
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বর্ষীয়ান নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই সপ্তাহের শুরুতে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। বঙ্গভবনে তাঁর এই শপথ গ্রহণ দেশের জন্য এবং তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
৭৮ বছর বয়সী রাষ্ট্রপতি আলমগীর সংসদ সদস্যদের ৩৪৩টি ভোটের মধ্যে ২৫৫টি ভোট পেয়ে জয়ী হন। তিনি তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদকে পরাজিত করেন, যিনি ৮৮টি ভোট পেয়েছেন। অলি আহমদকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সমর্থন দিয়েছিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ.এম.এম. নাসির উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি ছিল গত ৩৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। গত মাসে সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি আলমগীরের জনজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায়, যেখান থেকে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম (এস.এম.) হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ঐতিহাসিক ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (শিক্ষা ক্যাডার) যোগ দেন। তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রশাসনিক কর্মজীবনের মধ্যে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন, ইউনেস্কোর (UNESCO) বাংলাদেশ জাতীয় কমিশনে কাজ করা এবং আশির দশকের শুরুতে উপ-প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন উল্লেখযোগ্য।
পরবর্তীতে তিনি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা শুরু করেন; প্রথমে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং পরে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে কৃষি প্রতিমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী। ২০১১ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একজন স্বচ্ছ, নীতিবান ও ভদ্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত।
সংসদীয় ভোটের আগে রাষ্ট্রপতি আলমগীর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর আশার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি একটি সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেন, যেখানে সাধারণ শ্রমজীবী পরিবার এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী তাদের মৌলিক দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে পারবে। ভোটের আগে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তাঁর এই বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতির এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ প্রথম ভোট দেন এবং এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অন্যান্য সংসদ সদস্যরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ৩৫০ আসনের এই সংসদে একটি আসনের নির্বাচন স্থগিত থাকায় ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন, যার মধ্যে শেষ পর্যন্ত ৩৪৩ জন ভোট দেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক বা আলংকারিক, যেখানে প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত থাকে। তা সত্ত্বেও, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়গুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্যদের উন্মুক্ত ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের প্রার্থীর বিজয় আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল। তবুও, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাঠে থাকায় পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গতকাল ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে এর আগে সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি ভোট হয়েছিল, যে বছর দেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
রাষ্ট্র প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চলমান জাতীয় আলোচনার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি আলমগীরের মেয়াদ শুরু হচ্ছে। বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা সচল থাকলেও, জুলাই-পরবর্তী আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষাগুলো—যেমন ‘জুলাই সনদের’ অধীনে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিগুলো এখনও জনসাধারণের মাঝে সক্রিয় আলোচনার বিষয় হিসেবে রয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশিষ্ট প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং প্রজাতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সুস্বাস্থ্য, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সাফল্য কামনা করেছেন।
নিকোলাস বিশ্বাস একজন ফ্রিল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী। তাঁর সাথে যোগাযোগের ঠিকানা: gonomaddyom@gmail.com