বুধবার | ১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | রাত ১১:৪১
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিউরাল কারেন্সি’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কালীঘাট পটচিত্রের ইতিকথা : মনোজিৎকুমার দাস খোলাখাম : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জামা, জামি, জামাইষষ্ঠী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আবশ্যক : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (শেষ পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (প্রথম পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজুরিকা চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘একাকিনী’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটির অনবদ্য সুরঞ্জলি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী : ফারজানা নাজ শম্পা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিউরাল কারেন্সি’

অয়ন মুখোপাধ্যায় / ৯০ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

মহীতোষ বাবুর বয়স বাহাত্তর। এই বয়সে মানুষ সাধারণত ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করে কাটাতে ভালো বাসে। কিন্তু মহীতোষ বাবুর সমস্যাটা ঠিক উল্টো — তিনি তাঁর স্মৃতিগুলো থেকে মুক্তি পেতে চান।

কলকাতার এক কোণে, যেখানে পুরনো দিনের লাল ইটের বাড়ি গুলোর গায়ে শ্যাওলা জমেছে, তারই একটির দোতলায় মহীতোষ বাবুর বাস। একা মানুষ। এককালে বড় সরকারি অফিসে চাকরি করতেন, টাকা-পয়সার কোনো অভাব নেই। কিন্তু রাতের পর রাত তাঁর ঘুম আসে না। চোখের পাতা এক করলেই একটা জ্বলন্ত গাড়ির ছবি ভেসে ওঠে। কানে আসে এক কিশোরীর আর্তনাদ। সাতাশ বছর আগের এক বর্ষণমুখর রাতে মহীতোষ বাবুর গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা মেরেছিল একটা ল্যাম্প পোস্টে। সেই দুর্ঘটনায় তিনি বেঁচে গেলেও তাঁর বারো বছরের মেয়ে তুলি আর স্ত্রী অনিতা শেষ হয়ে গিয়েছিল।

এই অপরাধবোধ মহীতোষ বাবুকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। ঠিক তখনই তিনি খবর পেলেন ‘বিস্মরণ’ নামের একটা অদ্ভুত স্টার্ট-আপের। শহরের এক বিলাসবহুল বহুতলের পনেরো তলায় তাদের অফিস। বিজ্ঞা পনে বড় বড় করে লেখা ছিল: “আপনার যে স্মৃতি আপনাকে বাঁচতে দিচ্ছে না, তা আমাদের কাছে বিক্রি করে দিন। আমরা আপনাকে দেব এক নতুন, ভারমুক্ত জীবন।”

লিফটের বোতাম টিপে মহীতোষ বাবু যখন পনেরো তলায় পৌঁছালেন, তখন তাঁর বুকটা কাঁপছে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একজন তরুণ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাল। তাঁর মুখ যান্ত্রিক কিন্তু ঠোঁটে একটা মিষ্টি হাসি। “নমস্কার। আমি ডক্টর আর্য। আপনিই মহীতোষ চ্যাটার্জি?” মহীতোষ বাবু মাথা নাড়লেন। ডক্টর আর্য তাঁকে একটা কাচের কেবিনে নিয়ে গেলেন। সেখানে কোনো ডাক্তারী সরঞ্জাম নেই, কেবল একটা নরম সোফা আর একটা অদ্ভুত আকৃতির রুপোলি রঙের হেলমেট।

“আমাদের পদ্ধতিটা খুব সহজ, মহীতোষ বাবু,” আর্য বলতে শুরু করল। “আমরা কোনো ওষুধ দিই না। আমাদের ‘মেমোরি এক্সট্রাক্টর’ আপনার মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরাল নেটওয়ার্ক থেকে সেই নির্দিষ্ট স্মৃতির বৈদ্যুতিন তরঙ্গ সম্পূর্ণ আলাদা করে নিতে পারে। আপনি একবার এই হেলমেটটা মাথায় পরবেন, আর যে ঘটনাটা ভুলতে চান, সেটা মনে মনে খুব তীব্রভাবে ভাববেন। আমাদের মেশিন সেটাকে আপনার মস্তিষ্ক থেকে মুছে একটা ডিজিটাল মেমোরি ড্রাইভে বন্দি করে নেবে।”

মহীতোষ বাবু একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলেন, “আর এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া?” ডক্টর আর্য হাসল, “তেমন কিছু না। শুধু আপনার মাথায় একটা শূন্যস্থান তৈরি হবে। ওই সময় টার কথা আপনি আর কখনো মনে করতে পারবেন না। যেন ঘটনাটা আপনার জীবনে কখনো ঘটেইনি। আর হ্যাঁ, আমাদের কোম্পানি এই স্মৃতির বিনিময়ে আপনাকে একটা বড় অঙ্কের টাকাও দেবে। আমরা এই স্মৃতি গুলো কে গবেষক দের কাছে বিক্রি করি, যারা মানুষের মানসিক ট্রমা নিয়ে কাজ করছেন।”

“আমি টাকা চাই না, ডক্টর আর্য। আমি শুধু শান্তি চাই,” মহীতোষ বাবুর গলা বুজে এল। হেলমেটটা মাথায় পরার পর মহীতোষ বাবুকে বলা হলো সাতাশ বছর আগের সেই রাতের কথা ভাবতে। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। সেই বৃষ্টির শব্দ, গাড়ির ব্রেক কষার আর্তনাদ, কাচ ভাঙার আওয়াজ… আর ঠিক তখনই হেলমেটের ভেতর থেকে একটা মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। মহীতোষ বাবুর মনে হলো তাঁর মস্তিষ্কের একটা অংশ যেন কেউ আলতো করে টেনে ছিঁড়ে নিচ্ছে। একটা তীব্র শূন্যতা, আর তারপর… অন্ধকার।

যখন তাঁর জ্ঞান ফিরল, তখন ডক্টর আর্য তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে জল বাড়িয়ে দিচ্ছেন। “কেমন লাগছে?” আর্য জিজ্ঞেস করল। মহীতোষ বাবু চারপাশটা দেখলেন। তাঁর মাথাটা খুব হালকা লাগছে। একটা অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি মনে করার চেষ্টা করলেন — তাঁর স্ত্রী আর মেয়ের কথা? আশ্চর্য! তিনি মনে করতে পারছেন না। তিনি জানেন তাঁর একটা পরিবার ছিল, কিন্তু তারা কীভাবে চলে গেছে, সেই দুর্ঘটনার কোনো ছবি তাঁর মাথায় নেই। শুধু মনে আছে, তারা এখন আর নেই। কোনো অপরাধবোধ ও নেই, কোনো কান্না নেই। “অদ্ভুত!” মহীতোষ বাবু ফিসফিস করে বললেন, “আমার আর কষ্ট হচ্ছে না।”

পরের এক মাস মহীতোষ বাবুর জীবনটা খুব শান্তিতে কাটল। কোনো অপরাধ বোধ নেই, বিষণ্ণতা নেই। কিন্তু আস্তে আস্তে একটা অন্য সমস্যা দেখা দিল। একদিন সকালে উঠে তিনি বসার ঘরের দেয়ালে টাঙানো একটা পুরনো ছবির দিকে তাকালেন। ছবিতে সাতাশ-আটাশ বছরের এক তরুণী আর একটা ছোট্ট মেয়ে। মহীতোষ বাবু চিনতে পারলেন এরা তাঁর স্ত্রী অনিতা আর মেয়ে তুলি। কিন্তু ছবিটার দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে কোনো অনুভূতি জাগল না। কোনো ভালোবাসা, কোনো মায়া, কোনো দুঃখ — কিছুই না।

মহীতোষ বাবু চমকে উঠলেন। তিনি রান্নাঘরে গেলেন, যেখানে অনিতার হাতের রান্নার মশলার গন্ধ এখনো যেন লুকিয়ে আছে। কিন্তু তাঁর মন সম্পূর্ণ নির্বিকার। তিনি বুঝতে পারলেন, ‘বিস্মরণ’ কোম্পানি শুধু তাঁর দুর্ঘটনার স্মৃতিটুকু মুছে দেয়নি। দুর্ঘটনার স্মৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা অনিতা আর তুলির প্রতি তাঁর যাবতীয় আবেগ, ভালোবাসা আর অনুভূতির সুতোটা কেও ছিঁড়ে দিয়েছে।

মহীতোষ বাবু আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। আয়নায় এক বৃদ্ধ কে দেখা যাচ্ছে, যার চোখ দুটো সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন, মৃত মাছের চোখের মতো। তিনি বুঝতে পারলেন, যে কষ্টের হাত থেকে তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন, সেই কষ্টটাই আসলে তাঁকে মানুষ করে রেখেছিল। তাঁর মেয়ের জন্য যে চোখের জল তিনি ফেলতেন, সেটাই প্রমাণ করত যে তিনি একজন বাবা। আজ তিনি শুধু একটা চলন্ত শরীর, যার ভেতরে কোনো মন নেই। “আমি এ কী করলাম!” মহীতোষ বাবু ডুকরে কেঁদে উঠতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। কারণ কাঁদার মতো কোনো আবেগই তাঁর ভেতরে আর অবশিষ্ট নেই।

পরদিন সকালে মহীতোষ বাবু আবার ছুটলেন ‘বিস্মরণ’-এর অফিসে। তাঁর হাত কাঁপছে, চোখে এক তীব্র আর্তি। ডক্টর আর্য তাঁকে দেখে কিছুটা অবাক হলো। “কী ব্যাপার, মহীতোষ বাবু? কোনো সমস্যা?” মহীতোষ বাবু হাহাকার করে উঠলেন, “আমার স্মৃতিটা ফিরিয়ে দিন, ডক্টর আর্য। আমি আমার কষ্টটা ফেরত চাই।”

আর্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল “আমি দুঃখিত মহীতোষ বাবু। আমাদের চুক্তিটা তে স্পষ্ট লেখা ছিল, একবার স্মৃতি মুছে ফেললে তা আর ফেরত দেওয়া যায় না। ওই নিউরাল পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। তা ছাড়া, আপনার ওই স্মৃতিটা ইতিমধ্যে অন্য এক জায়গায় বিক্রি হয়ে গেছে।” মহীতোষ বাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন। “বিক্রি হয়ে গেছে? কার কাছে?”

“আমাদের এখানে একটা অন্য বিভাগ আছে,” আর্য নিচু গলায় বলল। “এমন অনেক মানুষ আছেন যারা নিজেদের জীবনে কোনোদিন কোনো তীব্র আবেগের মুখোমুখি হননি। তারা খুব একাকী, অনুভূতিহীন জীবন কাটান। তারা আমাদের কাছ থেকে অন্যের ফেলে দেওয়া স্মৃতি কিনে নিজেদের মাথায় প্রতিস্থাপন করেন। যাতে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও তারা অনুভব করতে পারেন জীবন কতটা গভীর হতে পারে। আপনার স্মৃতিটা যিনি কিনে ছেন, তিনি এই শহরেরই এক কোটিপতি ব্যবসায়ী। নাম সমরেশ সান্যাল।”

মহীতোষ বাবু আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। তিনি সমরেশ সান্যালের ঠিকানা জোগাড় করে বেরিয়ে পড়লেন। সমরেশ সান্যালের প্রাসাদোপম বাড়ির ড্রয়িংরুমে মহীতোষ বাবু যখন ঢুকলেন, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। সমরেশ বাবুর বয়স মহীতোষ বাবুর চেয়ে কিছুটা কম, কিন্তু তাঁর চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি। মহীতোষ বাবু সরাসরি কাজের কথায় এলেন। “সমরেশ বাবু, আপনি কি সম্প্রতি ‘বিস্মরণ’ থেকে কোনো স্মৃতি কিনেছেন?”

সমরেশ বাবু একটু চমকে উঠলেন, তারপর ম্লান হাসলেন। “হ্যাঁ, কিনেছি। একটা দুর্ঘটনার স্মৃতি। কিন্তু আপনি তা জানলেন কী করে?” মহীতোষ বাবু উত্তর দিলেন, “কারণ ওই স্মৃতিটা আমার। আমার স্ত্রী আর মেয়ের মৃত্যুর স্মৃতি। আমি ওটা ফেরত চাই।” সমরেশ বাবু সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। তাঁর চোখে জল চিকচিক করে উঠল। “আপনি জানেন না মহীতোষ বাবু, আপনি কী অমূল্য জিনিস ফেলে দিয়ে ছিলেন। আমি সারাজীবন শুধু টাকা কামিয়েছি। কোনো দিন কাউকে ভালো বাসিনি, পরিবার তৈরি করিনি। আমার জীবনটা ছিল একটা মরুভূমি।”

“কিন্তু আপনার এই স্মৃতিটা মাথায় নেওয়ার পর…” সমরেশ বাবুর গলা বুজে এল। “গত এক সপ্তাহ ধরে আমি প্রতি রাতে ওই কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আমি অনুভব করতে পারছি এক বাবার বুকফাটা আর্তনাদ। আমি প্রথমবার বুঝতে পেরেছি ভালোবাসা কী, কাউকে হারা নোর যন্ত্রণা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এই তীব্র দুঃখটাই আমা কে বুঝিয়ে দিয়েছে আমি বেঁচে আছি। আমি এটা ফেরত দেব না।” মহীতোষ বাবু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। একজন মানুষ অন্যের দুঃখকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাইছে, কারণ তার নিজের কোনো অনুভূতি নেই!

“কিন্তু সমরেশ বাবু, ওই দুঃখটা তো আমার!” মহীতোষ বাবু মরিয়া হয়ে বললেন। “আমার ভালোবাসার শেষ চিহ্ন ওটা। আপনি ওটা রাখলে আমি যে ভেতরে ভেতরে মরে যাব!” সমরেশ বাবু কঠিন গলায় বললেন, “আপনি তো মরবেন না মহীতোষ বাবু, আপনি শান্তিতে থাকবেন। শান্তি আর শূন্যতার মধ্যে যে তফাত আছে, তা আপনি এখন বুঝতে পারছেন। কিন্তু আমি এই প্রথম কিছু অনুভব করছি। আমি এই অনুভূতিটা ছাড়ব না।”

মহীতোষ বাবু বাড়ি ফিরে এলেন। তাঁর মনে হলো তিনি এক গভীর গোলক ধাঁধায় জড়িয়ে পড়েছেন। রাতের অন্ধকারে তিনি একা বসে ভাবলেন। স্মৃতি তো আসলে কোনো বস্তু নয় যে কেড়ে নেওয়া যায়। স্মৃতি হলো এক অদৃশ্য সুতো যা মানুষকে মানুষের সাথে বেঁধে রাখে। সমরেশ বাবু এখন সেই সুতোটা ধরে বসে আছেন। পরদিন সকালে মহীতোষ বাবু আবার সমরেশ বাবুর বাড়িতে গেলেন। তবে এবার তিনি একা যাননি, সাথে নিয়ে গেছেন তাঁর পুরনো অ্যালবামের কিছু ছবি আর তুলির আঁকা একটা ডায়েরি।

সমরেশ বাবু তাঁকে দেখে কিছুটা বিরক্ত হলেন। “আপনাকে তো বলেছি, আমি ওই স্মৃতি ফেরত দেব না।” মহীতোষ বাবু শান্তভাবে বললেন, “আমি জানি। আমি ওটা ফেরত নিতে আসিনি। আমি একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। আপনি ওই দুর্ঘটনার স্মৃতিটা রেখেছেন, কিন্তু আপনি তো অনিতাকে চিনতেন না, তুলিকে ভালোবাসতেন না। তাই আপনার দুঃখটা অসম্পূর্ণ। আসুন, আমরা আমাদের জীবনটা ভাগ করে নিই। আপনার কাছে আছে আমার দুঃখের স্মৃতি, আর আমার কাছে আছে ওদের সাথে কাটানো আনন্দের কিছু আবছা মুহূর্ত আর এই ছবিগুলো।”

মহীতোষ বাবু ছবিগুলো দেখাতে লাগলেন — তুলির প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন, অনিতার জন্মদিনে মহীতোষ বাবুর গান গাওয়ার চেষ্টা। তিনি বললেন, “আমি রোজ এখানে আসব। আমরা একসাথে বসব। আমি আপনাকে ওদের গল্প শোনাব। আপনি আপনার মাথায় থাকা সেই দুঃখের অনুভূতির সাথে আমার এই আনন্দের গল্পগুলো কে মিলিয়ে নেবেন। আর তার বদলে, আপনি যখন সেই তীব্র দুঃখটা অনুভব করবেন, তখন আমাকে একটু ছুঁয়ে দেবেন। আপনার স্পর্শের মাধ্যমে হয়তো আমার ভেতরেও সেই ফেলে আসা অনুভূতির একটু রেশ ফিরে আসবে।”

সমরেশ বাবু ছবিগুলোর দিকে তাকালেন। তারপর মহীতোষ বাবুর চোখের দিকে তাকালেন। সেখানে কোনো রাগ নেই, আছে এক অনন্ত আকুলতা। সমরেশ বাবু মহীতোষ বাবুর হাতটা শক্ত করে ধরলেন। “তাই হবে মহীতোষ বাবু। আজ থেকে আমরা দুজনে মিলে ওদের মনে রাখব।”

শহরের এক কোণে, সেই পুরনো লাল ইটের বাড়ির বারান্দায় এখন প্রায়ই বিকেলে দু’জন বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখা যায়। একজনের চোখে অতীতের তীব্র বিষণ্ণতা, আর অন্যজনের চোখে সেই বিষণ্ণতা কে বুঝে নেওয়ার এক অদ্ভুত তৃপ্তি। তারা দুজনে মিলে একটা সম্পূর্ণ মানুষের জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না, সে শুধু এক মন থেকে অন্য মনে তার ঠিকানা বদলে নেয়। আর এই ঠিকানার বদলই প্রমাণ করে যে, কষ্ট হলেও মানুষ আসলে ভালোবেসেই বাঁচতে চায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন