জিয়লের আঠার মত যারা তোমার সঙ্গে আটকে থাকতো আজ জাহাজ এখনও ডোবেনি শুধু একটা জোরালো ঢেউ এসেছে তাতেই তারা তোমাকে এমন ত্যাগ দিচ্ছে যেন তুমি দলিত অচ্ছুত প্রজাতির কেউ। তোমার ছায়া ডিঙ্গোলেও ওদের জাত চলে যাবে!!
জেনে রাখো এই সমগ্র বিপর্যয়ের কারণ তুমি!! হ্যাঁ তুমি। যারা অভিষেক, আইপ্যাক, আরজিকর, দমবন্ধ এসব বলছে দল হারার কারণ — আসলে তারা নিজেদের লাভের মুখ বন্ধ হবার অজুহাতে বলছে। ওসব সুখের পায়রাদের জীবনের মাখোমাখো চর্বিযুক্ত ঝোলের স্বাদ কমে যাওয়াটা আসলে বিরোধী হিসেবে রোদ বৃষ্টিতে কষ্ট করার ভীতি সেটা সবাই বুঝতে পারছে। ক্ষমতার ক্ষীর ক্রিমের মত উজ্জ্বলতা বাড়ায়, এলাকায় পায়ের জোর বাড়ায় প্রতিপত্তির….সেখানে হেরো দলের শূন্য থেকে শুরু করার পরিশ্রম কি পোষায়?

এত হবারই ছিলো। তুমি বুঝতে চাওনি। একুশের ব্যাপক জয়ের পর তোমার আত্মগরিমা এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যেটা চব্বিশের জয়ে সম্পুর্ন অন্ধ করে ছাড়লো। তোমার মাটির সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিলো। তোমার সুখের পায়রাদের কথা বাদ দাও। ওরা তো রাজনীতির লোক। কিন্তু আমি? আনন্দবাজারের লক্ষ টাকার চাকরি ছেড়ে সামান্য মাইনের পারিশ্রমিকে নবান্নে কাজ করতে আমার কি খুব শখ হয়েছিলো? কিন্তু আমি তোমার অনুরোধ ফেলতে পারিনি। আমি অন্য কোথাও চাকরি বিশাল অংকের মাইনের চাকরি করতে পারতাম। কিন্তু আমার চলে গেলেই হলো এই মানসিকতা আর যতই হোক চিফ মিনিস্টার অফিসে কাজ করবার মর্যাদা আর অবশ্যই তোমার উপর আমার ফটোগ্রাফির জার্নির জন্যই তোমাকে হ্যাঁ বলি!! কিন্তু যে তুমি আমায় হাত ধরে তোমার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিলে সেই তুমি একুশের পর আমার খোঁজ নিয়েছো একবারও যে আমি কেমন আছি? আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা?
আমার হার্ডকোর জার্নালিস্ট জীবনে বহু পক্ষ বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের সঙ্গে আমার সদ্ভাব কাজের সূত্রেই গড়ে উঠেছিলো। এসব তুমি ভুলে গেলে কি করে? নাহলে উনিশের লোকসভা নির্বাচনের পর তোমার দলেরই দু একটা ঘটনা অবগত করতে গিয়ে তুমি আমার কাজের সীমাবদ্ধতা মনে করাতে পারতে না!! প্রথম প্রথম অতো পাত্তা না দিলেও একুশের পর তোমার কথাবার্তার মধ্যে আমিত্ব এত বেড়ে গেল যে আমাকে অবধি বারংবার তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপমান করার যে আহ্লাদ সেটা আদতে তোমার পদস্খলন তা কি আমি বুঝিনি? কিন্তু বলে কোনো লাভ নেই তাই শেষের দিকে আমিও তোমাকে এড়িয়েই চলতাম। নিত্যই তোমার দু ফুটের দূরত্বে হাঁটাচলা থাকলেও খোদ তুমিই যদি কানে তুলো আর পিঠে কুলো বেঁধে রাখো তাহলে যা হবার সেটাই তো হয়েছে।

ইদানীং তোমার চারপাশে কি হচ্ছে খোঁজ খবর আদৌ নিতে? কি করে নেবে? চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে বসেছিলে তো তোমার ক্ষমতার ক্ষীর খাওয়াদের আশ্বাস নিয়ে। অথচ আমার উপর ক্ষেপে থাকতে কিন্তু তোমার অফিস আজ অবধি আমার জন্য একটা ক্যামেরা বরাদ্দ করেনি এটা কি জানো তুমি? ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক এমনকি পেনড্রাইভ অবধি আমি নিজের পয়সায় কিনে কাজ করে গেছি। বারবার চিঠি করা সত্ত্বেও ভাঙ্গা ক্যামেরা দিয়েই আমাকে কাজ চালাতে হচ্ছিলো। বন্ধুদের থেকে বডি নিয়েছি কখনও কখনও। যখন দেখলাম আর তো সম্ভব নয় তখন বাধ্য হয়ে ক্যামেরা কিনলাম ছেলের থেকে টাকা ধার করে!! নবান্নের চিফ মিনিস্টার অফিসে কাজ করা বাবার কাছে এটা কি লজ্জার তোমার ধারণা আছে?
হাস্যকর শুনতে লাগলেও আমার নিজের গ্যাজেটস দিয়েই কাজ করে গেলাম শুরু থেকে শেষ অবধি…. বহু বহুবার অফিসিয়ালি বলেও তোমার অফিস আমার জন্য ক্যামেরার টাকাটা দেয়নি। হিসাব করলে প্রায় সাত লক্ষ টাকা আমি পাই। ফাইল চোদ্দোতলা থেকে আইএনসিএ, ফিন্যান্স শুধু চক্কর কাটতে থাকে দিনের পর দিন। এই নিয়ে শেষের দিকে আমি তো হাসির পাত্র হয়ে গিয়েছিলাম অন্য অফিসারদের কাছে। রীতিমত মজা টিটকারি করে আমায় তারা বলতো, “কিগো অশোকদা টাকা পেলে? বলেছিলাম ও টাকা আর পাবে না!”….এটা ছিলো আমার প্রাপ্য?

তোমার ধূপ ধুনো দিয়ে পুজো করা কাছের লোকজন তোমার পিছনে সরকারের টাকা চুরি করে এখন পিঠ বাঁচাতে ছুটোছুটি করছে। আর সেই সরকারই আমার ওই কটা টাকা নিয়ে বসে আছে….আর আমি বোকা নির্বোধ বাড়িতে বসে রাগে গজগজ করছি। আমি সাধারণ মানুষ। খেটে খাই। বড়িশুদ্ধু সবাইকে কাজে নামতে হয়েছে সংসারকে সচল রাখতে। সেখানে তোমার প্রমোটি অফিসার দু-জন ইচ্ছাকৃত ঢিলেমি করে টাকাগুলো স্যাংশন করেনি। এখন পারবে দিতে তোমার ফেলে আসা সরকার আমার বকেয়া টাকাগুলো? মাঝেমধ্যে মনে হয় শুভেন্দুর দরবারে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিয়ে আসি। ওকে যতটুকু আমি চিনি তাতে টাকা পাই না পাই অন্তত বিষয়টা শোনবার মত সময় সে আমাকে দেবে।
আচ্ছা তুমি তো নিশ্চয় এটাও জানো না যে, আমার লাস্ট ছ-বছর কোনো ইনক্রিমেন্ট হয়নি? কন্ট্রাক্ট ফাইলটা রিনিউ করার সময় কেউ কি সেকথা মনে করিয়েছিলো তোমায়? কেন করায় নি জানো? ভয়ে। দুম করে কি কথা বলে দেবে সেই আশঙ্কায় নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা তারা করেনি। ফলে ভুগলাম আমি। অনেকে বলবেন, ছেড়ে দেননি কেন?

হ্যাঁ বহুবার ভেবেছি ছেড়ে দেবো। কিন্তু আমার ফটোগ্রাফির সাব্জেক্ট উনি…. ওনার কাজকর্ম, রাজনীতি এসবের ভিতরেই আমি ওনার জীবনকে তুলে রাখাই আমার অন্যতম প্যাশন। সেই কারণেই অপমান, অসম্মান হলেও কাজটা করে গেছি। কারণ ভবিষ্যতে ওনাকে নিয়ে চার লাইন লেখা হলে চারটে ছবি কিন্তু আমারও থাকবে। এটাই আমার প্রাপ্তি।
কিন্তু দুর্ভাগ্য কোথায় হলো জানো? তোমাদের এই নোংরা রাজনীতির পাঁকে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে তোমরাই নিয়ে গেছো যে তোমার উপর বই, ডকুমেন্টেশন কিংবা এক্সিবিশন করার জন্য না পাবো হল না কোনো পাবলিশার রাজি হবে বই ছাপাতে!! লজ্জাই লাগে আজ ভাবতে যে তোমরা সমাজসেবায় এমন নিমগ্ন ছিলে যে আমার মত সাধারণ মানুষের পেটে গামছা বাঁধার উপক্রম করলে। এরপরও কালীঘাটে আমি তিন চারদিন গিয়েছি। তুমি কোনো কথা বলো নি। অভিষেক নিজে ফোন করে সব শুনেও আর কিছু জানালো না। এখন তো আর পরিস্থিতিও নেই এসব কথা বলার!!

ভাবতেই বিরক্ত লাগছে যে, আজ হঠাৎ করে কি তোমার ছবি তুলছি আমি? তুমি কি সেসব ভুলে গেলে? সেই কোন কালে আদিগঙ্গার জল ঢুকে যেত তোমার বাড়িতে তখন থেকে অজস্র মুহূর্ত যা তুলতে গিয়ে কাগজের অফিসে পর্যন্ত গালাগালি খেয়েছি। তবুও একটি একলা মেয়ের লড়াইয়ের উত্থান-পতনের সাক্ষী থাকতে চেয়েছি আমার ক্যামেরার চোখ দিয়ে। আর সেই তুমিই আমাকে দিনের পর দিন এড়িয়ে চলতে শুরু করলে? শেষের দিকে প্রতিটা ট্যুরে আমাকে পারমিশন নিতে বাধ্য করেছিলে। এগুলো আমার অপমান নয়?
তোমার অফিস তো একুশ থেকে এই ছাব্বিশ অবধি একটা সরকারি ট্যুরের বিলও স্যাংশন করেনি। বারবার অনুরোধ করেও নবান্নের প্রমোটি ওই দুই স্টাফ তোমাকে কিছু জানতেও দেয়নি। তুমি হয়তো এখন বলতেই পারো যে, বলিস নি কেন?…. ক্যামেরার টাকা, ইনক্রিমেন্ট, ট্যুরের বিলের কথা চিফ মিনিস্টারকে বলবো কেন? এটা তো অফিসিয়াল কাজ।

এই সামান্য বিষয়গুলো তোমার জন্যই গণ্ডগোল বেঁধেছে। ইদানীং মন্ত্রী অফিসাররা ঘরে ঢোকার আগে তোমার মেজাজ জেনে নিত। মুড ভালো থাকলে যেত, নাহলে নয়। এরকম কবে ছিলে তুমি? তোমার তো চিরকাল স্বভাব এই গরম তো পরক্ষণেই গলে জল। একটা সময় নবান্নের অফিসারদের জন্মদিন পর্যন্ত মনে রেখে উইশ করেছো। সাংস্কৃতিক জগতের নামি মানুষদের জন্মদিনের কার্ড পাঠানো, মনিষীদের জন্ম মৃত্যুদিনে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর এসব মনছোঁয়া বিষয় তো তোমারই আমদানি!! সেগুলো ধীরে ধীরে তোমার পছন্দের তাঁবেদারিদের ভিতর সীমাবদ্ধ হয়ে গেলো যখন আমরা ওরার রাজনীতিই তো সেই হলো তাইনা?
আমাকে বেশ কয়েকবার তোমার দুই প্রোমোটি অফিসারদের দ্বারা তির্যক কথা শুনতে হয়েছে যে আমি নাকি সিএমও অফিসের নাম করে ছবি তুলি!! আমি জানি এই কথাটা তুমিই বলেছো। আচ্ছা সনিয়া গান্ধীর বাড়িতে ছবি তোলা নিয়ে যেবার অপমান করলে সেদিন কিন্তু একটা মিডিয়াও ঢুকতে পারেনি ওই বাড়িতে একমাত্র আমি ছাড়া। সনিয়া, রাহুল আর তোমার ছবি গোটা দেশের মিডিয়ায় আমি এক্সক্লুসিভ দিয়েছিলাম আর সেটাও তোমার নির্দেশেই।

তারপর কি হলো? সনিয়া গান্ধীর এসপিজি সুরক্ষা বলয়কে কনভিন্সড করে ভিতরে যাওয়া ও ছবি তোলার জন্য তুমি অভিষেকের সামনেই আমাকে যা নয় তাই কথা শোনালে! কেন না তুমি সেদিন ভেবেছিলে আমি সিএমও অফিসের পরিচয় দিয়ে ঢুকেছি। পরে যদিও নবান্নে এন্ট্রি পাসের ডিটেলসটা ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার এটা প্রিন্সিপাল সেক্রেটারী যখন তোমাকে শো করায় তুমি ঠিক আছে ঠিক আছে বলে ব্যাপারটায় জল ঢেলে দিলে অথচ একবারও ভাবলে না কতটা অপমানিত হতে হয়েছিলো দিল্লীতে সেদিন অভিষেক-সহ আরও কয়েকজন অফিসারের সামনে!!
সনিয়া গান্ধী তো ছেড়ে দাও, গান্ধী পরিবারের ছবি তোলার জন্য আমার আরও দশটা সোর্স আছে। কিন্তু তোমার প্রোমোটি অফিসাররা কখনও কি তোমাকে বলেছিলো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তোমার যে কতিপয় সাক্ষাৎ সেই ছবিগুলো কি করে পেতাম!! ওখানে তো পিএম ফটোগ্রাফার ছাড়া কারোর এলাও নেই!! সেই ছবি রিলিজ করে তামাম এজেন্সি কাগজের তো পৌষমাস ছিলো একসময়। কিন্তু তারা আমাকে কি পাঁচ টাকা কোনোদিন দিয়েছে? জিজ্ঞেস করে দেখো তো? তোমার তো সন্দেহ ছিলো আমি নাকি ছবি রিলিজ করেই কোটি কোটি টাকা করেছি!!

ঘটনা হচ্ছে আমি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মিডিয়া এ্যাডভাইজরের পদে নিযুক্ত ছিলাম ঠিকই কিন্তু পাশাপাশি আমি একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। সেই কার্ডটিও কিন্তু আমার রয়েছে। ফলে তোমার ছবি তোলার জন্য আমার সিএমও অফিসের পরিচয়টাই একমাত্র পরিচয় নয়। আমার দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনের সোর্স আর কার্ডের জোরেই এখনও যেকোনো ধরনের ছবি তোলার বৈধতা আমার আছে।
সনিয়া গান্ধীর বাড়িতে ঢোকার জন্যও আমি সেই কার্ডই ব্যবহার করেছিলাম। আর নরেন্দ্র মোদি শুধু নয় দেশের তামাম রাজনৈতিক নেতাদের যারা ছবি তুলছে এই মুহূর্তে সেই ফটোগ্রাফারদের সঙ্গে কখনও না কখনও কোনো না কোনো কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয়েছে। বা বন্ধুদের কারোর সঙ্গে পরিচয় আছে। এই সোর্স যেগুলো ফটোগ্রাফার মাত্রই কাজে লাগায়। নাহলে এত এত এক্সক্লুসিভ ছবি কি নেতারা আমাদের ডেকে ডেকে দেয় নাকি!!

এই যে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাকে কেউ কেউ চটিচাটা, দালাল এমনকি এই হারের পর সরকারি মাইনে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি তুলেছি এইসব কথা যারা বলছে তারা সুযোগ আছে বলেই যা মনে আসে তাই খোঁচা দিয়ে দেবো এই কুশিক্ষাগুলো একটু বন্ধ করুন। জীবন ও সমাজে সীমা ও সভ্যতা রাখলে দেখবেন অনেক সমস্যা দূর হয়ে যাবে। মানসিকভাবে ভালো থাকবেন।
একুশের পর কতবার আমাকে তোমার অকারণ ফালতু কথা শুনতে হয়েছে। মুকেশ আম্বানির ছেলের বিয়ে অ্যাটেন্ড করতে গিয়েও তুমি আমায় দোষী সাব্যস্ত করলে, অথচ মুকেশজি তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসার সময় আমি তো তোমার হোটেলের নিচে কফি খাচ্ছিলাম। তুমিই উপরে ডেকে পাঠালে…. মুকেশজি ওনাদের রিচুয়াল অনুযায়ী তোমাকে বরণ করার ছবি তুললাম। তুমি বারণও করোনি। তারপর সেই ছবি মিডিয়া সেলে পাঠালাম। ওখান থেকে আমাকে বারণ করা হলো মিডিয়া রিলিজ না করতে। করিনি। কিন্তু সেই ছবি কি করে তোমাদের তৎকালীন মুখপাত্রের দ্বারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেল সেটা আমি কি করে জানবো? কিন্তু তুমি তো তুমিই। রেগে গেলে দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকে না। পুরো দায় চাপালে আমার ঘাড়ে। আমাকে নিষেধ করলে প্রোগ্রাম অ্যাটেন্ড করতে। বাধ্য হয়ে আমি ফিরে এলাম।

ছবি আমি কোথাও দিইনি সেই সমস্ত তথ্য দিয়ে তোমাকে চিঠি করলাম ইনভেস্টিগেট করার জন্য। প্রায় একমাস অফিস রেস্ট্রিক্ট করে রাখা হলো আমাকে। তারপর আবার কাজে যোগ দিলাম। যে ম্যাডাম ছবিগুলো ব্লু টিক মুখপাত্রকে দিয়েছিলো সে তো তোমার আত্মীয়া? ওই তিনদিনের চুনোপুঁটিকে ম্যাডাম বলতে হত জানো তো নিশ্চয়; শুধু মিডিয়া সেলে কাজ করে তাদের নয় নবান্নের অফিসারদের কাছেও তিনি ম্যাডাম শুনতে অভ্যস্ত ছিলেন। আমি তাকে ছোটো থেকেই তার ডাক নামে ডাকতাম বলে আমাকে নিয়েও তার কটু কথার শেষ ছিলো না। মুশকিল হচ্ছে ইচ্ছে করলেই আমার নামের ওজনটা তাকে বুঝিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু পঁয়তাল্লিশ বছরের বেশি বয়সের ব্যবধানের কাওকে অপমান করার মত মানসিকতা আমার হয়নি। কিন্তু মুম্বইয়ের ঘটনা সবটা জানার পর তুমি কি একবারও বলেছিলে, “কিছু মনে করিস না?”
দিদি, সাংবাদিক হিসাবে আমি অশোক মজুমদার যে উচ্চতায় কাজ করেছি একুশ সালের পর থেকে নবান্নে তুমি আমার মর্যাদা বজায় রাখতে পারোনি। আমি দাঁতে দাঁত চিপে অসম্ভব জেদে পরে থাকতাম। এইযে এখন কংগ্রেসের সঙ্গে তোমার জোট নাকি মিশে যাওয়ার জল্পনা কল্পনা চলছে তাতে আমার অতীতেও বিন্দুমাত্র ভাবনা ছিলো না, আজও নেই। আমি যখন প্রথম তোমায় ফলো করতে শুরু করি তখন থেকেই তোমার সাফল্য ব্যর্থতার সব মুহূর্তই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আর আমি আমার এই জায়গা থেকে একটুও চ্যুত হইনি এটাই আমার জীবনদর্শন।

আজও এই বিপর্যয়ের পরও আমার অনেক পরিচিত ভাই বন্ধুদের মায়েরা যারা শুধু তোমার খবর জানতেই ফোন করতো আমায়। কখনও কখনও আমি খুব রেগে যেতাম। আবার মজাও করতাম। এই কদিনে তাদের ইচ্ছে করে ফোন করে কিংবা কারো কারো বাড়িতে গিয়ে তোমার নামে রাগ করেই কথা বলেছি কিন্তু তারা হতাশ হলেও বলেছে, ওর কি দোষ ওত ভালোই চেয়েছে সবার!!
আমাদের মত সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েদের বাপ ঠাকুর্দারা ছোটো থেকেই একটা কথা পইপই করে বলতো যে, “পায়ের মাপ বুঝে জুতো কিনবে। নাহলে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খাবে।”….এই বেদবাক্যের মত কথাটাই তো তোমারও জীবনদর্শন ছিলো!! তাইতো এত মানুষ তোমার পায়ে পা মিলিয়েছিলো। সেই তোমার জুতোর মাপ বৃদ্ধির মত বিগত কয়েক বছরে তোমার সভার ডি জোন যত বাড়ছিলো তত তোমার সঙ্গে পা মেলাতে না পেরে সাধারণ মানুষ পিছিয়ে পরছিলো…. তুমি বুঝতেও পারলে না!! আর ধীরে ধীরে নিজের সন্তানসম অগণিত কর্মী, সমর্থক, সমাজ সচেতন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের কথা শোনার মত মানসিকতা থেকে বহু বহু দূরে সরে গেলে। যারা শুধু তোমার লড়াই দেখে তোমার সঙ্গে হাঁটতে চেয়েছিলো। মানুষ চিনতে চিনতে হটাৎ করে থমকে যাওয়াটা বড্ড চোখে পরতো জানো তো?

যাইহোক, এখন তোমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো মাসিমার। রাজনীতির ভিতরে একেবারেই না থাকা সাধারণ ঘরের আমাদের মা যেমন হয় সেরকমই ছিলেন উনি। স্বাভাবিকভাবেই এসময় মেয়েকে যত্ন করে বলতেন, কি খাবি বল? কতদিন তো ভাত খাস না…. একটু বিউলির ডাল পোস্ত দিয়ে দুটো ভাত খেয়ে ঘুমো। কদিন একটু চুপ করে বাড়িতে থাক। রেস্ট নে। গান শোন, বই পড়। দলের যা হয় হোক ….নতুন ছেলে মেয়েদের হাতে ছেড়ে দে।
অনেকদিন আগে নবান্নে একজন আমায় বলেছিলেন, উনিই সৃষ্টি উনিই ধ্বংস। আজ তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় পাচ্ছি…. !!
১৪.০৬. ২০২৬
সমস্ত ছবি অশোক মজুমদারের তোলা এবং সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত