল-শশী। যোগিনীদল—সঙ্গিনী, ভ্রমিছে সিংহবাহিনী, হেরিয়া রণ-রঙ্গিণী, মনে বড় ভয় বাসি’। ইত্যাদি। একসময় শ্রী অমরেন্দ্র রায় ১৯৬৩ সালে ‘শাক্তপদাবলী’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গ্রন্থটিতে মোট ২৯৮টি গানের সংকলন দেখতে পাই। তার মধ্যে ১৩টি গানের রচয়িতা কে তা জানতে পারা যায় না। অবশিষ্ট সংগীতগুলি মোট ১০৮ জনের রচনা। গিরিশচন্দ্র ঘোষ আবার গাইলেন, ‘হের হর-মনোমোহিনী, কে বলে রে কালো মেয়ে। আমার মায়ের রূপে ভুবন আলো, চোখ থাকে তো দেখ না চেয়ে। বিমল হসি ঘরে শশী, অরুণ পড়ে নখে খসি, এলোকেশী শ্যামা ষোড়শী, ভ্রমর ভরমে কমল ভ্রমে, বিভোর ভোলা চরণ পেয়ে’ ইত্যাদি। পরবর্তীকালে গৌরমোহন রায় নামে এক শাক্তসাধক গাইলেন, ‘নাচ কে রে দিগম্বরী দিগম্বর হরহৃদি পরে। একি অপরূপ রূপের সিন্ধু, অর্দ্ধ-ইন্দু শোভে শিরে।’ আমাদের ভাবতে ভালো লাগে যখন দেখি রবীন্দ্রনাথ নিজে শ্যামাসংগীত গাইছেন। তিনি আমাদের কবিগুরু কিন্তু তিনি এমন শাক্তসাধক যাঁর তুলনা মেলা ভার। তাই তাঁর রচনায় পাই, ‘উলঙ্গিনী নাচে রণরঙ্গে। আমরা নৃত্য করি সঙ্গে। দশদিক আঁধার করে মাতিল দিক্‌-বসনা, জ্বলে বহ্নিশিখা, রাঙা রসনা, দেখে মরিবারে ধাইছে পতঙ্গে।’ ইত্যাদি। ঠিক একই সময়ে হরিনাথ মজুমদার (যিনি কাঙাল ফকিরচাঁদ নামেও খ্যাত) তিনি গাইলেন, ‘কে বলে আ মরি। তোমায় দিগম্বরী, শবাসনা বিবসনা ভয়ঙ্করী। জ্ঞান-নেত্রে আমি চেয়ে দেখি, তুমি সর্বময়ী সর্ব্বমঙ্গলা সুন্দরী।’ প্রভৃতি। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলা প্রয়োজন যে, আমি সবসময় প্রত্যেকের গানগুলো সবটা দিতে পারিনি স্থান সংকুলানের জন্য। কিন্তু তাঁদের প্রতিটি গানই অত্যন্ত মনোগ্রাহী এবং শাক্তরসসমৃদ্ধ।

স্বাভাবিকভাবে শ্যামাচরণ ব্রহ্মচারীর শাক্তপদাবলীর কথা চলে আসে। তিনি তাঁর স্বমহিমায় গাইলেন, ‘নীলবরনী কে, কামিনী, কন্দর্প-দর্পহারিণী, নবঘনে সুশোভিত যিনি কোটি সৌদামিনী। কি কাজ ঘরে নগরে, ডোব সে রূপসাগরে, নাম-সুধা ধর অধরে, ভাবরে দিবা যামিনী’ ইত্যাদি। আশ্চর্যের বিষয় বর্ধমান মহারাজ মহতাব চাঁদ কি অপূর্ব মা মহাশক্তির স্তবগান করছেন নিজস্বভঙ্গিতে। তিনি মনের সমস্ত আকুলতা সংগীতে সংগীতে ভরিয়ে দিয়েছেন। তিনি গাইলেন, ‘…অসি মুণ্ড বাম করে, দক্ষিণে অভয় বরে, রণে রণরঙ্গিণী। ভীমবেশা ভয়ঙ্করী, ভবহৃদি পদধরি, দক্ষিণারূপিণী।। চতুর্দিকে শিবা ঘেরি, শ্মশানালয়ে শঙ্করী অট্ট অট্ট হাসিনী। চন্দ্রে দেহি এই জ্ঞান, অন্তে করি তব ধ্যান কালী ত্রিনয়নী।’ তিনি আরও গাইলেন এবং সে সংগীত আজও ভুবন ভরিয়ে দেয় শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে। বহু মানুষ তাতে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জগজ্জননীর রূপের বর্ণনা দিলেন এইভাবে— ‘উচ্চপীন পয়োধর, তাহে বহে রক্তধার, মুণ্ডমালা ভয়ঙ্কর গলে বিভূষণ।। জপমালা এক করে, জ্ঞানমুদ্রা ধরে পরে, দ্বিকরে অভয় বরে, করেন ধারণ। সহ চন্দ্রকান্তমণি, মুকুট শিরোধারিণী, হে ভৈরবী ত্রিনয়নী, দেহি, চন্দ্রে শ্রীচরণ।’ শেষ পর্যন্ত তিনি শরণ চাইলেন সেই মহামায়ার চরণে। তাঁর রচিত বহু সংগীত সংগ্রহে আছে। সেগুলি সবই নিজগুণে অপরিমেয়। আমি এই নিবন্ধে রামপ্রসাদের কোনও সংগীত যুক্ত করিনি। কিন্তু আমরা তো কোনওদিন রামপ্রসাদের ‘মা বসন পর। বসনপর, বসনপর, মাগো, বসনপর তুমি’ এই সংগীত ভুলিতে পারিনি। পারবও না কোনওদিন। আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলায় তারিণীপ্রসাদ জ্যোতিষী নামে এক বিখ্যাত শাক্তসংগীতকার গাইলেন, ‘রাজার মেয়ে রাজনন্দিনী, মুণ্ডমালা পেলে কোথায়? যখন অসুরগুলো ছিল না মা, তখন কি মা পরতে গলায়?’ ইত্যাদি। কৃষ্ণপ্রসন্ন সেন (পরিব্রাজক) তিনি তাঁর নিজের কথায় শ্যামা মায়ের রূপের কল্পনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে রজনীকান্ত সেনের ভক্তি সংগীত নিঃসন্দেহে আমাদিগে মুগ্ধ করবে। তাঁর শাক্তসংগীতের অপূর্ব মাধুর্য থাকায় পুরোটা উল্লেখ করলাম। তিনি গাইলেন— ‘আর কতদিন ভবে থাকিব মা? পথ চেয়ে কত ডাকিব মা? (তুমি) দেখা তো দিলে না, কোলে তো নিলে না, কি আশে পরাণ রাখিব মা? (আমায়) কেহ ত আদর করে না গো, পতিতে তুলিয়া ধরে না গো, তবু মোহ নাহি টুটে, ঘুম নাহি ছুটে, আর কতদিনে জাগিব মা?’ ইত্যাদি। এরপর কালীদাস ভট্টাচার্য নামে এক কালীসাধকের গলায় আমরা শুনতে পেলাম এক অপূর্ব সংগীত। তিনি প্রাণভরে গাইলেন, ‘তারা, এবার আমাকে কর পার, তরঙ্গে পড়েছি শ্যামা, না জানি সাঁতার। একে দেহ জীর্ণ তরী তাহে পাপে হইল ভারি, কি ধরি, কি করি, ভবজলধি অপার।। ভেবেছিলাম যাব কাশী, হয়ে রব কাশীবাসী, কাম-সিন্ধু-নীরে আসি, পশিলাম আবার। এ-কূল, ও-কূল হারা আমি, মাঝামাঝি তুমি, কালীর ভরসা কেবল কালী কর্ণধার।’ দশরথি রায় আপন মনে গাইলেন, ‘দোষ কারো নয় গো মা, আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা। দোষ কারো নয় গো মা।’ আজও এ সুর আমাদিগে বিচলিত করে, মহাশক্তির সেই চরণতলে আজও মস্তক নত করে দেয়। এ সংগীতের চিরায়ত সত্যকে অস্বীকার করা যায় না। আমরা শ্যামামায়ের স্তব শুনতে পেলাম একজন বিদেশির গলায়। অ্যান্টনি সাহেব হঠাৎ গেয়ে উঠলেন ‘বাজাতো জয়কালীর ডঙ্কা— অতি তেজ ডঙ্কা, আবার ছল করে তার সোনার লঙ্কা দগ্ধ করে এসেছ। দয়াময়ী মাগো, কোনকালে বা কারে তুমি দায় করেছ?’

মহামায়া যেন পূর্ব-পশ্চিম এক করে দিয়েছেন তাঁর মহিমায়। আর সংগীত এমন একটা জিনিস যেখানে মন-প্রাণ এক হয়ে যায়। মাতোয়ারা হয়ে যায় ভক্তি আর ভক্তের উচ্ছ্বাস। বর্তমান সময়েও মহাকালীর সাধনায় নিমগ্ন বাঙালি আজও। তাই আমরা এখনও শাক্তসংগীতের কথা উঠলে ভুলতে পারি না ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কথা। আমরা ভুলতে পারি না পান্নালাল ভট্টাচার্যের কথা। আমরা ভুলতে পারি না অমৃক সিং অরোরার কথা। আর আগমনীর সুর বেজে উঠেছিল যাঁর অপূর্ব কণ্ঠে সেই রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কথা।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য শ্যামাসংগীতের এক সুসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান হলেও শ্যামাসংগীতকে তিনি একা জনপ্রিয় করেছিলেন, এ কথা বোধহয় তিনি নিজেও বিশ্বাস করতেন না। কারণ, তিনি মনে করতেন, তাঁর ছোটো ভাই পান্নালাল ভট্টাচার্য ছিলেন শ্যামাসংগীতের শেষ কথা। পান্নালালের অকালপ্রয়াণের পর তিনি বলেছিলেন, ‘মায়ের গানে ওর পরম সিদ্ধি হয়ে গিয়েছিল। তারপর ওর আর এ জগতে থাকা সম্ভব ছিল না। কিছুদিন ধরে তা টের পাচ্ছিলাম। মায়ের এও এক লীলা।’ তাই আজও আমরা সেই ‘রানি রাসমণি’, সাধক রামপ্রসাদ কিংবা সাধক বামাখ্যাপার মতো শ্যামাসংগীতে উত্তাল স্মরণীয় সব চলচ্চিত্র বারবার দেখতে চাই। পান্নালাল গাইছেন, ‘গয়াগঙ্গা প্রভাসাদি কাশী কাঞ্চী কে বা চায়’ কিংবা ‘গোপনে হৃদয়ে রেখো আদরিণী শ্যামা মাকে’ ইত্যাদি অবিস্মরণীয় গান। এখনও আমরা চোখ মুছি তাঁর সেই গান শুনলে, ‘আমার সাধ না মিটিল, আশা না ফুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা।’

তাই শেষ করব এই বলে যে, শ্যামা মায়ের ভাবের গান কখন যে আমাদের ভালোবাসার গান, আমাদের মনের গান হয়ে যায় তা বুঝতেই পারি না। এটা আমাদের বাঙালির নিজস্ব সত্তা। বাংলার ধর্মের সঙ্গে তাই তিনি আজও জড়িত। বাংলার ঘরে তাই আজও মহামায়ার রূপের নানা প্রকাশ ঘটে নানান সময়ে। তিনি তাঁর রূপের অনন্যতায় মহিমান্বিত আজও।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev