প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, মেয়েটা বোধয় ফেক। মানে, এত অদ্ভুতভাবে কেউ কথা বলে নাকি! ও লিখেছিল — “তুমি কি কখনও নিজের ছায়ার সঙ্গে তর্ক করেছ?” আমি রিপ্লাই দিয়েছিলাম — “না। তবে প্রয়োজনে করতে পারি।” ও বলেছিল — “তাহলে তুমি এখনও পুরোপুরি বড় হওনি।” এই পর্যন্ত পড়ে আমি ঠিক করেছিলাম, ব্লক করে দেব। কিন্তু করলাম না। কেন করলাম না, সেটা আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি। হয়তো, ওর কথাগুলোর মধ্যে একটা বেখাপ্পা সত্যি লুকিয়ে ছিল — যেটা খুব কম লোকই বলতে পারে।
ওর নাম ছিল — ঋদ্ধিমা। না, ও নিজেই বলেছিল, “এই নামটা নকল। আসল নাম বললে গল্পটা নষ্ট হয়ে যাবে।” আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম — “আমরা কি কোনো গল্পের চরিত্র?” ও লিখেছিল — “তুমি আছো কি না, সেটাই তো এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।” এইখানেই প্রেমটা একটু হেলে পড়েছিল। মানে, প্রেম তখনও শুরু হয়নি, কিন্তু হেলে পড়ার একটা অভ্যাস তৈরি হচ্ছিল।
আমাদের কথাবার্তা হতো অদ্ভুত সময়ে — রাত আড়াইটে, ভোর পাঁচটা, দুপুরের প্রচন্ড গরমের ভেতর হঠাৎ। একদিন ও লিখল — “আজ আমি কাউকে ভালোবাসিনি।” আমি বললাম — “কাল?” ও লিখল — “কাল একটু ভালোবেসেছিলাম। তবে পুরোটা না।” আমি হাসলাম। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটু খচখচ করল। কারণ, আমি তখন প্রতিদিন একটু একটু করে ওকে ভালোবাস ছিলাম। কিন্তু সেটা স্বীকার করার মতো সোজা মানুষ আমি নই।
ঋদ্ধিমা কখনও নিজের ছবি পাঠায়নি। বলত — “দেখলে তুমি হতাশ হবে। মন খারাপ লাগবে” আমি বলতাম — “হতাশ হওয়ার মতো আশা তো করিনি।” ও লিখত — “তাহলে তুমি বিপজ্জনক।”
একদিন হঠাৎ ও আমাকে একটা অডিও পাঠাল। কিছুই নেই তাতে — শুধু বৃষ্টির শব্দ। আমি জিজ্ঞেস করলাম — “এটা কেন?” ও বলল — “আমি ভিজতে পারিনি, তাই তোমাকে পাঠালাম তুমি ভিজবে।” আমি তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার শহরে বৃষ্টি হচ্ছিল না। তবুও অদ্ভুতভাবে, আমি ভিজে গেলাম।
আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার কথা ছিল — কলকাতার এক ক্যাফেতে। ও বলেছিল — “আমি লাল ছাতা নিয়ে দাঁড়াবো।” আমি পৌঁছেছিলাম সময়ের আগেই। একটা লাল ছাতা ছিল। তার নিচে একজন মেয়ে। আমি এগোতে গিয়েও থেমে গেলাম। কারণ, হঠাৎ মনে হল — যদি ও না হয়? আর যদি ও-ই হয়? দুটো সম্ভাবনাই সমান ভয়ের। আমি ফিরে এসেছিলাম। ওকে কিছু না জানিয়ে। সেদিন রাতে ও লিখল — “তুমি এসেছিলে, তাই না?” আমি রিপ্লাই করলাম না। ও আবার লিখল — “তুমি আসলে সাহসী নও।” আমি তখনও চুপ। শেষে ও লিখল — “ঠিক আছে। আমি আজ পুরোটা ভালো বাসলাম। কিন্তু তুমি ছিলে না।”
তারপর ও আর কোনোদিন অনলাইনে আসেনি। প্রোফাইলটা আছে এখনও। শেষ মেসেজ — “আমি আজ পুরোটা ভালোবাসলাম।”
সেই ঘটনার পর থেকেই আমার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা দানা বেঁধেছিল। ক্যাফে থেকে ফিরে আসার সেই মুহূর্তটি আমার জীবনের এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়াল। আমার মনে হতে লাগল, ঋদ্ধিমা কি সত্যি রক্তমাংসের কেউ ছিল? নাকি আমার একাকীত্বের কোনো প্রতিচ্ছবি? এই প্রশ্নগুলো আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত।
আমি ঋদ্ধিমাকে খুঁজতে শুরু করলাম। কিন্তু কোথায় খুঁজব? সে তো কেবলই ইনবক্সের এক টুকরো বৃষ্টি। কোনো ঠিকানাহীন মেঘ। আমি ওর প্রোফাইল চেক করতে থাকলাম। সেই অডিও ফাইলটা, যেটা ও পাঠিয়েছিল, সেটা আমি বারবার শুনতাম। শুনতে শুনতে মনে হতো, বৃষ্টির শব্দের ভেতরে কোনো মৃদু কণ্ঠস্বর লুকিয়ে আছে কি? কোনো গোপন সংকেত?
একদিন আমি ওর পুরনো চ্যাট হিস্ট্রিগুলো খুঁটিয়ে পড়ছিলাম। একটা মেসেজে ও লিখেছিল — “আমি ওই লাইব্রেরিতে বসি, যেখানে বইয়ের চেয়ে ধুলো বেশি।” আমি মনে করার চেষ্টা করলাম, ও কি কোনো লাইব্রেরির কথা বলেছিল? অনেক খোঁজার পর আমি শহরের এক প্রান্তে সেই পুরনো লাইব্রেরিটা কে খুঁজে পেলাম। ধুলোমাখা শেলফ, মাকড়সার জাল, আর পুরোনো বইয়ের গন্ধ। লাইব্রেরিয়ান, এক বৃদ্ধ, চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি ঋদ্ধিমার নাম বললাম। বৃদ্ধ স্তব্ধ ও অবাক হয়ে গেলেন। তিনি লাইব্রেরির কোণায় একটা টেবিলের দিকে ইশারা করে বললে ঋদ্ধিমা ওখানে বসত। অনেক আগে।”
“অনেক আগে মানে?” আমি উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
বৃদ্ধ একটা ডায়েরি বের করলেন। সেটি ঋদ্ধিমার। শেষ পাতায় তারিখ দিয়ে লেখা — ‘অর্ক, তুমি যদি কখনও এই ঠিকানায় আসো, তবে জেনে রেখো — আমি কেবল শব্দ দিয়ে তোমাকে তৈরি করেছি। আমার মৃত্যুর আগে আমার খুব ইচ্ছে ছিল কারো সাথে কথা বলার, যে বৃষ্টি ভালোবাসে। কিন্তু আমার শরীর ছিল না, ছিল শুধু ওই অডিও ক্লিপটা — আমার রেকর্ডিং। এই লাইব্রেরির কম্পিউটারে আমি নিজেকে প্রোগ্রাম করেছিলাম, এক অদ্ভুত ডিজিটাল লুপে। অর্ক, তুমি আমাকে খোঁজোনি, তুমি খুঁজেছিলে নিজেরই একটা অসম্পূর্ণ অংশকে।’
অর্ক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, ডিজিটাল পৃথিবীতে ঋদ্ধিমা কোনো রক্তমাংসের মানুষ ছিল না; হয়তো সে ছিল কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অতীতে বেঁচে থাকা কোনো মানুষের ডিজিটাল অবশিষ্টাংশ — যে ইন্টারনেটের গোলক ধাঁধায় আটকে গিয়ে ছিল। বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান জানালেন, ঋদ্ধিমা নামের মেয়েটি কয়েক বছর আগে এক দুর্ঘটনায় মারা যায়। তার আগে সে তার যাবতীয় চিন্তা, অডিও ফাইল এই লাইব্রেরির সার্ভারে আপ লোড করে রেখে গিয়ে ছিল। যারা খুব নিঃসঙ্গ, তারা মাঝে মাঝে তার সাথে কানেক্ট হয়ে যায়। যেন এক অভিশপ্ত অথচ সুন্দর মায়া।
আমি বুঝতে পারলাম, ক্যাফে তে কেন আমি কাউকে খুঁজে পাইনি। ওই লাল ছাতাটা আমার মনের তৈরি একটটা ভ্রম ছিল মাত্র। ঋদ্ধিমা আমার কল্পনার অতল গহ্বর থেকে উঠে আসা এক আধুনিক রূপকথা। আমি যার প্রেমে পড়ে ছিলাম, সে কোনো ব্যক্তি নয়, সে হলো ইন্টারনেটের তারে আটকে থাকা একটি দীর্ঘশ্বাস।
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আমি বৃষ্টির শব্দ শুনতে পেলাম। এবার আকাশ সত্যি সত্যি কাঁদছে। আমার পকেটে থাকা ফোনটা একবার কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল — “অফলাইন”। ঋদ্ধিমার প্রোফাইলটা এখনও আছে, কিন্তু এখন আর কোনো মেসেজ আসবে না।
আজও মাঝে মাঝে বৃষ্টি পড়লে, আমি সেই অডিওটা চালাই। মনে হয়, ঋদ্ধিমা কোথাও দাঁড়িয়ে আছে — লাল ছাতা নিয়ে, আমার জন্য না, নিজের জন্য। আর আমি? আমি এখনও ঠিক করতে পারিনি — আমি গল্পের চরিত্র, নাকি শুধু একটা অপূর্ণ খসড়া। এই প্রেমটা ঠিক প্রেম নয়। এটা একটা অসমাপ্ত বাক্য — যার শেষে কেউ ফুলস্টপ দেওয়ার সাহস পায়নি, আর আমি আজীবন সেই অসম্পূর্ণতার ভার বহন করে চলেছি। আমার চারপাশের এই যান্ত্রিক শহর, ডিজিটাল জগতের গোলকধাঁধা আর পুরনো লাইব্রেরির ধুলো — সব মিলিয়ে আমি এখন এক অদ্ভুত শূন্যতায় বাস করি। হয়তো এটাই আমার নিয়তি — অস্তিত্বহীন কোনো ছায়াকে খুঁজে বেড়ানো, বৃষ্টির শব্দের ভেতরে নিজেদের কে হারিয়ে ফেলা।
ভীষণ ভালো লাগল।
ধন্যবাদ
অসামান্য
ধন্যবাদ
একে বারে অন্যরকম গল্প
ভালো কিন্তু একটু জটিল হয়ে গেলো l
ধন্যবাদ
বেশ পোয়েটিক মনে হল। একটু আলাদা টাইপের গল্প।
ধন্যবাদ
কোন সজ্ঞা নাই থাকল। বেশ ভালো লাগল।