
“শরৎবাবু, খোলা চিঠি দিলাম তোমাকে,
তোমার গফুর, তোমার মহেশ কোথায়, কেমন আছে?
হারিয়ে গেছে তোমার আমিনা
তুমি জান না।”
সময় পেরিয়ে যায়, মানুষ চলে যায়, কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর সৃষ্টি সময়ের সীমানা অতিক্রম করে বারবার ফিরে আসে মানুষের কাছে। কখনও গল্পের চরিত্র হয়ে, কখনও গানের সুর হয়ে, কখনও বা বিবেককে প্রশ্ন করা এক তীব্র উচ্চারণ হয়ে। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং সঙ্গীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা — দুই ভিন্ন যুগের দুই স্রষ্টা — তাঁদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এমনই এক মানবিক সেতুবন্ধন রচনা করেছেন, যার কেন্দ্রে রয়েছে শোষিত, বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের জীবনকথা।
শরৎচন্দ্রের সার্ধশতবর্ষ এবং ভূপেন হাজারিকার শতবর্ষ পূর্তি তাই নিছক দুটি জন্মজয়ন্তীর স্মরণ নয়; বরং তাঁদের শিল্পচেতনা, মানবতাবাদ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে নতুন করে উপলব্ধি করার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমন এক কথাশিল্পী, যিনি সমাজের প্রান্তিক মানুষের দুঃখ-বেদনা, অভাব-অনটন, প্রেম-বিরহ, সামাজিক বৈষম্য ও মানুষের অসহায়ত্বকে অত্যন্ত সহজ অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন। তাঁর ‘মহেশ’ গল্প তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
‘মহেশ’-এর গফুর, তার ছোট মেয়ে আমিনা এবং বৃদ্ধ বলদ মহেশ — এই তিনটি চরিত্রের জীবনযন্ত্রণা আসলে একটি বৃহত্তর সমাজবাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মহেশ শুধু একটি গৃহপালিত পশু নয়; সে গফুরের সংসারের জীবিকা, তার ভালোবাসা, তার অসহায় জীবনের নীরব সঙ্গী। কিন্তু চরম দারিদ্র্য, খরা, অনাহার এবং সামাজিক অবহেলার চাপে সেই সম্পর্কও একসময় ভেঙে পড়ে। মহেশের জন্য সামান্য খাবার জোগাড় করাও যখন গফুরের পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে, তখন তার অসহায়ত্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। নিজের সন্তান আমিনার মুখে অন্ন তুলে দিতে পারে না যে মানুষ, সে কীভাবে তার প্রিয় মহেশকে বাঁচাবে? এই প্রশ্নের মধ্যেই শরৎচন্দ্র তুলে ধরেছেন দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা। গল্পের পরিণতি পাঠকের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। অনাহার, অপমান ও চরম মানসিক যন্ত্রণার এক অসহ্য মুহূর্তে গফুরের হাতে অনিচ্ছাকৃতভাবে মহেশের প্রাণ যায়। প্রিয় পশুকে হারিয়ে ও ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করে শেষ পর্যন্ত ছোট মেয়ে আমিনাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে ফুলবেড়ের চটকলে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হয় গফুর। এটি শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয় — এ যেন একজন দরিদ্র মানুষের স্বপ্ন, মমতা এবং শেষ আশ্রয়টুকু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার এক মর্মান্তিক দলিল।
শরৎচন্দ্রের গল্প যেখানে থেমে যায়, ভূপেন হাজারিকার গান যেন সেখান থেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে। তিনি শরৎচন্দ্রকে উদ্দেশ করে এক কাল্পনিক চিঠির ভাষায় জানতে চান —
“তোমার গফুর, তোমার মহেশ এখন কোথায় আছে?
হারিয়ে গেছে তোমার আমিনা — তুমি জান না!”
এই প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সময়কে অতিক্রম করা এক গভীর মানবিক বোধ। শরৎচন্দ্র যে সমাজের ছবি এঁকেছিলেন, ভূপেন হাজারিকা সেই সমাজের প্রতিধ্বনি শুনেছেন পরবর্তী সময়ে। গানটির রচয়িতা শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের গল্পের অন্তর্নিহিত বেদনার সঙ্গে সমকালীন সমাজবাস্তবতার একটি সেতু তৈরি করেছিলেন। আর ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠ সেই সেতুকে পৌঁছে দিয়েছিল মানুষের হৃদয়ে। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গানটিতে ‘গফুর’ ও ‘আমিনা’ কেবল একটি গল্পের চরিত্র নয়; তারা হয়ে উঠেছে যুগে যুগে অবহেলিত মানুষের প্রতীক।
শরৎচন্দ্র ছিলেন কথাশিল্পী, ভূপেন হাজারিকা ছিলেন সুর ও কণ্ঠের শিল্পী। একজন কলম দিয়ে মানুষের কথা বলেছেন, অন্যজন গান দিয়ে সেই কথাকে পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের ঘরে ঘরে। তাঁদের প্রকাশের মাধ্যম আলাদা হলেও তাঁদের শিল্পের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। শরৎচন্দ্রের সাহিত্য সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবনকে পাঠকের সামনে উন্মোচিত করেছে। ভূপেন হাজারিকার গানও একইভাবে দরিদ্র, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাঁর সৃষ্টিতে বারবার ফিরে এসেছে সাম্য, মানবতা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা। এই কারণেই শরৎচন্দ্র ও ভূপেন হাজারিকার মধ্যে সরাসরি কোনো সাহিত্যিক বা সাংগীতিক সম্পর্ক না থাকলেও তাঁদের সৃষ্টির অন্তর্নিহিত মানবিক সুর এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়।
শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ অতীতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের গল্প হলেও তার প্রশ্নগুলি আজও প্রাসঙ্গিক। সমাজে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনা আমাদের চোখের সামনে উপস্থিত, তখন শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পটি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
আজকের ‘গফুর’ হয়তো একই নামে পরিচিত নয়। আজকের ‘আমিনা’ও হয়তো শরৎচন্দ্রের গল্পের আমিনা নয়। কিন্তু অনাহারী শিশু, অসহায় কৃষক, জীবিকার অনিশ্চয়তায় থাকা পরিবার কিংবা সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া মানুষ — তাঁদের জীবনে সেই পুরোনো প্রশ্নগুলি এখনও ফিরে আসে। শরৎচন্দ্র তাই শুধু তাঁর সময়ের লেখক নন। তাঁর সাহিত্য আমাদের বর্তমানকেও প্রশ্ন করে। একইভাবে ভূপেন হাজারিকার গান শুধু তাঁর সময়ের গান নয়; মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি যতদিন থাকবে, তাঁর মানবিক সুরও ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোই শিল্পের সার্থকতা।
একজন লেখক যখন সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা লেখেন এবং একজন শিল্পী যখন সেই মানুষের বেদনা ও আকাঙ্ক্ষাকে কণ্ঠ দেন, তখন শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম থাকে না — তা হয়ে ওঠে সামাজিক চেতনার বাহন। শরৎচন্দ্র তাঁর লেখায় সমাজের অন্তর্লীন অসুখকে দেখিয়েছেন। ভূপেন হাজারিকা তাঁর গানে মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলেছেন। তাঁদের সৃষ্টির মধ্যে তাই একটি গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।
আজকের দিনে যখন প্রযুক্তি ও অনলাইন মাধ্যম মানুষের জীবনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে, তখনও সত্যিকারের শিল্পের আবেদন মুছে যায়নি। বরং নতুন মাধ্যমের মধ্য দিয়েই পুরোনো সৃষ্টি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ এবং ভূপেন হাজারিকার মানবিক গান সেই ধারাবাহিকতারই উদাহরণ।
সার্ধশতবর্ষে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে স্মরণ করা মানে শুধু তাঁর জন্মদিন পালন নয়; তাঁর সাহিত্য যে মানবিক মূল্যবোধের কথা বলে, তাকে নতুন করে আত্মস্থ করা। একইভাবে ভূপেন হাজারিকার শতবর্ষ উদ্যাপন মানে শুধু তাঁর গান শোনা নয়; তাঁর গানের অন্তর্নিহিত মানবপ্রেম, সাম্যবোধ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে উপলব্ধি করা।
দুই শিল্পীর সৃষ্টিকে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে — সময়ের পরিবর্তন হলেও মানুষের মৌলিক দুঃখ, বঞ্চনা এবং ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা খুব বেশি বদলায় না। তাই শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ আজও আমাদের চোখে জল আনে, আর ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে সেই মহেশ, গফুর ও আমিনার কথা আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। শরৎচন্দ্রের কলম এবং ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠ — দুটি ভিন্ন স্রোত। কিন্তু সেই দুই স্রোত এসে মিশেছে একই মানবিক মোহনায়।
সার্ধশতবর্ষে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শতবর্ষে সুরসম্রাট ভূপেন হাজারিকার অমর সৃষ্টির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।