| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে নয়া পুঁজিবাদ : সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (ষষ্ঠ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (পঞ্চম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার হাসানের ইতিহাস ও বর্তমান ছুঁয়ে : নন্দিনী অধিকারী গান্ধীজী : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কবরের ইতিহাস : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (চতুর্থ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার ছেলে বেলার পুজো : সুব্রত দত্ত SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (তৃতীয় কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার শাশ্বত বোস-এর গল্প ‘সর্বভূক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (দ্বিতীয় কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার শত সুরের সারস্বত সাধক — নলিনীকান্ত সরকার : রিঙ্কি সামন্ত পীযূষ কান্তি দাস-এর ছোটগল্প ‘ঝন্টু মামা ও তাঁর শিকারের গল্প’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (প্রথম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরা — বর্তমান পরিস্থিতিতে একট চ্যালেঞ্জ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘আদমের চোখ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার পার্থ সারথি পাত্র-র ছোটগল্প ‘টাইম-ব্যাঙ্ক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সার্ধশতবর্ষে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শতবর্ষে সুরসম্রাট ভূপেন হাজারিকার স্মরণে : যশোবন্ত রায় মাটির নিচের ইন্টারনেট — অণুজীব ও উদ্ভিদের এক অদৃশ্য নেটওয়ার্ক : অন্বেষা গাঙ্গুলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্রম্পটনে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের সমাধি : অসিত দাস
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৭০ Views জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

[সংক্ষিপ্তসার — গ্রান্ট এখানে জমা-তুমারি (রাজস্ব-তালিকা) নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী উপস্থাপন করেছেন। তিনি দেখান যে, বর্তমানে বাংলায় প্রচলিত এই রাজস্ব-তালিকা — যা জমিদারি সনদ প্রদান, রাজস্ব বিভাগ নির্ধারণ ও নতুন দাবি সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় — তা আসলে টোডরমলের প্রণীত এবং আইন-ই-আকবরীতে উল্লিখিত আদি হিসাব নয়। বরং এটি প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে বাস্তব জরিপ, হস্তবুদ ও স্থানীয় অনুসন্ধানের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে পরিবর্ধিত, সংশোধিত ও উন্নত একটি ব্যবহারিক আর্থিক কাঠামো। গ্রান্ট এটিকে বিশ্বের অন্যতম নিখুঁত, সুশৃঙ্খল ও আনুপাতিক মানদণ্ড-ভিত্তিক হিসাব-ব্যবস্থা বলে অভিহিত করেছেন। গ্রান্ট সতর্ক করেন — এই রাজস্ব-তালিকা হারিয়ে গেছে বলে ধারণা দেওয়া, এর গুরুত্ব খাটো করা বা অনুসন্ধান বিভ্রান্ত করার পেছনে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের একটি ক্ষুদ্র গণ্ডি সক্রিয় ছিল। কারণ অতীতে কেবল তাদের কাছেই এর নির্ভরযোগ্য অনুলিপি ও কারিগরি জ্ঞান ছিল; সরকার পরিবর্তনের বিশৃঙ্খলায় তারা ধরা পড়ার ভয় ছাড়াই আত্মসাতের সুবিধা নিতে পারত। তবে গ্রান্ট সন্তুষ্টির সঙ্গে ঘোষণা করেন — এই রাজস্ব-তালিকা সম্পূর্ণ বা বিস্তারিতভাবে বিদ্যমান রয়েছে। এরপর গ্রান্ট জমা-তুমারি-তশখিস নামে তৃতীয় বিশ্লেষণ প্রবর্তন করেন — যা বাংলা সুবার সংশোধিত রাজস্ব-তালিকা। এটি প্রথমে জাফর খানের শাসনামলে প্রবর্তিত হয় এবং সাত বছর পর তাঁর উত্তরসূরি সুজা খানের আমলে (১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ, ১১৩৫ ফসলি বঙ্গাব্দ) নিশ্চিত করা হয়। এই ব্যবস্থায় ২৫টি বিভাগের অধীনে জমিদারির এলাকা বিন্যস্ত করা হয়; জায়গিরসমূহ পৃথকভাবে বাদ দেওয়া হয় এবং প্রতিটি এলাকায় রাজকীয় নির্ধারিত রাজস্বের অনুপাত দেখানো হয়। গ্রান্ট আরও দেখান — জাফর খানের আমলে জমিদার নামক নতুন শ্রেণির সৃষ্টি এবং তাদের ব্যবস্থাপনায় জমির পরিমাণে চরম বৈষম্য রাজস্ব ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ত্বরান্বিত করে। এই প্রেক্ষাপটেই তৃতীয় বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। প্রথম উদাহরণ হিসেবে তিনি বর্ধমান জমিদারির কথা উল্লেখ করেন — যা শস্য, তুলা, রেশম ও আখ উৎপাদনে সমৃদ্ধ ছিল; ১৭২২ সালের পর কীর্তিচাঁদের ওপর ন্যস্ত হয়; ৫৭টি পরগনা নিয়ে গঠিত এবং আসল জমা তুমারিতে এর মূল্য ছিল ২০,৪৭,৫০৬ টাকা।]

