সোমবার | ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | রাত ১১:০৬
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটির অনবদ্য সুরঞ্জলি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী : ফারজানা নাজ শম্পা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী / ৭৪ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

ম্যাজিশিয়ান চিরাগলালের আজ মহাজাতি সদনে শো ছিল। হল পুরো ভর্তি হয়েও লোকে বাইরে লাইন দিয়ে নাকি দাঁড়িয়েছিল যদি টিকিট পাওয়া যায়! চিরাগলালের নামের এমন মহিমা যে তাঁর নাম দিয়ে পোষ্টার পড়লেই সব টিকিট নিমেষে উধাও হয়ে যায়… হ্যাঁ, এখনও! চিরাগলালের এখন বয়েস বাষট্টি। দেখে অবশ্য পঞ্চাশের বেশি মনে হয় না। তবুও একটা আকাশ ছোঁয়া খ্যাতি অর্জন করে সেটাকে ধরে রাখা খুব কঠিন কাজ। সেই কাজ অবলীলায় করে চলেছেন চিরাগলাল। তবেই তো তিনি ম্যাজিশিয়ান। জাদুকর তো এমনি হওয়া যায় না, অনেক জাদু আস্তিনের মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে বের করে ছড়িয়ে দিতে হয়। যিনি সেই কাজ যতো ভালভাবে করতে পারেন তাঁর খ্যাতি ততো ক্রমবর্ধমান হয়ে থাকে।

দক্ষিণ কলকাতার বিশাল জায়গা জুড়ে বাড়িতে তাঁর গাড়ি যখন ঢুকছে তখন রাত পৌনে বারোটা। তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে থাকে, আ্যসিস্ট করে, ছোটো খাটো ম্যাজিকও দেখায়, উনি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন তখন। অবশ্য ক্লান্তি শব্দটা তাঁর অভিধানে নেই। তবু ম্যাজিক টানা দেখতে একঘেয়ে যাতে না লাগে তার জন্যে মাঝে মাঝেই চমক রাখেন তিনি। যাতে দর্শক সবসময় শিরদাঁড়া সোজা করে বসে থাকে। এটা উনি শিখেছেন ওঁর গুরু সুলেমান খাঁ সাহেবের কাছে। খাঁ সাহেব সবসময় বলতেন, ‘কখনো ঢিলে ছাড়বি না, সর্বদা দর্শকের মনের রাশ তোর হাতে টেনে রাখতে হবে। তুই যেমন বলবি, দর্শক তেমন বুঝবে, তুই যেমন দেখাবি দর্শক ঠিক তেমন দেখবে। মনে রাখিস স্টেজে তুই হলি ঈশ্বর। তোর অঙ্গুলি হেলনে তোর জাদুর জগত চলবে। তবে স্টেজের বাইরে নিজেকে ঈশ্বর ভাবতে যেও না কখনও, পস্তাবে। আর এই ইন্দ্রজাল কখনো কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে যেও না। মারা পড়বে।’ চিরাগলাল অক্ষরে অক্ষরে গুরুর আদেশ পালন করে থাকেন।

আজ গাড়ি গেটের মধ্যে ঢুকতেই দারোয়ান সুরজ সিং স্যালুটের ভঙ্গীতেই ছুটে এল গাড়ির কাছে, দাঁড়িয়ে রইল মনিব গাড়ি থেকে নামার অপেক্ষায়। চিরাগলাল এত রাতে সামান্য বিরক্ত হয়ে নেমে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেয়া হুয়া সুরজ?’ সুরজ বলল, ‘কেয়া বাতায়ু সাহাব! এক ছোটাসা লেড়কা বহোত তং করতা হ্যায়!’ বেশ কিছুটা শুনে চিরাগলাল বুঝলেন যে একটা ছোট্ট ছেলে রোজ গেটের সামনে এসে ঢোকার জন্যে সুরজের কাছে কাকুতি মিনতি করে, একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চায়। তিনি ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিতে ব’লে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেলেন।

পুলু! পুলু! মায়ের ডাকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে মুখ ধুতে যায় পুলক। বছর তেরো হবে জোর। বোন দিতি ক্লাস টু। সে এইট। মা ওর হাতে চা আর দুটো রুটি আলু চচ্চরি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আজ একবার মুকুজ্জেদের বাড়ি থেকে টাকাটা নিয়ে আসিস তো, অনেক দিন পড়ে আছে টাকাটা। পেলে ওটা দিয়ে রামুর দোকানে ধার শোধ করে বাকিটায় ডাল, ডিম, এক প্যাকেট তেল নিয়ে আসবি।’ পুলু ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। বাবা কি একটা কাজে দুবছর আগে সৌদী আরব গেছিল, আর ফেরেনি। বেঁচে আছে কিনা তাও ঠিক বোঝা যায় না। বাবার সঙ্গে যে গেছিল সে ফিরে এসেছে, কিন্তু বাবার খবর সে বলতে পারে নি। বলেছে বাবা কিছুদিন আগেই অন্য জায়গায় চলে গেছিল, তাই ওর সাথে আর যোগাযোগ ছিল না।

মা আর ওরা কিছুদিন কান্নাকাটি করে চুপ করে গেল। মা পাড়ার নেতাদের কাছে কিছুদিন ছোটাছুটি করে ক্ষান্ত দিল। কিন্তু ক্ষিদে তো চুপ করে থাকে না। মা সেলাই করতে পারতো খুব ভাল, বাড়িতে সেলাই মেশিনও ছিল। তাই আস্তে আস্তে শাড়ির ফল,পিকো, তারপর ব্লাউজ, শালোয়ার সেলাই করে প্রথম প্রথম দোকানে দিত শুধু। তারপর একটু নাম হতে এখন দোকান ছাড়াও অনেক বাড়ির মেয়ে বউরা সেলাই করতে দিয়ে যায়, নিয়েও যায়। আবার পুলুও গিয়ে দিয়ে আসে। মুকুজ্জে কাকীমা ধার রাখেন খুব, পরে পরে শোধ করেন। মায়ের অসুবিধে হলেও কিছু বলতে পারেন না। এক পাড়ায় বাস, তাছাড়া কাকীমা নিয়মিত কিছু না কিছু সেলাই করতে দেন। ওই সেলাই করে যা আসে, আর বাড়ির একটা ঘর ভাড়া দিয়ে যা হোক করে চলে যাচ্ছে ওদের।

পুলু টাকা আদায় করে রামুকাকুর দোকানে গিয়ে সব কিনে থলিটা নিয়ে দোলাতে দোলাতে বাড়ি ফিরছে। রাস্তার ধারে বিরাট ফ্লেক্সটার ওপর আবার চোখ গেল। হাঁ করে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার নাচতে নাচতে বাড়ির পথে চলল পুলু। বাবা হারিয়ে যাবার আগে ওদের তিনজনকে মহাজাতি সদনে জাদুকর চিরাগলালের ম্যাজিক শো দেখিয়েছিলেন। কি অপূর্ব যে লেগেছিল পুলুর! এখনও ভাবলে মনে হয় সে হলের মধ্যে বসে আছে, আর আলোয় উজ্জ্বল স্টেজে সূর্যের মতো আলো করে খেলা দেখাচ্ছেন চিরাগলাল। তারপর থেকেই পুলুর মাথায় একটাই ভূত চেপে আছে, ওকে ম্যাজিশিয়ান হতেই হবে। একদম চিরাগলালের মত। হাত বাড়িয়ে যে যা চাইবে- আম, কেক, চকোলেট, পায়রা- যে যা চাইবে এনে দেবে পুলকলাল। গোটা হল হাততালিতে ফেটে পড়বে, সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে ওর দিকে। আর পুলক হেসে হেসে সবার হাতে গিফট দিয়ে আবার স্টেজে উঠে যাবে। সবাই ওকেই দেখবে,শুধু ওকে দেখবে! যেমন করে সবাই চিরাগলালকে দেখে। আজ এক প্যাকেট তাস কিনেছে পুলু, বাড়ি গিয়ে প্র্যাক্টিস করতে হবে। তারপর মাকে আর বনুকে দেখাবে তাসের ম্যাজিক। ভাল রকম প্র্যাক্টিস হয়ে গেলে স্কুলের বন্ধুদের দেখাবে।

বিকেলে আজ বাগানে বসে চা খাচ্ছিলেন চিরাগলাল আর ইন্দ্রাণী, তাঁর স্ত্রী। এই সময় হঠাৎ একটি ছোট্ট ছেলে ছুটতে ছুটতে ওনার সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে, ঠিক তার পিছন পিছন সুরজ সিং। ‘দেখিয়ে সাহাব! ইয়ে বদমাশ লেড়কা আজ ভি আ গয়া!’ চিরাগলাল গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি চাই তোমার? বারবার বাড়িতে ঢুকে আসছো কেন?’ ছেলেটি শুকনো মুখে বললো, ‘আমি আপনার কাছে ম্যাজিক শিখতে চাই, শেখাবেন? আমার মা খুব গরিব, আমি ম্যাজিকের জিনিস কিনতে পারি না, কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে আমি আপনার মত মহাজাতি সদনে ম্যাজিক দেখাবো।’ চিরাগ আর ইন্দ্রাণী দমফাটা হাসিতে ফেটে পড়লেন। ছেলেটা লজ্জায় মাথা নীচু করে ফেলল ।

চোখভরা টলটলে জল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে পুলু। চিরাগ লাল ওকে ম্যাজিক শেখাবেন না, ও সেটা বুঝতে পেরেছে। সেটা বড় কথা নয়, আসল কথা তিনি আর ওনার স্ত্রী ওকে নিয়ে ঠাট্টা করেছেন। ওর দ্বারা ম্যাজিক হবে না বলেছেন। এটা পুলুর সাংঘাতিক মনে লেগেছে। ওনারা না দেখে না শিখিয়ে কি করে বুঝলেন যে ও পারবে না। বাড়ি ফিরে ও গুম হয়ে থাকলো কদিন।

ছেলেটা শুকনো মুখে চলে যাবার পর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন চিরাগলাল ওরফে দীপক। হ্যাঁ, চিরাগলাল তাঁর নেওয়া নাম। গুরু বলেছিলেন ম্যাজিক দেখাতে গেলে এমন একটা নাম চাই যেটা সবার মনে চট করে ধাক্কা মারে। ছেলেটা তাঁকে হঠাৎ করেই অতীতে ফিরিয়ে দিয়েছে। মা মরা ছেলে দীপু। সৎমা নিজের দুটো ছেলে মেয়ে নিয়ে সদা ব্যস্ত। ওর দিকে নজরই দেন না। ম্যাজিকের ভূত ওর মাথায়ও চেপেছিল। ম্যাজিকের কিছু জিনিস কেনার জন্য মায়ের টাকা হাত সাফাই করতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে। কিন্তু হাত পাকা ছিল না, তাই বাবার বেদম পিটুনি খেয়ে গৃহত্যাগ করতে হল। ওইটুকু ছেলেকে কেউ ফিরে ডাকলোও না। দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে, মন্দিরে ভোগ খেয়ে, কখনো রাস্তার কলের বিশুদ্ধ জল খেয়ে কাটছিল। তারপর আশ্রয় জোটে খাঁ সাহেবের কাছে, এটা দৈব নির্দেশ ছাড়া আর কি বলা যায়!

