মুখের সঙ্গে খুব একটা মানানসই না হলেও রঙিন সানগ্লাস পরতে ভীষণ ভালোবাসত সায়নিকা।
বহরমপুর উইমেন কলেজের ফাইনাল ইয়ার, ফিলোসফি অনার্সের ছাত্রী। কখনও হলুদ ফ্রেম, কখনও গোলাপি কাচ, কখনও আবার আকাশি রঙের বড়সড় সানগ্লাস পরে কলেজে আসত। ওকে দেখলেই বান্ধবীরা হাসত।
—“এই যে, আজ আবার কোন সিনেমার নায়িকা সেজেছিস?”
—“সায়নিকা নয়, আজ থেকে “হলিউড রানি” বলে ডাকব!” অনুসূয়া টিটকারী কাটল।
হাসির রোল উঠত এই নিয়ে । সায়নিকা মুচকি হেসে বলত,
—“তোমাদের ভালো না লাগলে চোখ বন্ধ করে থাকো।”
বান্ধবীরা আরও হাসত।
বাড়িতেও শান্তি ছিল না। মা একদিন বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন,
—“তোর মুখের সঙ্গে এসব যায় না রে। মানুষ হাসে।”
—“মানুষ হাসলে আমার কী?” বিরক্ত হয়ে জবাব দিতে সায়নিকা।
—“সবকিছুর একটা মানানসই ব্যাপার থাকে।”
—“আমি মানানসই হওয়ার জন্য বাঁচি না, মা।”
এই ছিল সায়নিকার স্বভাব। নিজের পছন্দের ব্যাপারে সে আপসহীন।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হত তার প্রেমিক অনিন্দ্য।
অনিন্দ্য কৃষ্ণনাথ কলেজে বাংলা নিয়ে পড়ত। দু’বছরের সম্পর্ক। সায়নিকার অনেক অভ্যাসই সে মেনে নিয়েছিল, কিন্তু এই সানগ্লাসের ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নিতে পারত না।
একদিন কলেজের সামনে ফুচকার দোকানে দাঁড়িয়ে বলল,
—“তুমি কি সত্যিই বুঝতে পারো না, তোমাকে অদ্ভুত লাগে?”
সায়নিকা চশমার ওপর দিয়ে তাকাল।
—“অদ্ভুত মানে?”
—“মানে… মানুষ যেমন ঠাট্টা করে।”
—“মানুষের কাজই তো ঠাট্টা করা।”
—“আমি মজা করছি না, সিরিয়াসলি বলছি।”
—“আমিও সিরিয়াসলি বলছি। আমি যা ভালবাসি, তাই পরব।”
অনিন্দ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“তুমি সুন্দর মেয়ে। এসব পরে নিজেকে হাস্যকর বানাও কেন?”
কথাটা শুনে সায়নিকার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“তুমি আমাকে সুন্দর বলছ, না আমার পোশাক ঠিক করে দিতে চাইছ?”
—“আমি শুধু চাই তুমি স্বাভাবিক থাকো।”
—“স্বাভাবিক কাকে বলে, সেটা কে ঠিক করে?”
ফিলোসফি অনার্সের ছাত্রীকে তর্কে হারানো সহজ ছিল না।
তারপরও অনিন্দ্য চেষ্টা চালিয়ে যেত।
একদিন গঙ্গার ধারে বসে ছিল দু’জনে।
—“শোনো, কাল আমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। ওই গোলাপি চশমাটা পরে এসো না, প্লিজ।”
—“কেন?”
—“ওরা হাসাহাসি করবে।”
—“তাহলে ওদের সমস্যা।”
—“আমারও অস্বস্তি হয়।”
সায়নিকা চুপ করে কয়েক মুহূর্ত নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—“তোমার অস্বস্তি আমার স্বাধীনতার চেয়ে বড় নয়।”
অনিন্দ্য বিরক্ত হয়ে বলল,
—“একটা চশমার জন্য এত নাটক?”
—“তোমার কাছে চশমা, আমার কাছে পছন্দ।”
সেদিন তর্কটা অনেক দূর গড়িয়েছিল।
ক্রমশ অনিন্দ্য বুঝতে পারছিল, বিষয়টা শুধু সানগ্লাস নয়। সায়নিকার কাছে এটি নিজের মতো থাকার একরকম ঘোষণা।
কিন্তু সে মানতে পারছিল না।
এভাবেই দিন চলছিল।
২.
শীতের শেষে বহরমপুর বইমেলা শুরু হল। সাহিত্যপ্রেমী সায়নিকার জন্য বইমেলা ছিল উৎসবের মত। অনিন্দ্যও যাওয়ার কথা দিল। সন্ধ্যায় দু’জনে মেলায় দেখা করল।
সায়নিকার চোখে সেদিন এক বিশাল সাদা ফ্রেমের রঙিন সানগ্লাস।
মেলার আলোয় সেটি আরও বেশি চোখে পড়ছিল।
অনিন্দ্য দেখেই বিরক্ত হয়ে উঠল।
—“আবার এটা?”
—“কেমন লাগছে?”
—“খুব খারাপ।”
—“তোমার মতামত জানতে চাইনি।” বিরক্তিতে
অনিন্দ্য ঠোঁট কামড়াল।
মেলার ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে সে বলল,
—“তুমি কি ইচ্ছে করে আমাকে রাগাও?”
—“না। আমি নিজেকে খুশি রাখি।”
—“সবকিছুর একটা সীমা আছে।”
—“আমার পছন্দের সীমা তুমি ঠিক করবে?”
একটি বইয়ের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে অনিন্দ্য বলল,
—“সত্যি করে বলো তো, এসব পরে তুমি কী প্রমাণ করতে চাও?”
সায়নিকার চোখ চকচক করে উঠল।
—“জানো, মেরিলিন মনরোও এরকম চশমা পরতেন।”
—“তুমি মেরিলিন মনরো নও।”
—“হতে হবে কেন? আমি তাকে পছন্দ করি।”
—“তাই বলে নিজেকে তার মতো ভাববে?”
—“মনে মনে ভাবতেই পারি।”
অনিন্দ্য হেসে ফেলল।
—“এটা হাস্যকর।”
শব্দটা শুনেই সায়নিকার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—“কী বললে?”
—“হাস্যকর। তুমি নিজের একটা কল্পনার মধ্যে বাস করো।”
—“আর তুমি চাও সবাই একরকম হোক।”
—“আমি চাই তুমি বাস্তব হও।”
—“আমি বাস্তবই।”
—“না, তুমি একটা চশমাকে সম্পর্কের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছ।”
সায়নিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
চারপাশে মাইকে কবিতা পাঠের শব্দ ভেসে আসছিল। মেলার আলো, মানুষের ভিড়, বইয়ের গন্ধ—সবকিছুর মাঝখানে যেন এক অদৃশ্য নীরবতা নেমে এল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—“ভুল বলছ।”
—“তাহলে?”
—“আমি চশমাকে নয়, নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিই।”
—“দুটো একই কথা।”
—“না। আজ যদি চশমা খুলে ফেলি তোমার জন্য, কাল তুমি বলবে এই পোশাক পরো না। তারপর বলবে ওভাবে কথা বলো না। তারপর বলবে ওই বন্ধুদের সঙ্গে মিশো না।”
অনিন্দ্য প্রতিবাদ করল,
—“আমি কখনও তা বলিনি।”
—“আজ বলছ না। কিন্তু শুরুটা এখান থেকেই।”
—“তুমি বাড়িয়ে বলছ।”
সায়নিকা মাথা নাড়ল।
—“না। আমি বুঝতে পারছি।”
অনিন্দ্য এবার গম্ভীর স্বরে বলল,
—“শেষবার বলছি, এসব বাদ দাও।”
—“আর আমি শেষবার বলছি, আমি বাদ দেব না।”
দু’জনের চোখে চোখ পড়ল।
অনিন্দ্য বলল,
—“তাহলে আমাদের একসঙ্গে চলা কঠিন।”
সায়নিকা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—“হয়তো তাই।”
কথাটা বলার সময় তার গলায় কষ্ট ছিল, কিন্তু দ্বিধা ছিল না।
অনিন্দ্য কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
সায়নিকা একা দাঁড়িয়ে রইল বইমেলার মাঠে।
চোখে সেই সাদা ফ্রেমের সানগ্লাস।
হয়ত সেটি তাকে মেরিলিন মনরো বানায়নি। হয়ত সেটি সত্যিই তার মুখের সঙ্গে মানাত না। কিন্তু চশমাটা ছিল তার নিজের পছন্দ, নিজের পরিচয়, নিজের সিদ্ধান্তের প্রতীক।
বইয়ের স্টলের কাঁচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে মৃদু হেসে ফেলল। চোখের কোণে জমে থাকা জলটা সানগ্লাসের আড়ালে লুকিয়ে রইল। মানুষ সাধারণত ভাবে, প্রেম মানেই একে অপরকে বদলে নেওয়া। অথচ সত্যিকারের ভালবাসা হয়ত মানুষকে তার নিজস্বতাসহ গ্রহণ করার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। সায়নিকা সেদিন অনিন্দ্যকে হারিয়েছিল, কিন্তু নিজের বিশ্বাসকে হারায়নি।
বইমেলার ভিড়ের মধ্যে সায়নিকা এগিয়ে গেল, নতুন বইয়ের খোঁজে। সামনে আলো ঝলমল করছে, চারদিকে মানুষের কোলাহল। জীবনের মতই মেলাও চলতে থাকে, কেউ আসে, কেউ চলে যায়।
আর তার চোখে তখনও ঝলমল করছিল সেই রঙিন সানগ্লাস — যেটাকে সে মনে মনে বলত, “মেরিলিন মনরোর চশমা।”