
৬১. কালিদাস চট্টোপাধ্যায় হলেন সত্যব্রত সামশ্রমী
আসল নাম কালিদাস চট্টোপাধ্যায়। পরে তিনি পরিচিত হলেন সত্যব্রত সামশ্রমী রূপে। কিভাবে হল এই রূপান্তর? তাঁর বাবার গোলাপ বাগান ছিল। বড় প্রিয় সে জিনিস। বাগানে গোলাপ ফুটে থাকবে, কিন্তু কেউ ছিঁড়তে পারবে না। একদিন কালিদাস সেই বাগানে গিয়ে একটা বড় গোলাপ ফুল ছিঁড়ে আনলেন। অফিস থেকে ফিরে বাগানে গিয়ে বাবা বুঝতে পারলেন কেউ ফুল ছিঁড়েছে। মালিকে তলব করলেন। মালি কিছু জানে না। তখন বকাবকি শুরু করলেন। সেই বকাবকি শুনে কালিদাস সেখানে হাজির। তিনি বললেন, ‘বাবা, ওকে বকছ কেন? আমি ভুল করেছি। ফুল আমিই ছিঁড়েছি।’ ছেলে সত্য কথা বলেছে, বাবা খুব খুশি। তাই তাঁর নাম দিলেন ‘সত্যব্রত’। ‘সামশ্রমী’ উপাধিটি দিয়েছিলেন রাজস্থানের বুন্দি রাজ। পাণ্ডিত্যের জন্যই এই উপাধি।
কালিদাসদের আদি নিবাস বর্ধমানের ধাত্রীগ্রাম। তাঁর ঠাকুরদা রামকান্ত তর্কালঙ্কার পাটনা আদালতের জজ পণ্ডিত হিসেবে নিযুক্ত হলে ধাত্রীগ্রাম থেকে সপরিবারে চলে আসেন পাটনা। কালিদাসের বাবা রামদাস চট্টোপাধ্যায় ছিলেন গুণী মানুষ। ফারসি আর ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ছিল। তিনি প্রথমে পাটনা আদালতের কেরানি ছিলেন। পরে মির্জাপুরের সহকারী কমিশনার হন।
রামদাসের সন্তান হলেন কালিদাস (১৮৪৬-১৯১১)। ছেলে সংস্কৃত শিক্ষায় পারদর্শী হোক — এই ছিল রামদাসের ইচ্ছা। তাই কালিদাসের যখন মাত্র পাঁচ বৎসর বয়েস, তখন তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন কাশীর সরস্বতী মঠে। তখন বেদশিক্ষার জন্য বাংলা থেকে অনেক শিক্ষার্থী কাশীতে এলেও উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে বিশেষ কেউ আসত না। তাই রামদাস তাঁর ছেলেকে কাশীতে পাঠান। আচার্য গৌড় স্বামীর সরস্বতী মঠে শুরু হল কালিদাসের শিক্ষজীবন ও ব্রহ্মচর্যজীবন। এখানে তিনি বিশ্বরূপ স্বামীর কাছে পাণিনি ও পতঞ্জলি মহাভাষ্যএর পাঠ নিয়ে গুজরাটে নন্দরাম ত্রিবেদীর কাছে বেদপাঠ শুরু করেন। বৈদিক জ্ঞানে তাঁর ব্যুৎপত্তি বিস্মৃত করে শিক্ষকদেরও। তারপরে তিনি ভারত ভ্রমণে বের হন। অযোধ্যা, হৃষিকেশ, কম্পিলা, কাশ্মীর প্রভৃতি ঘুরতে ঘুরতে আসেন রাজস্থানের বুন্দি রাজ্যে। সত্যব্রতের বেদের জ্ঞান দেখে বুন্দি রাজ তাঁকে ‘সামশ্রমী’ উপাধি দেন। রাজস্থান থেকে তিনি আসেন নবদ্বীপে। তর্কযুদ্ধে পরাজিত করেন ব্রজনাথ তর্কালঙ্কারকে। এই সেই ব্রজনাথ, যিনি রচনা করেছিলেন বিখ্যাত সেই গৌরাঙ্গগীতি : ‘ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’। তর্কযুদ্ধে পরাজিত হলেন বটে, কিন্তু যুবক সত্যব্রতের জ্ঞান মুগ্ধ করল তাঁকে। নিজের মেয়ে সর্বমঙ্গলার সঙ্গে বিয়ে দিলেন সত্যব্রতের।
কলকাতায় ফিরে এলেন সস্ত্রীক সত্যব্রত। শিমুলিয়ায় বাড়ি কিনে বসবাস শুরু করলেন। এই বাড়ির ঠিকানা ১৬/১ ঘোষ লেন। এই বাড়িতে তিনি স্থাপন করলেন মুদ্রণ যন্ত্র। স্বামী-স্ত্রীর নাম মিলিয়ে সে যন্ত্রের নাম রাখলেন ‘সত্যমঙ্গলা মুদ্রণ যন্ত্র’। এখান থেকে প্রকাশিত হতে লাগল সংস্কৃত ভাষার পত্রিকা ‘প্রত্নকম্রনন্দিনী’ আর বাংলা-সংস্কৃত ভাষার পত্রিকা ‘ঊষা’। পত্রিকার সূত্রে পরিচয় ও পত্রবিনিময় হল জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্সম্যুলারের সঙ্গে। বিদ্যাসাগরের সঙ্গেও তাঁর পত্রালাপ চলত সংস্কৃত ভাষায়।
সত্যব্রতী সামশ্রমী রচিত গ্রন্থগুলি : ন্যায়বলি (১৮৭১), মন্ত্রব্রাহ্মণ (১৮৭৩), অক্ষরতন্ত্রম (১৮৮৯ ), নারদীয় শিক্ষা (১৮৯০), সাম্যপ্রতিশাখ্যম (১৮৯০) ত্রয়ীটিকা (১৮৯২), বংশব্রাহ্মণ্যম (১৮৯২), নিদানসূত্রম (১৮৯৬), ত্রয়ীভাষা (১৮৯৭), কৃষ্ণযর্জুবেদসংহিতা (১৮৯৯), সামবিধানব্রাহ্মণ্যম (১৯০৩)।
বেদ বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্যের তুলনা নেই। মুসলমান শাসনে বেদচর্চায় ভাটা পড়েছিল। সত্যব্রতীর ঐকান্তিক চেষ্টায় বেদচর্চায় জোয়ার আসে। বেদের প্রকারভেদ, বিশ্লেষণ, তার যথাযথ প্রয়োগ সম্পর্কে তিনি পরিচ্ছন্ন বোধ তৈরি করেন।কিন্তু উনিশ শতকের মানুষ হয়েও নবজাগরণের ভাবতরঙ্গ কি তাঁকে একটুও প্রভাবিত করে নি? কিছুটা করেছিল সন্দেহ নেই, তবে স্ববিরোধিতা থেকে গেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়তে এসেছেন এক মুসলমান ছাত্র। নাম তাঁর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি পড়তে চান সংস্কৃত। তখন সংস্কৃত পাঠক্রমে ছিল বেদ।
বাধ সাধলেন সত্যব্রতী সামশ্রমী। বললেন, ‘বেদ পড়বে মুসলমান? অসম্ভব।’
শহীদুল্লাহ ছিলেন স্যার আশুতোষের স্নেহভাজন। তিনি স্যার আশুতোষকে বললেন সত্যব্রতীর প্রবল আপত্তির কথা। সত্যব্রতীর সঙ্গেও আশুতোষের সম্পর্ক ভালো। তাঁর দুই ছেলে — রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদের উপনয়নের আচার্য ছিলেন সত্যব্রত। স্যার আশুতোষ অনেক অনুরোধ করলেন সত্যব্রতীকে, কিন্তু অটল হয়ে রইলেন অধ্যাপক। রেগে গিয়ে শহীদুল্লাহ আদালতে মামলা ঠুকে দিলেন। আদালত রায় দিল : হয় শহীদুল্লাহকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত পড়তে দেওয়া হোক না হলে তাঁর জন্য অন্য একটি বিষয় চালু করে তাঁর পড়ার ব্যবস্থা যেন করা হয়। সত্যব্রতীর জেদের কাছে হার মানতে হল আশুতোষকে, তবে শহীদুল্লাহকেও তিনি ফেরাতে পারলেন না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্ব বিভাগ চালু হল, আর শহীদুল্লাহ সেই বিভাগে ভর্তি হলেন।
অহিন্দু বা মুসলমানের ছেলেকে যিনি বেদ পড়তে দেবেন না বলে জেদ ধরেন, তিনিই আবার বেদ উদ্ধৃত করে দেখান যে সমুদ্রযাত্রায় হিন্দুর জাত যায় না বা কন্যা রজস্বলা না হওয়া পর্যন্ত তার বিয়ে দেওয়া যাবে না। এরই নাম স্ববিরোধিতা। আবার যিনি বলছেন রজস্বলা না হলে কন্যার বিয়ে দেওয়া যাবে না, তিনি তাঁর ছোটছেলের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছেন তেরো বছরের কন্যার সঙ্গে। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর আলাপ আলোচনা হত। বিধবা বিবাহকে তিনি সমর্থন করতেন। কিন্তু এই তিনিই আবার বহুবিবাহের সমর্থক।
কালিদাস চট্টোপাধ্যায় প্রত্যক্ষ কিন্তু এই ধরনের দ্বিচারিতা প্রায়শই দেখা যায় আজও।