| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাজলদীঘি

Reporter Default
রিপোর্টার / ২৬৪৪ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২০

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১০৬ নং কিস্তি

অফিসে যখন পৌঁছলাম দেড়টা বেজে গেছে। সেই ছেলেটা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আজ কোনও বাধা দিল না। একটু হাসলাম। দরজা খুলে ঢুকতেই পিউ উঠে দাঁড়াল।

স্যার।

একটু দাঁড়ালাম।

মা এসেছেন।

কোথায়?

ওপরে ম্যাডামের ঘরে।

আচ্ছা।

দাঁড়ালাম না। লিফটে আর দশজন যেমন ওঠে তাই উঠলাম।

তিনতলায় এসে নামলাম। লিফ্ট থেকে বেরতেই দেখলাম মিত্রার ঘরের সামনে একজন ভদ্রলোক চেয়ারে বসে আছে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল।

স্যার সবাই বড়োসাহেবের ঘরে আছে।

আমাকে চেনেন?

হ্যাঁ স্যার। আপনি অনিবাবু।

আপনাকে চিনলাম না।

আমার বাবার নাম হরিসাধন দাস।

তুমি হরিদার ছেলে!

হ্যাঁ স্যার।

হরিদা কেমন আছে?

বাবা আপনার কথা শুনে আমার সঙ্গে এসেছেন।

তাই! কোথায়?

বড়ো সাহেবের ঘরে।

আর দাঁড়ালাম না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। দাদার ঘরের দরজাটা খুলে মুখ বাড়াতেই, একটা হাসির রোল। একঝাঁক ঠান্ডা হাওয়া আমাকে গ্রাস করলো। ঘর ভর্তি লোক।

আয়।

দাদা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে।

আমি ভেতরে এসে দাঁড়ালাম।

চম্পক দেখ চিনতে পারিস কিনা।

আমি কাছে গেলাম।

চম্পকদা আমাকে তারিয়ে তারিয়ে দেখছে।

ওমা দেখছি সবাই এসে হাজির।

হরিদা, সনাতনবাবু, রনিতা দিদিমনি আমাকে দেখে হাসছে।

চম্পকদার শরীরের সেই জৌলস আর নেই, কেমন যেন বুড়োটে মেরে গেছে। উঠে দাঁড়াল। আমি জড়িয়ে ধরলাম। নীচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম।

আরে থাক না এখানে না করলেই কি নয়।

তুমি তো একেবারে বুড়ো হয়ে গেছো।

তুই মনে হয় এখনও জোয়ান আছিস।

দেখোনা কেমন জিনসের প্যান্ট কালারফুল গেঞ্জি লাগিয়েছি।

এটা তোর ঘটের ফসল নয়। নিশ্চই মিত্রা গজগজ করবে তাই পড়ে এসেছিস।

জব্বর কথা বলেছিস চম্পক। দাদা বলে উঠলো।

ঘর শুদ্ধু সকলে হাসছে।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকাচ্ছে।

তোমার সেই ঝকঝকে চেহারাটা এখনও চোখের সামনে ভাসছে।

আমারও সেই ইয়ং অনিকে দেখতে ইচ্ছে করছে।

মাথা নীচু করে হাসছি।

মাথার চুল কোথায়?

ওটা একজনের উদ্দেশ্যে দান করেছি।

জানিস আমি এখন দাদু হয়ে গেছি।

তাই! খাওয়া পাওনা রইলো।

কবে খাবি বল?

কাজগুলো সারি, তারপর দেখবে একদিন ঝপ করে চলেগেছি।

একে একে হরিদা, রনিতা ম্যাডাম, সনাতনবাবু সবার সঙ্গে কথা বললাম।

চম্পকবাবু, ছোটোবাবুর গলাটা কিন্তু এখনও সেইরকম আছে। সনাতনবাবু বললেন।

শুধু গলা কেন সনাতনবাবু, লম্বায় চওড়ায় কোথাও বদল দেখছি না।

দাদা হরিদাকে একটু চায়ের কথা বলো।

সারা ঘরে আবার হাসির রোল উঠলো।

হরিদা উঠে দাঁড়িয়েছে। আমি গিয়ে হরিদাকে জড়িয়ে ধরলাম। হাতটা ধরে চেয়ারে বসালাম।

তোমার হাতের চা কতদিন খাইনি বলো।

বটাটা মরে গেল বুঝলে ছোটোবাবু।

হাসাহাসির মধ্যেই হঠাৎ ঘরের পরিবেশটা কেমন থম থমে হয়ে গেল।

মন খারাপ করবে না। বটাদার ছেলে মেয়ে অফিসে আছে।

বুড়ো পকেট থেকে রুমাল বার করে চোখের জল মুছলো।

ওই দেখ তোমার দেখা দেখি রনিতা দিদিমনির চোখ ছল ছল করছে।

হরিদা আমার হাতটা শক্ত করে ধরেছে।

বটাদা এখানেই কোথাও আছে বুঝলে হরিদা, তুমি একটু চোখ বন্ধ করে ভাবো, দেখতে পাবে।

আমার সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়।

তাহলে কাঁদছো কেন? আজ কিন্তু তোমাকে চা খাওয়াতে হবে, তোমাকে সাহায্য করবে তোমার ছেলে। কি পারবে তো?

হরিদা মাথা দোলাচ্ছে।

এখন চুপটি করে বোসো।

দেখলাম দরজা খুলে সুতনুবাবু ঘরে ঢুকলেন।

আমি হরিদার কাছ থেকে সুতনুবাবুর কাছে গেলাম। নীচু হয়ে প্রণাম করতে যেতেই হাতটা ধরে ফেললেন।

এ কি করছো ছোটোবাবু…।

কেমন আছেন।

ভালো নেই ছোটোবাবু। শরীরটা একেবারে গেছে।

এই যে শুনলাম আপনি সপ্তাহে দু-দিন অফিসে আসেন।

কো-অপারেটিভে এসে বসি। তোমার সাহায্যে আজ কো-অপারেটিভটা একটা ভালো জায়গায় দাঁড়িয়েছে।

আমার লোন দরকার, পাওয়া যাবে?

কোনও গ্যারেন্টার ছাড়া বিনা ইন্টারেস্টে দেব। কি বলুন চম্পকদা।

আমার রেকারিংয়ের টাকাটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। কাউকে ডাকো এসে নিয়ে যাক।

এখন রাখুন না। আপনি তো এখুনি চলে যাচ্ছন না।

এই ঘরের অনেকেই আমার অপরিচিত। যারা পরিচিত তারা আছেই। ছেলে, মেয়ে, সুন্দর মল্লিকদার পাশে বসে। মিত্রা, দাদার পাশে। তার পাশে একটা চেয়ার খালি।

মিলি, টিনা, অদিতি যার যার নিজস্ব ডিপার্টমেন্টের এক্সিকিউটিভদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। সবার সঙ্গে পরিচিত হলাম। মিত্রার পাশে ফাঁকা চেয়ারে বসলাম।

চম্পকদা।

বল।

তোমাকে, সনাতনবাবুকে, সুতনুবাবুকে নিশ্চই মিত্রা মাঝেমাঝে অফিসে এসে এদেরকে একটু সাহায্যের কথা বলেছে।

কেন, আমি অফিসে সপ্তাহে একবার না হলেও পনেরো দিন অন্তর একবার আসি। সনাতনবাবুও আসেন। সুতনু তো সপ্তাহে দু-দিন আসেই।

আমার কিন্তু হালহকিকত খুব একটা ভালো ঠেকছে না।

কেন আবার কিংশুক, অরিন্দম, সুনীতের জন্ম হয়েছে নাকি!

এখনও হয়নি তবে হতে চলেছে।

সবাই এবার একটু নরেচরে বসলো। মিলিদের চোখ মুখটা কেমন যেন শুকনো শুকনো লাগছে।

ছিদাম দরজা খুলে মাথা ঢোকাল। হরিদা দেখলাম ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। কেউ বাধা দিল না।

তোর যদি কাউকে সন্দেহ হয় একবারে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে অফিস থেকে বার করে দিবি।

তুমি রাগ কোরো না।

রাগের কথা নয়। অনেক কষ্ট করে একটা ভেঙে যাওয়া হাউসকে তুই দাঁড় করিয়েছিস। তুই বার বার বলেছিস, চম্পকদা আমাদের হাউসটা একটা বট বৃক্ষের মতো। এটাকে যদি আমরা সবাই মিলে ঠিক মতো দেখভাল করি, তাহলে দেখবে এই গাছের তলায় বসে আমরা সবাই একটু ছায়া পেতে পারি। কথাটা আমি এখনও মনে রেখেছি। তুই কোনওদিন আমাদের সাহেব হোস নি, মালিক হোস নি। আমাদের থেকেও সাধারণ থাকার চেষ্টা করেছিস। নিজে কোনওদিন ডেকে পাঠাসনি। প্রয়োজন পড়েছে নিজে ছুটে গেছিস।

তুই না থাকলেও আমরা যতদিন ছিলাম। তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। তুই আমাদের থেকে অনেক ছোটো। তোর কথা একসময় আমরা মেনে নিয়েছিলাম। কেন? তুই হাউসের কোনও দিন খারাপ চাস নি। এমনকী তুই যে এই হাউসের একজন ওয়ান অফ দ্যেম পার্টনার তাইই এই হাউসের শতকরা নব্বইভাগ স্টাফ জানতো না।

চম্পকদা থেমে থেমে লম্বা লেকচার দিল।

তোমাকে কতকগুলো কথা জিজ্ঞাসা করবো?

বল।

আচ্ছা এখন যারা এ্যাড ডিপার্টমেন্টের এক্সিকিউটিভ আছে তার কার রিক্রুটমেন্ট।

আমার। আরে আমি সনাতনবাবু, সুতনুবাবু বছর দুয়েক হলো ছেড়েছি। যা নতুন মুখ দেখছিস, সব দাদার পার্মিশন নিয়ে আমরা রিক্রুট করেছি।

তোমাকে আমি লাস্ট থ্রি ইয়ার্সের একটা স্ট্যাটিসটিকস দিচ্ছি। তুমি দেখলেই বুঝতে পেরে যাবে। এই ব্যাপারটা মিলির ক্ষেত্রে ধরা একটু টাফ। তুমিও ওই জায়গায় থাকলে এক ঝটকায় ধরতে পারতে না। একটু স্টাডি করলে ধরা যায়। তবে আমি শেষের তিন বছরের করেছি। আগেরগুলো দেখার সময় পাইনি।

আমি ফাইল থেকে কাগজগুলো বার করে চম্পকদার হাতে দিলাম।

মিলি আমার দিকে ভয় ভয় চোখে তাকিয়ে। যেন শরীরের সমস্ত রক্ত মুখে এসে জড়ো হয়েছে।

আমি কাগজগুলো চম্পকদার দিকে এগিয়ে দিলাম।

হরিদার ছেলে চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।

একে একে সকলকে চা দিয়ে গেল।

শুভদীপ।

হ্যাঁ স্যার।

ছেলেটি উঠে দাঁড়ালো। বেশ ব্রাইট। লুকটা ভীষণ সুন্দর। দেখে মনে হয় ভদ্র বিনয়ী।

বসো। তুমি অনিকে আগে দেখেছো?

না স্যার।

ওর সম্বন্ধে আমাদের হাউসে অনেক গল্প আছে। তার কিছু তোমার কানে গেছে?

সামান্য।

অনি, মিত্রা দুজনে শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়। ওরা খুব ভালো বন্ধু। একসময় দুজনে একই কলেজে এক ক্লাসে এক সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশুনো করেছে।

সেটা শুনেছি স্যার।

একসময় আমি সনাতনবাবু এমন কিছু অন্যায় করেছিলাম, এই হাউস থেকে ইচ্ছে করলে ও তাড়িয়ে দিতে পারতো। দেয়নি। আজ আঠারো বছর পর ওর সঙ্গে আমাদের দেখা হলো। সবার সঙ্গে ওর ব্যবহারটা লক্ষ্য করেছো।

শুভদীপ এবার চুপ করে রইলো।

ও যেগুলো পয়েন্ট আউট করেছে সেগুলো সত্যি আমার পক্ষেও ধরা সম্ভব ছিল না। আমি দেখতে পাচ্ছি, আমি থাকা কালীন এই ঘটনার শুরু, আজও তা চলছে।

কি হয়েছে বলতো চম্পক! দাদা বললো।

দাঁড়ান আপনাকে পরে সব বুঝিয়ে বলছি। আগে নিজে আর একটু ভালোকরে বুঝি।

আমার দিকে তাকাল।

তুই এগুলি বুঝলি কি করে বলতো?

মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।

হাসিস না মিত্রা। অনি যে আমাদের ক্ষেত্রে কতটা জরুরি সেটা ও আগেই বুঝিয়েছে, ফিরে এসে আবার বোঝাতে শুরু করে দিয়েছে।

শুভদীপের মুখের চেহারা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে।

শুভদীপ।

হ্যাঁ স্যার।

তুমি একবার জয়ন্ত, শ্যামল আর ঋককে ডেকে পাঠাও।

শ্যামল একটু বাইরে গেছে। ঋক, জয়ন্ত অফিসে আছে।

শ্যামলকে আর চাকরি করতে হবে না।

শুভদীপের মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। মিলি একটু নরেচরে বসলো।

শ্যামলকে অফিসে ডেকে পাঠাই।

ডাকো।

শুভদীপ মনে হয় মোবাইল থেকে তিজনকে ম্যাসেজ করলো।

চম্পকদা এই সমস্যার সমাধান তুমি করো। আমি এর মধ্যে আর মাথা গলাব না।

ওমনি আমার ঘাড়ে বন্ধুক রাখলি।

নিজের ঘাড়ে রাখলে কোথায় উল্টোপাল্টা জায়গায় লেগে যাবে, তখন আবার এক বিপদ। তখন তোমরাই আবার আমাকে সকলে চেপে ধরবে।

চম্পকদা হাসছে।

আরও আছে তোমায় পড়ে বলবো।

মিত্রা তোর সেদিনকার কথাটা মনে আছে। চম্পকদা মিত্রার দিকে তাকাল।

কোনটা বলো?

আরে ওই যে, অফিসের যখন খুব টালমাটাল অবস্থা। সুনীত তোকে বললো, অনিকে ডাকো।

পার্টিকুলার কোন ব্যাপারটা বলো?

এরই মধ্যে ভুলে গেলি। আমি মরার আগের দিন পর্যন্ত ওর সেদিনকার মুভমেনটা মনে রাখবো।

কোনটা?

আমি মুচকি মুচকি হাসছি ফাইল দেখছি।

ঘরে ঢুকে তোকে স্ট্রেইট বললো, ম্যাডাম আমার একটা পা অফিসের মধ্যে থাকে, আর একটা অফিসের বাইরে, প্রয়োজন পরলে যেটা ভেতরে আছে ওটাও বাইরে বার করে নেব। কথায় কি ঔদ্ধত্য ছিল বল। একজন নিপাট সাংবাদিক। মালকিনকে ওইভাবে ডাঁটছে!

মিত্রা হো হো করে হেসে উঠলো। সবাই-ই কম বেশি হাসছে।

বলেছিল বুঝি।

দাদা হাসতে হাসতে আমার দিকে তাকাল।

হ্যাঁরে এখনও ওই দিনকার ওই সিচুয়েশনের কথা মনে পড়ে গেলে গায়ে কাঁটা দেয়। বৃদ্ধ বয়সে এসে সেটা হাড়ে হাড়ে রিয়েলাইজ করছি।

তুই তো এখনও বললি না। দাদা বললো।

দাঁড়ান মর্কট দুটো আসুক ওদের সামনেই গল্পটা বলছি। পালের গোদা এই তিনটে। আর এই তিনটেকেই ও ঠিক চিনেছে। তাও কাগজ দেখে।

দরজা খুলে দুটো ছেলে ভেতরে এসে দাঁড়াল। একেবারে ধোপ দুরস্ত। যেন চোখে মুখে কথা বলছে। এ্যাডের ছেলেগুলো সব সময় বেশ ফিট ফাট থাকে। মুখে একগাল হাসি।

মে আই কামিং স্যার।

চম্পকদা ঘুরে তাকাল।

আসুন।

ছেলে দুটো চম্পকদার কাছে এসে হাফ কোমড় ভাঙলো তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল।

পায়েই যদি হাত না দিবি তবে কোমড় ধাপাবার দরকার কি?

ছেলেদুটো কেমন যেন থমকে গেল। তবু চোখে মুখে হাসির ছটা।

বোস।

ছেলে দুটো চম্পকদার পাশের দুটো চেয়ারে বসলো।

আমার দিকে আঙুল তুলে।

ওই ভদ্রলোককে আগে কখনও দেখেছিস।

দু-জনেই একবার শুভদীপের চোখে চোখ রাখলো। তারপর মাথা দুলিয়ে বললো, না স্যার।

ওর নাম অনি।

নামটা শুনেছি স্যার।

এই হাউসের এক সময় সাংবাদিক ছিল। পরে এই হাউসের মালিক হয়।

অনি ব্যানার্জী! মিলি ম্যাডামের মুখ থেকে ওনার কিছু গল্প শুনেছি।

তোদের নিয়ে ও একটা গল্প লিখেছে। সেটা শোনানোর জন্য ডেকেছি।

আপনি ফ্ল্যাটার করছেন স্যার।

নট ফ্ল্যাটার, বি সিরিয়াস।

এবার ছেলে দুটো কেমন গুম হয়ে গেল।

এই কাগজগুলো একবার চোখ বুলিয়ে নে। যে হাউস তোদের মুখের ভাত জোগাচ্ছে সেই হাউসের কতটা ক্ষতি করেছিস দেখ।

দেখলাম ছেলেদুটোর চোখ মুখ শুধু পরিবর্তন হলো না। মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন পাংশুটে হয়ে গেল। কাগজে চোখ বোলাবার পর মাথা আর তোলে না।

চম্পকদা ওদের কাছ থেকে কাগজগুলো নিয়ে মিলির দিকে এগিয়ে দিল।

মিলি, এবার তুই শুভদীপ কাগজটা দেখ। কিছু বুঝিস কিনা।

ছেলেদুটো তখনও মাথা নীচু করে বসে আছে।

চম্পকদার গলার স্বর একেবারে পরিবর্তন হয়ে গেছে।

জয়ন্ত আমার দিকে তাকা।

দু-জনের কেউ মুখ তোলে না।

শুভদীপ কিছু বুঝলে।

মিলি, শুভদীপ দুজনেই চম্পকদার মুখের দিকে তাকাল। চোখ ফ্যাকাশে।

মাথা দোলাল। বুঝেছি।

ওরা লাস্ট তিন বছরে হাউসের কতো কটি টাকার রেভিনিউয়ের ক্ষতি করেছে বুঝতে পেরেছো।

মিলি, শুভদীপ দুজনেই চুপ করে আছে।

দেখ হিসাব যদি ঠিক থাকে তাহলে এ্যামাউন্টটা ওখানে লেখা রয়েছে।

বোচন হরিকে বলতো চা দিতে। দাদা চেঁচিয়ে উঠলো।

দাদার গম্ভীর কন্ঠস্বরে ঘরটা গম গম করে উঠলো। ছেলে উঠে বাইরে চলে গেল।

বুঝলেন দাদা, এরা কিংশুক, অরিন্দম, সুনীতের থেকে আরও বেশি পলিশড। বুদ্ধিটা ওরা সূক্ষ্মভাবে প্রয়োগ করেছে। ম্যানেজমেন্ট পড়া ছেলে। ভেবেছে ওরা জল মেশালে কেউ সহজে ধরতে পারবে না। কিন্তু অনি যে বাপের বাপ এরা সেটা জানে না। এখন জানতে পারবে।

শোন ঋক অনি সম্বন্ধে তোদের একটা গল্প বলে রাখি। ও যদি মনে করে, আজ এই ঘরে ঢোকার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তোরা দুজন কি কি করেছিস, কোথায় খাওয়া দাওয়া করেছিস। কার কার সঙ্গে কথা বলেছিস, তার পুরো ডিটেলস ও দিয়ে দেবে। এমনকী ক-বার বাথরুমে গেছিস সেটাও ও বলে দেবে।

