
[প্রথমত, ভূমিস্বত্বের প্রকৃতি নিয়ে প্রধান মতপার্থক্য। এক পক্ষের দাবি — জমি জমিদার ও দেশীয় শ্রেণির সম্পত্তি, সরকার কেবল নির্দিষ্ট অংশ পায় (যাকে কুইট-রেন্ট, ট্রিবিউট বা ল্যান্ড ট্যাক্স বলা হয়)। কিন্তু ১৭৮৪ সালের নর্দার্ন সার্কারস সংক্রান্ত রাজনৈতিক জরিপে এর বিপরীত সিদ্ধান্ত — সার্বভৌম শাসকই ভূমির প্রকৃত ও একমাত্র মালিক; জমিদাররা কেবল বার্ষিক চুক্তিবদ্ধ কর আদায়কারী, যাদের প্রাপ্তি মোট আদায়ের নির্দিষ্ট শতাংশের বেশি হতে পারে না। লেখকের মতে, এই মৌলিক নিয়ম পরিবর্তন করা হবে অবিবেচনাপ্রসূত, অকার্যকর ও বিপজ্জনক। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত ভূমি-রাজস্বের বোঝা নিয়ে দ্বিতীয় মতপার্থক্য — টোডর মলের আদি তুমার জমা ও আধুনিক বন্দোবস্তের তুলনা। ১৭২৮ সালের তালিকা ৭ লাখ কম দেখানোর দাবি ভুল, কারণ প্রথম তালিকায় ওড়িশার ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল, দ্বিতীয়টিতে কেবল হিজলি ও বালেশ্বরের চাকলা। প্রকৃতপক্ষে ১৭২৮ সালের বন্দোবস্ত ৩১ লাখ বেশি। ১৭২২ সালে জাফর খানের আমলে ১৩টি চাকলা ও ১,৬৬০টি ক্ষুদ্রতর জেলায় পুনর্বিন্যাস করা হয়, যা প্রকৃত তুমার জমা — এটিকেই ভুলভাবে টোডর মলের আদি তালিকা বলা হয়। এই বিভাগীয় বিন্যাসের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ না করায় গুরুত্বপূর্ণ ভুল এড়ানো সম্ভব হয়নি]
এই প্রস্তাবনায় নিহিত তাত্ত্বিক বা অনুমাননির্ভর মতামত বিতর্কের বিষয় হতে পারে এবং তা কেবল অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকেই যাচাই করা সম্ভব — যে অভিজ্ঞতা হয়তো এখনও বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো বাস্তব পরিস্থিতির ক্ষেত্রে আংশিক বা পুরোপুরি অকার্যকরও হতে পারে; কিন্তু নিছক বাস্তব তথ্যের প্রশ্নে আমাদের অবশ্যই দ্বিমত পোষণ করতে হবে।
এখানে সার্বভৌমত্ব, প্রজাস্বত্ব কিংবা সম্পত্তির অধিকারের মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিষয়গুলো জড়িত; এবং যদিও আমাদের আলোচনার সূচনাবিন্দু ভিন্ন, তবুও এটা ন্যায্য যে আমরা যেন একই সময়ে এবং যথাসম্ভব সমান শর্তে আলোচনা শুরু করি। সহজ কথায়, প্রমাণের দায়ভার যেন কেবল এক পক্ষের ওপরই না চাপে — বিশেষ করে যখন অন্য পক্ষের কেবল নিছক দাবি বা বক্তব্যই কোনো পূর্ব-তদন্ত ছাড়াই মেনে নেওয়া হয়েছে। আমাদের ভিন্ন ভিন্ন নীতিগুলো যখন স্পষ্টভাবে বিবৃত বা ঘোষিত হবে এবং উভয় পক্ষের যুক্তি ও তার সপক্ষে প্রমাণ বা দৃষ্টান্তগুলো জনসমক্ষে পর্যালোচনা ও আলোচনার জন্য উন্মুক্ত থাকবে — তখন, যেহেতু আমাদের লক্ষ্য অভিন্ন, তাই সরেজমিনে একটা নির্ভরযোগ্য ও আনুষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমেই হয়তো একটা নিরপেক্ষ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এই পরিকল্পনার প্রণেতা যে এতে সহজেই সম্মতি দেবেন, তা আমি নিশ্চিতভাবেই আশা করতে পারি; বিশেষ করে এই কারণে যে, তথ্যের সরল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত যদি তাঁর নিজের বিবেচনায় প্রতিকূলও হয়, তবুও তা থেকে উদ্ভূত গৌণ বা আনুষঙ্গিক সিদ্ধান্তগুলোর প্রতি তিনি আগেই অসম্মতি জানিয়ে রেখেছেন। এই ঘটনায় যারা শেষ পর্যন্ত এবং সর্বাধিক আগ্রহী পক্ষ হিসেবে জড়িত, তারা হলো প্রতিটি অধীনস্থ রাজ্যের তিনটি প্রধান শ্রেণি: প্রতিনিধিত্বমূলক শাসক, ভূমিমালিক (যাদের অবস্থান পারিভাষিক বা স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত) এবং কৃষকদের সমগ্র গোষ্ঠী। ভারতের জমিদার ও সংশ্লিষ্টদের — যারা শাসক ও কৃষকের মধ্যবর্তী একমাত্র ভূ-সম্পত্তি-মালিক শ্রেণি — অধিকার ও বিশেষ সুবিধাসমূহ সংজ্ঞায়িত করার অর্থ হলো পরোক্ষভাবে অন্য দুই শ্রেণির অধিকারও নির্ধারণ করা; কারণ পারস্পরিক নির্ভরশীলতার শৃঙ্খলে তাদের সবার অধিকারের সীমানা একে অপরের সাথে যুক্ত এবং সেখানেই কেবল তাদের সীমানা নির্দিষ্ট করা সম্ভব — অন্যথায় স্বৈরতন্ত্রের সর্বোচ্চ সীমা কিংবা দাসত্বের সর্বনিম্ন অবস্থা — উভয়ই অনির্দিষ্ট থেকে যায়। অবশ্য, পূর্বে উল্লিখিত সারকারসমূহের রাজনৈতিক জরিপ-এ (Political Survey of the Circars) এ ধরনের একটা প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে এবং বর্তমান আলোচনাতেও বিষয়টি হয়তো কিছুটা অস্পষ্টভাবে উঠে আসতে পারে; কিন্তু আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বাংলার বিশিষ্ট ভূমিমালিকরা — বিশেষ করে রাজা উপাধিপাওয়ারা, যাদের মর্যাদাকে ইওরোপের জার্মান সাম্রাজ্যের সামন্ত রাজাদের সাথে তুলনা করা হয় — তারা অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী একটা গোষ্ঠী। তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন ও গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধির অভাব কখনোই হবে না — বিশেষ করে যখন তাদের বিশাল এলাকার অনির্ধারিত রাজস্ব অবাধ ও নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাই এই প্রবন্ধে আমরা বরং সমাজের অন্য দুটো গোষ্ঠীর বিশেষ অধিকার ও পারস্পরিক অবস্থান ব্যাখ্যা করার দিকেই আমাদের যুক্তি নিবদ্ধ করতে চাই। [২৫১]
মতের দ্বিতীয় পার্থক্যটি দেখা দেয় প্রকৃত ভূমি-রাজস্বের বোঝা বা করর ভার বিবেচনার ক্ষেত্রে — যখন টোডর মলের (Toory Mull) প্রবর্তিত আদি তুমার জমা (toomar jumma)-র সাথে বর্তমান শতাব্দীর আধুনিক বন্দোবস্ত-এর তুলনা করা হয়। মীমাংসা পরিকল্পনা বা প্ল্যান অফ সেটলমেন্ট-এর ১৬৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত বিষয়গুলোর সমর্থনে দুটো নথিপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে — একটা হলো আকবরের শাসনামলে নির্ধারিত প্রদেশগুলোর রাজস্বের তালিকা (রেন্ট-রোল) এবং অন্যটি ১৭২৮ সালের তালিকা। বলা হয়েছে যে, পরবর্তী তালিকাটির পরিমাণ পূর্ববর্তীটির তুলনায় ৭ লাখ কম; এবং আরও বলা হয়েছে, যদি এই নথিপত্রগুলোর সাক্ষ্যকে অকার্যকর করার মতো কোনো প্রমাণ থাকে, তবে তা উপস্থাপন করা উচিত। এ বিষয়ে, পৃথকভাবে উভয় হিসাবের সত্যতা স্বীকার করে নিয়েও, এদের বিষয়বস্তু দেখে প্রাথমিকভাবে যে সিদ্ধান্ত টানা হয়, আমরা তা মেনে নিতে পারি না; কারণ প্রথম রাজস্ব তালিকাটির বিবরণ ওড়িশার সেই সমস্ত ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা তখন বাংলার