| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল : সুশীল চৌধুরী, (১ নং কিস্তি) অনুবাদ : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৪৭১ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৯ মার্চ, ২০২৩

ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

মুখবন্ধ

এই বই ১৬৬৯ সালে ইউনিভার্সিটি লন্ডনে জমা দেওয়া ডক্টরাল থিসিসের সম্পাদিত রূপ। এই গবেষণার দুটি উদ্দেশ্য, বাংলায় বিভিন্ন ইওরোপিয় কোম্পানির কাজকর্ম, বিশেষ করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির কাজকর্ম জানা, বোঝা; দ্বিতীয়ত বাংলার দেশিয় ব্যবসা এবং ব্যবসায়িক সংগঠন এবং এই দুয়ের মধ্যেকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশদে খোঁজ খবর করা।

আমি যে সময়টি বেছে নিয়েছি ১৬৫০-১৭২০, সেই সময়টি বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়; কারণ বাংলায় নিযুক্ত কুঠিয়ালেরা তাদের নিজের এবং কোম্পানির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতির মাধ্যমে ব্যবসা বাড়িয়ে আগামী দিনে কোম্পানির ভিত্তিপ্রস্তর দৃঢ় করছে। এই আলোচনায় আমরা শুধুই বাংলার ভৌগলিক ভূখণ্ডটিই আলোচনায় আনলাম কেননা আমরা যে সময়ক্রম নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময়ে বাংলায় বৃহত্তরভাবে কৃষি অর্থনীতিভিত্তিক বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ গড়ে উঠেছিল, যার ফলে এশিয়া আর ইওরোপের সঙ্গে বিপুল ব্যবসা সংযোগ তৈরি হয়।

বাংলায় পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা বিপুল পরিমানে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বাংলা থেকে কোম্পানির রপ্তানি বিপুলাকারে বাড়ছিল — মোট মূল্যে এবং সংখ্যার পরিমানেও। লন্ডন এবং সামগ্রিক ইওরোপে বাংলার শস্তা বস্ত্রের যে বিপুল চাহিদা তৈরি হচ্ছিল, সেই চাহিদাকেই পূরণ করতে গিয়ে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রপ্তানি ব্যবসা ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। বাংলায় কোম্পানির ব্যবসা পরিমান বৃদ্ধির সাফল্যে একটা বিষয় প্রমান হয় যে বাংলায় ব্যবসা করতে গিয়ে কোম্পানি যে সব পরিকাঠামো এবং ব্যবস্থা গত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিল, সেগুলি তারা সমাধান করতে পারছিল সফলভাবে। যদিও বাংলায় প্রথমদিকে ব্রিটিশ ব্যবসা খুব বড় আকার ধারণ না করলেও ক্রমশ তাদের সামগ্রিক উপমহাদেশীয় ব্যবসায় বাংলাভূমের বাড়তে থাকা ব্যবসার পরিমান গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিল।

ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির বাংলার ব্যবসা নিয়ে বেশ কিছু কাজ হলেও বাংলায় দেশিয় বণিকদের ব্যবসা এবং তাদের আর ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির ব্যবসায়িক সংগঠনের চরিত্র সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে খুব বেশি গবেষণার কাজ হয় নি। আমার এই গবেষণায় আলোচ্য সময়ে একচেটিয়া ব্যবসার সওদাগরী পুঁজির চরিত্রের ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেশিয় বণিকদের যে সব নতুন অবস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল, সেই পরিবেশে তাদের ব্যবসা, তাদের ব্যবসা সংগঠন ইত্যাদিকে দেখার চেষ্টা করেছি ওপর ওপর, কারণ তাদের সম্বন্ধে বিস্তৃত তথ্য পাওয়ার সমস্যাটা থেকেই গিয়েছে।

লন্ডনের বিভিন্ন গ্রন্থাগার, মহাফেজখানা এবং হেগ শহরের এলগিমিন রিকসারচিফ নামক মহাফেজখানায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যে বিপুল তথ্যভাণ্ডার রয়েছে, তার একাংশ সম্বল করে এই গবেষণা সাধন করেছি।

এই কাজ করতে গিয়ে আমি বিভিন্ন সূত্র দ্বারা উপকৃত হয়েছি। স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজের ড কে এন চৌধুরীর অনুপ্রাণিত নির্দেশনা এবং সহানুভূতি আমার সহায়ক হয়েছে। ইংলন্ডের কমনওয়েলথ স্কলারশি কমিশন-এর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ, তারা ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে কাজ করার জন্যে আমাকে তিন বছরের একটি জলপানি দিয়েছিলেন। এই বই ছাপার জন্য ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চের অর্থ সাহায্য আমি স্মরণে রাখব।

আমায় ঐতিহাসিক গবেষণা করতে উৎসাহিত করা অধ্যাপক নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিনহা এই ছাপা বইটি দেখে যেতে পারলেন না। তিনি গভীরভাবে এই বইএর কাজে জুড়েছিলেন এবং আমায় বেশ কিছু অমূল্য পরামর্শও দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে মৃত্যু হওয়ায় এই বইটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার অনন্য অনুভূতি থেকে বঞ্চিত হলাম।

সুশীল চৌধুরী

ইউনিভার্সিটি কলেজ অব আর্টস কলকাতা সেপ্ট ১৯৭৫

এডিজি : একাউন্ট্যান্ট জেনারেলস ডিপার্টমেন্ট

বিজিএলএন্ডজে : বেঙ্গল জেনারেল লেজার এন্ড জার্নাল

বিএম এডি ম্যানু : ব্রিটিশ মিউজিয়াম এডিশনাল ম্যানু

বিপিসি : বেঙ্গল পাবলিক কনসাল্টেশন্স

সিএন্ডবি এবস : কোস্ট এন্ড বে এবস্ট্র্যাক্টস

সিএইচআই : কেম্ব্রিজ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া

ডিবি : ডেসপ্যাচ বুক

ইএফআই : ইংলিশ ফ্যাক্টরিজ ইন ইন্ডিয়া

হেজেস ডায়েরি : দ্য ডায়েরি অব উইলিয়াম হেজেস

হোম মিসলেনি : হোম মিসলেনিয়াস সিরিজ

কেএ : কলোনিয়াল আরসিফ

মাস্টার্স ডায়েরি : দ্য ডায়েরিজ অব স্ট্রেনশ্যাম মাস্টার

ওসি : অরিজনাল করস্পনডেন্স

রাওল : রাওলিনসন ম্যানুস্ক্রিপট

রোজ এম্বাসি : দ্য এম্বাসি অব টমাস রো

মানচিত্র

সেন্টার্স অব ট্রেড ইন বেঙ্গল, ১৬৫০-১৭২০

প্রথম অধ্যায়

পৃষ্ঠভূমি

বাংলাকে সম্রাট আওরঙ্গজেব বিশ্বের স্বর্গ আখা দিয়েছেন (রিয়াজুস সালাতিনের লেখক গুলাম হুসেইন সালিম বাংলাকে অভিহিত করতেন জিন্নাতুল বিলাদ, রিয়াজুস… সম্পা মৌলভি আবদুল হক আবিদ, অনু মৌলভি আবদুস সালাম, ৪ পাতা, বাংলার গৌড় সম্বন্ধে বলতে গিয়ে হুমায়ুন বলেছেন জিন্নত-আবাদ বা বিশ্বের বাসভূমি, সূত্র আইনিআকবরি, আবুলফজল অনু জ্যারেট, খণ্ড ২, ১২২১২৩; আল বাদাউনি, মুন্তাখাবু-উল-তাওয়ারিখ, সম্পাদিত মৌলভি আহমদ আলি, খণ্ড ১, ৩৪৯ আ, অনুবাদ র‍্যাংকিং, খণ্ড ১, ৪৫৮)। অষ্টাদশ শতকের পাঁচের দশকে কাশিমবাজারের ফরাসী কুঠিয়াল জাঁ ল’র বলছেন, বাংলা বিষয়ে তুচ্ছাতিতুচ্ছ মোঘল সরকারি নির্দেশনামা বা ফরমান সম্পূর্ণ হত না, শুরুতেই বাংলাকে ভারতের স্বর্গ নামক লব্জ লেখা ব্যতীত, এবং তিনি বাংলা সম্বন্ধে লিখতেন পার এক্সেলেন্স (এস সি হিল, বেঙ্গল ইন ১৭৫৬-৫৭, খণ্ড ৩, ১৬ পাতা)। সপ্তদশ শতে যে সব বিদেশি মুসাফির বাংলায় এসেছিলেন, তাদের লেখায় মধ্যযুগে বাংলার সম্পদের বর্ণনা প্রায় রূপকথাসম হয়ে উঠেছিল এবং তারা স্পষ্টভাবে বাংলার পণ্যের সুলভ দামের কথা বার বার উল্লেখ করেছেন (টমাস বাউরি, আ জিওগ্রাফিক্যাল একাউন্ট অব কান্ট্রিজ রাউন্ড দ্য বে অব বেঙ্গল, ১৯৩-৯৪, সেবাস্তিয়ান মনরিকে, ট্রাভলস, খণ্ড ১, ৫৪-৫৫ এফ বার্নিয়ে ট্রাভলস ইন দ্য মুঘল এম্পায়ার, ৪৩৮-৩৯, লিন্সকোটিন দ্য ভয়েজেস অব… ৯৩)।

ভৌগোলিক দিক দিয়ে বাংলা শব্দের অর্থ হিসেবে বোঝাতে চাইছি মুঘল কাগজপত্রে যে অঞ্চলটাকে বাংলা সুবা বলা হয়েছে। আধুনিক ভূগোলের সঙ্গে সাযুজ্য মিলিয়ে বলতে গেলে মোটামুটি পূর্ব পশ্চিম বাংলা, ওডিসা এবং বিহার নিয়ে বাংলা সুবার ব্যাপ্তি। ১৫৭৬ থেকে ১৫৮২ এই সময়কালে আকবরের কাগজপত্রে যে অঞ্চলকে সুবাইবাংলা বলা হছে সেই ভূখণ্ডেরত মানচিত্র শুধু চট্টগ্রাম নেই। ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রামকে বাংলার প্রশাসনের সঙ্গে যোগ করেন। এই বিশাল ভৌগোলিক সুবা এলাকা দিল্লির সম্রাট নিযুক্ত সুবাদারের প্রশাসনিক দক্ষতায় পরিচালিত হত।

এই সময়ের বাংলার প্রাশাসনিক কাঠামো আকবরের সময়ের তৈরি করা প্রশাসনিক নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হত। সুবার কাজকর্ম দুটি মৌল বিভাগে বিভক্ত ছিল প্রশাসনিক, অন্যটি রাজস্ব – দুটি বিভাগই আলাদাভাবে পরিচালিত হত – একটির কাজ বা নীতি অন্য দপ্তরের কাজকর্মের ওপর প্রভাব ফেলত না। প্রশাসনের প্রধান ছিলেন নায়েব নাজিম, অন্য লব্জে সুবাদার এবং সুবার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন দেওয়ান। দুটি পদই সম্রাটের ফরমান অনুযায়ী নিযুক্ত হত এবং প্রশাসনিক কর্মের নির্দেশমালা দস্তুর-উল-আমল-এ লিখিত নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত হত (রিয়াজুস সালাতিন, অনু পূর্বোল্লিখিত, ২৪৭-৪৮, সালিমুল্লা, তারিখ-ই-বাংলা, অনু গ্ল্যাডউইন, ৩০-৩১)।

নবাব আর দেওয়ানের কাজের মধ্যে নীতিগতভাবে অনির্ভরতা থাকলেও, বহু সময়ে দুই পদের আধিকারিকদের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে বিবাদ বাধত। ১৬৭৮ সনে (সাকি মুস্তাদ খান, মসির-ই-আলমগিরি, অনুবাদ জে এন সরকার, ১০৫) হাজি সফি খানের সঙ্গে নবাব ফিদায়ি খানের খুব সুসম্পর্ক ছিল না। দুজনেই দুজনের বিরুদ্ধে পাদশাহের কাছে অভিযোগ করতেন। তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক এতই বিষিয়ে যায় যে ফিদায়ি খানের মৃত্যুর পর, তার পুত্র দেওয়ান হাজি শফির ভয়ে বাংলা ছেড়ে পালিয়ে যান। ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে হাজি শফি খানের ছেলে কটক ছেড়ে চলে যায় ফিদায়ি খানের ছেলে মহম্মদ খান ওডিসার নতুন প্রশাসক হয়ে আসায় (ফ্যাক্টরি রেকর্ডস, হুগলী, ৭ খণ্ড, ৮৮, ৯০, ৯৮)। তবে আমরা যে সময়ের কথা আলোচনা করব সেই সময়ে এই দুই কাজের দায়িত্ব মুর্শিদকুলির ওপরে আর্ষিত হয়।

বাংলার অধিকাংশ মুঘল আধিকারিক মূলত মুঘল সাম্রাজ্যের অন্য অংশ থেকে বদলি হয়ে বাংলায় আসতেন, কারণ মুঘল প্রশাসনে উচ্চতম আমলাতন্ত্রে সুবাগুলোয় বদলি একটি নিয়মিত ঘটনা ছিল। বদলি সাধারণত হত তিন বছর অন্তর (তাভার্নিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের একটি প্রথা সম্বন্ধে বলেছেন এটা মোটামুটি ঠিক ছিল যে কোনও সুবাদার তিন বছর অন্তর দিল্লিতে ফিরে আসবেন, দেখুন তাভার্নিয়ে ট্রাভলস ইন ইন্ডিয়া, খণ্ড ২, ৬৩)। কিন্তু আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময়ে তিনটি দীর্ঘ সময়ের নবাবের পদে থাকার উদাহরণ দেখি। শাহ সুজা ছিলন ২১ বছর (১৬৩৯-৫৯), এর মধ্যে দুবছর তার অবর্তমানে কাজ চালানো এক আধিকারিকও কাজ করেছেন। শায়েস্তা খাঁ ছিলেন ২৩ বছর, দুটি কিস্তিতে (১৬৬৪-৮৮), দুবার খুব কম সময়ের জন্যে দুজন শাসনের দায়িত্বভার নেন। শাহজাদা মহম্মদ আজিম (১৬৯৮-১৭০৭) ছিলেন ১০ বছরের জন্যে যদিও অধিকাংশ সময় তার ছেলে প্রশাসনিক কাজ চালাতেন সুবাদারের অধীনস্থ হিসেবে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলায় শীর্ষ প্রশাসকদের থাকার অন্যতম কারন ছিল, বহুকাল এই সুবায় রাজনৈতিক শান্তি বিরাজ করত। আরেকটা কারণ হয়ত নবাবেরা ছিলেন সম্রাটের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, অন্যান্য সাধারণ প্রশাসনিক অভিজাতদের থেকে তাদের উচস্তরে যোগাযোগ অনেক বেশি পোক্ত ছিল। তারা প্রশাসনে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারতেন। স্থানীয় বিরোধীরা খুব তাড়াতাড়ি বুঝে যেত এদের তুলনায় তাদের ক্ষমতা খুব বেশি ছিল না এবং কেন্দ্রিয় দরবারের এদের বিরুদ্ধে নল চালানো সহজ ছিল না। তাই হয়ত অন্যান্য সুবার তুলনায় বাংলায় তুলনামূলকভাবে দীর্ঘকাল রাজনৈতিক অস্থিরতা কম হয়েছে (জে এন সরকার, সম্পাদিত, হিস্ট্রি অব বেঙ্গল, ২ খণ্ড, ৩১৬)।

যেহেতু সুবা শাসন করতে আসা প্রশাসকেরা কম সময়ের জন্যে সুবার শীর্ষপদে বসার পদাধিকার পেতেন, তাই তারা দীর্ঘ সময়ের জন্যে লাভদায়ী প্রকল্প হাতে নিতেন না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বদলি হওয়ার আগেই যা হোক করে সুবা থেকে অতিরিক্ত অর্থ রোজগার করে নেওয়া। স্থানীয় অভিজাতদের থেকে অর্থ আদায় বা একচেটিয়া ব্যবসায় মন দিতেন। সপ্তদশ শতকে ভারতবর্ষ জুড়ে এই ধরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল — বাংলা এর ব্যতিক্রম ছিল না। অন্তত তিনজন বাংলার নবাব, মীর জুমলা, শায়েস্তা খাঁ এবং শাহজাদা আজম — বাংলার অর্থনীতির একাংশ একচেটিয়া করণের চেষ্টা করেছেন। বাংলায় উচ্চপ্রশাসনিক পদপ্রাপ্তি ভাগ্য ফেরাবার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়েছে বহুকাল। ফলে নবাব বা সুবাদারেরা বাদশাহকে নানান ধরণের উপঢৌকন দিয়ে যতদিন পারা যায় পদে অধিষ্ঠিত থাকার চেষ্টা করতেন। ১৬৯৭ সালে নভেম্বরে ব্রিটিশ কুঠিয়াল সূত্রে জানা যায় যে সম্রাটকে ৩ কোটি টাকা উপঢৌকন দিয়ে শায়েস্তা খাঁ তার নবাবি পদ ফিরে পান (হোম মিসলেনিয়াস, ৮০৩ খণ্ড, ১৫৪)। ১৭০২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে শাহজাদা আজিম তার পদাধিকার বজায় রেখেছিলেন আওরঙ্গজেবকে ৩০ লক্ষ টাকা উপঢৌকন দিয়ে (ও সি, ৪ ফেব, ১৭০২, ৭৮৫২ সংখ্যা, ৬৩ খণ্ড; ফ্যাক্টরি রেকর্ডস মিসলেনি ৩এ খণ্ড, ৪ ফেব ১৭০২)। কিছু কিছু সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর যেমন হুগলী বা বালেশ্বর ইত্যাদির ফৌজদারও নবাবকে বিপুল অর্থ দিয়ে পদে থাকতেন। ১৬৭২ সালে মালিক কাশেম তিন হাজার টাকার বিনিময়ে বালেশ্বরের শাসকের পদ নিশ্চিত করেন (ফ্যাক্টরি রেকর্ডস, হুগলী, ৪ খণ্ড, অংশ ১, ১০)। ১৬৭৭ সালে হুগলীর বক্সবন্দরের আমলার পদ বহু মানুষ হাসিল করার চেষ্টা করেন। আজিজ বেগ দশ হাজার টাকা আর ১২টি হাতি উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী লুডারামও বিপুল অর্থ দিতে রাজি ছিলেন। কিন্তু কাশিম আলি সবার থেকে বেশি অর্থ দেওয়ার ক্ষমতা থাকায় তার সুযোগ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত আলি নাকিকে হুগলীর বক্সবন্দর করা হয় (ফ্যাক্টরি রেকর্ডস, হুগলী, ৭ খণ্ড, ২ অংশ, ৫, ২১, খণ্ড ৩, ৬১; বক্সবন্দরের অর্থ [বক্সীদের] অধীনস্থ বন্দর — আমাদের মনে হয় ব্রিটিশেরা এখানে ফৌজদারের পদের জায়গায় এই শব্দটা ব্যবহার করেছে)। শোনা যায় ১৬৭২ সালে ডাচেরা নবাবকে দেড় লক্ষ টাকা এবং অন্যান্য আমলাকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে মালিক কাশেমকে পদচ্যুতির ব্যবস্থা করে (ফ্যাক্টরি রেকর্ডস, হুগলী, ৪ খণ্ড, ১, ৪-৭, খণ্ড ৭, ১, ৮১)। ঐ বছরে জুলাইতে ব্রিটিশ ঢাকা কুঠিয়ালেরা লিখল, মালিক কাশেম বালেশ্বরে যাচ্ছে হয়ত, আপনারা যদি আমাদের সময়, ছুটি এবং ক্ষমতা দেন তাহলে তার বহিস্কার রুখতে পারি (ফ্যাক্টরি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৭, ১, ৮১)। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev