খুঁটিপুজোর বিবরণ শ্রদ্ধেয় চিন্তাহরণ চক্রবর্তীর ‘হিন্দুর আচার-অনুষ্ঠান’ বইয়ে নেই৷ নেই পল্লব সেনগুপ্তর বই ‘পূজাপার্বণের উৎসকথা’-তেও। বিশ্বকোষ অভিধানেও নেই। তাই এই অনুষ্ঠানের পৌরাণিক ভিত্তি নেই বলেই মনে হয়।
প্রতি বছর রথযাত্রার দিন বেশিরভাগ পুজোপ্যান্ডেলের খুঁটিপুজো হয়। এদিন পুজো করতে না পারলে, পরের অন্যান্য শুভ দিনগুলিকে বেছে নিতে হয়। খুঁটিপুজোর মাধ্যমেই দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়ে। তাই বলা যায়, শুরু হল এবছরের দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। আর ঠিক মাস চারেক পরেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। বিগত কয়েক দশক ধরে জাকজমক করে খুঁটি পুজো উৎসব পালন করা একটা ট্রেন্ড। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ঐতিহ্য — কাহিনি।
খুঁটি পুজোর ধারণাটি এসেছে প্রায় শত বছরের পুরনো এক রীতি থেকে। আগে এত ক্লাব, থিম, প্রতিযোগিতার পিছনে ছোটাছুটি ছিল না। পুজো মানেই ছিল বনেদি বাড়ির সাবেকি প্রতিমা। আর সেই সময় মূলত বাড়ির ঠাকুর দালানে গড়া হত প্রতিমা। অনেকেই রথযাত্রার শুভ দিনে, মাটির প্রতিমার কাঠের ফ্রেমকে (কাঠামো) পুজো করতেন। যেটি কাঠামো পুজো বলেই পরিচিত। এরপর একটু একটু করে গড়ে উঠত দুর্গা প্রতিমা।
এক সময় পুজো প্যান্ডেল মানে ছিল বাঁশ ও রঙিন কাপড়ের তৈরি। ধীরে ধীরে সেই বাঁশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে থার্মোকল, চট, প্লাস্টিক, কাঠ, পাট প্লাস্টার অফ প্যারিস, সিমেন্ট আরও কত রকমারি সামগ্রী। কলকাতার হেভিওয়েট পুজো প্যান্ডেলগুলোর পাশাপাশি, ছোটখাটো প্যান্ডেলেও থাকে থিমের নয়া চমক৷ এখন তো বুর্জ খলিফার আদলে গগনচুম্বী প্যান্ডেলও দেখা যাচ্ছে।

কালীপ্রসন্ন সিংহ-র ‘হুতোম পেঁচার নক্সা’য় ‘দুর্গোৎসব’ পর্বের যে বিবরণ পাচ্ছি তাতেও কোথাও খুঁটিপুজোর বিবরণ নেই৷ দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এই বিশেষ অনুষ্ঠানটির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত কেউ দেননি।
কিন্তু আইডিয়াটি এল কোথা থেকে? হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষে এই ‘খুঁটিপুজো’ শব্দবন্ধের উল্লেখ নেই৷ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাংলা অভিধানেও নেই এর উল্লেখ৷ তবে বঙ্গীয় শব্দকোষে ‘খুঁটিগাড়ী’ বলে একটা কথা আছে৷ নদীর তীরে নৌকা বাঁধতে হলে জমির মালিককে দেয় কর বা শুল্ককে ‘খুঁটিগাড়ি’ বলা হত৷ তাহলে কি প্রাচীন কুমারটুলি থেকে গঙ্গাবক্ষে নৌকাযোগে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার জন্য কুমারটুলির গঙ্গাতীরে খুটিবাঁধার চল ছিল একসময়? এজন্য ভূস্বামীকে কিছু টাকাকড়ি বা কর দিতে হত? এই খুঁটিকে পুজো করার রেওয়াজও ছিল? যাতে একজনের নৌকা বাঁধার খুঁটিকে আর-একজন অস্বীকার করতে না পারে? কে জানে!
এবার একটি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার চেষ্টা করা যাক।
বাংলা ভাষায় ‘কোটি’র অর্থ শীর্ষ বা অগ্র। কোটি মানে উৎকর্ষও হয়।
‘কোটিপূজা’ থেকেও অপভ্রংশে খুঁটিপুজো আসতে পারে৷ বৈদিক দেবতাদের উচ্চকোটির স্থান বা আসনটিকেই যেন পূজা করা হয় খুঁটিপুজোয়। যে লম্বা খুঁটিতে কাপড় জড়িয়ে সেলিব্রিটি নায়ক-নায়িকারা ধরে সেটিকে খাড়া করেন সবাই মিলে, তার উচ্চতম বিন্দুটিই কোটি। কোটিকেই পূজা করা হয় প্রতি বছর। সেখানেই যে দেবতা আসনগ্রহণ করবেন। দণ্ডটি উপলক্ষমাত্র।
তেত্রিশ বৈদিক দেবতা শাস্ত্রস্বীকৃত। তাঁদের স্মরণ করেই দেবী দুর্গার পূজা শুরু করার বিধি আছ শাস্ত্রে।
শাস্ত্রে আছে — ‘কোটিপূজা ফলম লভেৎ তৎভালোৎপন্ন কৈবল্যম্’৷

শিবপুরাণেও কোটিপূজার উল্লেখ পাওয়া যায়, —
“সামন্তানাং জয়ে চৈব কোটিপূজা প্রশস্যতে
রাজামযুতসংখ্যং চ বশীকরণকর্মণি।”
উড়িষ্যাবাসী কবি সারলা দাস লিখেছেন, —
‘কলিকাল ধ্বংসন ভোগেণ কোটিপূজা’।
প্রণমিতে খটই দেবাদিদেব কপিলেশ্বর মহারাজা।’
(দাণ্ডিবৃত্ত ছন্দে লেখা)
স্কন্দপুরাণেও আছে কোটিপূজার উল্লেখ।

বেলুড় মঠে খুঁটিপুজো
কোটিপূজা তাই পৌরাণিক দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের আগে তাঁর ও তাঁর পুত্রকন্যাদের স্থাপনের নিমিত্ত বৈদিক দেবতাদের উচ্চকোটির আসনগুলিকে প্রতি বছর পূজা করে নেওয়ার অনুষ্ঠান।
অর্থাৎ পৌরাণিক দেবী দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পৌরাণিক দেবতা কার্তিক ও গণেশের আগমনকে নির্বিঘ্ন করতে কোটিপূজার মাধ্যমে বৈদিক দেবতাদের স্মরণ করা হয় এই অনুষ্ঠানটিতে।
কোটিপূজাই অপভ্রংশে খুঁটিপুজো হয়ে গেছে।
কোটিপূজা > কুটিপূজা > খুটিপূজা > খুঁটিপুজো।
এবং আমরাও খুঁটির পেছনে দৌড়চ্ছি। বিভিন্ন নামকরা পুজোমণ্ডপে সেলিব্রিটিদের দৌড়ঝাঁপ ও তাঁদের আদর-আপ্যায়ন দেখে মনে পড়ে যায় সেই প্রবাদটি, — ‘মেড়া লড়ে খুঁটির জোরে’!