এ থেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, বর্তমানে বাংলায় প্রচলিত বা জমিদারির সনদ প্রদান, জমির রাজস্ব-সংক্রান্ত বিভাগ নির্ধারণ এবং সর্বোপরি বিভিন্ন জেলায় নতুন রাজস্বের দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ করা কিংবা পুরনো দাবির যৌক্তিকতা বিচারের ক্ষেত্রে অপরিহার্য সেই বিখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত রাজস্ব-তালিকা — যা ফারসি পরিভাষায় জমা-তুমারি (jumma toomary) নামে পরিচিত — তা আসলে টোডরমল কর্তৃক প্রণীত এবং আইন-ই-আকবরী-তে উল্লিখিত সেই আদি হিসাব নয় (যেমনটা সরকারি দেশীয় কর্মকর্তারা অজ্ঞতাবশত বিশ্বাস করেন বা অন্যদের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে ইচ্ছাকরাভাবে প্রচার করেন); বরং এটা হলো প্রায় দেড় শতাব্দী এবং বর্তমান শতাব্দীরও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময়কাল জুড়ে বাস্তব জরিপ, হস্তবুদ (hustabood) বা জমির প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং স্থানীয় বিশেষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে পরিবর্ধিত, সংশোধিত ও উন্নত একটা ব্যবহারিক আর্থিক কাঠামো। এটা সম্ভবত বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে তৈরি ও বিদ্যমান ভূখণ্ড-মূল্যায়নের অন্যতম সাম্প্রতিক, অত্যন্ত নিখুঁত, সুশৃঙ্খল, প্রামাণিক ও আনুপাতিক মানদণ্ড-ভিত্তিক হিসাব-ব্যবস্থা। আলোচ্য রাজস্ব-তালিকা সম্পর্কে এই বিবরণ জানার পর আমাদের আর অবাক হতে হবে না যে, কেন এটা হারিয়ে গেছে বলে ধারণা দেওয়ার জন্য, এর গুরুত্ব খাটো করার জন্য কিংবা বাইরের কোনো ব্যক্তির দ্বারা এর সন্ধানে পরিচালিত যেকোনো অনুসন্ধানকে বিভ্রান্ত ও জটিল করার জন্য এত প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। কারণ, অতীতে সম্ভবত কেবল তাদের কাছেই এর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি অনুলিপি এবং এর অন্তর্ভুক্ত সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয় বোঝার মতো কারিগরি জ্ঞান ছিল; এবং সরকার পরিবর্তনের বিশৃঙ্খলা বা নতুন শাসকদের অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তারা ধরা পড়ার ভয় ছাড়াই আত্মসাতের স্বাভাবিক প্রবণতায় গা ভাসাতে পারত — অর্থাৎ এমন গুরুত্বপূর্ণ নথির সুবাদে পাওয়া বিপুল সুবিধা নিজেদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করত, অথচ এর প্রকৃত মূল্যের গোপন তথ্যটি কেবল স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের একটা ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখত। তাই অত্যন্ত সন্তুষ্টির সাথে আমরা এখানে ঘোষণা করছি যে, এই রাজস্ব-তালিকাটি সম্পূর্ণ বা বিস্তারিতভাবে — অন্তত সাধারণ আর্থিক প্রয়োজনে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু — বিদ্যমান রয়েছে। খালসার (সরকারি রাজস্ব বিভাগের) নথিপত্রে যদি এটা পাওয়া না-ও যায় — যার বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে, কারণ কোনো ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনেই এটাকে স্বীকৃতি দেওয়া বা ব্যবহার করা হয়নি, যদিও কোম্পানির কোষাগারে নিযুক্ত দেশীয় কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে এর পূর্ণ প্রয়োগ দেখা যেত (যা আমরা শীঘ্রই বিস্তারিতভাবে তুলে ধরব) — তবুও বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি মাধ্যমের সাহায্যে এটা যে পাওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে যথেষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া যেতে পারে। প্রথম প্রধান সময়কালের শুরু ও শেষে নির্ধারিত বাংলার রাজস্বের মধ্যে উপযুক্ত তুলনামূলক বিচার করার জন্য পূর্বোল্লিখিত সাধারণ বিন্যাসগুলোর কোনো একটাই হয়তো যথেষ্ট হতে পারত; কিন্তু আলোচ্য বিষয়ের স্বাভাবিক ক্রম অনুযায়ী এখানে একটা তৃতীয় বিশ্লেষণ (Analysis) যুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে। পরবর্তীকালের হিসাব-নিকাশ বোঝা বা তুলনা করার ক্ষেত্রে এটা অপরিহার্য হয়ে উঠবে, কারণ সেই সময়ে সরকারি অর্থব্যবস্থার বিন্যাস ও ব্যবস্থাপনায় একটা নতুন পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এই পরিবর্তন থেকেই মুঘল রাজকীয় অধিকারের ওপর পরিকল্পিত হস্তক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্ট হয় — যা সাম্রাজ্যের দৃশ্যমান পতনের দ্বারা নিশ্চিত হয়েছিল এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পরবর্তীকালের সমস্ত বিশৃঙ্খলার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের নর্দার্ন সরকারস-এর (Northern Circars) রাজনৈতিক সমীক্ষায় বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে যে, সমগ্র হিন্দুস্তানে বন্দোবস্ত বা বার্ষিক রাজস্বের হার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী সরকার (প্রশাসনিক বিভাগ) ইত্যাদির অধীনে আনুপাতিক হারে স্থির ও চূড়ান্ত করা হলেও, এই পরিবর্তনশীল বন্দোবস্তটি সর্বদা সরকারি কর্মকর্তাদের — মূলত হিন্দু — মাধ্যমেই সম্পন্ন ও কার্যকর করা হতো। ক্রোরি, জমিদার ও চৌধুরী — এই পদবিধারী কর্মকর্তারা একই সঙ্গে প্রধান ইজারাদার, সাধারণ কৃষকদের স্বাভাবিক প্রতিনিধি এবং নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমার মধ্যে সম্রাটের রাজস্ব আদায়কারী হিসেবে কাজ করতেন। এই নির্দিষ্ট এলাকাটি সাধারণত তদারককারী ভূস্বামীর পদবি দ্বারা চিহ্নিত হতো এবং পরগনা নামে পরিচিত দেশের সুনির্দিষ্ট কিছু অংশের (কম বা বেশি সংখ্যক) সমন্বয়ে গঠিত হতো; আর এই বিন্যাস নির্ভর করত সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী দেওয়ানি প্রতিনিধির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি-ভূস্বামীর ওপর অর্পিত আস্থা বা প্রদর্শিত অনুগ্রহের ওপর।

