রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনে প্রায় নয় বছর ধরে এই সংকট মোকাবেলা করে আসছে, কিন্তু সমস্যা সমাধানে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এই সংকট মিয়ানমারে শুরু হয়েছে এবং সেখানেই এর সমাধান প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এই নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।
আরাকান আর্মি (এএ) বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের প্রায় নব্বুই ভাগ নিয়ন্ত্রণ করলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অনুকূল নয়। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে টেকসই ও কার্যকর করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিয়ানমারের বিভিন্ন অংশীজনদের বেশ কিছু সমস্যার সমাধান করতে হবে। মিয়ানমারের জনগণ, রাজনৈতিক দল এবং সরকারকে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে থাকা রোহিঙ্গারাও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। কাম্পের ভেতরে কাজের কোনো সুযোগ না থাকায় বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বেকারত্বের শিকার। মানবিক সহায়তার ক্রমহ্রাসমান প্রবণতা, স্বদেশে ফেরার অনিশ্চয়তা, কাম্পের সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতার ফলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। সংকট সমাধানে দীর্ঘসূত্রিতা, সীমান্ত বরাবর মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানব পাচার, নতুন রোহিঙ্গাদের আগমন, রাখাইনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং আরাকান আর্মির সাথে সম্পর্ক বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অন্যান্য খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী দাতাদের তহবিল হ্রাস, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার এবং ব্যাপক আর্থিক কর্তনের কারণে আরও জটিল হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় প্রণীত জয়েন্ট রেসপন্স প্লান (জেআরপি) ধারাবাহিকভাবে আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
২০২৫ সালের জেআরপিতে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়সহ প্রায় ১.৪৮ মিলিয়ন মানুষকে সহায়তা করার জন্য ৯৩৪.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুরোধের প্রেক্ষিতে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সহায়তা কার্যক্রমে ৪৩৪.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে, যা আবেদনের ৪৬%। টেকসই সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য স্বল্পমেয়াদী মানবিক ত্রাণ থেকে সরে এসে মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগিসহ সমন্বিত নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন।
প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। এই তহবিল দিয়ে রোহিঙ্গাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্যাম্পগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়নি। বিপুল সংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠী মানবিক সহায়তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং এই চাপ বেড়েই চলেছে। মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুস, রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে, আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানায় এবং উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, এ ধরনের পদক্ষেপ মানবিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। তহবিলের ঘাটতির কারণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) মাথাপিছু খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। ডব্লিউএফপি ১ এপ্রিল থেকে প্রয়োজনের ভিত্তিতে তিনটি শ্রেণিতে রোহিঙ্গাদের সহায়তা প্রদান করে আসছে। মাথাপিছু ১২ ডলারের পরিবর্তে, এখন প্রায় ১৭ শতাংশ রোহিঙ্গাকে ৭ ডলার, ৩৩ শতাংশকে ১২ ডলার এবং বাকি ৫০ শতাংশকে ১০ ডলার মাসিক খাদ্য সহায়তা দেয়া শুরু করেছে। চলমান প্রচেষ্টাগুলো শিক্ষা, পুষ্টি-সংবেদনশীল খাদ্য সহায়তা এবং সুরক্ষা, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষার উপর জোর দিচ্ছে। সাহায্যের পরিমাণ কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং এটি চলমান মানবিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে। খাদ্য সহায়তা কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং অপুষ্টি বাড়বে। জীবিকার অভাবে অনেক রোহিঙ্গা শিবিরের বাইরে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হবে এবং সামাজিক উত্তেজনা বেড়ে যাবে। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর জন্য এই সহায়তা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে বিপুল সংখ্যক বেকার রোহিঙ্গা যুবক আয়ের বিকল্প উৎস হিসেবে এই বাহিনীগুলোতে যোগ দিতে পারে, যা স্থানীয় নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করার পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি সার্বিক নিরাপত্তা সংকট তৈরি করবে। আগামী দিনে এই সংকট মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
রাখাইনের অভ্যন্তরে মানবিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো প্রায়শই মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কার্যকরভাবে ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারছে না। একই সাথে তাদেরকে তাদের গ্রামে ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে, বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের উপর চাপ বাড়ছে, যা ধীরে ধীরে একটি জটিল মানবিক ও নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হচ্ছে।
এ এ রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অফ আরাকান এখন রাখাইনে একটি সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এর নিজস্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আদালত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য কূটনৈতিক কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।
এএ তার সামরিক শক্তির পাশাপাশি একটি বিস্তৃত মাদক অর্থনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করছে। ইয়াবা ও আইস পাচার তাদের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। নাফ নদী ও সমুদ্রপথ দিয়ে ইয়াবা ও আইস পাচার করা হচ্ছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ সমুদ্রপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক ও সীমান্ত দিয়ে পাচার রোধ করতে বাংলাদেশ সীমান্ত পাহারা ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে।
এএ প্রকাশ্যে রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বললেও, বাস্তবে অভিযোগ রয়েছে যে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং তাদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। জীবিকার সুযোগ সীমিত হওয়ায় তাদের জীবন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ধরনের নিপীড়ন রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে, যা তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। এএ’র মুখপাত্র জানায় যে, তারা ভবিষ্যৎ রাখাইন রাজ্যে সকল জাতিগোষ্ঠীর নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, তারা বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনা করবে এবং জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেবে ও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে। তবে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হলে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থানও নিশ্চিত করতে হবে।
চলমান সংঘাত রাখাইন অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত করেছে। এএ-নিয়ন্ত্রিত রাখাইনের ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক স্থল ও জলপথ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চোরাচালান করছে। এর বিনিময়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সীমান্তে পণ্য চোরাচালান এবং মাদকের আদান-প্রদান এখন একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এএ বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু করা এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী বলে জানা যায়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, এএ-কে প্রথমে রাখাইনে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের অবিশ্বাস ও ভয় দূর করতে এবং তাদের চলাচল, জীবিকা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অন্যান্য মানবাধিকার নিশ্চিত করার পথে থাকা বাধাগুলো দ্রুত অপসারণ করতে উদ্যোগ নিতে হবে। রোহিঙ্গা ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে এনে এএ তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে। রাখাইনে রোহিঙ্গা ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মধ্যকার মতপার্থক্য দূর হলে আগামী দিনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে। একই সাথে, সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ করতে এবং বাংলাদেশের জলসীমা থেকে জেলে অপহরণ বন্ধ করতে এএ-কে আরও সক্রিয় হতে হবে। এএ বাংলাদেশের সাথে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য সহজতর করে চোরাচালান বন্ধের পদক্ষেপ নিতে পারে ।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, বাংলাদেশ সরকার ২১ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে বাংলাদেশের ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ১৬-সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করেছে। কমিটি আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পরিচালনা ও সমন্বয় করার জন্য রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর সার্বিক কার্যক্রমের সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান করবে। কমিটিটি প্রত্যাবাসন বিষয়ক জাতীয় টাস্ক ফোর্স এবং ভাসানচরে পুনর্বাসনের জন্য গঠিত জাতীয় নির্বাহী কমিটির গৃহীত কার্যক্রমসহ রোহিঙ্গা-সম্পর্কিত সকল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করবে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্থল সীমান্তের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে বিজিবি এবং কোস্ট গার্ড। এই সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করলে সীমান্ত ও কাম্পের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। মানবিক সহায়তার ঘাটতি মোকাবেলায়, কমিটি একটি ইমার্জেন্সি রিজার্ভ গঠন করে জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় সহায়তা করতে পারে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন উদ্যোগ ও সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় মিত্র দেশগুলোর সাথে কাজ করছে। রোহিঙ্গা সংকটের একটি উপযুক্ত সমাধান খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সকল অংশীজনের, যাদের এই সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত এই বিষয়টি বৈশ্বিক আলোচ্যসূচিতে সক্রিয় রাখতে হবে। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদেরকে এই সংকটের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত রাখতে হবে এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে সেসব দেশের গণমাধ্যমে বিভিন্ন ভাষায় সর্বশেষ তথ্য প্রচারের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই উদ্যোগ চলমান রাখতে হবে।
মানবিক সহায়তার ক্রমহ্রাসমান প্রবণতা মোকাবেলায়, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের সাথে জড়িত সকল অংশীজনের উচিত নতুন দাতা এবং এই সংকট মোকাবেলার উপায় খুঁজে বের করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা। জরুরি ও সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য একটি সংরক্ষিত তহবিল বজায় রেখে নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ঘৃণা ও বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে এবং রাখাইন পুনর্গঠনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে এবং মিয়ানমারের সাথে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা উৎসাহব্যঞ্জক। এই সংকট মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী রোহিঙ্গানীতি এবং মিয়ানমার-সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে একযোগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে।
রোহিঙ্গাদেরকে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রণয়ন করতে হবে। দাতা দেশগুলোর তহবিল হ্রাস পাওয়ায় সাহায্য ও সমর্থনের ঘাটতি পূরণের জন্য, তাদের সহযোগিতায় সক্ষমতা ও আস্থা-নির্মাণমূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং আত্মনির্ভরশীলতার উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। জাতীয় কমিটিকে স্বল্পমেয়াদী মানবিক সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগি সমন্বিত করে কৌশল গ্রহণ করতে হবে। মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গা বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও আরাকান আর্মিকে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নিপীড়ন বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে কাজ করতে হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অবঃ), মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক