| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ গুরুবাবাদের প্রবঞ্চনা-শোষণ-যৌনতা ও রাজনীতির জম-জমাট রঙ্গ : দিলীপ মজুমদার সিরাত : জীবন খুঁজে দেয় : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘টেবিলের নিচে একটি দেশ’ বানভাসি এলাকায় মানুষ ও সাপের সহাবস্থান, দংশনে বাড়ছে মৃত্যু : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘সংকোচ’ পাখণ্ডী শব্দটির অর্থ যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ লাইন অব প্যাসেজ — সংগ্রামী জীবনের দর্পণ : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কেন উত্তম মহানায়ক : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হড়পা বানের হাড়হিম করা দৃশ্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উত্তম কুমার : বাঙালির সমাজভাষ্য, মূল্যবোধ ও মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় গৈরিক নয়, ‘গৈরেয়’ শব্দটি থেকেই এসেছে ‘গেরুয়া’ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাঙালিয়ানা ও উত্তম কুমার: সংস্কৃতির দর্পণে এক অনন্য মহাকাব্য : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় বিচিত্র লোক সংস্কৃতি — নন্দোৎসবে নারকেল কাড়াকাড়ি : সুব্রত দত্ত গড়িয়াহাট কি ছিল অলস, অকর্মণ্য বলদের হাট : অসিত দাস চলচ্চিত্র অভিনয়ের সংজ্ঞা ছিলেন উত্তম : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার প্রিয় গল্পগুলো : নুসরাত সুলতানা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কবিদের লেখনীতে শরৎ ঋতু : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিঝুম রাতের পাড়ি : সুব্রত দত্ত
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ রাখি পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

গুরুবাবাদের প্রবঞ্চনা-শোষণ-যৌনতা ও রাজনীতির জম-জমাট রঙ্গ : দিলীপ মজুমদার

Reporter
দিলীপ মজুমদার / ১৩৭ Views জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলার ভাগ্যাকাশে সৌভাগ্যের ঘনঘটা। নতুন সরকার এসেছে। ভয় আউট, ভরসা ইন। ধ্বজা উড়েছে হিন্দুত্বের। সনাতনীদের কদর বেড়েছে। গীতার সম্ভবামি যুগে যুগে সার্থক হয়েছে। ননবায়োলজিক্যাল অবতারের সাক্ষাৎ মিলেছে। কেন্দ্রে এবং রাজ্যে। বাবারা এ রাজ্যে আসতে শুরু করেছেন। বাগেশ্বরবাবাকে দিয়ে তার সূত্রপাত। এই বাবাটি বড় বাচ্চা। এই সেদিন ১৯৯৬ সালে বাবার জন্ম। মাত্র তিরিশ বছর বয়েস। বাবা বলতে মন চায় না। কিন্তু না চাইলে তো চলবে না। হনুমানজি বা বাগেশ্বর বালাজির ভক্ত তিনি। অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী। যে মানুষ তাঁর কাছে আসবে। তার ঠিকানাকোষ্ঠী সবই তাঁর জানা। বাবা বাগেশ্বর এলেন বঙ্গে। তাঁর সভায় গেলেন মুখ্যমন্ত্রী। হাসি হাসি মুখ। যেন সব পেয়েছির দেশে এসেছেন। বাবা বললেন, দুর্গাপুজোয় আমিষ যে খায় সে পাখণ্ড। এই কথাটাই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ভজাচ্ছিলেন। অনেকে ঠাট্টা করছিলেন। তাই বাবাকে দিয়ে বলানো হল। ব্যস। আর কোন কথা নেই।

বাগেশ্বরবাবার আসল নাম ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ গর্গ। মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর জেলার গড়াগ্রামে তাঁর জন্ম। দরিদ্র পরিবার। প্রথাগত পড়াশুনো খুব বেশি না হলেও একটা গুণ ছিল। চমৎকার কথকতা করতে পারতেন। সব ধর্মগুরুর মধ্যে এই গুণটি থাকে। মন দিলেন ধর্মব্যবসায়ের দিকে। ভক্তদের মনের কথা পড়ে ফেলার কারবার খুলে বসলেন। মাথায় পাগড়ি আর হাতে রুপোর গদা নিয়ে।

ধর্মের সঙ্গে মিশিয়ে নিলেন রাজনীতি। ভারত জুড়ে হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের ডাক দিলেন। বললেন হিন্দু দম্পতির অন্তত তিন থেকে চারটি শিশুর জন্ম দিতে হবে, তার মধ্যে একজনকে সঁপে দিতে হবে ধর্মের সেবায়। তবেই তো রক্ষা পাবে হিন্দুধর্ম। লাভ জিহাদ ও ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য তাঁর।

বাগেশ্বর মন্দিরের আশপাশের জমি দখল করে নিচ্ছেন বাবা। বাড়াতে হবে আশ্রম। প্রবচনের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা নেন (ইভেন্ট প্রতি ৫০-৭৫ লক্ষ তাকা)। তাঁর প্রভাব– প্রতিপত্তিকে কাজে লাগান তাঁর পরিবারের লোকজন। এক দলিত পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে হামলা চালান তাঁর ভাই শালিগ্রাম গর্গ। সবচেয়ে বড় কথা, প্রকারান্তরে বিজেপি সরকারের ভিত শক্ত করেন বাবা বাগেশ্বর। শুধু তিনি নন, সব স্বঘোষিত বাবার সঙ্গে রাজনীতির একটা যোগ থেকে যায়।

বিংশ শতাব্দীতে শুরু হয়েছে স্বঘোষিত গুরুদের রমরমা। সেই ধারায় বাগেশ্বরবাবা শেষের দিকের মানুষ। তাঁর পূর্বসূরীদের ইতিহাস না জানলে ঐতিহ্যপরম্পরাটা ঠিক বোঝা যাবে না।

আসারাম বাপু (১৯৪১- )

তাঁর আসল নাম আসুমাল থাউমল হরপালানি। জন্ম বতর্মান পাকিস্তানে। দেশভাগের পর চলে আসেন গুজরাটের আমেদাবাদে। ২৩ বছর বয়েসে বিয়ে হয়েছিল লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে। বিয়ের পরে গৃহত্যাগ করে চলে যান। নৈনিতালে লীলাশা্হজি মহারাজের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। নতুন নাম হয়। ফিরে আসেন আমেদাবাদে। সবরমতীর তীরে তৈরি করেন আশ্রম। প্রথমে ছিল কুঁড়েঘর। নামডাক হবার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে আশ্রম। দেশ-বিদেশে নাম ছড়ায়। নানাস্থানে তাঁর প্রায় ৪০০টি আশ্রম আছে।

কথা-বক্তা হিসেবে জনপ্রিয়। তাঁর বক্তৃতায় সংগীত, নৃত্য ও হাস্যরসের অপূর্ব সমন্বয় ঘটে। হু হু করে বেড়ে যায় জনপ্রিয়তা। মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ভগবানের বার্তাবাহক’, ‘উদ্ধারক’, ‘মহাজ্ঞানী’। বিজেপি দলের উথ্থানের সময় তিনি ও তাঁর অনুগামীরা প্রচুর সাহায্য করেছেন।

সেই মহাজ্ঞানীর যৌন কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ পেল ২০১৩ সালে। দুই নাবালিকা বোনকে ধর্ষণ করেছেন তিনি। তখন বেরিয়ে আসেন তাঁর এক শিষ্য। শিষ্য বলেন এই ধর্ষণকাণ্ড চলছে বহুদিন। ২০০৩ সালে শিষ্য নিজেই এসব কাণ্ড দেখেছেন পুষ্কর, ভিওয়ানি ও আমেদাবাদ আশ্রমে। থলে থেকে বেড়াল বেরোতে শুরু করে। গ্রেপ্তার এড়ানো গেল না। একাধিক অভিযোগ। তাঁর বিরুদ্ধে চার্জশিটে তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীবেন, কন্যা ভারতী এবং চারজন শিষ্যের মদত দেওয়ার অভিযোগ আছে।

সন্ত রামপাল (১৯৫১-)

সোনিপথ ধনানা গ্রামে জন্ম এই গুরুর। শিক্ষা শেষ করে তিনি হরিয়ানার সেচবিভাগের ইঞ্জিনিয়ার হন। তারপর একদিন আধ্যাত্মিক শান্তির আশায় দেখা করেন স্বামী রামদেবানন্দের সঙ্গে। এই রামদেবানন্দই তাঁর গুরু। গুরুর মন্ত্র জপ করে তিনি শান্তি লাভ করেন। ১৯৯৪ সালে রামদেবানন্দ রামপালকে গুরুর পদ দেন এবং তিনি হয়ে যান সন্ত রামপাল দাস। নিজেকে তিনি কবীরের অবতার মনে করতেন। ভক্তদের কাছে ছিলেন ‘ঈশ্বরের দূত’। তবে ধর্মগুরু হলেও বড্ড হিংসুটে ছিলেন সন্ত রামপাল।

আর্য সমাজের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধে গেল রামপালদের। অভিযোগ, আর্য সমাজের এক সদস্যকে খুন করেছেন রামপাল ও তাঁর ভক্তরা। ২০০৬ সালে গ্রেপ্তার হলেন তিনি। ছাড়া পেলেন ২০০৮ সালে। ২০১৪ সালে আবার গ্রেপ্তার হলেন। এবার অভিযোগ ধর্ষণের। আশ্রমের সাধিকাদের সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্ক আছে রামপালের। তদন্ত শুরু হতে দেখা গেল এই গুরুটি নিয়মিত শয্যাশঙ্গী বদল করেন। এটা তাঁর অভ্যাস। কিন্তু গ্রেপ্তারের খবর চাউর হতে পথে নামে ভক্তের দল। হরিয়ানার পুলিশের সঙ্গে ভক্তদের খণ্ডযুদ্ধ শুরু। মৃত্যু ৬ জনের।

স্বামী প্রেমানন্দ (১৯৫১-২০১১)

আসলে তিনি প্রেমকুমার। শ্রীলঙ্কার ভারতীয় তামিল। জন্ম মাতালের এক অনাথ আশ্রমে। গৃহযুদ্ধের সময়ে চলে আসেন ভারতে। প্রথমে তিরুচিরাপল্লির ভাড়াবাড়িতে। তারপরে ফাতিমানগরে। দুই জায়গায় ছিল তাঁর অনাথ আশ্রম। ভারতে তাঁকে আদর করে বলা হত ‘কুত্তি সাইবাবা’ বা ছোট সাইবাবা। কারণ দুজনের চুলের স্টাইল। বাড়তে থাকে গুরু হিসেবে খ্যাতি। প্রচারিত হয় প্রেমান্দের ঈশ্বরিক শক্তির কথা। বড় হয় আশ্রম। দেশ থেকে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যাণ্ড, বেলজিয়াম, মেক্সিকোয় শাখা।

১৯৯৪ সাল। আশ্রমে বসবাসকারী অরুণ জ্যোতি হাটে হাঁড়ি ভাঙেন। তিনি জানান যে তিনি আশ্রমে ধর্ষিতা হয়েছেন, গর্ভে এসেছে সন্তান। রবি নামে আর এক বাসিন্দা সমর্থন করেন তাঁকে। স্বামীজির পক্ষে যুক্তি, ধর্ষণ হবে কেন, এই যৌন মিলন যে ঈশ্বরের সেবা। বিচার হল আদালতে। প্রেমানন্দকে ১৩টি ধর্ষণ, প্রাণ লোপাটের চেষ্টা এবং হত্যার অভিযোগে দেওয়া হল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৬৭ লক্ষ টাকা জরিমানা। আশ্রমে তল্লাশি চালাতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ পুলিশের। বাবার ঘর থেকে পাওয়া যাচ্ছে পর্নোগ্রাফির ভিডিয়ো। আশ্রমের এক ভক্ত পুলিশের জেরায় স্বীকার করেন যে কিশোরীদের নিজের ঘরে ডেকে বাবা পর্নগ্রাফি ভিডিয়ো চালিয়ে দিতেন। তারপর যৌন নিপীড়ন চালাতেন।

সন্ত স্বামী ভীমানন্দজি মহারাজ (?)

এই মহারাজের আসল নাম মুরাত দ্বিবেদী। উত্তরপ্রদেশের চিত্রকূটের বাসিন্দা। ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিত ইচ্ছাধারী সন্ত স্বামী ভীমানন্দ বলে। ১৯৯৭ সালে নারী পাচার ও দেহব্যবসার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রথমে তিনি দিল্লির এক পাঁচতারা হোটেলে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করতেন। পরে লাজপত নগরে একটি ম্যাসাজ পার্লারে কাজ শুরু করেন। সেখানে মধুচক্র চালানোর অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জামিনে ছাড়া পেয়ে তিনি ধর্মব্যবসা শুরু করেন। ভেবেছিলেন ধর্মব্যবসার আড়ালে দেহব্যবসা চললে তিনি নিরাপদে থাকবেন। ধর্মের কল বাতাসে নড়ল অবশেষে।

স্বামী গঙ্গেশানন্দ (?)

কেউ বলেন হরি স্বামী, কেউ বা বলেন স্বামী গঙ্গেশানন্দ। তাঁর আশ্রম কেরালায়। কোল্লামের পনপনা আশ্রম। তাঁর মুখোশ খুলে গেল ২০১৭ সালে। মুখোশ খুলে দিল এক আইনের ছাত্রী। সেই ছাত্রীর বাবা পক্ষাঘাতে ছিলেন শয্যাশায়ী। বাবার কষ্ট দেখে ষোলো বছরের তরুণী ভেবে আকুল। প্রতিবেশীর মুখে শুনতে পেল স্বামী গঙ্গেশানন্দের নাম। স্বয়ং ভগবানের বরপুত্র তিনি। অসাধ্য সাধন করতে পারেন। তরুণীর অনুরোধে হরি স্বামী এলেন তাঁর বাড়িতে। রোগ সারিয়ে দেবার নাম করে হাত বাড়ালেন তরুণীর দিকে। বাবার রোগ সারবে এই আশায় তরুণী কিছু বলেন নি। দিনের পর দিন যায়। বাবার কোন উন্নতি হয় না। স্বামীজি তরুণীর শরীর নিয়ে খেলতে থাকেন। একদিন অসহ্য হয়ে উঠল। ধর্ষণের মুহূর্তে ধারালো ছুরি দিয়ে হরি স্বামীর যৌনাঙ্গ ছিন্ন করে দিলেন তিনি।

নির্মলবাবা (১৯৫২-)

আসল নাম নির্মলজিৎ সিং নারুলা। মাণ্ডির সামানায় তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা ছিলেন শিখ, পিতামহ হিন্দু। পিতামহের কোন সন্তান ছিল না বলে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের সকলকে শিখধর্মে ধর্মান্তরিত করবেন। ধীরে ধীরে নির্মলবাবা এক আধ্যত্মিক নেতা হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁর টেলিভিশনে প্রচারিত সমাগম বা সমাবেশ ‘দ্য থার্ড আই অব নির্মলবাবা’র জন্য পরিচিত। আধ্যাত্মিক নির্দেশনা ও বিশ্বাসের দ্বারা নিরাময়ের সন্ধানে মানুষ তাঁর কাছে ছুটে আসে। সমাগমের টিকিটের জন্য তিনি প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নেন। গুরগাঁওতে তাঁর ২১ কোটি টাকার জমি আছে, দিল্লির গ্রেটার কৈলাসে আছে হোটেল। তাঁর বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেলের অভিযোগ আছে। তাঁর পরামর্শে এক ব্যক্তির ডায়াবেটিসের অবস্থা খারাপ হওয়ায় নির্মলবাবার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

স্বামী অসীমানন্দ (?)

নবকুমার সরকার তাঁর আসল নাম। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কামারপুরে তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের কর্মী। পরে যোগ দেন বনবাসী কল্যাণ আশ্রমে। তাঁর গুরু স্বামী পরমানন্দ। ছত্তিশগড়ের ডাঙ্গের আদিবাসীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব গুজরাটে খ্রিস্টানদের উপর হামলায় তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। আজমির দরগাহ বোমা মামলা, মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ এবং সমঝোতা এক্সপ্রেস বোমা মামলায় তিনি অভিযুক্ত হন।

হরি ওম বাবা (?)

দিলীপকুমার যমুনাপ্রসাদ তিওয়ারি ওরফে হরি ওম বাবা। মহারাষ্ট্রের বুলধানা জেলার শখারখেড়া গ্রামে জন্ম। তিনি না কি টাকা দ্বিগুণ করে দিতে পারেন। তাই মানুষ ছুটে আসে তাঁর কাছে। যারা টাকা দেয় তারা আর কোন টাকা ফেরত পা্য় না। শুধু টাকা দ্বিগুণ নয়, তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা আছে। তিনি যে কোন রোগ নিরাম্য় করতে পারেন। কল্পনা পাগরের ছিল চর্মরোগ। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও সারে নি। তিনি ছুটে এলেন হরি ওম বাবার কাছে। আজ হবে কাল হবে—এমনি করে বাবা তাঁর কাছ থেকে হাতিয়ে নিলেন ১৮ লক্ষ টাকা। মহেশ তানপুরা নামে তাঁর এক শিষ্য ছিলেন। তাঁর স্ত্রী সুন্দরী। শিষ্যের বউকে নিয়ে চম্পট দিলেন গুরু।

গুরুমিত রাম রহিম (১৯৬৭-)

রকস্টারসুলভ ভঙ্গিমায়, মেসেঞ্জার অব গডের অবতারে, মিডিয়া মুঘলের ভূমিকায়, রাজনৈতিক প্রভাব–প্রতিপত্তিতে গুরুমিত রাম রহিম একেবারে স্বতন্ত্র এক মহামানব। রাজস্থানের এক জমিদার পরিবারে জন্ম। অল্প বয়সেই ডেরা সাচ্চা সৌদার সঙ্গে যুক্ত। সাত বছর বয়েসে গুরু শাহ সাতনাম সিংএর কাছে দীক্ষা এবং মাত্র তেইশ বছর বয়েসে সাতনাম সিংএর উত্তরাধিকারী তিনি। সুযোগ্য উত্তরাধিকারী নিশ্চয়ই। কারণ রাম রহিম গড়ে তুলেছিলেন ১৪ বিলিয়ন টাকার এক বিরাট সাম্রাজ্য।

২০১৭ সালের আগস্টে ১৯৯৯ সালের এক মামলায় দুই অনুসারীকে ধর্ষণের দায়ে রাম রহিমকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার পর পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় তাণ্ডব শুরু করেছিল তাঁর অনুগামীরা। রাস্তায় নেমেছিল মৃত্যুর মিছিল। শুধু ধর্ষণ নয়, সিরসার এক সাংবাদিক রামচন্দ্র ছত্রপতিকে খুনের অভিযোগ ওঠে রাম রহিমের বিরুদ্ধে। বাবার ডেরা সাচ্চা সৌদাতে যে মধুচক্র বসত তা প্রকাশ পায় সাংবাদিকদের লেখায়। রামচন্দ্র ছত্রপতি তাঁর পত্রিকা ‘পুরা সচ’-এ বাবাজির কীর্তি কলাপ ফাঁস করে দেন বলেই তাঁকে মরতে হয়। বাবার ৭০০ একরব্যাপী ডেরাতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে হতবাক হয়ে যান তদন্তকারীরা। দেখতে পান বাবার অট্টালিকার ভেতর গোপন সুড়ঙ্গ। সে সুড়ঙ্গ চলে গেছে নারী ভক্তদের বাসভবনে। সেখান থেকে সুড়ঙ্গপথে প্রতিদিন নারীদের পাঠানো হত বাবার যৌন লালসাকে প্রশমিত করার জন্য। ডেরার পুরুষ ভক্তদের নির্বীজকরণ করা হত।

রাম রহিমের সঙ্গে বর্তমান শাসদের সম্পর্ক মধুর। তাই তিনি বারবার প্যারোলে মুক্ত হয়ে ডেরার দেখভাল করে যান।

বাবা পরমানন্দ (১৯৭১-)

রামশঙ্কর তিওয়ারি ওরফে বাবা পরমানন্দ। উত্তরপ্রদেশের বারাবাঁকির পুলিশ গ্রেপ্তার করল বাবা পরমানন্দকে। কেন ? অভিযো্গ যৌন নির্যাতনের। বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসার নামে তিনি যৌন নিপীড়ন চালাতেন। বারাবাঁকির আশ্রমে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ উদ্ধার করে পর্ন মুভির সিডি, নারীদের অশ্লীল ভিডিয়ো, অশ্লীল পত্র-পত্রিকা। একশোর বেশি মহিলা বাবার শিকার। এ ব্যাপারে তাঁর ভক্তরাও যুক্ত ছিলেন। তাই তাঁর বিশেষ সহকারী অরবিন্দ পাঠককেও গ্রেপ্তার করা হয়।

স্বামী নিত্যানন্দ (১৯৭৮-)

কর্নাটকের গডম্যান তিনি। তামিলনাড়ুর মাদুরাই অধিনাম মঠের প্রধান। এই ভগবানের বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে হিমাচল প্রদেশের সিমলার ৫০ কিলোমিটার দূরের এক গ্রাম থেকে এই ভগবানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শুধু যৌন নির্যাতন নয়, শিশুদের বেইনিভাবে আটক ও অপহরণের অভিযোগও আছে তাঁর বিরুদ্ধে। ইনি আবার ইকুয়েডরের কাছে একটা দ্বীপ কিনে রেখেছেন, তার নাম দিয়েছেন ‘কৈলাস’।

স্বামী সদাচারী (?)

রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদের আশীর্বাদপুষ্ট এই বাবা। প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে তিনি যজ্ঞানুষ্ঠান করেন। আবার একই সঙ্গে পরিচালনা করেন যৌনপল্লী। সেখানে নাবালিকাদের জোর করে ধরে আনা হয়।

জ্ঞানচৈতন্য (?)

প্রচুর ভক্ত এই বাবার। ধর্মপ্রচারের ফাঁকে চলে ব্যাভিচার। তাঁর বিরুদ্ধে ৩টি খুন আইনের চোখে প্রমাণিত। ১৪ বছর হাজতবাস করতে হয়েছে বাবাজিকে।

অখিল ভারতীয় আখড়া পরিষদের তালিকা

১৯৫৪ সালে এলাহবাদের কুম্ভমেলায় পদদলনের ঘটনায় অনেক মানুষ মারা যায়। ভবিষ্যতের কুম্ভমেলায় যাতে এই ধরণের ঘটনা না ঘটে, তার জন্য সমস্ত আখড়াগুলিকে একত্রিত করে গঠিত হয় অখিল ভারতীব আখড়া পরিষদ। হিনদু সমাজের অখড়া ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করেই এই পরিষদ গঠিত। এতে আছে মোট ১৩টি আখড়া। এর মধ্যে ৭টি শৈব আখড়া, ৩টি বৈষ্ণব আখড়া এবং ৩টি উদাসীন ও নির্মলা আখড়া। এই পরিষদ সরাসরিভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করলেও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, সংঘ পরিবারের সঙ্গে তার যোগ আছে। রাম মন্দির নির্মাণের আন্দোলনে পরিষদের ভূমিকা ছিল। বেশ কিছু স্বঘোষিত ধর্মগুরু বা বাবাদের কার্যকলাপে হিন্দুত্ববাদী এই পরিষদও বিব্রত। এঁরা ভণ্ড বাবাজিদের যে তালিকা প্রকাশ করেছেন, তাতে আছেন : —

আসারাম বাপু, রাধে মা বা সুখবিন্দর কৌর, গুরুমিত রাম রহিম সিং, সচিদানন্দ ওরফে শচীন দত্ত, ওম বাবা ওরফে বিবেকানন্দ ঝা, নির্মলবাবা ওরফে নির্মলজিৎ সিং, ইছাধারী ভীমানন্দ (শিবমূর্তি দ্বিবেদী), নারায়ণ সাই, রামপাল, কুশমণি বাপু, বৃহস্পতি গিরি, মালকান গিরি, ওম নমঃ শিবায় বাবা বা ওম বাবা।

এটা ছিল ভণ্ড বাবাদের প্রথম তালিকা। দ্বিতীয় তালিকায় যুক্ত হল ৩ জনের নাম : বীরেন্দ্র দীক্ষিত কালনেমি, সচিদানন্দ সরস্বতী, ত্রিকাল ভাওয়ান্ত।

তৃতীয় ও চতুর্থ তালিকায় ছিল যোগী সত্যম, স্বামী চক্রপাণি মহারাজ,আচার্য প্রমোদ কৃষ্ণানের নাম।

ভণ্ড বাবাদের জনপ্রিয়তার ভিত্তি

ভারতীয় সংস্কৃতিতে সাধু-সন্ন্যাসীদের শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। মনে করা হয় এঁরা আধ্যাত্মক জ্ঞানের আধার। এহিক জীবনে এাঁরা যেমন বিপদ থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে পারেন, তেমনি মৃত্যুর পরে অমৃতলোকে উত্তীর্ণ করতে পারেন। বাবা বা গুরুরা গেরুয়া বস্ত্র ও ধর্মীয় প্রতীক ধারণ করে মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করেন। এই ধর্মের কাছে সমস্ত প্রশ্ন স্তব্ধ হয়ে যায়। এটাই বাবাদের বড় সুবিধে। তাঁরা মানুষের উপলব্ধিতে যে কথাটা গেঁথে দেন তা হল : বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।

মনোবিজ্ঞানী সিগমুণ্ড ফ্রয়েড half belief-এর কথা বলেছিলেন। বিজ্ঞানের যুগেও মানুষের মনে অলৌকিক ক্ষমতা, অসম্ভবকে সম্ভব করার জাদুর প্রতি বিশ্বাস অব্যাহত আছে। বাবারা অসাধারণ কথা-বক্তা। তাঁদের কথার মায়াজালে মুগ্ধ হয় মানুষ। বিশ্বাস করতে থাকে যে তাঁদের কৃপায় মূক বাচাল হতে পারে, পঙ্গু লঙ্ঘন করতে পারে গিরি।

অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানসিক সংকটে মানুষ যখন দিশেহারা হয় তখন তারা হাতে গরম সমাধান চায় . চায় দ্রুত মুক্তির পথ।

আনন্দ তেলতুম্বদে বলেছেন নয়া উদারনৈতিক সংস্কার যেমন দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উথ্থানের কারণ, তেমনি ভণ্ড বাবাদের রমরমারও কারণ — ‘However, from the 1990 neoliberal reforms attacked rational thinking. These reforms deepened economic crisis, making people vulnerable and more likely to seek solace in occult powers, boostingthe influence of godmen and right-wing political forces. The rise of the BJP, from its dilapidated state in mid-1980 to capturing power at the centre in the 1990.’

ভণ্ড সাধুদের মদত দেন রাজনৈতিক নেতারা। মদত দেন ভোট ব্যাঙ্ক নিয়ন্ত্রণ, কালো টাকা সাদা করা এবং নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। এঁদের প্রচারে সাহায্য করে মিডিয়া। প্রচারে ছাগল কুকুর হয়ে যায়। এই প্রচারের ফাঁদে পড়েন শিক্ষিত মানুষরাও। ভণ্ডদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেই। পুলিশের ভূমিকাও কহতব্য নয়।

ভণ্ড বাবা ও স্বৈরাচারী শাসক : আশ্চর্য মিল

ভণ্ডবাবা ও স্বৈরাচারী শাসকের মধ্যে মিল আছে। প্রথম মিল, দুজনের ক্যারিশমা আছে। তাঁরা দাবি করেন যে তাঁরা শক্তির আধার, যে কোন প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা তাঁরা করতে পারেন। সংকটের সমাধান তাঁদের হাতেই আছে। ভণ্ডবাবা যেমন ব্যক্তিগত সমাধান দিতে পারেন, স্বৈরাচারী শাসক তেমনি দিতে পারেন জাতিগত সমাধান।

দ্বিতীয় মিল ভীতি ও উদ্বেগের নিরসন। ভণ্ডবাবা যেমন ব্যক্তিগত ভীতি ও উদ্বেগ দূর করতে পারেন, তেমনি স্বৈরাচারী শাসক দূর করতে পারেন সামাজিক ভীতি ও উদ্বরগ।

তৃতীয় মিল মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা।

চতুর্থ মিল, উভয়েই তৈরি করেন ‘a cult of personality’ (‘Godmen build a cult around their spiritual identity, becoming central figures in their followers’ lives. Fascist leaders build a cult around their political identity, becoming central to the nation’s identity.’)

পঞ্চম মিল উভয়েই মানুষকে অর্থনৈতিভাবে শোষণ করেন।

ষষ্ঠ মিল নিরন্তর প্রচার উভয়েরই হাতিয়ার। (‘Godmen use religious propaganda, ioncluding testimonies and sermons, to reinforce their authority . Fascist leaders use political propaganda, media control and national symbols to reinforce their political authority and attract suppoeters.’)

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev