চতুর্দশ অধ্যায়।
স্যার এলিজা ইম্পে এবং সদর দেওয়ানি আদালত।
ডানিংকে লেখা এক চিঠিতে স্যার এলিজা ইম্পে এই বিধিমালাগুলোর (Regulations) ওপর নিচে উল্লিখিত সমালোচনা তুলে ধরেন —
‘আদালত’ বা গ্রামীণ বিচারালয়গুলোর — যেখানে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা সভাপতিত্ব করতেন — দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা এতটাই কুখ্যাত ছিল যে, সুপ্রিম কোর্টের আইনি কার্যক্রমের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অন্তত প্রদেশগুলোতে বিচারকার্য পরিচালনার একটি বাহ্যিক রূপ বজায় রাখা জরুরি বলে মনে করেছিল। অতএব, সরকার এই আদালত লুপ্ত করে নতুন আদালত তৈরি করে প্রত্যেকটিতে কোম্পানির অনভিজ্ঞ কর্মচারী নিযুক্ত করেছে, যিনি (যা পূর্বে কোনো আদালতের বিচারকের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না) নিরপেক্ষভাবে বিচার পরিচালনা এবং কোনো ঘুষ গ্রহণ না করার শপথ গ্রহণ করেন। এইপর্বে বিচারক হিসেবে নিযুক্ত ভদ্রলোকেরা হলেন —
পাটনা — জন গুইচার্ড বুথ (১৭৭৬ সালে ‘রাইটার’ বা লেখক পদে নিযুক্ত)
ঢাকা — আলেকজান্ডার ডুক্যানন (১৭৭২ সালে নিযুক্ত)
দিনাজপুর — বেঞ্জামিন গ্রিন্ডাল (১৭৭৩ সালে নিযুক্ত)
বর্ধমান — হিউ অ্যাস্টিন (১৭৭২ সালে নিযুক্ত)
মুর্শিদাবাদ — থমাস আইভস (১৭৭৩ সালে নিযুক্ত)
কলকাতা — থমাস ডুগাল ক্যাম্পবেল (১৭৭১ সালে নিযুক্ত)
এঁদের মধ্যে শেষোক্ত দুজন ছাড়া বাকি প্রত্যেকেই কেবল সুপ্রিম কোর্টের চেয়ে বেশি মূল্যের সম্পত্তির মামলার রায় দেন না, বরং আমি বিশ্বাস করি, আমি নির্দ্বিধায় এ-ও বলতে পারি যে, ওয়েস্টমিনস্টার হলের সমস্ত আদালতের সম্মিলিত বিচারকার্যের চেয়েও এঁদের বিচারকার্যের আওতা ব্যাপকতর। মিস্টার বুথ সমগ্র বিহার প্রদেশে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা আদালতগুলোকে তাঁদের প্রশাসনিক কাজের এমন এক অংশ হিসেবে গণ্য করে অভিযোগ জানিয়েছিলেন যা ছিল অত্যন্ত গুরুভার, দায়বদ্ধতাপূর্ণ এবং লাভহীন — এবং তাঁরা এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছিলেন — তবুও পরিষদ থেকে আদালতগুলোকে পৃথক করে ফেলার পর তাঁরা মধ্যে প্রায় বিদ্রোহে নামার উপক্রম করেফেলেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম আইনজীবী মিস্টার মোর্স পরিষদ সদস্যদের আবেদন জানিয়ে নতুন বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার প্রতিশ্রুতি লাভ করেন; কোম্পানির কর্মচারীদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছালে তাঁরা এতটাই তীব্র আর বিপুলভাবে প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন যে, সেই প্রতিশ্রুতি আর সরকারের পক্ষে রক্ষা করা সম্ভব হলো না। স্বাভাবিকভাবেই এমনটা মনে হতে পারে যে, যেহেতু এই ব্যক্তিদের কোম্পানির প্রবীণ কর্মচারীদের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হয়নি, তাই তাঁরা নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ যোগ্যতার কারণে বিশিষ্টতা অর্জন করেছিলেন; কিন্তু মিস্টার ক্যাম্পবেলের ক্ষেত্রটা সম্ভবত ব্যতিক্রম হলেও, বাকিদের ক্ষেত্রে বাস্তবতা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন — তা মোটামুটি সকলেরই জানা। তাদেরই একজন, মিস্টার বুথ — স্বভাবগত মেধার দিক থেকে অত্যন্ত সাধারণ মানের; তিনি নিজের মাতৃভাষাতেই অসামান্য নিরক্ষর এবং একটাও প্রাচ্য ভাষা সম্পর্কে তাঁর বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই। উপরন্তু, তিনি দেশের অন্যতম নিম্নরুচির, অমিতব্যয়ী ও উচ্ছৃঙ্খল তরুণদের একজন ছিলেন। আমার সন্দেহ, তিনি আদৌ পূর্ণবয়স্ক হয়েছিলেন কি না। (নন্দকুমারের বিচারের সময়, ফারসি অনুবাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন আলেকজান্ডার এলিয়ট এবং তিনি ‘খালসা নথিপত্রের তত্ত্বাবধায়ক’ বা Superintendent of the Khalsa Records-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আমার মনে হয় না তাঁর চাকরির বয়স আদৌ পূর্ণ হয়েছিল, আর যদি হয়েও থাকে তাহলে সেটা হয়েছিল সবেমাত্র; তৎকালীন ডেপুটি শেরিফ তো প্রকৃতপক্ষে নাবালকই) জনাব অটো আইভস তাঁর পদের বেতন — অর্থাৎ মাসে ১,২০০ সিক্কা টাকাকে এতটাই নগণ্য জ্ঞান করতেন যে, তাঁকে অন্য বাড়তি উপার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হলে, এই বেতন তাঁর কাছে নগন্য ছিল। তাছাড়া, শপথ গ্রহণ ছাড়া দুর্নীতির কাজকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখার অন্য নৈতিক বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ; যে কারণে তিনি বেশ কিছুদিন দ্বিধায় ছিলেন যে, তিনি আদৌ শপথ গ্রহণ করবেন কি না। এই সমস্ত নতুন রদবদল বা সংস্কার সাধন হয়েছিল আমাকে — কিংবা আমার বিশ্বাস, অন্য বিচারকদের কোনও রকম জনসমক্ষে বা ব্যক্তিগতভাবে বিন্দুমাত্র আগাম ইঙ্গিত না দিয়েই। গভর্নর-জেনারেল ও তাঁর পরিষদ নিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই বন্ধ ‘সদর আদালত’ বা আপিল আদালত সেই প্রায় একই সময়ে নতুন করে চালু হয়; কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেখানে বিচার বিষয়ক অধিবেশন বসেনি। জমিদারি স্বত্ব ইত্যাদি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলা এখন আর আগের মতো সেখানে নিষ্পত্তি হয় না; বরং তা নিষ্পত্তি করে থাকে পুরো পরিষদ (Board) — কেবলমাত্র ‘খালসা নথিপত্রের রক্ষক’ (Keeper of the Khalsa Records) নামক এক ইংরেজ ভদ্রলোকের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে; অথচ পরিষদের সদস্যদের সামনে এ বিষয়ে কোনো প্রকার সাক্ষ্য-প্রমাণই উপস্থাপন করা হয় না।
১৭৮০-র ২৯শে সেপ্টেম্বর, হেস্টিংস, কাউন্সিলে অত্যন্ত ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন কার্যবিবরণী (minute) পেশ করেন। নতুন তৈরি আদালতগুলোর সাথে প্রাদেশিক কাউন্সিলগুলোর সংঘাতের প্রবণতা লক্ষ্য করে এবং এই নতুন আদালতগুলোকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করে, তিনি ‘সদর দেওয়ানি আদালত’ পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে তাঁর বিখ্যাত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। একই সাথে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এই পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই কাজের ভারে জর্জরিত কাউন্সিলকে সেই গুরুভার থেকে অনেকটাই স্বস্তি দিতে সক্ষম। তিনি লিখলেন —
“দেওয়ানি আদালতগুলোর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সেগুলোর সবকটিই ঊর্ধ্বতন আদালতে জবাবদিহি করতে আইনত বাধ্য; এই ঊর্ধ্বতন আদালতের নাম ‘সদর দেওয়ানি আদালত’। সাধারণত — তবে ভুলবশত — এই আদালতকে কেবল আপিল আদালত হিসেবেই গণ্য করা হয়। অথচ এর কাজকর্মের পরিধি আরও অনেক বেশি বিস্তৃত — এবং স্বভাবতই তা আরও বেশি বিস্তৃত হওয়া জরুরি। এর দায়িত্ব শুধুই নিম্ন আদালতগুলোর রায়ের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার ঊর্ধ্বে থাকা সব মামলার আপিল গ্রহণ করাতেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়; বরং নিম্ন আদালতগুলোর যাবতীয় কার্যবিবরণী গ্রহণ ও পর্যালোচনা করা, তাদের কার্যপদ্ধতির ওপর নজর রাখা, তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করা এবং সর্বোপরি — অভিজ্ঞতার আলোকে আদালতগুলোর প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যেসব বিধিবিধান ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হবে — সেগুলো প্রণয়ন ও কার্যকর করাই হলো এর মূল দায়িত্ব। এখন পর্যন্ত ‘বোর্ড’ (কাউন্সিল) এই দায়িত্ব নিজেদের হাতেই কুক্ষিগত করে রেখেছিল; কিন্তু তারা এখনো পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালনের কাজে হাত দেয়নি। এমনকি আমি নির্ভয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি — যদিও তাদের মোট সময়ের অর্ধেকটা কেবল এই একটি বিভাগের কাজেই ব্যয় করা হতো — তবুও তারা কখনোই কার্যকরভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হতো না। (এ প্রসঙ্গে মিল [Op cit., vol. iv, p. 245] মন্তব্য করেছেন: “যদি সর্বোচ্চ গুরুত্বসম্পন্ন একটি বিচার দায়িত্ব — যার প্রতি সমাজের চাহিদা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক — টানা সাত বছর ধরে সম্পূর্ণভাবে অবহেলিত ও অপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকে, তবে সেই গভর্নর-জেনারেল ও তাঁর কাউন্সিল সম্পর্কে আমাদের কী ধারণা পোষণ করা উচিত? তাঁরাই তো বিচারব্যবস্থাকে এমন শোচনীয় অবস্থায় পড়ে থাকতে দিয়েছেন!”) অথচ, যদি কোনো শক্তিশালী কর্তৃপক্ষের সমর্থন ও নিয়ন্ত্রণ তাদের ওপর বলবৎ না থাকে, তবে এই আদালতগুলোর পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে; এমতাবস্থায় হয় তারা জনচক্ষে অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত হবে, নতুবা শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করবে।” “এই ক্ষমতা — আমি পুনরায় বলছি — পরিষদের (Board) পক্ষে প্রয়োগ করা অসম্ভব; আর যদি এই ক্ষমতা এমন কোনো ব্যক্তিগোষ্ঠী বা প্রতিনিধির ওপর ন্যস্ত করা হয়, যাদের কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতার বাইরে নিজস্ব কোনো প্রভাব বা গুরুত্ব নেই, তবে সেই পদক্ষেপও খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। এর বিকল্প হিসেবে আমি একমাত্র যে পদ্ধতির কথা ভাবতে পেরেছি, তা আমার প্রস্তাবিত নিম্নোক্ত প্রস্তাবগুলোর অন্তর্ভুক্ত; পূর্বোল্লিখিত কারণগুলোর ভিত্তিতে আমি এখন এই প্রস্তাবগুলো পরিষদের বিবেচনার জন্য পেশ করছি: —
“প্রস্তাব এই যে, প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ জানানো হোক যেন তিনি বর্তমান বিধিবিধান এবং পরিষদ কর্তৃক সংযোজিত বা প্রতিস্থাপিত অন্য যেকোনো বিধিবিধানের অধীনে সদর দেওয়ানি আদালতের কার্যালয়ের দায়িত্বভার ও তত্ত্বাবধান গ্রহণ করেন; এবং তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হলে, তাঁকে উক্ত পদে নিয়োগ দেওয়া হোক এবং ‘সদর দেওয়ানি আদালতের বিচারক’ উপাধিতে ভূষিত করা হোক।
“এই প্রস্তাবের সমর্থনে আমি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আরও দু-একটি কথা যুক্ত করার অনুমতি প্রার্থনা করছি: আমি বিলক্ষণ অবগত আছি যে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদের জন্য — যে পদ সিভিল সার্ভিসের প্রতিটি স্তরের কার্যক্রমকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে — আমি যাকে নির্বাচন করেছি, তা আমাকে সাধারণ মানুষের ব্যাপক বিরূপ ধারণার (prejudice) সম্মুখীন করবে। এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে অনেকে ভুলভাবে বুঝবেন, আরও অনেকে এর ভুল ব্যাখ্যা করবেন এবং সম্ভবত কেউ কেউ একে ভীতির চোখেও দেখবেন। আমি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে এই পরিণাম মেনে নেব; কারণ আমি আমার উদ্দেশ্যের সততা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন এবং আমি নিশ্চিত যে, ভবিষ্যতে ঘটনার গতিপ্রকৃতিই আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করবে। তখন দেখা যাবে যে — বাইরের দৃষ্টিতে বিষয়টি যেভাবেই প্রতীয়মান হোক না কেন — আমি প্রকৃতপক্ষে এই সার্ভিসের প্রকৃত স্বার্থরক্ষায় সচেষ্ট ছিলাম এবং এর মর্যাদা ও সুনাম বৃদ্ধিতেই সবচেয়ে কার্যকর অবদান রেখেছি।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