সুলেমান সাহেব বিরাট নামী কেউ ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু ম্যাজিকের হাত ছিল মাখনের মত। ডান হাত কি করছে বাঁ হাত জানতে পারবে না। আর উনি নামের প্রত্যাশী ছিলেন না একেবারেই। বিয়ে থা করেন নি, যেটুকু রোজগার করতেন তার সিংহভাগ অনাথ ছেলেদের জন্য দিয়ে দিতেন। দীপুর মত আরও চার পাঁচটা ছেলেকে তিনি মানুষ করেছেন। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের জীবনে সফল। তবে দীপক ওরফে চিরাগলাল সকলকে ছাপিয়ে গেছেন। গুরুর কথা কি তিনি ভুলে গেলেন? সাফল্য কি তাঁকে খুব বেশি অহংকারী করে দিল! আরে একটা ছেলের জন্য এত কিছু ভাবছেন কেন তিনি! তিনি ট্যালেন্টেড ছিলেন তাই খাঁ সাহেব তাকে সব জাদুবিদ্যা উজাড় করে দিয়েছিলেন। ওই যে ছেলেটি এসেছিল, তার কি সেরকম কিছু আছে? কিন্তু নেই যে তা তো তিনি দেখেন নি! উফ! এ ছেলেটাকে মাথা থেকে বের করে দিতে হবে। এক কাপ কফির খুব দরকার।

পুলু একরাশ অপমান আর কষ্ট নিয়ে বাড়িতে ঢুকে দেখল অবাক কান্ড! মা ভীষণ খুশি হয়ে কাকে ফোন করে বাবার খবর পেয়েছে বলছে! পুলু অবাক হবে, না কাঁদবে, না আনন্দ করবে কিচ্ছু বুঝতে না পেরে মাকে গিয়ে পিছন থেকে আস্তে আস্তে জড়িয়ে ধরে। মা ফিরে ওকে দেখে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে। মাকে কাঁদতে দেখে ওরা দুই ভাই বোনও কেঁদে ওঠে। কান্নাকাটি থামলে পুলু যেটুকু বুঝলো যে বাবার জরুরি কিছু কাগজপত্র হারিয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায়। আর তার সুযোগ নিয়ে ওখানকার একজন ধনী ব্যক্তি বাবাকে আটকে রেখে বিনা পয়সায় কাজ করতে বাধ্য করে। আইনের ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন অত্যাচার চালায়। এই ব্যাপারটা ওখানকারই একজন ভাল মানুষের চোখে পড়ে। আর তাঁরই সহায়তায় বাবা আবার ভারতে ফিরে আসতে পারবে। তবে দিন পনের লাগবে। তেতো হয়ে যাওয়া মনটা কেমন হঠাৎ করে ভাল লাগল পুলুর।

বছর সাত কেটে গেছে। চিরাগলাল বেশ কিছু দিন পর কলকাতায় ফিরেছেন। ইদানিং শো করা কমিয়ে দিয়েছেন খুব। ছেলে মেয়ে দুজনেই নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। বাবাকে ম্যাজিক দেখানোর সময় আর সাহায্য করতে পারে না। স্ত্রী ইন্দ্রাণীও নিজের পোষাকের ব্যবসা আরও বাড়িয়েছেন। ইন্দ্রাণী আজ কলকাতায় তো কাল আমেরিকা। কারো সঙ্গেই দেখা বিশেষ হয় না। চিরাগ মনে মনে হাসেন, কার জন্যে এতকাল ছুটে মরলেন! শুধু নাম আর খ্যাতির মোহ? তাঁর এত ভালবাসার পেশা এই ম্যাজিক, এটা তো তাঁর ছেলে বা মেয়ে কেউ একজন ভালবেসে আপন করে নিতে পারত! আসলে তিনি স্টেজে উঠে অপরের মনের দখল নিতে পারেন ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে সবই অন্য এক ম্যাজিশিয়ানের অঙ্গুলিহেলনে চলছে অস্বীকার করে লাভ নেই। আজকাল চিরযুবা চিরাগলালের খুব ক্লান্তি আসে।

দারোয়ান উত্তম এসে একটা কার্ড হাতে দিয়ে বললো, ‘একজন দিয়ে গেল।’ সুন্দর সাজানো একটা কার্ড। খুলে দেখলেন আমন্ত্রণ পত্র। সামনের রবিবার মহাজাতি সদনে একটা ম্যাজিক শো এর আমন্ত্রণ! খুব বিনীত অনুরোধ করা হয়েছে চিরাগলালকে, তিনি গেলে এই শো ধন্য হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এরকম আমন্ত্রণ তিনি প্রায়ই পেয়ে থাকেন। মুশকিল হচ্ছে এটা এই নতুন জাদুকরের প্রথম বড় শো, সুতরাং একবার গিয়ে পড়লে পুরোটা না দেখে আসতে দেবে না। অনুনয় বিনয় করে ঠিক আটকে রেখে দেবে। তিনি অবহেলা করে কার্ডটা একপাশে ফেলে রাখলেন। নাহ্, এরকম আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারবেন না তিনি।

রবিবার সকালে কাগজ পড়তে গিয়ে বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ল চিরাগলালের। মহাজাতি সদনে আজ অনুষ্ঠান, জাদুকর একলব্যের। বাহ্ রে! অদ্ভুত নাম তো! নিজের? না ওনার মতই নেওয়া নাম? মনে পড়ে গেল আমন্ত্রণের কথা। যাবেন না-ই ভেবেছিলেন, কিন্তু ওই একলব্য নামটা কেমন যেন টানছে! বিকেল পাঁচটায় শো। হাতে অনেক সময়, দেখা যাক তখনও যদি মন টানে যাবেন একবার। দুপুরে খেয়ে দেয়ে একটা বই পড়তে পড়তে কখন চোখটা লেগে গেছিল, ঘুম ভাঙল কাজের মেয়ে রেবার ডাকে। রেবা বললো একজন গাড়ি নিয়ে এসেছে তাঁকে নিয়ে যেতে। রেবাকে দিয়ে তাকে চা দিতে বলে তিনি চট্পট তৈরী হয়ে নিলেন। তাঁকে যথাযথ সম্মান দিয়ে গাড়িতে করে মহাজাতি সদনে নিয়ে যাওয়া হলো। একটি ফর্সা ছিপছিপে সুন্দর দেখতে ছেলে এসে তাঁকে প্রণাম করে বসতে বলল। পরিচয় দিল সে একলব্য। খুব অনুনয়ের সুরে ছেলেটি বলল যে তাঁকেই উদ্বোধন করতে হবে, সেজন্য হয়তো একটু কষ্ট হবে ওনার, ইত্যাদি ইত্যাদি। উনি ছেলেটিকে আশ্বস্ত করলেন কোনো চিন্তা না করতে, ওনার কোনো অসুবিধে হবে না। তার প্রথম বড় স্টেজ শো, সে যেন তাতেই কনসেনট্রেট করে। ছেলেটি খুব খুশি হয়ে ভিতরে চলে গেল। উদ্বোধনের পর্ব মেটার পর একলব্য বলল, ছোটো থেকে চিরাগলাল হবার স্বপ্ন দেখেছে সে, চিরাগলালকে সামনে রেখেই সে দিনের পর দিন প্র্যাক্টিস করেছে। ওর খুব ইচ্ছা ছিল চিরাগলালের কাছে ম্যাজিক শেখার কিন্তু অত ব্যস্ত মানুষের কাছে পৌঁছনো তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি, তাই ওনার ছবি সামনে রেখে ও প্র্যাক্টিস করেছে, আর তাই ও নিজেকে একলব্য বলে। ওর আসল নাম পুলক।

