“মা, কালিহাতির সেই বাসা থেকে চিঠি লিখছি। এখানে সবাই ভাল আছে। খুব যত্ন করেছে। — ইতি খোকন”। ১৯৯০ সালে তিনি এই চিঠি লিখছেন বৃদ্ধা মা’কে। এখন তাঁকে চেনে, জানে অনেকেই। এ বাংলায় শিকড় পৃথ্বীর গভীর ছুঁয়েছে, ও বাংলা হয়েছে অপর। একান্নে থাকার মমতায় সকলকে আঁকড়ে থেকেছেন, হৃদয়ের গভীরে থেকেছে সাতক্ষীরার স্মৃতি, ভাই বোন, আত্মীয় অনাত্মীয়ের নিবিড় বন্ধন। কলকাতার চোখ ধাঁধোনো অন্দিসন্ধির মাঝেও স্মৃতির সরণি বেয়ে চলে যেতে চাইতেন সাতক্ষীরের সেই একান্নবর্তী পরিবারে, জমি জিরেত, পুকুর — বাগান নিয়ে পল্লবিত এক সংসারে। ভীড় করে করে আসতো হরিদাদু, কিরণদাদুর মত অনাহূত আত্মীয়, আর যা গ্রামতুতো স্বজন সুজন। আনন্দময় এক যাত্রপথের পথিক ছিলেন তিনি। তিনি মনোজ মিত্র। এই নামেই বাঙালি জীবনে তিনি থেকে যাবেন এক দিকচিহ্ন হিসেবে।
দেশভাগ এক রাষ্ট্রীয় সংঘটন। তখন কলকাতা কেন, দেশের কোন অংশই বাস্তুচ্যুতদের পরাশ্রয় নয়। কিন্তু বাস্তব তাই ছিল, নেই কি এখনো! ঠাট্রা ছিল — এদের সকলের চকমেলান বাড়ি ছেলো, পুকুর, বাগান ছেলো, হাতিশালে হাতি! সব একেকটা জমিদার ছিল। এমত ঠাট্রায় কি তিনিও জর্জরিত হননি! অনেক দিন আগে ‘দেশের বাড়ি’ নামে একটি লেখায় মনোজ বাবু লিখেছিলেন, “দেশের বাড়ির সবকিছু আমি লোকজনের কাছে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলতাম। দেশের বাড়িতে এত পুকুর ছিল, এত জমিজমা, এত দুধেল গাই, এত এত এত”। প্রায় কারোরই তা হয়তো ছিলনা। কিন্তু মাথার উপর চালা ছিল, শাকাহার ছিল, যাহোক ভদ্রস্থ কোন পেশা ছিল। তিনি লিখছেন, “আসলে তত ছিলনা।” কিন্তু ছিল যে কিছু তাও তো মিছে নয়। কেন বলতেন এমন বাড়িয়ে কথা? উত্তরে তিনি লেখেন যে, দেশের বাড়ির কনসেপ্টটা যত ধূসর হয়েছে, দূরবর্তী হয়েছে, ততই যেন বাড়িয়ে বলার ‘আগ্রাসনটা’ বেড়েছে। এমন বাড়িয়ে কথায় যেন ‘হতাশাগুলো পুষিয়ে নিতেন’।
এই হতাশায় নগর কলকাতার উপেক্ষা, মানসিক নির্যাতন কতটা সক্রিয় ছিল তা উল্লেখ করেননি বটে, কিন্তু সেই দেশেই যে ফেলে এসেছিলেন হৃদয়ের অনেকটা সেটা তাঁর মা’কে লেখা চিঠি থেকেই বোঝা যায়।
একান্নবর্তী পরিবারের একজন তিনি। বাবা ছিলেন সরকারি কর্মচারী, বদলির চাকরি। একজায়গায় থিতু হতে পারতেন না। কাকারাও ছিলেন ঢিলেঢালা প্রকৃতির। তাঁর পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত ঠাকুরদা বেঁচে ছিলেন। কিন্তু দুরারোধ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত, শয্যাশায়ী। ঘরের মধ্যেই খাওয়াদাওয়া, না-নড়াচড়া, অবরেসবরে দাওয়ায় এনে বসিয়ে দিলে সেভাবেই থাকতেন। তাঁর মনে হয়েছিল, ভূসম্পত্তি রক্ষনাবেক্ষনের জন্য যে প্রখর চোখ তা হয়তো ঠাকুরদার ছিল, কিন্তু অশক্ত তিনি তত্বাবধানে অক্ষম ছিলেন। ঠাকুরদার এই প্রখর চোখ-এর খোঁজ তিনি পেয়েছিলেন নিশ্চয়ই। আর ছিল ঘরের একপাশে থাকা একজন মানুষের অতীত কথার স্মৃতিভার, বর্তমানের দিনযাপন। এই দেখাই হয়তো তাঁর নাটকের চরিত্র সৃষ্টির ব্যাপারে বৃদ্ধদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছে, নাটকের প্রধান চরিত্র করে তুলেছে বৃদ্ধদের। খুব কমবয়সে লেখা ‘মৃত্যুর চোখে জল’ নাটকে অশীতিপর অসুস্থ মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ, ‘চাকভাঙা মধুর’ খিটকেল বৃদ্ধ জটা, কিংবা ‘সাজানো বাগান’-এর সেই মরেও না মরা বাঞ্চা কাপালি। তাঁর মনোজগতে আগাগোড়া এক ত্রিকালদর্শী জীর্ন, শীর্ন বৃদ্ধের ছবি ভেসে এসেছে। কেনারাম-বেচারাম-এ দুই শিরোনাম্নী, রাজদর্শন-এ লম্বোদর, নরক গুলজার-এ ব্রহ্মা, দর্পনে শরৎশশী — তে সিতিকণ্ঠ — এমন অনেক, অজস্র। এমন বুড়ো ঘেঁষা চরিত্র চিত্রনে কোথাও কি তাঁর স্মৃতি পটে ঠাকুরদা, তাঁর অসহায় শরীর অথচ চোখের উদ্ভাসিত দীপ্তি চলে আসতো!
তাঁর সৃষ্ট বৃদ্ধ চরিত্ররা কি ‘জীবননাট্যের ক্লাউন’! কেবলই পরিবারের বোঝা! হ্যাঁ, এসেছে এমন কথা। বাঞ্চারাম মরে না কেন — তাহলেই বিষয় সম্পত্তি সবটা গ্রাস করা যাবে। আর বাঞ্চারাম বাঁচতে চায়, টুকরো জমিটার মধ্যেই যে রয়েছে তার জীবন-দর্শন। বাগানের গাছপালা, ফল ফুল তার সন্তানের মত। এমন চরিত্র সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে তাঁর ওপার বাংলার স্মৃতি।
তখন তিনি কিশোর। পিসিমা খুব পান খেতেন। সেই পান আসত গ্রামেরই এক পানের বরজ থেকে। একদিন বৃদ্ধা পিসি বললেন, চল মনু, তোকে পানের বাগান দেখিয়ে আনি! বিকেলের দিকে পিসির হাত ধরে রওনা হলেন পানের বরজ দেখতে। সম্ভবত পিসি সেই পানের বাগানের কাছে গিয়ে বাঞ্ছা… বাঞ্ছা বলে চিৎকার করে ডেকেছিলেন। কোথায় বাঞ্ছা? তাঁর কোনও টিকিও দেখা যাচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ দেখা গেল পাটকাঠি দিয়ে ঘেরা পানের বরজ থেকে বেরিয়ে আছে একজন বুড়ো মানুষের মাথা। মাথার চুল থেকে গালের দাড়ি সবই সাদা। কেমন এক ভূতুড়ে মার্কা চেহারা। বৃদ্ধ বাঞ্ছা কুঁজো হয়েই থাকেন, হাঁটেনও কুঁজো হয়ে। পরনে একটা নোংরা খাটো ধুতি, খালি গা। সে এক ভয়ঙ্কর চেহারা! বাঞ্চা তাঁকে বলেছিল, শুধু এই পানের বরজ নয়, ফুল, ফল, আম, কাঁঠালের যেসব গাছ দেখছ, সবই আমার। এই গাছগুলো আমার ছেলেপিলে। আমি এদের জন্ম দিয়েছি, পালন করেছি। এরা আমায় বাবার মতো ভালোবাসে।
বুড়োদের প্রতি কি তাঁর কিছু পক্ষপাত ছিল? যারা অসহায়, সহায়সম্বলহীন, নিরালম্ব প্রায় সেই মানুষরা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে তাঁর কাহিনীতে। তিনি নিজেও এমন চরিত্রে মিশে যেতেন। বেঁচে থাকার দুর্মর এক আকাঙ্খা, অতীতচারী এক যাপন হয়তো তাঁকে টানতো! শৈশব ও বার্ধক্যের অবাধ চলাচলে তিনি স্বস্তি পেতেন, জীবনের ‘সময়’ চিহ্নকে তিনি নাটকে, যাপনে, মননে লালন করেছেন শেষাবধি।
কথায়, বলায়, নাটকের চলনে তিনি ভাল মানুষ, মন্দ মানুষ, দুয়ের মিশেলে যে মানবসত্তা তার খোঁজ করেছেন অবিরত। সমষ্টি ও ব্যক্তি মানুষের অন্তর্লোক, আলোছায়ার প্রকাশকে তিনি অস্বীকার করেননি। তাঁর নাটকে রাজনীতি ছিল, তিনি রাজনীতিক ছিলেন না। কোন ‘তন্ত্রে’ তাঁকে বেঁধে ফেলা যায়নি, দলতন্ত্রেও নয়। এর মাশুল গুনেছেন, নত হন নি।
যদি হও সুজন তেঁতুলপাতায় ন’জন — এমত এক ভাবনায় জারিত ছিল তাঁর হৃদয়। বারে বারে ফিরেছেন তাঁর ফেলে আসা দেশের কথায়। বাবার বদলির চাকরি, দাদু শয্যাশায়ী সেই কবে থেকে। বিষয় আশয়ে বাবার খেয়াল ছিলনা, কাকারা ছিলেন ঢিলেঢালা প্রকৃতির। কত আত্মীয়, অনাত্মীয়ের আসা যাওয়ায় গমগম করতো বাড়ি। সকাল-রাত্রে চল্লিশ পঞ্চাশটা পাত পড়তো। বাড়ির লোক, কাজের লোক, সরকার-মশাই, বন্ধু-স্বজন, কুটুম্ব, মুনিষ, মাহিন্দর মিলিয়েই এতগুলো পাত। এর মধ্যে এসে পড়ত অনাহূত যত। এমনই এক মানুষের গল্প শুনিয়েছেন তিনি। একদিন হুট করে একজন এল, অনেকগুলো ঘরের একটাতে ঢুকে পড়ল, ব্যাগ থেকে গামছা বার করল, ভাঁড়ার ঘর থেকে একখামচা তেল নিয়ে সটান পুকুরে। বিস্ময়ে হতভম্ব সবাই — কিসের জোরে তার এই রোয়াবে বিচরণ? ঠাকুমা সব শুনে বললেন — ও হবে খন, খাওয়ার সময় দেখবো। জানা গেল সেই তিনি ঠাকুরমার বাপের বাড়ির একজন লোক। কোন জ্ঞাতিগুষ্টি নয়! সেই তিনি, হরিদাদু কিছুদিনের মধ্যে হয়ে গেলেন বাড়ির ছোটদের, মায় বড়দেরও অভিভাবক। কার কি করা উচিত, কি করলে পাঁচভূতে লুটে খাওয়া সম্পত্তি রক্ষা পাবে — এমত নানান নিদান দেওয়ার দায় যেন সেই মানুষটারই। তা ঠাকুমাও বুঝে গেলেন, আর চিন্তা নেই মুস্কিল আসান এসে গেছে। এমন আগন্তুক আরো এসেছে। যেমন হিরণ নামের সেই মানুষটা। এল শীতের মুখে মুখে, পাক্কা চারমাস কাটিয়ে ফিরে গেল। প্রতি শীতেই সে আসতো, কে, কি তার পরিচয় — এমন খবরের আধুনিকতায় মোড়া ছিলনা সে সব দিন। দেশভাগের উৎপাটনে সমূলে অভিবাসিত হয়ে এদেশে এসেও প্রথমে বেলেঘাটায়, পরে বসিরহাটের দণ্ডিরহাটে থিতু হয়েছিল তাঁদের পরিবার। ভার কিছু কম ছিলনা। কিন্তু নিজের জন ও অপর জনের ভেদাভেদ স্পর্শ করেনি নির্ভেজাল মনুষ্যত্বকে। সকলকে নিয়ে এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন, অভিনয়ে ও রচনাতেও সে কথাই বলেছেন বারবার।
যেমন করে তিনি বলেছেন টাঙ্গাইল সাব-ডিভিশনের ‘ঘাটাইল’ (কালিহাতি?) গ্রামের সেই মানুষটির কথা। বাবার বদলি সূত্রে চাকরির কারনে তাঁরা কিছুদিন ছিলেন সেখানে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ গেলে সাধ হয় — একবার যদি দেখা যেত বড় রাস্তার শেষে, ধানমাঠের গায়ে সেই বাসাখানা। তো বন্ধু মামুনুর, সঙ্গে বিষ্ণু বসু পৌঁছলেন সেই বাড়ির দুয়ারে। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন যিনি তিনি অতি রুক্ষ গলায় বললেন, “আপনাদের কোন বোধগম্যি নেই, দুপুর সূর্য ঠা ঠা করছে, এখন কিনা এসেছেন বাড়ি দেখতে? ” লজ্জায়, অস্বস্তিতে মুখ ফিরিয়েছেন তিনজনেই। হঠাৎ পিঠে হাতের স্পর্শ। ফিরে দেখেন সেই মানুষটা। সকলকে চমকে দিয়ে বললেন, “বাড়ি না দেখে চলে যাচ্ছেন যে বড়! এইখানে আপনার ছেলেবেলা কেটেছে। এই বাড়ি আপনারই।”
মাকে একথাই তিনি লিখেছিলেন, এখানে সবাই ভাল আছে মা।
যত্নে থাকুক এ ধরার মানুষজন, চিরজীবিত তারার আলোর মত — এমন এক প্রত্যয়ে নিবিষ্ট ছিলেন মনোজ মিত্র, আমৃত্যু। এক অন্তর্লীন মায়া রেখে গেলেন বাঙালি জীবনে, বাঙালিয়ানার স্বতন্ত্র গোলোকে।