যখন সমগ্র সরকারি রাজস্ব তুমার জমা বাদশাহী (সম্রাটের নির্ধারিত রাজস্ব তালিকা) অনুযায়ী আদায় করা হতো এবং নিজ নিজ প্রদেশের অর্থ-বিভাগে অন্যায্যভাবে ক্ষমতা বিস্তারকারী নবাবরা জমিদারদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি কেবল একটা নজরানা বা উপহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন — যার পরিমাণ ছিল অনির্ধারিত ও খেয়ালখুশিমতো এবং যা কেবল পদাধিকারবলে পাওয়া এক গোপন ও সাময়িক উপরি পাওনা হিসেবে গণ্য হতো — তখন এই অনিয়ম সাম্রাজ্যের প্রাচীন শাসনকাঠামোকে খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করা যায় না। কিন্তু যখন জাফর খানের শাসনামলে তাঁর নিজস্ব তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে (যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনকে এক করে দেখা হচ্ছিল) এই অনিয়মিত করগুলো আয়ের স্থায়ী উৎসে পরিণত হলো — বিশেষ করে যখন রাজকীয় ক্ষমতার বিপরীতে নাজিমদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পেল এবং মুদ্রার মান হ্রাসের ফলে উভয় পক্ষেরই অর্থের প্রয়োজনীয়তা কৃত্রিমভাবে বেড়ে গেল; এবং পরবর্তীকালের অধিকতর স্বাধীন শাসকরা যখন এই ধরনের দাবির সংখ্যা ও পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন — অথচ তা আদায় করা হতো জমিদারির এলাকার পরিবর্তনশীল ও অস্পষ্ট সীমানা অনুযায়ী সামগ্রিকভাবে, এবং কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী পরিমাপকরা ভূখণ্ডে সুষম ও নিশ্চিত বণ্টনের পরিবর্তে অজ্ঞ ও স্বার্থান্বেষী জমিদারদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হতো তাদের অধীনস্থ ছোট ছোট এলাকায় এই অতিরিক্ত করর বোঝা ভাগ করে দেওয়ার ভার — ঠিক তখনই ভারতের শাসনব্যবস্থা প্রথম লঙ্ঘিত হলো বলে বলা যায়। এর ফলে সরকার ও কৃষক — উভয়ের অধিকারই ক্ষুণ্ণ হলো এবং মুঘল প্রশাসনের নিয়মিত ও ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতির পরিবর্তে এমন এক প্রতারণা, আত্মসাৎ ও নিপীড়নের ব্যবস্থা চালু হলো যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ছিল।