একটার পর একটা খেলা দেখাচ্ছে একলব্য অসাধারণ দক্ষতায়। চিরাগলাল একটু পরে চলে যাবেন ভেবেও খেলার টানে থেকে গেলেন। ছেলেটার পারফরম্যান্স তাঁর নিজের কথা বারবার মনে পড়াচ্ছে। গোটা স্টেজ জুড়ে পারফর্ম করছে একলব্য। হাত সাফাইয়ের খেলাগুলো অসাধারণ। ছেলেটা বিদেশী জাদুর থেকে ভারতীয় জাদুর ওপরে জোর দিয়েছে বেশি, এটা খুব ভাল লেগেছে চিরাগ লালের। দেহ দ্বিখন্ডিত করার খেলাতে একলব্য তার বোনকে নিয়ে খেলা দেখাল। এটাও ভাল ভাবেই উতরে দিল। এবার থট রিডিং! পারবে ছেলেটা!! সোজা হয়ে বসলেন কিংবদন্তি জাদুকর। একটার পর একটা দর্শকদের স্টেজে তুলে একলব্য চোখ বেঁধে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে ঠিক ঠিক! এবার একলব্য হঠাৎ করেই তাঁর নাম আ্যনাউন্স করে ডাকছে। নতুন এসে এত সাহস যে তাঁকে ডাকছে! মজা পেলেন জাদুকর। উঠলেন স্টেজে। দেখা যাক তাঁর মনের খবর একলব্য দিতে পারে কিনা! তিনি বোর্ডে আঁকলেন একটা ছোট্ট ছেলে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, এঁকে তাকালেন একলব্যের দিকে। একলব্য বেশ কিছুক্ষণ চুপ। তারপর হেসে বলল, ‘আপনি আমায় আঁকলেন স্যার, আপনি আমায় আঁকলেন।’ একলব্য চোখ খুলে জাদুকরের পায়ে এসে হাত ছোঁয়ালো, চিরাগলাল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। হল বুঝে না বুঝে ফেটে পড়ছে হাততালিতে।

গল্পটা এখানেই শেষ হলে বেশ হত। কিন্তু এটা তো জীবনের কাহিনী, তাই একটু অন্যরকম হোক।

আজ মেটিয়াবুরুজে কবরখানায় একরাশ হলুদ গোলাপ দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেন দীপক, তাঁর গুরু এবং পালক পিতাকে। কবরখানা থেকে বেরিয়ে গাড়িতে না উঠে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে লাগলেন চিরাগলাল। গাড়িটা পাশে পাশে যাচ্ছে। খানিকটা হেঁটে জাদুকর দেখলেন একটা ছোট জটলা, তার মধ্যে নানান জাদু আর মাদারির খেলা দেখাচ্ছে একটা ছোট্ট ছেলে। দেখছে যতো ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ের দল। অবাক হয়ে জাদুকর দেখছেন ছোটো ছেলেটার চোখ দুটো। কি অসম্ভব ঔজ্জ্বল্য চোখ দুটোয়!

খেলা শেষ হতেই ভিড় আলগা হয়ে গেল। দীপক এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘কি নাম তোর?’ পাশ থেকে আর একটা ছেলে উত্তর দিল ‘সল্লু সলমন’। যে ছেলেটা খেলা দেখাচ্ছিল সে এবার বললো, ‘খেলা দেখানোর সময় আমার নাম চমকলাল।’ চিরাগলাল চমকে উঠে হেসে শক্ত করে হাতটা চেপে ধরলেন চমকলালের। ‘চল, তোকে আমি ম্যাজিক শেখাবো আজ থেকে, আমার নাম… ‘ছেলেটা হেসে বলল,’ জানি তো! দ্যা গ্রেট চিরাগলাল।’

ওই দেখো! দেখতে পাচ্ছো? পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে অতীত আর ভবিষ্যত। পেছনের খাঁ সাহেবের সমাধিতে আজ গোলাপের গন্ধ ম ম করছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন