৪৭. কবিয়াল রমেশ শীল
১৮৯৮ সালে।
চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজারের মাঝিরঘাটে দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে কবিগানের আয়োজন করা হয়েছে। সেকালে কবোগানের প্রতি মানুষের খুব আগ্রহ ছিল। মাঝিরঘাটের আসরেও লোক জমেছে বিস্তর। হাজার পঞ্চাশেক হবে বোধকরি। হবার কারণও আছে। এই আসরে কবিগান পরিবেশন করবেন মোহনবাঁশি আর চিন্তাহরণ। এাঁরা দুজনেই তখনকার বিখ্যাত কবিয়াল।
শুরু হল কবিগান। কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন। অসুস্থ হয়ে পড়লেন চিন্তাহরণ। কি হবে! দুজন ছাড়া কবিগান হবে কি করে! হই হই করে উঠলেন দর্শকরা। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন আয়োজকরা। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কবিয়াল দীনবন্ধু। তিনি কবিগান শুনতে এসেছিলেন। আয়োজকরা তাঁকে অনুরোধ করলেন আসরে নামতে। দীনবন্ধু নিজে না গিয়ে আর এক কবিয়ালকে দেখিয়ে দিলেন। একুশ বছরের তরুণ কবিয়াল। তিনি প্রথমে উঠতে চাইছিলেন না। আয়োজকদের কাতর অনুরোধে নামলেন আসরে।
তরুণ সেই কবিয়ালকে দেখে একচোট হেসে নিলেন মোহনবাঁশি। গানের সুরে তাচ্ছিল্য করে তিনি বললেন, ‘এই পুঁচকের সাথে কি পালা করা যায়!’
উত্তর দিলেন যুবক কবিয়াল। বললেন : —
উৎসব আর ভয় লজ্জ কম নয়
কে বা হারাতে পারে কারে
পুঁচকে ছেলে সত্যি মানি শিশু ব্রজ ছিল জ্ঞানী
চেনাজানা হোক না আসরে।
তরুণ কবিয়ালের গান শুনে থমকে গেলেন প্রবীণ মোহনবাঁশি। তখন দর্শকের দিকে তাকিয়েছেন তরুণ কবিয়াল। আর তাঁর ভয় নেই। সংকোচ নেই। কি যেন ভর করেছে তাঁর উপর। টানা আধঘণ্টা গান গাইলেন তিনি। কে জয়ী, কে পরাজিত — তা ঠিক করা গেল না। কিন্তু তরুণ কবিয়ালের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
এই তরুণ কবিয়ালের নাম রমেশ শীল (১৮৭৭-১৯৬৭)।
চণ্ডীচরণ শীলের পুত্র রমেশ শীল জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম বিভাগের বোয়ালখালি থানার অন্তর্গত গোমদণ্ডী গ্রামে। পেশাতে নাপিত ও কবিরাজ ছিলেন চণ্ডীচরণ। যখন তিনি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, তখন অকস্মাৎ মৃত্যু হল পিতার। লেখাপড়ার সুযোগ আর রইল না। পরিবারের দায়িত্ব নিতে হল এক কিশোরকে। ভাগ্যান্বেষণের জন্য কিছুদিন রেঙ্গুনে কাজ করেছিলেন। দেশে ফিরে এলেন তারপর। নরসুন্দরের কাজ করতে করতে কবিরাজিও করতে লাগলেন।
কবিরাজি করতে করতে আকৃষ্ট হলেন কবিগানের প্রতি।
১৮৯৭ সালে তিনি প্রথম কবিগান পরিবেশন করলেন। কিছুটা নাম হল। কিন্তু ১৮৯৮ সালে তিনি যখন কবিগানের প্রতিযোগিতায় তিনজন কবিয়ালকে পরাজিত করলেন, তখন থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর নাম।
প্রথম দিকে প্রথাগত কবিয়ালদের রীতি অনুসরণ করতেন। পুরাণ থেকে সংগৃহীত হত গানের বিষয় ল নারী-পুরুষ, সত্য-মিথ্যা, গুরু-শিষ্য, সাধু-গৃহস্থ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে গান বাঁধতেন। সমাজ সচেতন মানুষ বলে পরবর্তীকালে তাঁর কবিগানে অনুপ্রবিষ্ট হল সমকালীন বিষয়। যুদ্ধ-শান্তি, মজুতদার-চাষি, মহাজন-খাতক, স্বৈরতন্ত্র-গণতন্ত্রের কথা এল তাঁর গানে।
রমেশ শীল যেন কবিগানে নতুন সুর সংযোজনা করে দিলেন। না, সেখানে অশ্লীলতা নেই, খেউড় নেই, কুরুচিপূর্ণ শব্দ নেই, স্থূল অঙ্গভঙ্গি নেই। তিনি বললেন —
ব্যবসার ছলে বণিক এল
ডাকাত সেজে লুঠ করিল
মালকোঠার ধন হরে নিল
আমারে সাজায়ে বোকা
কৃষক মজদুর একযোগেতে
হাত মেলালে হাতে হাতে
শ্বেতাঙ্গ দুষমনের হতে
যাবে জীবন রাখা
চারণ কবি মুকুন্দ দাসের মতো রমেশ শীলও হয়ে উঠলেন স্বাধীনতার সৈনিক। তবে মুকুন্দ দাসের সঙ্গে তাঁর পার্থক্যও আছে। রমেশ শীল অঙ্গীকার করে নিয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তিনি দেশি শোষকদেরও বিদ্ধ করেছেন সমালোচনায় :
আমার খুনে যারা করেছে মিনার
রক্ত মাংস খেয়ে করেছে কঙ্কালসার
আজ সেই সময় নাই ত্বরা ছুটে আসো ভাই
বেদনা প্রতিকারের সময় এসেছে।
রমেশ শীল রচিত গ্রন্থগুলি হল : শান্তিভাণ্ডার, নূরে দুনিয়া, দেশের গান, ভোট রহস্য, চট্টলা পরিচয়, ভাণ্ডারে মওলা, জীবন সাথী, মুক্তির দরবার, মানব বন্ধু, দেশদরদী গানের বই, শান্তির কবিতা ইত্যাদি।