তাছাড়া, জাফর খানের সুবাদারির সময় জমিদার নামক এক নতুন শ্রেণির কর্মকর্তার সর্বব্যাপী সৃষ্টি এবং তাদের ব্যবস্থাপনায় ন্যস্ত জমির পরিমাণে চরম বৈষম্য — যা সম্ভবত তাঁর নিজস্ব গোপন আয়ের পরিমাণ কার্যকরভাবে আড়াল করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল — সাম্রাজ্যের রাজস্ব ব্যবস্থায় তখন যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল তাকে আরও ত্বরান্বিত বা তীব্র করে তুলেছিল। এই প্রেক্ষাপটেই জমা তুমারি-র প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্লেষণটি (Analysis) প্রবর্তনের যৌক্তিকতা অনুভূত হয়; যা তুলনার মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে এবং বাংলার ইতিহাসের পরবর্তী দুটো পর্যায়কে স্পষ্টভাবে বুঝতে সহায়তা করবে। সুজা খান সুবাদার পদে আসীন হওয়ার পরপরই বিখ্যাত রাজস্ব-তালিকা বা রেন্ট-রোল-এর মোট অঙ্কে খুব একটা পরিবর্তন না ঘটালেও তকসীম (tuckseem)-এর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য রদবদল করা হয়েছিল। তাঁর পূর্বসূরির আমলে রাজস্ব বণ্টনের অসামঞ্জস্যের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত এই নতুন পদ্ধতি অনুযায়ী মুর্শিদাবাদ বিভাগের মতো কিছু অঞ্চলের আনুপাতিক রাজস্ব নির্ধারণের জন্য বিগত দশ বছরের প্রকৃত আদায়ের গড় হিসাবের ভিত্তিতে নতুন করে যাচাই-বাছাই বা তদন্তের প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই আমরা এখন থেকে এই পরবর্তী হিসাবটিকেই আমাদের নির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করব; এবং আরবি শব্দটির আক্ষরিক অর্থ অনুযায়ী তশখিস (Teshkhees) নামক পারিভাষিক শব্দটির মাধ্যমে এটাকে সুবার সংশোধিত রাজস্ব-নির্ধারণ হিসেবে আরও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করব। এ বিষয়ে আমাদের আরও একটা মন্তব্য হলো — সংস্কারের যে ধারণা এর মাধ্যমে ফুটে উঠেছিল, তা আংশিকভাবে প্রাচীন রাজস্বের বিচ্ছিন্ন বা অনুৎপাদনশীল উৎসগুলোকে বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল; ফলে একই নীতির অজুহাতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজস্ব তছরুপ বা ঘাটতির সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এছাড়া, সামগ্রিক অঙ্কের বিচারে এটা ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত Original Minutes, &c। (পৃষ্ঠা ৮৪)-এর সেই সারসংক্ষেপের সাথে হুবহু মিলে যায়, যা বাংলার তুমার জমা (Toomar Jumma), ১১৩৫ বঙ্গাব্দ শিরোনামে চাকলা (Chuckleh) বিভাগের মতো সাধারণ বিভাগগুলোর অধীনে সাজানো হয়েছিল (যার বিস্তারিত বিবরণ অন্য কোথাও পাওয়া যায়)। তবে ওই নথির রচয়িতা এটাকে আসল বা মূল রাজস্ব-তালিকা বলে মনে করেননি; বরং স্পষ্টতই এটাকে সুজা খানের বার্ষিক পরিবর্তনশীল বন্দোবস্ত (buudobust) হিসেবে গণ্য করেছেন, যা সেই একই বছরে — অর্থাৎ খ্রিস্টীয় ১৭২৮ সালে — চূড়ান্ত করা হয়েছিল। [২৬৬]

জমা-তুমারি-তশখিস (Jumma Toomary Teshkhees) — অর্থাৎ বাংলা সুবার সংশোধিত রাজস্ব-তালিকা — এর সারাংশ। বার্ষিক বন্দোবস্তের আওতায় ২৫টি বিভাগের অধীনে তৎকালীন এহতিমাম বা জমিদারির দায়িত্বপাওয়া এলাকার সংখ্যা অনুযায়ী এটা বিন্যস্ত। এতে পৃথকভাবে উল্লেখ্য জাগিরসমূহ বাদ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি আঞ্চলিক এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় রাজকীয় নির্ধারিত রাজস্বের (স্ট্যান্ডার্ড অ্যাসেসমেন্ট) অনুপাত দেখানো হয়েছে। এই ব্যবস্থাটি প্রথমে জাফর-এর শাসনামলে প্রবর্তিত হয়েছিল এবং সাত বছর পর তাঁর উত্তরসূরি সুজা খানের আমলে তা নিশ্চিত করা হয় (যা ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ বা ১১৩৫ ফসলি বঙ্গাব্দের সমতুল্য)। খালসা (Khalsa) — অর্থাৎ দেশের ভূমি ও রাজস্বের সেই অংশ যা সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় ছিল।

১। বর্ধমান (Burdwan): শস্য, তুলা, রেশম ও আখ উৎপাদনে সমৃদ্ধ এক বিশাল ও সংহত জমিদারী। ১৭২২ সালের পরবর্তী কোনো এক সময়ে এটা ক্ষত্রিয় বর্ণের কীর্তিচাঁদের ওপর ন্যস্ত হয়েছিল। তিনি ছিলেন বর্তমান পরিবারের প্রথম জ্ঞাত পূর্বপুরুষ; এই পরিবারটি হয়তো একই নামের অঞ্চলের প্রাচীন কর্মকর্তাদের সাথে পার্শ্বীয় কোনো সম্পর্কে যুক্ত ছিল অথবা — কারও কারও মতে — সরাসরি তাঁদেরই বংশধর ছিল। ১৬৯৬ সালের বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত এর আদি আয়তন ছিল মাত্র ৪ বা ৫টি পরগনা-সীমিত। সেই বিদ্রোহের সময় চিতওয়ার ও বরদার সুবাহ সিংহ এবং তাঁর সহযোগী মিত্ররা বেআইনিভাবে তৎকালীন শাসক কৃষ্ণরামকে (যিনি এই বংশের নথিভুক্ত প্রথম ব্যক্তি) ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করেন। এরপর ওই বিদ্রোহীদের তালুকদারি স্বত্ব বাজেয়াপ্ত করে বর্ধমান জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তা নিহত কৃষ্ণরামের পুত্র জগৎ-রায়ের অনুকূলে প্রদান করা হয়; সম্ভবত তাঁর থেকেই তা বর্তমান অধিকারীর পূর্বপুরুষের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছিল। সে সময় সমগ্র জেলাটি একই নামের চাকলা-র (Chuckleh) প্রধান অংশ এবং হুগলি ও মুর্শিদাবাদ চাকলার অতি ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে গঠিত ছিল; এতে ৫৭টি পরগনা অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং আসল জমা তুমারি (রাজস্বের হিসাব)-তে এর মূল্যমান ছিল ২০,৪৭,৫০৬।

টিকা ১

গ্রান্ট এখানে কোন হিসাব দেখাচ্ছেন? গ্রান্ট এখানে তৃতীয় হিসাব দেখাচ্ছেন — ১৭২২ সালের মুর্শিদকুলি খানের (জাফর খানের) চূড়ান্ত বন্দোবস্ত। এটা আগের দুটো হিসাব থেকে আলাদা: প্রথম হিসাব (১৫৮২) — টোডরমলের আসিল তুমার জমা: ১৯টি সরকার, ৬৮২ পরগনা, মোট ৬৩,৪৪,২৬০ টাকা। এটি ছিল আকবরের আমলের মূল মূল্যায়ন। দ্বিতীয় হিসাব (১৬৫৮) — সুলতান সুজার উন্নত তুমার জমা: ৩৪টি সরকার, ১,৩৫০ পরগনা, মোট ১,৩১,১৫,৯০৭ সিক্কা রুপি। এতে নতুন সংযুক্ত অঞ্চল (ওড়িশা, আসাম, কুচবিহার) যোগ করা হয়েছিল। তৃতীয় হিসাব (১৭২২) — মুর্শিদকুলি খানের চূড়ান্ত বন্দোবস্ত: এটি ছিল ১৩টি চাকলায় বিভক্ত। মুর্শিদকুলি খান ৩৪টি সরকারকে ১৩টি চাকলায় রূপান্তর করেন এবং ১,৩৫০ পরগনাকে ১,৬৬০ পরগনায় উন্নীত করেন। এই নতুন বন্দোবস্তে মোট রাজস্ব দাঁড়ায় ১,৪২,৮৮,১৮৫ সিক্কা রুপি।

মাথায় রাখতে হবে মুঘল আমলের প্রথম আর দ্বিতীয় হিসাব ছিল তুমার জমা অর্থাৎ সরকার আর পরগনার সংখ্যা মূল ভিত্তি। তৃতীয় হিসাব ছিল চাকলা ভিত্তিক — প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করে রাজস্বের পরিমাণ আরও নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা। গ্রান্টের বক্তব্য হল মুর্শিদকুলি খানের এই চূড়ান্ত বন্দোবস্তই ছিল বাংলার প্রকৃত রাজস্ব, যা ১৭৬৫-র দেওয়ানি লাভের সময় দেশীয় প্রশাসন গোপন করেছিল। এই তথ্যই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও রাজস্ব সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করে।

টিকা ২

চাকলা (Chuckleh): মুর্শিদকুলি খান কর্তৃক প্রবর্তিত বৃহত্তর প্রশাসনিক বিভাগ — যা কয়েকটি সরকার নিয়ে গঠিত ছিল। ১৭২২ সালে বাংলাকে ১৩টি চাকলায় বিভক্ত করা হয়।

আসিল (Ausil): মূল মূল্যায়ন — ১৫৮২ সালে টোডরমল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত।

ওয়াসিল (Wasil): নতুন অধিকৃত অঞ্চল থেকে আসা রাজস্ব — যা মূল মূল্যায়নের সঙ্গে যোগ করা হয়।

এজাফা (Ezafa): পুরনো খাজনার বৃদ্ধি — ভূমির ক্রমোন্নতি, হস্তাবুদের প্রকৃত উৎপাদন বা পর্যায়ক্রমিক তদন্তের মাধ্যমে।

জেবতী (Zebty): পুনরুদ্ধারকৃত ভূমি — যা জায়গিরে বরাদ্দ ছিল, পরে রাজকোষে ফিরিয়ে আনা হয়।

জমা কাউমিল তুমারী: সমগ্র বাংলার ১৩টি চাকলার মোট রাজস্ব — যা খালসা ও জায়গির ভূমি, মহল ও সায়ের সহ গণনা করা হয়।

সিক্কা রুপি: মুঘল আমলে প্রচলিত রুপি — যার মান মুদ্রার ওজন ও খাঁটি ধাতুর ভিত্তিতে নির্ধারিত।

মহল: রাজস্বের একক — গ্রাম বা জমিদারির অংশ।

সায়ের: রাজস্বের অতিরিক্ত উৎস — যেমন বাজার, শুল্ক, টোল ইত্যাদি।

টিকা ৩

মুজফফর আলম ও সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যমের সংশোধনী – মুজফফর আলম ও সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রান্ট যে ১৭২২ সালের ১৩ চাকলার ভাগের কথা বলছেন, সেটি আসলে মুর্শিদকুলি খানের রাজত্বের প্রাথমিক পর্যায়েই (১৭০৭-১৭১২ সালের মধ্যেই) সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, গ্রান্টের দাবির প্রায় এক দশক আগেই এই প্রশাসনিক পুনর্গঠন ঘটে যায়। বাহাদুর শাহের রাজত্বের কর্মকর্তাদের তালিকা (১৭০৭-১৭১২): এই তালিকা অনুসারে, তৎকালীন বাংলায় ইতিমধ্যেই ১৩টি চাকলার অস্তিত্ব ছিল। ‘উলুলদারি’র দায়িত্বে থাকা ৭৪ জন ব্যক্তির মধ্যে মাত্র ৩০ জনকে জমিদার হিসেবে চিহ্নিত করা যায়; বাকি ৪৪ জন ছিলেন কারোরি, সাজোয়াল, দারোগা, কানুনগো বা গোমস্তা। এই তথ্যই প্রমাণ করে — মুর্শিদকুলি খান জমিদারদের রাজস্ব প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে না বসিয়ে বরং তাদের ‘দাসত্ব ও পরাধীনতায়’ নামিয়ে আনার নীতি নিয়েছিলেন।

প্রচলিত ধারণার ভিত্তি হল মুর্শিদকুলি খান ১৭২২ সালে ১৩ চাকলা গঠন করেন — এই তথ্য মূলত জেমস গ্রান্টের বিশ্লেষণ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পঞ্চম প্রতিবেদন সূত্রে ইতিহাসে সাধারণ ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত নথি ঘেঁটে দেখলে বোঝা যায় — গ্রান্টের বক্তব্য সময়ের দিক থেকে সঠিক নয়। গ্রান্ট তার রাজস্ব প্রস্তাবে ১৭২২ সালের ‘নিখুঁত রাজকীয় আনুপাতিক মূল্যায়ন’ হিসেবে ১৩ চাকলার বন্দোবস্তের কথা বলেছেন। কিন্তু এই বন্দোবস্তের ভিত্তি আসলে তার অনেক আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। গ্রান্ট কেবল সেই কাঠামোর চূড়ান্ত রাজস্ব-হিসাবটি ১৭২২ সালের সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছেন।

মুজফফর আলম ও সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যমের মূল বক্তব্য — গ্রান্টের বিশ্লেষণ ও ফিফথ রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার অনেক সাধারণীকরণ করা হয়েছে, যা আঠারো শতকের গোড়ার দিকের মূল রেকর্ডপত্র দেখলে টিকিয়ে রাখা যায় না।

টিকা ৪

গ্রান্ট হলেন সেই প্রথম দিককার উপনিবেশিক লেখক, যিনি হিন্দু গ্লোরিফিকেশন আর মুসলমান সমাজ/প্রশাসন কাঠামোকে ভিলেন বানাবার কাজের কাজি। ৭৮ কিস্তিতে গ্রান্টের প্রশংসা দেখেছি। তিনি মুর্শিদকুলি খানকে অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের প্রশংসা করেছেন — তাঁকে তত্ত্ব ও বাস্তবতার সমন্বয়ে টোডরমলের মানদণ্ডকে পূর্ণতা দেওয়া অর্থ-প্রশাসক” বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি মুর্শিদকুলি খানের ব্রাহ্মণ পিতামাতার ঘরে জন্ম এবং হিন্দুদের জাতীয় চরিত্রের গুণাবলি (উদাসীনতা, ধৈর্য, সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা, মিতব্যয়িতা, খুঁটিনাটিতে মনোযোগ) তাঁর মধ্যে বিদ্যমান বলে দাবি করেছেন। মুর্শিদকুলি খানের জন্ম ও প্রথম জীবন সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি ইস্পাহানে হাজি শফিয়ার কাছে ক্রীত হয়ে পারস্যে যান এবং সেখানে মোহাম্মদ হাদি নামে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। এটি প্রমাণ করে — তিনি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে যে দাবি, তা প্রমাণিত নয়। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে; কেউ বলেন তিনি দাক্ষিণাত্যের হিন্দু ব্রাহ্মণ, কেউ বলেন তিনি বাংলার কায়স্থ। মুর্শিদকুলি খানকে প্রশংসা করেছেন — কিন্তু সেটা আদতে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন তৈরি করার প্রথমদিককার উদ্যম। তিনি বলছেন — মুর্শিদকুলি খান ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং হিন্দুদের জাতীয় চরিত্রের গুণাবলি তাঁর মধ্যে ছিল। অর্থাৎ, তাঁর সাফল্যের কারণ ছিল তাঁর হিন্দু পরিচয় — যদিও তিনি মুসলিম হয়েছিলেন এবং মুসলিম প্রশাসনিক কাঠামোয় কাজ করেছিলেন। মুর্শিদকুলি খান ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, মুসলিম নাম ধারণ করেছিলেন এবং মুসলিম প্রশাসনিক কাঠামোয় কাজ করেছিলেন। তাঁর শাসনামলেই বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা পূর্ণতা লাভ করে।

গ্রান্টের ব্রাহ্মণ-পরিচয়ের দাবি ও হিন্দু-গুণাবলির প্রশংসা — এই দুটোই ছিল উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার হাতিয়ার, যা হিন্দু-মুসলিম বিভাজনকে উস্কে দিয়ে ব্রিটিশ শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

টিকা ৫

১৪০ বছরের প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি – গ্রান্ট এখানে ১৪০ বছরের (১৫৮২–১৭২২) বাংলার আর্থিক ইতিহাসের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি টানছেন।এই দীর্ঘ সময়ের শুরুতে টোডরমলের রাজস্ব ছিল ৬৩,৪৪,২৬০ টাকা; শেষে মুর্শিদকুলি খানের বন্দোবস্তে তা দাঁড়ায় ১,৪২,৮৮,১৮৫ সিক্কা রুপি — যা মূল রাজস্বের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি এবং সম্রাট-কোষাগারের প্রাথমিক বার্ষিক আয়ের দুই-তৃতীয়াংশের সমান। গ্রান্টের প্রশ্ন হল নতুন শাসকদের মনে এই ভুল ধারণা গেঁথে দেওয়া কি অজ্ঞতা, সুপরিকল্পিত চক্রান্ত, নাকি উভয়ের ফল? কারণ আমেরিকা ও উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে সমুদ্রপথ উন্মোচনের পর মুদ্রার মান কমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জমির কর বাড়ার যে প্রবণতা বিশ্বজুড়ে দেখা গেছে, তার সঙ্গে এই ধারণা সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। গ্রান্টের সতর্কতা: দেশীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, যার সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত, তা অত্যন্ত অবিশ্বাস ও সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিনের দুর্নীতির দ্বারা সংকীর্ণ। আকবরের আমল থেকে আলোচ্য সময় পর্যন্ত জমা-ই-তুমারিতে মোট বৃদ্ধি ছিল ৩১,৭৯,১১৩ টাকা। এই বৃদ্ধি এসেছিল সুবার সীমিত অংশের উন্নয়ন থেকে — কারণ জায়গির, বীরভূম, রাজমহল, পূর্ণিয়া, দিনাজপুর, রংপুর ও ঢাকার মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলো বাদ দিতে হয়েছিল। এসব জেলা ফৌজদারদের তত্ত্বাবধানে অনুৎপাদনশীল থাকলেও গোপনে প্রাদেশিক প্রতিনিধিদের জন্য লাভজনক ছিল। কাসিম আলীর শাসনকাল পর্যন্ত এই অবস্থা বজায় ছিল।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev