
আদালতে মায়াবী ছলনা
‘দ্য রিপোর্টাস কালেকটিভ’ পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল রেকর্ড আর অভ্যন্তরীণ ডেটা খতিয়ে দেখেছেন। তাঁদের সফটওয়্যার কিভাবে চলছে তা পর্যবেক্ষণ করেছে। ৫ জন বিধানসভা স্তরের নির্বাচন অফিসারের সঙ্গে কথা বলেছেন। রাজ্যস্তরের একজন সোর্স আর ডজনখানেক বুথ-লেভেল অফিসারের সঙ্গে আলাপ করেছেন। এসব করে বোঝার চেষ্টা করেছেন কীভাবে নির্বাচন কমিশন শেষমেশ রাজ্যের মোট ভোটারদের ১৮ শতাংশেরই বেশি মানুষকে আবার নতুন করে তাদের পরিচয় আর ভোট দেওয়ার অধিকার প্রমাণ করার জন্য লাইনে দাঁড়াতে ডেকে পাঠিয়েছেন।
‘দ্য রিপোর্টাস কালেকটিভে’র এই পর্যবেক্ষণের প্রতিবেদন (২৯.০১.২৬) তৈরি করেছেন আয়ূষী কর। তিনি বলেছেন যে নির্বাচন কমিশন ভুল বুঝিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টকে। কমিশন কোর্টকে বলেছিলেন, ‘কোন অটোমেটেড নোটিশ তৈরি হয় না …. ই-আর-ও-রা মন দিয়ে দেখে সই করেন।’
আয়ুষী করের প্রতিবেদন বলছে : সুপ্রিম কোর্টে কমিশন যা দাবি করেছেন, হয়েছে ঠিক তার বিপরীত। এখানে ব্যাপকভাবে নোটিশগুলো তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয়ভাবে, পরীক্ষা-না-হওয়া অ্যালগরিদম দিয়ে। কমিশন এগুলিকে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি বলে উল্লেখ করেছেন।
ই-আর্-ও-দের প্রতিদিন হাজার হাজার এমন কেস রিভিউ করতে হচ্ছে, তাই তাঁদের অন্য কোন উপায় থাকছে না। কমিশনের সফটওয়্যার যাঁদের সন্দেহজনক বলে ফ্ল্যাগ করছে, তাঁদের লক্ষ লক্ষ নোটিশে মাত্র ২ সপ্তাহের মধ্যে যান্ত্রিকভাবে সই করে দিতে হচ্ছে। কমিশন ২০০২ সালের ভোটার তালিকার কাগজের রেকর্ড ডিজিটাইজ করেছেন। তখন বেশিরভাগ রেকর্ড বাংলায় ছিল। কম্পিউটারের অপরীক্ষিত অ্যালগরিদম দিয়ে সেগুলির ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে। তারপর আর একটা অ্যালগরিদম দিয়ে ২০০২ সালের ডিজিটাইজড তালিকার তুলনা করা হয়েছে। সফটওয়্যার ১ কোটি ৩১ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে সন্দেহজনক বলে চিহ্নিত করেছে।
রিভিশন প্রক্রিয়ার মাঝপথে যে সফটওয়্যার প্রোটোকল তাড়াহুড়ো করে চালু করা হয়েছিল তা যে ভুলে ভরপুর ছিল সে কথা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের অফিস থেকে স্বীকার করা হয়। এতে ভয়ঙ্কর পরিমাণ ভোটারদের ফ্ল্যাগ করা হয়ে গিয়েছিল। এই ভুল ঠিক করার জন্য নির্বাচন কমিশন প্রথম কয়েক সপ্তাহের জন্য স্থানীয় নির্বাচনী আধিকারিক আর বুথ-লে্ভেল কর্মীদের ছোটখাটো ভুলগুলিকে গুরুত্ব না দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। কিন্তু কমিশন তবুও নতুন নতুন ফিল্টার আর ক্রাইটেরিয়া সফটওয়্যারে ঢোকাতে থাকলেন সন্দেহজনক ভোটারদের চিহ্নিত করার জন্য।
কাগজে-কলমে নির্বাচনী আধিকারিকদের বলা হয়েছিল মন দিয়ে বিবেচনা করে নোটিশ পাঠানোর আগে সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু ডেডলাইনের অসম্ভব চাপে স্থানীয় নির্বাচনী আধিককারিকেরা কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। এদিকে ই-সি-আই-র কনস্টিটুয়েন্সি- লেভেল আধিকারিকরা ই-সি-আই সফটওয়্যারে যে যে বাটন দরকার টিপে দিলেন, বাল্কে নোটিশ প্রিন্ট করলেন, তারপর একসঙ্গে সাইন করে দিলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী দফতরের একজন সিনিয়র আধিকারিকের বক্তব্য, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বলে যে অসংখ্য ভোটারকে রেড-ফ্ল্যাগ করা হয়েছে, সেই বিপুল সংখ্যার জন্যই এখন আর ছোটখাটো ডিসক্রিপ্যান্সি থাকা ভোটারদের ফিল্টার থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ই-সি-আই-এর অ্ভ্যন্তরীণ ডেটা পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে ২৪ জানুয়ারি (২০২৬) পর্যন্ত একটা বিশাল প্রশাসনিক ব্যাকলগ তৈরি হয়েছে। ১.৫ কোটিরও বেশি সমন নোটিশ তৈরি করা হয়েছে; কিন্তু আধিকারিকরা শুধু ৯৫.৩৯ লক্ষ পৌঁছে দিয়েছেন। ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৩০ লক্ষ ভোটার শুনানিতে হাজির হয়েছেন।
এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার এক মাস পরেও কমিশন পরিকল্পিত শুনানির মাত্র ২০% শেষ করতে পেরেছেন।
যা গেছে তা যাক?
৭ এপ্রিল, ২০২৬। ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে ৯১ লক্ষ নাম। ‘বিচারাধীন’ ৬০ লক্ষের মধ্যে অবৈধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনকে। ১৬ ডিসেম্বর (২০২৫) প্রকাশিত খসড়া তালিকায় বাদ যায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জনের নাম। ২৮ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) প্রকাশিত প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় বাদ পড়েন আরও ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জন। ৬ এপ্রিল (২০২৬) যে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে অবৈধ বলা হয়েছে ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনকে। ফলে মোট ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৪৫ জনের নাম বাদ পড়ল। পরিসংখ্যান বলছে, SIR-এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত এ রাজ্যের ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯ জন। যোগ-বিয়োগের পর এই মুহুর্তে রাজ্যের বৈধ ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৭৭ লক্ষ ২০ হাজার ৭২৮ জন। এই ৯১ লক্ষ নাম বাদ নিয়ে ইতিমধ্যেই চড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শুনতে চান নি বিরোধীদের কথা। প্রকারান্তরে অপমান করেছেন। কিন্তু এর মধ্যে একটা কাকতালীব মিল দেখা যাচ্ছে। তখনকার বিরোধী দলনেতাসহ অন্যান্য বিজেপি নেতারা ‘রোহিঙ্গা’, ‘অনুপ্রবেশকারী’দের যে সংখ্যার কথা বলছিলেন, তার সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া নামের সংখ্যার ঘনিষ্ঠ মিল আছে। মনে হয় সবটাই কাকতালীয় নয়।
কত সেনা চলেছে সমরে
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে অভূতপূর্ব মাত্রায় কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (CRPF) করা হয়েছিল। ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে কোন একটি রাজ্যে একক নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটিই ছিল সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
দুই দফায় অনুষ্ঠিত (২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল) এই নির্বাচনে সর্বমোট রেকর্ড ২৫৫০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে প্রথম দফায় ২৪০৭ কোম্পানি ও দ্বিতীয় দফায় ২৩২১কোম্পানি উপস্থিত ছিল।
নির্বাচনের এক মাস আগে ১ মার্চ থেকে ৪৮০ কোম্পানি চলে আসে রাজ্যে। তারা শুরু করে দেয় রুট মার্চ। মনে হয় যেন যুদ্ধের পরিস্থিতি। যুদ্ধই তো। করতেই হবে বঙ্গ জয়। প্ল্যান-এ ব্যর্থ হলে প্ল্যান-বি, প্ল্যান-বি ব্যর্থ হলে প্ল্যান-সি, প্ল্যান-সি অসফল হলে প্ল্যান-ডি। চাণক্য-সংহিতায় ছকে নেওয়া হয়েছিল এসব। এমন কি নির্বাচনোত্তর যুদ্ধের কথা ভাবা হয়েছিল।
৪ মে ফলাফল ঘোষণার পরেও রেখে দেওয়া হয় ৭০০ কোম্পানি অর্থাৎ ৭০,০০০কেন্দ্রীয় বাহিনীর কর্মীকে, এর মধ্যে ৫০০ কোম্পানি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আর ২০০ কোম্পানি ইভিএম পাহারা দেবার জন্য।
বন্দুকধারী সেনাদের বাইরে ছিলেন নানা ছদ্মবেশী সেনা।
নির্বাচনের ঠিক আগে এলেন নতুন রাজ্যপাল। বদলে দেওয়া হল অনেক পুরাতন আধিকারিককে। এলেন নতুন আধিকারিকরা। সবাই মিলে হাত লাগালেন নির্বাচন যজ্ঞে।