সাথে যুক্ত ছিল; অন্যদিকে, দ্বিতীয়টির তকসিম বা বিভাগীয় বিন্যাসে ক্ষুদ্রতর সুবা-র (lesser soubah) কেবল একটা ছোট অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা হিজলি ও বালেশ্বরের চাকলা গঠন করেছিল; এর ফলে ১৭২৮ সালে সুজা খানের করা বন্দোবস্তের পরিমাণ মুঘল সম্রাটের (প্রায় ১৫০ বছর আগে করা) বন্দোবস্তের তুলনায় ৭ লক্ষ কম হওয়ার পরিবর্তে ৩১ লক্ষ বেশি বলে সাব্যস্ত হয়। তুলনামূলক রাজস্ব মূল্যায়নের প্রশ্নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত — সমসাময়িক বা পরবর্তী সময়ে অর্থের আপেক্ষিক মূল্য সংক্রান্ত — আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকেও একইভাবে যুক্তিযুক্ত ও সুদৃঢ় নীতির ভিত্তিতে বিচার করতে হয়; তবে তা নির্ভর করে।।। [পৃষ্ঠা ১৭২, ১৭৩ অনুপস্থিত] ।।।এতে ছিল দেশের ১৯টি বৃহত্তর অংশ — যা আমাদের কাউন্টি বা জেলার ধারণার অনুরূপ — এবং ৬৮২টি ক্ষুদ্রতর মহল বা স্বতন্ত্র জেলা, যার মোট রাজস্ব মূল্যমান ছিল প্রায় ১ কোটি ৭ লক্ষ টাকা। ১৬৫৮ সালে শাহজাহানের রাজত্বকালের সমাপ্তিলগ্নে — বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে যেমনটা জানা যায় — প্রথমোক্ত বিভাগের সংখ্যা বেড়ে ৩৪-এ দাঁড়ায় (যদিও আয়তনের অনুপাতে সেই বৃদ্ধি ঘটেনি); এর কারণ ছিল হিজলি থেকে বালেশ্বর পর্যন্ত ওড়িশার সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল সংযোজন এবং আসামের দিকে নতুন ভূখণ্ড জয় ইত্যাদি। অন্যদিকে, এই সংযোজন এবং প্রাচীন পরগনা-গুলোর ১৯টি উপবিভাগের ফলে শেষোক্ত বিভাগের (ক্ষুদ্রতর মহলের) সংখ্যা বেড়ে ১,৩৫০-এ পৌঁছায়, যা থেকে তখন প্রায় ১ কোটি ৩১ লক্ষ টাকা রাজস্ব পাওয়া যেত। ১৭২২ সালে জাফর খানের শাসনকাল ও মুহাম্মদ শাহের রাজত্বকালে — দিল্লিতে প্রেরিত বার্ষিক হিসাব সমন্বয়ের প্রয়োজনে খালসা নথিপত্রে যদিও সেই একই সরকার বা প্রশাসনিক বিভাগগুলো বজায় রাখা হয়েছিল — তবুও সেগুলোকে তখন অনেক মুসলমান আমিলদার বা তত্ত্বাবধায়কের পৃথক প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে পরিচালনা করাটা অত্যধিক ব্যয়বহুল বা অকার্যকর বলে মনে করা হয়। তাই পরবর্তীকালে সেগুলোকে একত্রিত করে ১৩টি চাকলা বা বৃহত্তর ফৌজদারি প্রশাসনিক অঞ্চলে রূপান্তর করা হয়; একইসাথে ক্ষুদ্রতর জেলার সংখ্যা বাড়িয়ে ১,৬৬০ করা হয়, যার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত রাজস্ব মূল্যমান ছিল প্রায় ১ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা। বাংলায় রাজকীয় ভূ-রাজস্ব বিন্যাসের ক্ষেত্রে এটাই ছিল সর্বশেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। এটাই হলো সেই মূল ভিত্তি ও উপাদান যা বর্তমানে সমগ্র দেশের আসল তুমার জমা (Ausıl Toomar Jumina) নামে পরিচিত — যাকে এতদিন সর্বজনীনভাবে এবং মারাত্মকভাবে টোডর মল (Toorel Mull)-এর প্রবর্তিত সেই বিখ্যাত আদি রাজস্ব-তালিকা (rent-roll) বলে ভুল করা হয়েছে। চাকলা (chucklahs) বা প্রশাসনিক অঞ্চল অনুযায়ী বিন্যস্ত এর একটা সারসংক্ষেপ ইতিপূর্বে উল্লিখিত বন্দোবস্তের পরিকল্পনায় (Plan of settlement) উপস্থাপন করা হয়েছিল; তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এর বিস্তারিত বিবরণ তখন প্রকাশ করা হয়নি। কারণ, সেই বিবরণ প্রকাশিত হলে সম্ভবত ওই প্রকাশনায় পরিলক্ষিত ভুলটি এবং একই নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে প্রকাশিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভুলগুলোও এড়ানো সম্ভব হতো।
জাগির (jagheer) ও খালসা (khalsa) — এই দুই ভাগে জমির বণ্টন ব্যবস্থা মূলত পূর্বোল্লিখিত বিভাগগুলোর অধীন বা সেগুলোর দ্বারাই সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। প্রথমোক্ত বিভাগের (জাগির) আওতায়, আকবরের আমলে নির্ধারিত ভূখণ্ডের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ প্রাদেশিক বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসন পরিচালনার ব্যয়নির্বাহের জন্য সাময়িক বন্দোবস্তে বরাদ্দ করা হয়েছিল। শাহজাহানের শাসনামলে এ ধরনের হস্তান্তরিত রাজস্বের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকলেও, তৎকালীন বর্ধিত মোট রাজস্বের তুলনায় এর অনুপাত ছিল মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু জাফর খানের শাসনামলে এই জাগির বরাদ্দের পরিমাণ ও মূল্য কমিয়ে সেই সময়ের সংশোধিত তুমার জমা-র এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে আনা হয়। অন্যদিকে, সুবার অবশিষ্ট বা খালসা অংশ — যা কোম্পানির শাসনকাল শুরুর পূর্ব পর্যন্ত বার্ষিক বন্দোবস্ত বা প্রথাগত রাজস্ব চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল — তা অসংখ্য এহতমাম (eahtimams) বা জমিদারির এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় বিভক্ত ছিল। এই এলাকাগুলোর আয়তন বা গুরুত্ব নির্ভর করত সংশ্লিষ্ট ভূস্বামীদের প্রভাব বা সক্ষমতার ওপর। এদের মধ্যে রাজশাহী, বর্ধমান, দিনাজপুর, নদীয়া, বীরভূম ও কলকাতার জমিদারিগুলো ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য; কারণ চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত রাজস্ব-তালিকা অনুযায়ী হিসাব করলে দেখা যায়, জমির এই বিভাগের প্রায় অর্ধেক অংশই ছিল এই কয়েকটি জমিদারির অন্তর্ভুক্ত। ২ডি।- বাংলার বড় ও ছোট জেলাগুলোর — তা সে চাকলা, সরকার, পরগনা, জায়গির, খালসা বা জমিদারি — একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন বা বিন্যাস কেবল আবওয়াব বা আনুপাতিক কর-নির্ধারণের মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব। মুঘল সম্রাটদের নির্ধারিত মূল রাজস্ব বা আসল-ই-তুমার-এর অতিরিক্ত হিসেবে বর্তমান শতাব্দীর শুরু থেকে প্রাদেশিক প্রতিনিধিরা এই আবওয়াব আদায় করা শুরু করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, এই নতুন করগুলো ছিল হয় প্রাচীন সামরিক সেবার বিনিময়ে ধার্যকরা একটা পরিমিত অর্থ, অথবা সরকারের বর্ধিত ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় এক সংযোজন — যা মুদ্রার (ধাতব মুদ্রা) অস্বাভাবিক ও বিপুল আমদানির ফলে তার মান কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আরোপ করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল — যথাযথ নির্ভুলতার সাথে — ভূমির বার্ষিক উৎপাদনের অংশ হিসেবে শাসক ও প্রজাদের জন্য নির্ধারিত হিস্যা বা বরাদ্দের পরিমাণকে মূল প্রাক্কলনের মানদণ্ড অনুযায়ী বজায় রাখা। তবে এই করগুলোর নাম, প্রয়োগ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভিন্নতা ছিল; কোনোটি সমগ্র প্রদেশজুড়ে কার্যকর ছিল, আবার কোনোটি কেবল নির্দিষ্ট কিছু জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; এবং এগুলি নির্বিচারে রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে অথবা ক্ষমতাপাওয়া ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ব্যয় নির্বাহের কাজে লাগানো হতো।
টিকা কিস্তি ৭৪
এই অনুচ্ছেদে গ্রান্ট দুটি মৌলিক প্রশ্নে আলোকপাত করেছেন — ভূমিস্বত্বের প্রকৃতি এবং প্রকৃত ভূমি-রাজস্বের বোঝা। তিনি দেখান যে, এক পক্ষের দাবি অনুযায়ী জমি জমিদার ও দেশীয় শ্রেণির সম্পত্তি, আর সরকার কেবলমাত্র নিট উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট অংশ (কুইট-রেন্ট/খিরাজ/ল্যান্ড ট্যাক্স) পায়। অথচ মুঘল শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌম শাসককেই ভূমির প্রকৃত ও একমাত্র মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতো — তিনি মোট উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশ কর হিসেবে আদায়ের অধিকারী ছিলেন। জমিদাররা ছিলেন কেবল বার্ষিক চুক্তিবদ্ধ কৃষক বা কর আদায়কারী, যারা কমিশন ও পারিবারিক ভরণপোষণের জন্য কিছু অংশ পেতেন। গ্রান্ট সতর্ক করেছেন — এই মৌলিক নিয়মগুলো পরিবর্তন করা বিপজ্জনক ও অসাংবিধানিক হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্নে তিনি টোডর মলের আদি তুমার জমার সঙ্গে আধুনিক বন্দোবস্তের তুলনা করেছেন। তিনি দেখান যে, ১৭২৮ সালের তালিকা আসলে ১৭২২ সালে জাফর খানের শাসনামলে করা সংস্কারের ফল — যেখানে ওড়িশার উপকূলীয় অঞ্চল সংযোজিত হয় এবং চাকলা ব্যবস্থায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করা হয়। সেই কারণেই পরিমাণ ৭ লক্ষ কম নয়, বরং ৩১ লক্ষ বেশি। তিনি আক্ষেপ করেন যে, এই সংস্কারের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়নি, যার ফলে টোডর মলের নামে একটি ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
টিকা ১
১. টোডর মল (Todar Mal): আকবরের রাজস্বমন্ত্রী। ১৫৮২ সালে তাঁর প্রবর্তিত তুমার জমা (Toomar Jumma) বা রাজস্ব-তালিকা মুঘল ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। তবে গ্রান্ট দেখান যে, বাংলার ক্ষেত্রে প্রকৃত আসল তুমার জমা (Ausıl Toomar Jumma) আসলে ১৭২২ সালে জাফর খানের সংস্কারের ফসল — টোডর মলের নয়।
২. তুমার জমা (Toomar Jumma): মুঘল আমলে ভূমি-রাজস্বের নির্ধারিত তালিকা বা বন্দোবস্ত। “তুমার” অর্থ নির্ধারিত বা স্থির, “জমা” অর্থ মোট আদায়। এটি ছিল রাজস্ব নির্ধারণের মূল নথি।
৩. চাকলা (Chucklah): মুঘল প্রশাসনিক বিভাগ। ১৭২২ সালে জাফর খান বাংলার ১৯টি সরকারকে একত্রিত করে ১৩টি চাকলায় রূপান্তর করেন — যা পরবর্তীতে ফৌজদারি প্রশাসনের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
৪. খালসা দপ্তর: রাজস্ব ও হিসাব সংক্রান্ত সরকারি দপ্তর। দিল্লিতে বার্ষিক হিসাব সমন্বয়ের জন্য এই দপ্তরের নথিপত্র ব্যবহার করা হতো।
৫. আমিলদার: রাজস্ব আদায়কারী বা স্থানীয় রাজস্ব কর্মকর্তা। ১৭২২ সালের সংস্কারের আগে প্রতিটি সরকার বা প্রশাসনিক বিভাগ আলাদা আমিলদারের অধীনে পরিচালিত হতো, যা ব্যয়বহুল ছিল।
৬. রাজা উপাধিপাওয়ারা: বাংলার বিশিষ্ট ভূমিমালিকদের মধ্যে যারা “রাজা” উপাধি পেয়েছিলেন। গ্রান্ট তাদের মর্যাদাকে জার্মান সাম্রাজ্যের সামন্ত রাজাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
৭. নর্দার্ন সারকার (Northern Circars): ভারতের পূর্ব উপকূলের একটি অঞ্চল। ১৭৮৪ সালের ডিসেম্বরে এই অঞ্চল সংক্রান্ত রাজনৈতিক জরিপে সার্বভৌম শাসককেই ভূমির প্রকৃত মালিক বলে ঘোষণা করা হয়।
৮. কুইট-রেন্ট (Quit-rent): জমিদারদের সরকারকে দেওয়া নামমাত্র ভূমি-কর। গ্রান্ট এটিকে “ট্রিবিউট” বা “ল্যান্ড ট্যাক্স” নামেও অভিহিত করেছেন। মূল উদ্দেশ্য প্রকৃত রাজস্ব আদায় নয়, জমির উপর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা।
৯. প্রজাস্বত্ব: জমির উপর প্রজার অধিকার। গ্রান্ট দেখান যে, সার্বভৌম শাসকই প্রকৃত মালিক হলে প্রজা ও জমিদারের অধিকার হবে সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ।
১০. পারস্পরিক নির্ভরতার শৃঙ্খল: গ্রান্টের মতে, জমিদার, শাসক ও কৃষক — এই তিন শ্রেণির অধিকার একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। একটির সীমানা নির্ধারণ করলে অন্যটিরও সীমানা নির্ধারিত হয়। অন্যথায় স্বৈরতন্ত্রের সর্বোচ্চ সীমা বা দাসত্বের সর্বনিম্ন অবস্থা অনির্দিষ্ট থেকে যায়।
টিকা ২
“মীমাংসা পরিকল্পনা বা প্ল্যান অফ সেটলমেন্ট-এর ১৬৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত বিষয়গুলোর সমর্থনে দুটো নথিপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে”
মীমাংসা পরিকল্পনা বা প্ল্যান অফ সেটলমেন্ট হলো ব্রিটিশ আমলে বাংলার ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার একটি প্রস্তাবিত পরিকল্পনা-নথি, যেখানে জমিদারি বন্দোবস্ত, রাজস্ব নির্ধারণ ও ভূমিস্বত্ব সংক্রান্ত নীতিমালা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এর ১৬৭ পৃষ্ঠায় আকবরের শাসনামলের রাজস্ব-তালিকা ও ১৭২৮ সালের তালিকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে — যা গ্রান্ট তাঁর যুক্তির সমর্থনে উপস্থাপন করেছেন।
গ্রান্ট এখানে দুটি নথির কথা বলেছেন:
১। আকবরের আমলের রাজস্ব-তালিকা (রেন্ট-রোল): ১৫৮২ সালে টোডর মলের প্রবর্তিত তুমার জমা অনুযায়ী নির্ধারিত রাজস্বের তালিকা।
২। ১৭২৮ সালের তালিকা: মুহাম্মদ শাহের রাজত্বকালে জাফর খানের সংস্কারের পর প্রস্তুতকৃত রাজস্বের তালিকা।
গ্রান্ট দেখান যে, ১৭২৮ সালের তালিকা আকবরের তালিকার চেয়ে ৭ লক্ষ টাকা কম দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ৩১ লক্ষ টাকা বেশি — কারণ প্রথম তালিকায় ওড়িশার উপকূলীয় অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা দ্বিতীয় তালিকায় ছিল না। এই তুলনার মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, রাজস্বের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে যেসব দাবি করা হয়, সেগুলো ভুল বা বিভ্রান্তিকর।
দুই পক্ষ কারা? এক পক্ষ (মূল বইয়ের ১৬৩-৪ পৃষ্ঠা): যারা দাবি করে — জমি জমিদার ও দেশীয় শ্রেণির সম্পত্তি, সরকার কেবল কুইট-রেন্ট/খিরাজ/ল্যান্ড ট্যাক্স পায়। আর অন্য পক্ষ (গ্রান্ট নিজে): যারা দেখায় — মুঘল শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌম শাসকই ভূমির প্রকৃত মালিক; জমিদাররা কেবল কর আদায়কারী।
গ্রান্টের যুক্তি হলো — এই দুই পক্ষের “মীমাংসা” বা নিষ্পত্তি প্রয়োজন, কারণ এখানে সার্বভৌমত্ব, প্রজাস্বত্ব ও সম্পত্তির অধিকার জড়িত। এই মীমাংসার জন্যই “প্ল্যান অফ সেটলমেন্ট” বা মীমাংসা পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছিল, যেখানে দুই পক্ষের যুক্তি ও প্রমাণ খোলাখুলি আলোচনার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
দুটি নথিপত্র কোনটি? গ্রান্ট এখানে যে দুটি নথির কথা বলেছেন: প্রথম নথি: আকবরের শাসনামলে নির্ধারিত প্রদেশগুলোর রাজস্বের তালিকা (আদি তুমার জমা) দ্বিতীয় নথি: ১৭২৮ সালের রাজস্বের তালিকা (জাফর খানের সংস্কারের পর)
এই দুটি নথির তুলনা করে গ্রান্ট দেখান যে — আকবরের তালিকা ও ১৭২৮ সালের তালিকার মধ্যে পার্থক্য ৭ লক্ষ টাকা কম দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ৩১ লক্ষ টাকা বেশি। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন:
১। প্রথম তালিকায় ওড়িশার উপকূলীয় অঞ্চল (হিজলি থেকে বালেশ্বর) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২। দ্বিতীয় তালিকায় কেবল ক্ষুদ্রতর সুবার একটি অংশ ছিল।
৩। ১৭২২ সালে জাফর খানের সংস্কারে ১৯টি সরকারকে ১৩টি চাকলায় রূপান্তর করা হয় এবং ক্ষুদ্রতর জেলার সংখ্যা ১,৩৫০ থেকে ১,৬৬০-এ উন্নীত করা হয় — যা পরবর্তীতে “আসল তুমার জমা” নামে পরিচিত হয়।
গ্রান্ট এই তুলনার মাধ্যমে দুটি বিষয় প্রমাণ করতে চেয়েছেন: প্রথমত: বাংলার রাজস্বের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে যেসব দাবি করা হয়, সেগুলো ভুল বা বিভ্রান্তিকর — কারণ টোডর মলের নামে প্রচলিত তালিকাটি আসলে ১৭২২ সালের জাফর খানের সংস্কারের ফসল। দ্বিতীয়ত: রাজস্বের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করতে হলে আকবরের আদি তালিকা ও ১৭২৮ সালের তালিকার মধ্যে সঠিক তুলনা প্রয়োজন — যা “প্ল্যান অফ সেটলমেন্ট”-এর ১৬৭ পৃষ্ঠায় করা হয়েছে।
অতয়েব মীমাংসা পরিকল্পনা বা প্ল্যান অফ সেটলমেন্ট হলো বাংলার রাজস্ব বন্দোবস্ত পুনর্গঠনের একটি প্রস্তাবনা। গ্রান্ট এর ১৬৭ পৃষ্ঠায় দুই পক্ষের যুক্তির তুলনা করে দুটি নথি — আকবরের রাজস্ব-তালিকা ও ১৭২৮ সালের তালিকা — উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল প্রমাণ করা যে, টোডর মলের নামে প্রচলিত রাজস্বের পরিমাণ আসলে ১৭২২ সালের জাফর খানের সংস্কারের ফল, এবং প্রকৃত তুলনা করলে তা কম নয়, বরং ৩১ লক্ষ টাকা বেশি।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