
[এই অনুচ্ছেদে গ্রান্টের দৃষ্টিভঙ্গীতে ঔপনিবেশিক বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটি ও তার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গ্রান্টের মূল বক্তব্য হলো — ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী শ্রেণির ওপর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার একচেটিয়া দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিল, যা ছিল একটি ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত। স্থানীয় মধ্যসত্ত্বভোগীরা শাসক ও কৃষকের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করলেও তারা নিজেদের স্বার্থে রাজস্বের প্রকৃত পরিমাণ, আদায় পদ্ধতি ও হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে ইউরোপীয় তত্ত্বাবধায়কদের বিভ্রান্ত করে। মিনিট লেখক, গ্রান্টের দাবি, বাংলার বর্তমান রাজস্ব কাঠামোটি শুরু থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল; এটি আসলে একটি বাহ্যিক আবরণ, যার আড়ালে স্থানীয়দের দুর্নীতি, চাতুর্য ও স্বার্থসিদ্ধি লুকিয়ে ছিল। দেওয়ানি লাভের পর টানা সাত বছর রাজস্ব পরিচালনার একক দায়িত্ব স্থানীয় হিন্দুস্তানি কর্মকর্তাদের হাতে থাকায় তারা বিচারক ও বিবাদী — উভয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনা কঠিন ছিল, কারণ তৎকালীন ইউরোপীয় আইনি মানদণ্ডে তা প্রমাণ করা সম্ভব ছিল না। লেখক আরও উল্লেখ করেন, ১৭৭৩ সালের পার্লামেন্টের গোপন কমিটির তথ্যভাণ্ডার ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য এই ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রমাণ করে। যদিও দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল বিশ্বাস পরিবর্তন করা কঠিন, তবুও সত্য উদ্ঘাটনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত। একটি অসম্পূর্ণ প্রচেষ্টাও ভবিষ্যতে যোগ্য ব্যক্তিদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। সবশেষে, লেখক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীরা কোম্পানিকে মারাত্মকভাবে প্রতারিত করেছে এবং রাজস্ব নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতামতকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ছিল এক বড় ভুল।]
এ কথা সত্য যে, এ দেশের স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি — যারা শাসক ও কৃষকের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাষ্ট্রের জমিদারি বা ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে — তাদের ক্ষেত্রে এই আইন মূলত আইনসভার মানবিক ও উদার উদ্দেশ্যেরই প্রতিফলন। এই উদ্দেশ্যের লক্ষ্য হলো — ভারতের সংবিধানসম্মত ন্যায়বিচারের নীতির ভিত্তিতে — তাদের সেইসব পদমর্যাদা বা ভোগদখলীয় অধিকার পুনরুদ্ধার ও সুদৃঢ়ভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা (যার মধ্যে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক এখতিয়ার বা প্রাচীন ও সুনিশ্চিত বিশেষ সুবিধাসমূহ), যা থেকে ব্রিটিশ শাসনামলে তারা হয়তো বেআইনিভাবে বঞ্চিত হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোম্পানিকে পাঠানো নির্দেশে অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ও বাধ্যতামূলকভাবে বলা হয়েছে: অভিযোগ বা অনুমিত অবিচারের সত্যতা প্রমাণিত হলে অবিলম্বে তার প্রতিকার করতে হবে। তাই, প্রস্তাবিত কার্যক্ষেত্রে এই আইন কার্যকর হওয়ার মুহূর্ত থেকেই এর সুদূরপ্রসারী ও কল্যাণকর উদ্দেশ্যগুলো পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হবে বলে যৌক্তিকভাবেই আশা করা যায়।
সুতরাং, এমন একটা তদন্ত প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা — যার উদ্দেশ্য যেমন অত্যন্ত প্রশংসনীয়, তেমনি এর বাস্তবায়নও অত্যন্ত ব্যাপক ও কঠিন এক কাজ — কেবলমাত্র প্রশাসনিক বা নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিদেরই দায়িত্ব নয়; বরং একই সম্প্রদায়ের প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব — তা তিনি ব্যক্তিগত বা সরকারি যে অবস্থানেই থাকুন না কেন। কারণ, তারা নিজেদের বা অন্যদের অভিজ্ঞতার আলোকে এমন একটা বিষয়ে সামান্যতম আলোকপাতও করতে পারেন, যা ব্রিটিশ জাতির স্বার্থ, মর্যাদা ও সম্মানের সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত। সাধারণভাবে ভারতীয় অর্থব্যবস্থা — এবং বিশেষত নর্দার্ন সরকার Northern Circars অঞ্চল — সংক্রান্ত পূর্ববর্তী আলোচনায় যে সহনশীলতা ও মনোযোগ প্রদর্শিত হয়েছিল, তাতে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে আমি নতুন করে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণের ফল তুলে ধরার সাহস করছি। সরকারের পক্ষে এবং তাদের সুনির্দিষ্ট অনুমোদনে সংগৃহীত সুবা-ই-বাংলার (বাংলা সুবার) নির্ধারিত রাজস্বের প্রকৃতি, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং এর অতীত ও বর্তমান পরিমাণ — এসব বিষয় এবার আরও বিশদ ও গভীর তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করাই আমার এই প্রয়াসের লক্ষ্য।
অন্যদের মনে আমার নিজস্ব মতের প্রতি সত্যতা সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মানোর আকাঙ্ক্ষা — তা যতই গুরুত্বপূর্ণ বা যথার্থ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠুক না কেন — ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ এক আশা; এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত জোরালো অনুপ্রেরণার প্রয়োজন ছিল। কারণ, অজ্ঞতাপ্রসূত ভুল ব্যাখ্যার অপবাদ পাওয়ার ভয় — এমনকি নিজের উদ্দেশ্যের সততা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকার আত্মবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও — বর্তমান জনপ্রিয় বিশ্বাসের বিরোধিতা করার কাজে আমাকে নিরুৎসাহিত করতে পারত। বাগ্মিতার জাদুতে — যেখানে আংশিক সত্য কিন্তু ভুল প্রয়োগকরা কোনো পরিচিত তত্ত্বকে তুলে ধরা হয়েছে — সেই বিশ্বাসটি গত দশ বছরে ক্রমশ প্রাধান্য বিস্তার করেছে। অথচ এর বিপরীতে ছিল ১৭৭৩ সালে গঠিত পার্লামেন্টের গোপন কমিটির সেই প্রামাণিক তথ্যভাণ্ডার, যা এ দেশের অর্থ বিভাগের উচ্চপদস্থ ও অত্যন্ত দক্ষ, সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মৌখিক বা লিখিত সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। এই ব্যক্তিরা স্থানীয় প্রশাসনের সাংবিধানিক কাঠামো সম্পর্কে তাঁদের তাত্ত্বিক জ্ঞান আহরণ করেছিলেন পূর্ববর্তী মুসলিম সরকারের প্রকৃত কার্যপদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করে — যাদের থেকেই তাঁরা সরাসরি শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন — তাই অনুসন্ধানের সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদেরই সবচেয়ে ভালোভাবে অবহিত বলে ধরে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত। এমতাবস্থায়, দেওয়ানি লাভের পর অতিবাহিত বিশ বছরের কথিত অভিজ্ঞতা, কোম্পানির বিশাল নথিপত্র এবং অনেক সম্মানিত ব্যক্তির সুচিন্তিত সাক্ষ্য — যা সুপ্রতিষ্ঠিত তথ্যের সমর্থনহীন কেবলই ব্যক্তিগত মতামত ছিল — সেসবই যদি আমার অবস্থানের বিরুদ্ধে যেত, তবুও আমি দৃঢ়ভাবে দাবি করতাম — এবং আজও করব — যে বাংলায় রাজস্ব আদায়ের বর্তমান ব্যবস্থাটি শুরু থেকেই ভুল ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছিল; এটা ছিল মৌলিকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ এবং এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অথচ সত্যকে নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধানের সদিচ্ছা ও সাধারণ বুদ্ধিমত্তা থাকলেই এর নীতিগত ভুল প্রমাণ করা এবং ব্যবস্থাটি সংশোধন করা সম্ভব। এটা স্থানীয়দের অজ্ঞতা, দুর্নীতি ও চাতুর্যের ওপর গড়ে ওঠা এক ভিত্তিহীন কাঠামো; যার উদ্দেশ্য ছিল মূল কাঠামোর সুসামঞ্জস্য, সুবিধা ও সরলতাকে সাধারণ মানুষের অগভীর দৃষ্টির আড়ালে রাখা — বা হয়তো শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে ফেলা। বাইরের দৃষ্টি থেকে একে অদক্ষভাবে আড়াল করা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি জানার সোনার চাবির প্রথম ও একমাত্র রক্ষকদের দেওয়া বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে — যা বিদেশি শাসকদের সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল — এটাকে ভারতীয় অর্থব্যবস্থার এক সুদৃঢ় ও খাঁটি কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমনটি তুলে ধরা হয়েছিল, এটাকে সর্বতোভাবে তেমনই বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল; এবং যেহেতু এটাকে পুরোপুরি ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলা অত্যন্ত বিশাল বা ব্যয়বহুল কাজ বলে মনে করা হয়েছিল, তাই আধুনিক ইওরোপিয় নিখুঁত মানদণ্ড অনুযায়ী এর কেবল সংস্কার ও অভিযোজন করাই সমীচীন বলে বিবেচিত হয়েছিল। দৃশ্যমান ত্রুটি-বিচ্যুতি আড়াল বা সংশোধন করার জন্য সর্বাত্মক উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল; আর এমন দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় সেই বিচিত্র ও আকারহীন স্তূপটি যে এখন একটা অত্যন্ত সুনিপুণ শিল্পকর্ম হিসেবে গণ্য হচ্ছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেবল আক্ষেপের বিষয় এই যে, যারা সর্বোত্তম অভিপ্রায় বা অসাধারণ কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তারা এর অভ্যন্তরীণ রূপটি দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিতই থেকে গিয়েছিলেন; ফলে তারা এটা আবিষ্কার করতে পারেননি যে, তাদের শ্রমের মূল লক্ষ্যবস্তুটি ছিল আসলে একটা বাইরের আবরণ — আবর্জনার এক অমার্জিত স্তূপ — যার উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ পথচারীদের দৃষ্টি থেকে ভেতরের আসল ও সুদৃঢ় কাঠামোটিকে আড়াল করা অথবা কৌতূহলী পর্যবেক্ষকদের কাছে পৌঁছানো কঠিন বা অসম্ভব করে তোলা।
তুলনামূলক আলোচনার ভঙ্গি — যা আমাদের এই রচনার শিরোনাম দ্বারা অনুমোদিত হলেও — এখন বাদ দেওয়া যাক; তবে একথা নিশ্চিত যে, দেওয়ানি লাভের সময় এবং পরবর্তীকালে বাংলার কোম্পানি প্রশাসনের ওপর চতুর স্থানীয়রা যে ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা ও রাজস্ব-হিসাব চাপিয়ে দিয়েছিল — এবং যা প্রায় সর্বজনীনভাবে মেনে নেওয়া বা গৃহীত হয়েছিল — তা আজ হোক বা কাল প্রকাশ পাবেই এবং সর্বজনস্বীকরা হবে। কারণ সত্যের স্বভাবই হলো, যারা সত্য উদ্ঘাটনে আগ্রহী, তাদের সবার মনে শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্ব ও গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা। অবশ্য দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল বিশ্বাসের অনমনীয়তা এতটাই প্রবল হতে পারে যে, ভুল সম্পর্কে সচেতন হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির হতে পারে, যার ফলে কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে এই পরিবর্তন আনার আশা হয়তো সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। কিন্তু কোনো কাজ যদি একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব না-ও হয়, তবুও সেই উদ্যোগটি যদি প্রশংসনীয় এবং বাস্তবায়নটি প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়, তবে তা পুরোপুরি পরিত্যাগ করা উচিত নয়। একটা অমার্জিত বা অসম্পূর্ণ প্রচেষ্টাও যদি ইতিবাচক সাড়া পায়, তবে তা অধিকতর যোগ্য ব্যক্তি এই কাজ হাতে নিতে এবং চূড়ান্ত সাফল্য না আসা পর্যন্ত তা এগিয়ে নিতে অনুপ্রাণিত করতে পারে; আর এই উদ্যোগের সার্থকতা — যা ব্যক্তিগতভাবে হয়তো কোনো প্রতিদান বা স্বীকৃতি বয়ে আনে না কিন্তু জনস্বার্থে অত্যন্ত উপকারী — তা নির্ভর করবে অতিক্রমযোগ্য বাধাগুলোর সংখ্যা ও কাঠিন্যের মাত্রার ওপর।
এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী বিষয় হলো সেই সব পদ্ধতি বা নিয়মকানুন, যা প্রাচীন প্রথা থেকে উদ্ভূত বলে দাবি করা হয়েছিল এবং যা স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে দক্ষতা ও সততার জন্য অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা অনভিজ্ঞ শাসক কর্তৃপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোম্পানি কর্তৃক দেওয়ানি রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভের পর থেকে টানা সাত বছর ধরে কার্যত অবাধে এই রাজস্ব পরিচালনার একক দায়িত্ব তাদের হাতেই ন্যস্ত ছিল। রাজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক পর্যায়ে নিযুক্ত উচ্চপদস্থ হিন্দুস্তানি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকর প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন না হলেও অন্তত অস্বস্তিকর একটা কাজ হতো। এর কারণ কেবল কোনো মুসলমান বা হিন্দুর অনুভূতিতে আঘাত লাগার ভয় নয়; বরং সহানুভূতিশীল বা এদেশের জাতীয় চরিত্র সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিদের দৃষ্টিতে তাদের বিরুদ্ধে ইওরোপিয় মানদণ্ড অনুযায়ী অপকর্ম বা অনিয়ম-এর অভিযোগ আনাটা হয়তো ক্ষতিকর বিবেচিত হতো — বিশেষ করে যখন ইওরোপিয় আইনি প্রমাণের আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে তা হয়তো সমর্থন করা সম্ভব হতো না। এছাড়া, শাসক বা অনুগ্রহ প্রদানকারীদের চোখে কলঙ্কিত হওয়া, অতীতে অন্যায্যভাবে অর্জিত অর্থ ফেরত দেওয়া, বর্তমান ভোগ-বিলাস ত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে আরও অর্থ আত্মসাতের সুযোগ হারানোর মতো পরিণতির আশঙ্কাও এর সাথে জড়িত ছিল। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজের জন্য কেবল এটুকু প্রমাণ করাই যথেষ্ট হতে পারে যে, স্থানীয় ব্যক্তিদের — যারা এতদিন ধরে কার্যত অর্থসংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন — মাধ্যমে আমরা কোনো না কোনোভাবে (অনিচ্ছাকর বা ইচ্ছাকরভাবে) বাংলার বার্ষিক রাজস্ব নির্ধারণের প্রকৃতি, ধরন ও পরিমাণের বিষয়ে মারাত্মকভাবে প্রতারিত হয়েছি। এই মধ্যস্থতাকারীরা নিজেরাই এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পূর্ণ বা নিখুঁতভাবে অবগত ছিলেন, অথচ ইওরোপিয় তত্ত্বাবধায়কদের কাছে সেই তথ্য গোপন রেখেছিলেন। আর যখন সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের মতামতকে চূড়ান্ত বা নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা হয়েছে বা তাদের সাথে পরামর্শ করা হয়েছে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সার্বভৌম শাসকের বিরুদ্ধে একইসাথে বিচারক ও বিবাদী — উভয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এবং নিজেদের সিদ্ধান্তের ফলাফলের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁদের কার্যকলাপকে যথাযথভাবে ও বিচক্ষণতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অপরিহার্য সমস্ত নথিপত্র, হিসাব ও সরকারি নথির পাশাপাশি — রাষ্ট্রের এমন সব গুরুত্বপূর্ণ পদও একই ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত ছিল যা আসলে একে অপরের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিল; অথচ এই সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা তখনো অবাধ ও ব্যাপক অভিজ্ঞতার আলোকে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পাননি। ফলে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁদের কার্যকলাপ ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