ও এখানে বিগতো আঠারো বছর ছিল না। কিন্তু এই হাউসের প্রতিদিনকার রিপোর্ট ওর কাছে পাই টু পাই চলে যেত। আজও যায়। প্রতিটা ডিপার্টমেন্টে ওর নিজস্ব লোক আছে। তারা সবাই ইনভিজিবিল। তুইও চিনিস না। আমরাও কেউ চিনি না।

এবার বল একটু শুনি। দাদা বললো।

অনন্য ঘরে ঢুকলো। পেছন পেছন ছিদাম।

আমি, মিলি, শুভদীপ প্রত্যেক মাসে মিটিং করে একটা টার্গেট ঠিক করতাম। এবং এও জানতাম কতটা আমরা এ্যাচিভ করতে পারবো।

সেই হিসাবে এদের টার্গেট দেওয়া হতো। এবং এ্যাডের এ্যামাউন্ট পিছু কতটা খরচ হতে পারে তা আমরা আগে থেকে ঠিক করে সেই এ্যামাউন্ট খরচ করতাম।

সোজা হিসেব। দাদা বললো।

আপনার কাছে, এদের কাছে নয়।

সবাই চুপ করে দু-জনের কনভার্সেশন শুনে যাচ্ছে। আমি নেক্সট ফাইলটা ধরে আমার মতো করে গোছান শুরু করলাম।

ধরুণ এই মাসে এদের টার্গেট দিয়েছি চল্লিশ লাখ। এরা হয়তো তার থেকে বেশি তুলেছে ধরুণ পঞ্চাশ লাখ। চল্লিশ লাখ দিয়ে বাকিটা নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে। পরের মাসে যদি টার্গেট ফুল ফিল করতে না পারে, তহলে ওটা দিয়ে মেকআপ দেবে।

এদিকে এ্যাড এসে গেছে এই রিকুইজিশান দেখিয়ে, ওই দশলাখের এন্টারটেনমেন্ট বিল নিয়ে নিয়েছে।

পরের মাসে যখন ওই দশলাখ ঢোকাতে গেছে তখন দেখতে পেয়েছে ডেড লাইন ওভার বা পার্টি আর দিতে চায়নি। বা বলেছে পরে দেবে। কিন্তু ওই দশলাখ টাকার এ্যাড তোলার জন্য যে খরচটা হওয়ার দরকার তা হয়ে গেছে।

আর একটা ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের ইয়ার্লি স্পেস সেল হয়। কম স্পেস নিলে সেটা রিটেল হিসাবে ট্রিট হয়। আর বেশি স্পেস নিলে সেটা হোল সেল হিসেবে ট্রিট হয়। রিটেলের রেটটা বেশি, কমিশন কম। হোলসেলে রেট কম কমিশন বেশি।

একজন হয়তো ছ-হাজার স্কয়ার সিএম স্পেস নিয়েছে। কিন্তু তলিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে ওটা পাঁচজনে মিলে বা ছজনে মিলি নিচ্ছে। কেন?

হাজার স্কয়ার সিএম নিলে সেটা রিটেলের রেটে হয় আর ছ-হাজার স্কয়ার সিএম নিলে সেটা হোল সেলে হয়। একজনের নামে স্পেস বুক করছে আর ছয়জনে এ্যাড দিচ্ছে।

রিটেল ব্যাপারটা হোলসেলে নিয়ে গিয়ে পার্টিকে একটু সুবিধা পাইয়ে দিল।

নিজেরাও কমিশন ভাগাভাগি করলো। প্লাস ওখানে আমাদের এন্টারমেন্ট খরচটা একবারে একটু বেশিই ধরা থাকতো সেটাও ওরা পকটস্থ করলো।

অনির যেটা সন্দেহ এই একজন ব্যক্তি এদেরই কেউ। গাছেরও খাচ্ছে তলারও কুড়চ্ছে।

ওরে বাবা এতো কিংশুকদের থেকে অনেক উঁচু মানের খেলোয়াড়।

কি বললাম দাদা। এরা সব ম্যানেজমেন্ট পড়ে এসেছে।

ইনভিসিবিল ভাবে কি করে টাকা সরাতে হয় এরা খুব ভালো ভাবে ব্যাপারটা জানে। হাউসের রেভিনিউ প্রতিমাসে প্রায় দেড় থেকে দু-কোটি টাকার মতো লস। কিন্তু ওদের যার যার টার্গেট ফুল ফিল হয়ে যাচ্ছে। আপনি খাতা কলমে কিছুই বলতে পারবেন না।

বরং টার্গেট ফুল ফিল হলে, আমাদের হাউস থেকে একটা এক্সট্রা ইনসেনটিভ দেওয়া হয়, কোথাও ঘুরতে যাওয়া কিংবা ক্যাশ টাকা, সেটাও নিজেরা ভাগাভাগি করে নিয়ে নিচ্ছে। সব যদি ধরা হয় তাহলে সেটা লসের খাতায় যায় পঞ্চাশ থেকে ষাট কোটি টাকার মতো।

খাতা কলমে কিন্তু আপনি একটুও গলদ ধরতে পারবেন না। সব ওকে।

অনি ধরলো কি করে?

সেটা আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন? তাই যদি পারতাম, তাহলে অনির বদলে আমি এই হাউসের মালিক হতাম।

দাদা হাসছে, জব্বর উত্তর দিলি।

কি বলুন সনাতনবাবু ঠিক কথা বলিনি? চম্পকদা বললো।

ভাগ্যিস হরিদা এই মুহূর্তে নেই থাকলে হয়তো বলেই বসতো নাক টিপলে দুধ বেরোয় এখনই এতো। সনাতনবাবু হাসতে হাসতে বললেন।

সত্যি আমার মাথায় ঢুকছে না চম্পকদা এরা কি মাইনে কম পায়। সুতনুবাবু বললেন।

একবারে না। চম্পকদা বললো।

অনিতো এই জায়গায় কখনও কমপ্রমাইজ করেনি। এখনও করে না। ম্যাডাম কতবার ডেকে আমাকে বলেছে। সুতনুবাবু বললেন।

বাচ্চা বাচ্চা ছেলে এদের কতো ব্রাইট ফিউচার। রনিতা ম্যাডাম বললো।

রনিতা তোমার যুগটা চলে গেছে। দেখ তোমার কাজে ভুল দেখেছে অনি তোমাকে ডেকে বলেছে। কেন? তোমাকে সে সম্মান করতো তাই বলেছে। এমনকী নিজের ব্যক্তিগতো উদ্যোগে ওই ঘটনা ঘটার পর তোমার যাতে কোনও ক্ষতি না হয় তার ব্যবস্থাও করেছে। তুমি যতদিন এই হাউসে চাকরি করেছো কেউ তোমার দিকে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলতে পারে নি।

চম্পকদা ব্যাপারটা তুমি ড্রিল করো, আমি পরবর্তী পার্টটা ধরি।

চম্পকদা হাসলো।

এই ডিপার্টমেন্টের আরগুলো বল। তোমাকে, মিলিকে আলাদা করে বলবো। এদের এখন বিদায় করো। এখনও টিনা, অদিতি বাকি আছে।

এই টাকাটা তোকে আমি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।

পারলে ভালো, আমি হাত দিলে ঘটি বাটি বিক্রি করতে হবে। সুনীতদার যা হয়েছে।

সবাই চুপ চাপ শুনে যাচ্ছে।

টিনা ম্যাডাম তুমি তোমার তিন মেশিন ম্যান কাম ম্যানেজারদের একটু ডাকো।

শুভদীপ এদের নিয়ে চলে যাও। নিজেরা মিটিং করে আমাকে তোমাদের ডিসিশন জানাও। আমরা এখন সন্ধ্যে পর্যন্ত আছি। চম্পকদা বললো।

ছেলেদুটোর দিকে তাকাল।

তোরা পারলে অনির সম্বন্ধে আর একটু ভালো করে খোঁজ খবর নিয়ে নে। ও কে কি বৃতান্ত। কাগজে ওর ধারাবাহিক লেখাটা পড়ছিস তো, কার সম্বন্ধে লিখছে। কতটা গার্ডস থাকলে এটা লিখতে পারে, একটু বুঝে নে।

তিনজনে মাথা নীচু করে বেরিয়ে গেল।

মিলি তুইও ধরতে পারিস নি? চম্পকদা মিলির দিকে তাকাল।

তুমি বলো। ধরা সম্ভব। এটা ধরতে গেলে কত ঘাটের জল খাওয়ার দরকার বলো। আমরাও এমবিএ পড়েছি চম্পকদা, অনিদা কোথা থেকে আমাদের তুলে নিয়ে এসেছে তুমি সব জানো।

আর একটা কথা বলি মিলি। আমি বললাম।

বলো।

এখানে এমন কিছু ছেলে আছে, তারা ভীষণ উদ্ধত, তারা পিকু, বিতান, অনিসা, অনন্যর পেছনে টিজ করে, এখন থেকেই এরা এদের ঠিক মতো মানতে চাইছে না।

কি বলছো কি তুমি!

ব্যাপারটা তুমি দেখো।

তুমি সবে মাত্র কালকে অফিসে এলে, এতো খবর পেলে কোথা থেকে বলো?

টিনা রেডি হ। এবার তোর পালা। মিত্রা বললো।

টিনা হাসছে।

চম্পকদা। আমি বললাম।

বল।

তুমি সুতনুবাবুর জায়গায় যাও, আর সুতনুবাবুকে তোমার জায়গায় একটু বসতে দাও।

এবার কি সুতনুবাবুকে নিয়ে পরবি?

একটু।

কেনো অনি, প্রেসেও কি গণ্ডগোল? সুতনুবাবু বললেন।

তা আছে।

আমি গতো সপ্তাহ পর্যন্ত খোঁজ খবর নিয়েছি, সব ঠিক আছে।

এটাও ইনভিসিবিল।

দেখলাম তিনজন এসে ঘরে ঢুকলো।

আয় ভেতরে আয়। সুতনুবাবু বললেন।

একজন একটু বয়স্ক, বাকি দুজন বিতানদের বয়সী।

হেড মেশিনম্যান কে?

আমি।

বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন।

সুতনুবাবু উনি মনে হচ্ছে আপনার সময়কার।

আমার এ্যাসিসটেন্ট ছিল।

তাহলে আপনি আমাকে চেনেন।

হ্যাঁ ছোটোবাবু। চেহারাটা একটু বদলে গেছে।

বদলাবে না। তোমার যেমন বয়স হয়েছে, ওরও হয়েছে। সুতনুবাবু খ্যাঁক করে উঠলো।

আচ্ছা সুতনুবাবু নতুন মেশিনগুলো যখন কেনা হয় তখন আপনি ছিলেন?

অবশ্যই। ম্যাডাম আমাকে মুম্বাইতে দেখতে পাঠিয়ছিলেন, চম্পকদা সঙ্গে গেছিলেন। ওই মেশিন আমার হাতে বউনি হয়েছে। তার জন্য আমরা দশজন ট্রেনিং নিলাম প্রায় ছয়মাস।

ওই দশজনের মধ্যে এনারা তিনজন ছিলেন?

হ্যাঁ।

আচ্ছা আমাদের যে কাগজের রোল আসে এটা কার তত্ত্বাবধানে কেনা হয়।

আগে আমি কিনতে যেতাম। এখন উদয় যায়, না হলে শেখর যায়।

আপনাদের দু-জনের বায়োডাটা দেখলাম, আপনারা দু-জনেই যাদবপুর থেকে প্রিন্টিং টেকনলজি নিয়ে মাস্টার ডিগ্রী করেছেন।

দু-জনেই আমার মুখের দিকে তাকাল।

আশা রাখবো আপনারা কাগজ চেনেন।

দু-জনেই চুপ করে আছে।

কিরে কথা বলছিসনা কেন, অনি যা বলে তার উত্তর দে। সুতনুবাবু ধমকে উঠলেন।

উনি এমন প্রশ্ন করছেন তার উত্তর দেওয়া যায়। উদয় বললো।

তারমানে! তুই জানিস কার সঙ্গে কথা বলছিস।

জানি, উনি অনি ব্যানার্জী।

হাসলাম।

আচ্ছা আমাদের নতুন মেসিনে লোয়েস্ট কত জিএসএমের কাগজ টানতে পারে আর হায়েস্ট কত জিএসএমের কাগজ টানতে পারে।

ওটা দেখিনি। তবে আমরা ছাপান্ন থেকে আটান্ন জিএসএমের কাগজ ব্যবহার করি।

কেন?

ওটা এ্যাভেলেবেল।

কতো রিল কাগজ আমাদের মাসে লাগে?

সার্কুলেশনর ওপর নির্ভর করে।

তবু।

পারডে ওয়েস্টেজ নিয়ে কুড়ি থেকে বাইশটা রিল।

তারমানে তিরিশ টন মতো। মাসে ন-শো টন।

দুজনেই চুপ করে রইলো।

দেখুন আমার সবেতেই একটু বেশি ইন্টারেস্ট। কাল টিনা ম্যাডামের কাছে মিসিনের বইপত্রগুলো বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাতে একটু পড়াশুনো করলাম। তাতে দেখলাম নতুন মেশিন চুয়াল্লিশ থেকে আটান্ন জিএসএমের কাগজ টানতে পারে।

আমাদের এই মেশিন কলকাতার আরও দুটো হাউসে আছে। তারা বাহান্ন থেকে চুয়ান্ন জিএসএমের কাগজে ছাপছে। তাদের ক্ষেত্রে এ্যাভেলেবেল আমাদের ক্ষেত্রে নয় কেন?

দাঁড়াও দাঁড়াও অনি। বুঝেছি এবার।

সুতনুবাবু উদয়ের দিকে তাকাল।

হ্যাঁরে উদয় আমাদের পুরনো মেসিনে ছাপান্ন থেকে আটান্ন জিএসএম কাগজ লাগে। নতুন মেসিনে আমি নিজে বাহান্ন জিএসএম কাগজ চালিয়েছি। তখন এ্যাভেলেবেল ছিল এখন পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপারটা কি?

দু-জনেই চুপ করে বসে আছে।

দাশু গত সপ্তাহে আমি মেশিনরুমে গেছি, তুমি আমাকে কিছু বলোনি।

আমি কি বলবো, ওদের বহুবার বলেছি। কাগজ ওরা কিনতে যায়।

বিতান আপনাদের ব্যাপারটা দেখে, বিতানকে বলেছিলেন? আমি বললাম।

বিতানবাবু এখনও এতটা বোঝেন না। তাছাড়া আমি অশিক্ষিত হ্যাড মেশিনম্যান, ওরা ইঞ্জিনিয়ার। মতে মেলে না। যে কয়দিন আছি ম্যাডামের নুন খেয়েছি প্রাণপণে প্রেসটাকে ঠিক রাখার চেষ্টা করে যাব।

সুতনুবাবু পকেট থেকে ফোনটা বার করে কাকে ফোন করতে শুরু করেছেন।

হ্যালো ব্যানার্জীবাবু আমি সুতনু মুন্সী বলছি।

সুতনুবাবুর দিকে তাকালাম।

আচ্ছা আপনারা কি শুরু করেছেন বলুন তো….আমাদের শুধু বেশি বেশি জিএসএমের কাগজ পাঠাচ্ছেন….কি বললেন!….তাই!….ঠিক আছে পরে আপনার সঙ্গে কথা বলছি।

কথা বলতে বলতেই সুতনুবাবুর মুখটা কেমন কঠিন হয়ে গেল। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে রেখে চেঁচিয়ে উঠলেন।

স্কাউন্ড্রেল। তোমাদের এতো বড়ো সাহস। একবার হাত কাঁপলো না।

ঘরে যেন বাজ পরলো। সুতনুবাবুর চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। উদয়, শেখর দু-জনেই মাথা নীচু করে বসে আছে। টিনা, বিতান চমকে উঠলো। দেখলাম সুতনুবাবুর চেঁচামিচিতে হরিদা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলো।

তুমি চেঁচিয়ো না সুতনু, দূর করো এগুলোকে। কথা বলতে বলতে হরিদা চেয়ারে বসলো।

সতনু, তুমি হঠাৎ এতটা উত্তেজিত হয়ে পরলে কেন? চম্পকদা বললো।

আমাদের সময় আমরা ম্যাডামের কাছে আবদার করতাম এটা দিতে হবে, সেটা দিতে হবে। কোনও দিন না করেন নি। দু-দিন দেরি হয়েছে। কিন্তু দিয়েছেন। আর তোরা? আমার ঘেন্না করছে তোদের সঙ্গে কথা বলতে। দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে।

চম্পকদা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো।

তুমি একটু শান্ত হও।

আবার অনির মুখের ওপর কথা, উনি এমন প্রশ্ন করছেন উত্তর দেওয়া যায়।

ঠিক আছে ঠিক আছে, সমস্যা যখন তৈরি হয়েছে, তার একটা সমাধান করার দরকার।

বুঝলেন চম্পকবাবু এদের হাউসে থাকার যোগ্যতা নেই। ভেবেছিলাম শিক্ষিত ছেলে। তারাতারি কাজটা ধরে ফেলবে। বয়েস কম ভালো কাজ করবে।

তোমাকেও বলি দাশু। তুমি সারাটা জীবন চোখ কান বুঁজে কাজ করে গেলে?

দেখলাম দাশুবাবু মাথা নীচু করেই আছেন, মাথা আর তোলেন না।

তুমি প্রেসের সবচেয়ে সিনিয়ার লোক। আর কাউকে না বলো অন্ততঃ আমাকে বলতে পারতে।

সত্যি বলছি ভেতরের ব্যাপারটা আমি জানতাম না। জানলে তোমায় বলতাম না। দাশুবাবু মিউ মিউ করে উঠলো।

আপনারা এখন আসুন। মন দিয়ে কাজ করুণ। আর একটা কথা, সাবতাজ করার চেষ্টা করবেন না। তাহলে আপনাদের চরম ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

আমি উদয়, শেখর দুজনের দিকে তাকিয়ে খুব ধীর স্থির ভাবে বললাম।

দু-জনে উঠে দাঁড়াল।

আপনি একবার আমাদের কথাটা শুনতে পারতেন। উদয় আসতে করে বললো।

আপনি তো এতক্ষণ সময় পেলেন। বললেন না কেন?

ঠিক সেই সুযোগটা পাই নি।

তোরা কোন মুখে কথা বলিস। তোরা রিল পিছু টাকা নিস নি? আমাদের হাউসের কাগজ অন্য হাউসের সঙ্গে ইন্টার চেঞ্জ করিস নি? তাও কলকাতার হাউসের সঙ্গে একশো রিল করলে বিহার, ইউপির হাউসের সঙ্গে ইন্টার চেঞ্জ করিস নি। রেলের রেক পর্যন্ত বদলে দিয়েছিস।

সুতনুদা, আপনার সব কথা ঠিক। কিন্তু কেন করেছি সেটা জানতে চাইলেন না।

বসে কথা বলুন।

আমার গলার স্বরটা সকলের কাছেই একটু বেমানান ঠেকলো। সকলেরই চোখে মুখে বিষ্ময়।

দু-জনে আবার বসলেন।

সুতনুবাবু আমি ওদের সঙ্গে একটু কথা বলি। গন্ধটা আমার নাকে ভালো ঠেকছে না।

আমার গলার স্বরটা এবার যে একেবারেই পরিবর্তন হয়েছে পাশে বসে মিত্রী ধরে ফেললো। মিলি, টিনা, অদিতি আমার মুখের দিকে বিষ্ময়ে তাকিয়ে আছে।

সরাসরি ওদের চোখে চোখ রাখলাম।

ওরা আবার দুজনে চেয়ারে বসলো।

অতীশবাবু কি কোনওভাবে আপনাদের প্রভাবিত করেছে?

মিত্রা, টিনা, মিলি, অদিতি আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। চোখের পাতা পড়ছে না।

তড়িতাহতের মতো উদয় দাঁড়িয়ে উঠলো। অস্ফুট স্বরে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো।

স্যার।

বসুন।

বুঝতে পারলাম নিজের গলার স্বরের চরম পরিবর্তন হলো।

চম্পকদা, সুতনুবাবু চমকে আমার দিকে তাকালেন।

পকেট থেকে মোবাইলটা বার করলাম। টেবিলের ওপর রাখলাম। সারা ঘর নিস্তব্ধ।

ভয়েজ অন করেই ডায়াল করলাম।

হিন্দীরটানে বাংলা কথা।

বইল অনিদা।

হানিফ, দিবাকর কোথায়?

দেখলাম সারাটা ঘর নড়েচড়ে বসলো, উদয়, শেখরের চোখ যেন ঠেলে বেড়িয়ে আসছে।

ইখানে আছে।

একটু দে।

হেই দিবাকর তোকে অনিদা ফোন কইরেছে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ।

হ্যালো। দিবাকরের গলা ভেসে এলো।

অনি বলছি।

আমাকে এদের হাত থেকে বাঁচা।

হানিফের অট্টহাসির শব্দ।

ভালোইতো আছিস খাচ্ছিস-দাচ্ছিস, ঘুমচ্ছিস।

দিনরাত একটা টেনশনের মধ্যে আছি।

যা বলে শুনবি, তাহলে ভালো থাকবি। তুই তো আর কোচি খোকাটি নোস।

আর কতো শোনাবি বল।

অনাদির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিস?

কাল একবার কথা বলেছি।

কি বললো?

কেন তুই জানিস না।

আমি তোর মতো ন্যাকামো করি না।

তোর টাকা তারাতারি পৌঁছে যাবে।

ডেট লাইন দে।

অনাদির কাছ থেকে জেনে নিবি।

তোর পিসেমশাই কবে থেকে কাগজের ব্যবসা করতে শুরু করলো।

দিবাকর চুপ করে রইলো।

তোকে খুব বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছে হয় বুঝলি। তারপর ভাবি না থাক। তুই আমার বাল্য বন্ধু, স্কুলে তোর সঙ্গে কতো খেলেছি, এক সঙ্গে স্কুলে গেছি। মাঝে মাঝে আবার তোর ওপর ভীষণ রাগ হয়, অভিমান হয়, তোকে আর বাঁচিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে না।

কোনও কথা নেই।

তুই যেখানে আছিস, দেখবি তার আশে পাশে প্রচুর বিষধর সাপ, কাঁকড়া বিছে আছে। একবার কামরালে বুঝতেই পারছিস। কোনও গোলাগুলির দরকার পরবে না।

তুই বরং আমাকে মেরে ফেল।

অতীশবাবুকে বল টাকাটা কারুর হাত দিয়ে অফিসে পৌঁছে দিতে।

পিসেমশাই টাকা নেয় নি।

কে নিয়েছে? নাম বল।

অনাদির এজেন্ট হিসেবে পিসেমশাই কাজ করতো।

টাকাটা আমার প্রেসের ছেলেরা নেয় নি।

কিছু নিয়েছে।

নিজেরা বাঁচার জন্য হাত গন্ধ করিয়েছিস। সিংহভাগটা?

চুপ করে রইলো।

তোর বম্বের চেলাগুলো আর বেঁচে নেই।

অনি তুই আগুন নিয়ে খলছিস।

এই তো তোর মুখে বুলি ফুটেছে। এবার সত্যি কথাটা বলে ফেল। না হলে অতীশবাবু সমেত তোর ফাইলটাতেও সাইন করতে বাধ্য হবো।

তিনজনেই ভাগ করেছি।

বিলের দু-নম্বরি কে করতো?

অফিস থেকে করাতাম।

অরিজিন্যাল?

হ্যাঁ।

অনাদির ইনফ্লুয়েনস?

হ্যাঁ।

কাগজের আর কোথায় কোথায় সর্বনাশ করার চেষ্টা করেছিলি?

আর কোথাও নয়।

এতদিন এদিকে মন দিইনি। আজ থেকে মন দিতে শুরু করলাম।

বিশ্বাস কর।

আজ কুড়ি বছর ধরে তোকে বিশ্বাস করছি।

আমাকে ছেড়ে দে, ব্যবসার অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

এতদিন নিজে খেয়েছিস, এবার অনাদিকে একটু খেতে দে।

আমি তোর নামে আমার শেয়ার লিখে দিয়েছি।

আমাকে একটু ভাববার সময় দে।

শোন শোন….।

লাইনটা কেটে দিলাম।

সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

এটা সেই দিবাকর! চম্পকদা বলে উঠলো।

হ্যাঁ।

সেই মলবাবুর কেশের সময় যে মার্ডার করেছিল।

হ্যাঁ।

এখনও বেঁচে আছে।

বম্বের নামকার দ্বিতীয় শ্রেণীর ডন।

চম্পকদা জোড়ে হাসলেও আর সবার হাসির শব্দ হলো না।

হরিদা, বুড়ো বয়সে তোমাকে একটু খাটাতে ইচ্ছে করছে।

চা?

হাসলাম।

হরিদা উঠে দাঁড়াল।

তুই বোস। আমি বেল বাজাচ্ছি। দাদা হরিদার দিকে তাকাল।

ওরকম করছেন কেন। হরিদা বলেছে আজকের দিনে ও অনিকে চা খাওয়াবে।

চম্পকদা কথা বলছে আর হাসছে।

আপনারা এখন যান। আমি বললাম।

স্যার আর একটা কথা ছিল। দু-জনেই উঠে দাঁড়াল।

বলুন।

আমরা যে টাকাপয়সা নিয়েছিলাম, তা আমাদের কাছে গচ্ছিত আছে।

ওগুলো আর ফেরত দিতে হবে না। পারলে আপনাদের স্টাফ ওয়েলফেয়ার ফাণ্ডে দিয়ে দিন।

ঠিক আছে স্যার।

যদি কোনও হুমকি দিয়ে ফোন টোন আসে আমাকে একবার জানাবেন।

এরপরও আসবে! চম্পকদা বললো।

সুতনুবাবু এবার হেসে ফেললো।

দিবাকরবাবুকে আমরা দুজনে জীবনে একবার দেখেছি।

কবে?

বছর দেড়েক আগে।

একবার আপনার সিনিয়ারদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতেন।

আরও অনেক কথা আছে, আপনাকে বলতে চাই।

ঠিক আছে আমি এখন থাকছি। সময় করে বলবেন।

আচ্ছা স্যার।

আপনাদের কাছে কদিনের কাগজ স্টক আছে।

দশদিন।

এরপর থেকে সময় মতো আপনাদের কাছে কাগজ পৌঁছে যাবে, কাগজ নিয়ে আর টেনশন করতে হবে না।

তাহলে খুব ভালো হয় স্যার।

টেনেশন দেনে কে লিয়ে লেনে কা নেহি।

ইয়েস স্যার, আজ থেকে কথাটা মেনে চলবো।

মন দিয়ে কাজ করুন।

স্থির চোখে দুজনকে একবার দেখলাম। ধীর পায়ে তিনজনে বেরিয়ে গেল।

অনি, অতীশবাবু এখনও আছেন? চম্পকদা আমার দিকে তাকাল।

তোমাদের থেকে খুব ভালো আছেন। এখনও বেশ শক্ত সমর্থ।

খুব জানতে ইচ্ছে করছে।

কি বলো।

হঠাৎ তুই অতীশবাবুর নামটা উচ্চারণ করলি।

দিবাকর একবার আমি আর আমার এক বন্ধুর সামনে ফোনে এদের ধমকেছিল। কথায় কথায় অতীশবাবুর নামটা বলছিল। তখন খুব একটা মনোযোগ দিতে পারি নি। শুধু মাথায় রেখে দিয়েছিলাম। কাগজ নিয়ে ভাববার মতো মানসিকতা তখন ছিল না। তখন আমি পাখির চোখ দেখে ফেলেছি।

তোর সামনে দিবাকর!

আমি তখন সন্ন্যাসী। প্রেমানন্দ নাম। দিবাকরের কুষ্টি বিচার করতে গেছি।

চম্পকদা, সনাতনবাবু, সুতনুবাবু হেসেই যাচ্ছেন।

তখন আমাকে চেনবার মতো পরিবেশ পরিস্থিতি ওদের ছিল না। দিবাকরকে সেই সময় আমি বকলমায় প্রচুর টাকা দিচ্ছি, অনাদির সঙ্গে পার্টনারশিপে বিজনেস করার জন্য।

টোপ।

একরকম তাই। দিবাকর তখন ঘন ঘন দুবাই যাতায়াত করছে।

তুই কি সাংঘাতিক! চম্পকদা বললো।

তা না হলে অনাদিকেও ধরতে পারতাম না, দিবাকরকেও নয়। ওরা তখন সব লুটে পুটে খেয়ে নিয়েছে। ভেবেছে অনি মরে গেছে।

তোর কথা শুনে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টোপ গল্পটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ক্ষুধার্ত বাঘ ধরতে শিশুকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করা।

আমি কিন্তু কোনও শিশুকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করিনি।

দূর পাগল আমি কি সেই কথা বলেছি। তোর কথা শুনে গল্পটার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল।

আমার এই শিক্ষাটা ওই গল্পটার থেকেই নেওয়া।

তাহলে ঠিক ধরেছি বল।

আমি হাসছি।

মিত্রা অনির কথা শুনছিস। চম্পকদা আমার মুখের থেকে চোখ সরিয়ে মিত্রার মুখের দিকে তাকাল।

গল্পটা তখন পড়েছি পরীক্ষার জন্য, এখন ওর কথা শোনার পর রিয়েলাইজ করছি।

গল্পটা কিন্তু বাংলা সাহিত্যের একটা সম্পদ। আমি বললাম।

সম্পদ কি রে ওরকম গল্প আর কারুর হাত থেকে বেরবে না।

মিত্রা মুখ নীচু করে নিল।

মানুষ তার নিজের স্বার্থ চরিতার্থতার জন্য কতটা নীচে নামতে পারে এই গল্পটা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ছিদাম চা নিয়ে এলো। সবাইকে দিল। একবার ভালো করে ঘরটা মেপে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করলো।

মিত্রা ফিক করে হেসে ফেললো।

বুঝতে পারলাম ও ধরে ফেলেছে।

ছিদাম বেরিয়ে গেল।

তুই হাসলি যে। চম্পকদা বললো।

হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল।

কি?

দু-জনের পালা শেষ হলো এবার অদিতির পালা।

অদিতিরও কি গণ্ডগোল আছে?

না হলে ডেকেছে কেন?

চম্পকদা, মল্লিকদা শুধু হজম করে যাচ্ছে। আমি বললাম।

ছাড় তো ওর কথা।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসছে। ভাবটা এরকম কেমন দিলাম বল।

বুঝলি চম্পক আমি একটা ধারাবাহিক লিখতে শুরু করেছি। মল্লিকদা বললো।

কিসের ওপর।

অনি কি করে অনিন্দবাবায় পরিণত হল তার ওপর।

চম্পকদা কাপটা ঠোঁটে ছোঁয়াতে যাচ্ছিল প্লেটে রেখে সারাটা শরীর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো।

আমি তোর প্রথম পাঠক হতে চাই।

দাঁড়া সবে মাত্র ভেবেছি, এখনও লেখা শুরুই করিনি।

অদিতি একবার নেপলাকে একটু ডাকো। আমি বললাম।

অদিতি মোবাইলটায় ডায়াল করে আস্তে করে কথা বললো।

বুঝলি চম্পক এবারে দেখছি সকলে খুব চালাকির সঙ্গে টাকা সরাচ্ছে। মল্লিকদা বললো।

তা যা বলেছিস। ব্যাটারা সব ম্যানেজমেন্ট পাস।

তুই ওপর থেকে কিছুই বুঝতে পারবি না। যদি ব্যাপারটা নিয়ে তলিয়ে না দেখিস, আর অনির চোখ, ফাঁকি দেওয়া যায়। ও বলেই ধরতে পেরেছে। এ আমাদের কম্ম নয়।

নেপলা হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো।

একটা কাজ করবি। আমি নেপলার দিকে তাকালাম।

সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি ওটা নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না।

সবাই নেপলার মুখের দিকে তাকিয়ে।

সেই নেপলা! চম্পকদা বললো।

হ্যাঁ।

তোর কথা বলার আগেই কাজ শেষ!

আঠারো বছর দাদার সঙ্গে ঘর করছি। দাদা যদি কথা না বলে শুধু ঠোঁট নাড়ে তাহলেই বুঝে যাব দাদা কি বলতে চাইছে।

নেপলা নীচু হয়ে চম্পকদার পায়ে হাত ঠেকাল। পর পর সকলের পায়েই হাত ছোঁয়াল।

ওরে অনি এ কি সেই নেপলা! চুপ চাপ শুনে যেত আর ভেতর ভেতর তরপাতো।

চম্পকদা সাঁইত্রিশ পেরিয়ে আঁটত্রিশে পরলাম।

চম্পকদা উঠে দাঁড়িয়ে নেপলার ঘাড়টা ধরলো।

খুব কথা শিখেছিস।

সব দাদার সৌজন্যে।

কি হয়েছে বল একটু শুনি। চম্পকদা বললো।

সবকটা চোর বুঝলে।

অদিতির দিকে তাকাল।

অদিতিদি তোমার ফাইল বন্ধ করো। তোমার চ্যাপ্টার ক্লোজ। আবিদদা একটা কাগজ তোমাকে এনে দিচ্ছে। ওখানে সব লেখা আছে। তুমি একটু চোখ বুলিয়ে দাদাকে সই করে দিয়ে দাও। আবিদদা দ্বীপায়ণদার ঘরে আছে। কম্পোজ করাচ্ছে।

অদিতি নেপলার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে।

তোর কথা মাথায় ঢুকছে না। চম্পকদা বললো।

ঢুকবে না দাদা।

অদিতির দিকে তাকাল।

তুমি, বিতান, পিকু এসব ধরতে পারবে না। দাদার খুপরিতেই এসব জন্মায়। আমরা ছিটে ফোঁটা পাই। শিখি। জানো আমরা তিনজনে প্রায়ই দাদাকে নিয়ে হাসাহাসি করি, দাদার খুপরিটা হচ্ছে বিষ খোপরা।

(আবার আগামীকাল)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev