
৬৯. প্রথম বাঙালি মহিলা ইঞ্জিনিয়ার ইলা ঘোষ মজুমদার
অনেক বিষয়েই প্রথম ইলা ঘোষ মজুমদার (১৯৩০-২০১৯)। শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রথম ছাত্র তিনি।প্রথম বাঙালি মহিলা ইঞ্জিনিয়ার তিনি। ভারতবর্ষের প্রথম মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার তিনি। শিক্ষনবিশ হিসাবে বিদেশে পড়তে যাওয়া প্রথম মহিলা তিনি। তিনিই প্রথম মহিলা যিনি ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় কাজ করেছিলেন। কলকাতার ও বাংলাদেশের প্রথম মহিলা পলিটেকনিক কলেজের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা।
বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার পেয়ারপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন তাঁর বাবা যতীন্দ্রমোহন মজুমদার। ইলার জীবনে বাবার প্রেরণা অনেকখানি। নারীশিক্ষা ও নারীস্বাধীনতার পূজারী যদি না হতেন যতীন্দ্রনাথ, তাহলে ইলার ইচ্ছাপূরণ হত না।
বাবার ছিল বদলির চাকরি। তাই প্রথম দিকে ইলার পড়াশুনোয় ব্যাঘাত ঘটেছে। কলকাতায় চলে এসে তাঁর পরিবার স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করে। ইলা প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলেন। ফল খুব ভালো হল না। পাশ করলেন দ্বিতীয় বিভাগে। তারপর আশুতোষ কলেজ। ভর্তি হলেন ইন্টারমিডিয়েটে। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিংএর প্রবেশিকা পরীক্ষা দিলেন। দুটোতেই ভালো ফল হল।
এবার কি করবেন? ডাক্তারি না ইঞ্জিনিয়ারিং?
এতদিন মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ ছিল না। সে সুযোগ এল ১৯৪৭ সালে। তখনকার শিক্ষামন্ত্রী নিকুঞ্জবিহারী মাইতি মেয়েদের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিংএর দরজা খুলে দিয়েছিলেন। শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন দুজন নারী। ইলা মজুমদার এবং অজন্তা গুহ। অজন্তা কিন্তু মাঝপথে বিদায় নিয়েছিলেন কলেজ থেকে।
ইঞ্জিনিয়ারিংএ ভর্তি তো হলেন ইলা, কিন্তু কোন বিভাগ বেছে নেবেন তিনি? তাঁর ইচ্ছা ছিল পড়বেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। আপত্তি করলেন কলেজের অধ্যক্ষ। বললেন, এই বিভাগে প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়, যেটা মেয়েদের পক্ষে কিছুটা অসম্ভব। তাই ইলাকে ভর্তি হতে হল মেকানিক্যালে। মেকানিক্যালে ভর্তি হলেন বটে, পরোক্ষে যোগ থেকে গেল সিভিলের সঙ্গে। কারণ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএর বিভাগীয় প্রধান পুলিনবিহারী ঘোষ ইলাকে খুব স্নেহ করতেন। তিনিই হয়ে উঠেছিলেন তাঁর কলেজের অভিভাবক।
ভর্তি তো হলেন, কিন্তু ইলা থাকবেন কোথায়? তখন সেখানে মেয়েদের কোন হস্টেল ছিল না। পুলিনবিহারী একটা ব্যবস্থা করে দিলেন। কলেজের লাইব্রেরি সংলগ্ন একটা ঘরে থাকবেন ইলা। আর একটা সমস্যা ছিল। কলেজে মেয়ে বলতে তিনিই শুধু। সংকোচ ঝেড়ে ফেলে ইলা সহজভাবে মিশতে শুরু করলেন ছেলেদের সঙ্গে। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে ইলা বলেছেন, ‘গোটা ব্যাচে আরও একজন মেয়ে (অজন্তা গুহ) ছিল। ছেলেরা প্রথমে অবাক হয়েছিল, কিন্তু শীঘ্রই আমরা ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম। তারা আমাদের সঙ্গে গল্প করত, ঠাট্টা করত, ক্রিকেট ম্যাচে উৎসাহ দিত। আমরা কখনও অস্বস্তি বোধ করি নি।’
১৯৫১ সাল।
তৈরি হল ইতিহাস। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংএ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করলেন ইলা মজুমদার। প্রথম বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার। এবার শিক্ষানবিশ হিসাবে কিছু সময় কাজ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে মেয়েদের সে সুযোগ ছিল না। তাই ইলা মজুমদারকে যেতে হল স্কটল্যাণ্ডের গ্লাসগোতে। স্নাতকোত্তর স্তরের প্রৃশিক্ষণ নিলেন বার অ্যাণ্ড স্টাইড সংস্থায়।
দেশে ফিরে তিনি দেরাদুনের অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় যোগ দিলেন। মাস ছবেক কাজ করেছিলেন তিনি। তারপর চলে আসেন দিল্লির পলিটেকনিক কলেজে। শুরু করেন অধ্যাপনা। তারপর তাঁর বিয়ে হয়। তিনি পাকাপাকিভাবে চলে আসেন কলকাতায়। যোগ দেন ইন্সটিটিউট অব জুট টেকনোলজিতে।
কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যের বাধা ছিল। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই আমার পেশাগত জীবনে সব সময় লিঙ্গ বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছি। আমার মনে হয়েছে সমাজের মানসিকতা বদলাতে অনেক সময় লাগবে এবং তা সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই।’
কলকাতায় কোন মহিলা পলিটেকনিক কলেজ ছিল না। তাই তিনি গড়িয়াহাট রোডে প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম মহিলা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট। ১৯৬৩ সালে। এই কলেজের সাফল্যে ইউনেস্কো তাঁকে ঢাকায় একটি পলিটেকনিক কলেজ খোলার দায়িত্ব দেয়।