| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনে শহিদ কমলা ভট্টাচার্য ও সুদেষ্ণা সিনহা : বিজয়া দেব

Reporter
বিজয়া দেব / ১২৫১ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৯ মে, ২০২৩

ভাষা বলতে প্রথমেই আসে মাতৃভাষা। মায়ের মুখের ভাষা শুনে একটি শিশু অজানা অচেনা পৃথিবীকে ও পৃথিবীজাত যাবতীয় জড় ও চেতন বস্তুকে চিনতে শেখে ও নিজের ভাবপ্রকাশ করতে পারে। তাই মা থেকেই মাতৃভাষা।আমাদের জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি আমাদের মাতৃভাষা।

মাতৃভাষা বনাম ক্ষমতার ভাষা মানে রাজশক্তির ভাষা নিয়ে এক চিরন্তন সংঘাত আমরা লক্ষ করি। ক্ষমতার আগ্রাসী চরিত্র মাতৃভাষার অস্তিত্বকে ও তার সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে বিপন্ন করে এবং তার জাতিগত অস্তিত্বকে সংকটপূর্ণ করে তোলে। আমরা দেখেছি সারা বিশ্বে এই অপকৌশল ও অপরাজনীতির বলি হয়ে অনেক জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

কমলা ভট্টাচার্য ও সুদেষ্ণা সিনহা।

আসামের ভাষাআন্দোলন তাই বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে তুলনীয়। উভয়তই আমরা ক্ষমতার আগ্রাসী শক্তির বাংলাভাষাকে গিলে খাওয়ার বিরুদ্ধে আত্মসচেতন মানুষের নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে লড়াই করতে দেখেছি। তবে এখানে আমাদের আলোচনা শুধু বাংলাভাষা আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মাতৃভাষা মানে যে কোন মাতৃভাষা, যে কোনও জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা, সে জনগোষ্ঠী ছোট হতে পারে, মাঝারি হতে পারে, বড় হতে পারে, আবার একেবারে ছোটও হতে পারে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতীয় সংবিধানে এ দেশে প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষার অধিকারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বিশেষ করে ভাষার ক্ষেত্রে রাজনীতির অন্যতম কৌশল মাৎসন্যায় নীতিকে কার্যকর করতে দেখেছি আমরা বারবার। আর এর বিরুদ্ধে আত্মসচেতন মানুষকে রুখে দাঁড়াতে হয়েছে, এবং প্রাণও বলিদান করতে হয়েছে।

ভাষা আন্দোলনে মেয়েদের উল্লেখযোগ্য ভুমিকা আমরা লক্ষ করেছি বাংলাদেশে একুশের আন্দোলনে, বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলনে। মেয়েদের গণআন্দোলনে এগিয়ে আসার কাজ তো তখন সহজসাধ্য ছিল না, কারণ ‘অন্তঃপুরিকা’ শব্দটি মেয়েদের উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হত। সংসারের খুঁটিনাটি কাজ দেখার ভার তাঁদের ওপর বর্তানো হয়েছে সামাজিকভাবে এবং সারাদিনব্যাপী এইসব কাজে ব্যাপৃত মেয়েরা সেইসময়ে ভাষাচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘরের আগল ভেঙ্গে এগিয়ে গেছেন, গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, মাতৃভাষাকে আপন মর্যাদায় দাঁড় করাবার যে লড়াই তাতে অংশগ্রহণ করেছেন, ভাবতেই শিহরণ জাগে। যদিও যাঁরা গণআন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সবার নাম আমাদের কাছে নেই, সেইসব নাম আমাদের সামনে আসেনি, হয়ত আসবেও না, তবু আমরা শহিদ কমলা ভট্টাচার্যকে তাঁদের সবার আলোকিত প্রতিনিধি হিসেবে ধরে নেব। আমরা এ-ও জানি বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষাশহিদের মর্যাদা পেয়েছেন কমলা ভট্টাচার্য ভাষাআন্দোলনের অনেক পর।

বিশ্বের দ্বিতীয় ভাষাশহিদ সুদেষ্ণা সিনহা—

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি নামে পরিচিত ভাষিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর আদিভূমি হল উত্তর পূর্বাঞ্চলের আসামের পার্শ্ববর্তী রাজ্য মণিপুর। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে নানা রাজনৈতিক এবং সম্প্রদায়গত সংঘর্ষের কারণে এবং বিশেষ করে ১৮১৯-১৮২৫ সাল পর্যন্ত কালপরিধিতে সংঘটিত বার্মা মণিপুর যুদ্ধের সময় ব্যাপক মণিপুরির অভিবাসন ঘটে আসামের কাছাড়, ত্রিপুরা এবং পূর্ববাংলাতে (বর্তমান বাংলাদেশ)। অভিবাসী মণিপুরিদের মধ্যে মৈতেই মণিপুরি, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি এবং পাঙন (মণিপুরি মুসলিম) মণিপুরিরা আছেন। মণিপুরে জিরিবাম অঞ্চলে এবং বরাকউপত্যকার গ্রামেগঞ্জে এঁরা ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ও মেইতেই মণিপুরি, মণিপুরি জনগোষ্ঠীর দুটি শাখা বলে চিহ্নিত। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা অনেকটা বাংলা ও অসমিয়া ভাষার কাছাকাছি। মণিপুরে মূলত মেইতেই মণিপুরিরা সংখ্যাধিক্যে রয়েছেন। ওখানের পঠনপাঠনের মাধ্যম ও যোগাযোগের ভাষা মেইতেই মণিপুরি। সুতরাং মণিপুরে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি যাঁরা আছেন তাঁদের মুখের ভাষা ও অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্তির পথে। সুতরাং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের সংকটের অভিঘাত এককথায় গভীর। স্বার্থান্বেষীরা তাদেরকে মণিপুরি বলে স্বীকৃতি দিতেও দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।

১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ শে সেপ্টেম্বর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ মণিপুরি ভাষার অপর শাখা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে “নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া গণসংগ্রাম পরিষদ’’ গঠন করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন রবিশঙ্কর সিনহা, কুলচন্দ্র সিনহার মত নেতারা। শুরু হয় আন্দোলন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত আসাম ও ত্রিপুরায় বহুবার রেল অবরোধ, পথ অবরোধ, গণ অনশন ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এরই প্রতিক্রিয়ায় ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে মে ত্রিপুরা সরকার রাজ্যের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা চালু করেন। কিন্তু আসামে তা চালু না হওয়ায় আসামে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলতে থাকে। ১৯৯৫ খৃস্টাব্দে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দেয় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি গণসংগ্রাম পরিষদ।

১৯৯৬ সালের ১৬ই মার্চ শনিবার। দীর্ঘ ৫০১ ঘন্টার রেল অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া গণসংগ্রাম পরিষদ। আসামের কলকলিঘাটের গুঙ্গাঝারি রেলওয়ে স্টেশনে করিমগঞ্জ থেকে আসা একটি ডাউনট্রেন অবরোধ করে গণসংগ্রাম পরিষদ। এই সময় আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন এক ৩২ বছরের তরুণী। ১৯৯৬ সালের ১৬ই মার্চ রৌদ্রস্নাত দুপুরবেলায় বিনা প্ররোচনায় আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ। ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়েন সেই ৩২ বছরের তরুণী, যাঁর নাম সুদেষ্ণা সিনহা। ঘড়িতে তখন দুপুর ১২টা বেজে১০ মিনিট। সুদেষ্ণা সিনহা আত্মবলিদান দিলেন তাঁর মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্যে, তিনিই বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা ভাষা শহিদ।

৫০১ ঘন্টার রেল অবরোধ কর্মসূচিতে আসার সময় সুদেষ্ণা নাকি তাঁর বন্ধু প্রমোদিনীকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন — “মোর রক্তলো অইলেউ মি আজি ইমারঠারহান আনতউগাগো চেইস (আমার রক্ত দিয়ে হলেও আজ আমি মাতৃভাষাকে কেড়ে আনব দেখিস), এই শপথ কিন্তু ব্যর্থ হয়নি। এই ঘটনার পর প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা আসামে স্বীকৃত হয়।

এইদিন পুলিশের গুলিতে অনেক আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। আহত অবস্থায় আরেক তরুণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেন। তিনি হলেন শহিদ সলিল সিনহা।

বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা ভাষাশহিদ সুদেষ্ণা ছিলেন অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে আসামের বিলবাড়ি নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর ডাকনাম ছিল বুলু। ছোটবেলা থেকেই তিনি বিজাতীয় ভাষায় শিক্ষাগ্রহণের ব্যাপারে প্রশ্নাতুর ছিলেন। অন্য ভাষায় শিক্ষাগ্রহণের অসুবিধের কথা তিনি মা বাবাকে বলতেন। একটি শিশু যখন প্রাথমিক স্কুলে পড়তে যায় তখন তার সাথে জড়িয়ে থাকে তার মুখের ভাষা মাতৃভাষা। সেখানে বিজাতীয় ভাষা শিখতে গিয়ে তার শিক্ষার অগ্রগতি ব্যাহত হয়। সুদেষ্ণা সেই অসুবিধের কথা বাবা মাকে বলতেন। নিজের মাতৃভাষায় কেন তিনি শিক্ষাগ্রহণ করতে পারবেন না সেই প্রশ্নও করতেন। শৈশবের বাস্তব অসুবিধেগুলি তাঁকে তাঁর মাতৃভাষা সম্পর্কে আত্মসচেতন করে তুলেছিল।

ভাষিক সংখ্যালঘুদের অসুবিধে নানাবিধ। মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হয়, নানাবিধ নিগ্রহ থাকে তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। অস্তিত্ব সংকটের যন্ত্রণা, সামাজিকভাবে অবহেলা তাঁদের সইতে হয়। তাছাড়া তাঁদের মুখের ভাষা ও সংস্কৃতি বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা থাকে যদি না তারা আত্মসচেতন হয়। সুদেষ্ণার মধ্যে এই আত্মচেতনা দেখতে পাই তার প্রাথমিক স্কুলে পড়তে যাওয়ার সময় থেকেই। তিনি বুঝতেন তাঁদের এই ছোট জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব বিলোপ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। মণিপুরের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মেইতেই মণিপুরিদের প্রভাব তাঁদের বিলুপ্ত করে দিতে সক্ষম। সুদেষ্ণার আত্মবলিদান বিষ্ণুপ্রিয়াদের অস্তিত্বকে সুদৃঢ় করেছে। সুদেষ্ণা সিনহা অমর রহে।

বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষা শহিদ কমলা ভট্টাচার্য —

১৯৫২ এর ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে উর্দুভাষা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বাঙালিরা। শহিদ হয়েছিলেন আবুল বরকত রফিক জব্বার…ঠিক সেইমত আসামে অসমিয়া ভাষা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান বরাক উপত্যকার বাঙালিরা। একই প্রেক্ষিতে এবং একই গণচেতনায় উদ্বুদ্ধ এই ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা তাই ভাষিক চেতনার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আসামের ভৌগলিক অবস্থানে বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র ও বরাক এই দুই নদীর অববাহিকা অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতিতেও রয়েছে লক্ষণীয় পার্থক্য। বরাক উপত্যকার তিনদিকে সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণী আর একদিকে সমতল, আর ঐদিকে পড়েছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল। এই সিলেট দেশভাগের পূর্বে আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দেশভাগের সময় এক বিতর্কিত গণভোটের মাধ্যমে তা বাংলাদেশে চলে যায়। হাজার হাজার মানুষ ছিন্নমূল হয়ে বরাক উপত্যকার তিনটি শহর শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জে ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার শহরে ও গ্রামে এসে আশ্রয় নেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় অসমিয়া জাতির মনে ব্যাপক ভয়ের সঞ্চার হয় যে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি অসমিয়া ভাষা ও সংস্কৃতিকে গ্রাস করে নেবে। শুরু হয় ‘বঙালখেদা’ আন্দোলন। হাজার হাজার ছিন্নমূল বাঙালি উত্তরবঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও বরাক উপত্যকায় অভিবাসিত হয়।

আসামে বরাক উপত্যকায় মূলত বাঙালিদের বাস, এছাড়া চা বাগানের জনজাতি, মণিপুরি, নাগা, ছোটো অসমিয়া আদিবাসী জনগোষ্ঠী ধেয়ানি, দিমাসা বা কাছাড়ি আদিবাসীরা রয়েছেন। সংখ্যাধিক্যে রয়েছেন বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান। বরাক থেকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যাতায়াতের রাস্তাও সুগম নয়। এখানেও অর্থাৎ ভৌগলিক কারণেও বরাক ব্রহ্মপুত্রের মধ্যে একটা দূরত্বও প্রথম থেকে রয়ে গেছে।

১৯৬০ সালে আসাম সরকার অসমিয়া ভাষাকে মূল দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই মর্মে এক প্রস্তাব গ্রহণ করে। তারই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বরাকের বাঙালিদের মধ্যে নানা প্রশ্ন জাগে। পুনরায় ছিন্নমূল হবার আশংকা ও মাতৃভাষার অস্তিত্বরক্ষার প্রশ্নেও তাঁরা একজোট হওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ১০ই অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহার মন্ত্রীসভা বিধানসভায় অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র রাজ্যভাষা হিসাবে গ্রহণ করার সপক্ষে বিল আনে। তারই প্রতিক্রিয়ায় বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় বাংলাভাষাকে শিক্ষা ও দাপ্তরিক কাজকর্মের মাধ্যম হিসাবে চালু করার জন্যে আসামের অন্যতম রাজ্যভাষা হিসাবে বাংলাভাষা চালু করার দাবিতে ‘কাছাড় গণসংগ্রাম’ পরিষদ গঠিত হয়।

এই প্রসঙ্গে একটু অতীতে ফিরে গেলে দেখব বাংলা ভাষাচেতনার সাথে জড়িয়ে আছে নিপীড়ন ও উচ্ছেদের কাহিনি, প্রধানত আসামের ‘বঙাল খেদা’ আন্দোলন। বরাক উপত্যকার ভাষিক সংকটের সাথে জড়িয়ে আছে অস্তিত্বসংকটের নিদারুণ দুঃস্বপ্ন। মাতৃভাষা ও অস্তিত্ব রক্ষা একে অপরের সাথে জড়িত, বরাকের বাঙালিরা তা বুঝতে পেরেছিলেন, হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন প্রতিরোধ গড়ে না তুললে হয়ত একটি সময় বরাক উপত্যকা থেকে বাঙালিদের আবার উৎখাত হওয়াও অসম্ভব নয়। দেশভাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছিন্নমূল হওয়া বাঙালিরা পুনর্বাসিত হয়েছেন, হয়ত আরও একবার ছিন্নমূল হবার অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে, মাতৃভাষা আগ্রাসনের প্রক্রিয়া তার প্রথম পদক্ষেপ।

১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে ‘কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ১৯৬১ র ১৪ই এপ্রিল তারিখে বরাক উপত্যকার তিনটি শহর শিলচর, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জে ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’ ‘সংকল্প দিবস’ পালন করে। সংকল্প দিবসে ভাষিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সার্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সংকল্প গ্রহণ করা হয়। গণসংগ্রাম কমিটির নেতা রথীন্দ্রনাথ সেন এর প্রতিবাদে ১৯ শে মে ১২ ঘন্টার হরতালের ডাক দেন। আসাম সরকারের তরফ থেকে আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা ফ্ল্যাগ মার্চ শুরু করে ১২ই মে থেকে। বরাক উপত্যকার তিনটি শহরেই প্রচুর সেনা মোতায়েন করা হয়। ১৮ই মে কাছাড় গণসংগ্রাম কমিটির প্রথম সারির নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় রবীন্দ্রনাথ সেন, নলিনীকান্ত দাশ, বিধুভূষণ চৌধুরী-সহ প্রথম সারির নেতাদের।

১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ শে মে কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদের সত্যাগ্রহীরা শিলচর রেলস্টেশনে শান্তিপূর্ণভাবে রেল অবরোধ আন্দোলন শুরু করেন। শান্তিপূর্ণভাবেই অবরোধ চলছিল, এরই মধ্যে সেনাপুলিশ একটি ট্রাকে করে কিছু সত্যাগ্রহীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে। তা দেখে রেলস্টেশনে অবরোধকারী সত্যাগ্রহীরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। বেলা ২-৩৫ মিনিটে বিনা প্ররোচনায় ১৭ রাউন্ড গুলি চালায় সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তারক্ষীরা। ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন নয়জন ভাষাসৈনিক। পরে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়। শহিদ হলেন কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ ও কমলা ভট্টাচার্য। এই কমলা ভট্টাচার্য হলেন বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষা শহিদ।

কমলা ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৪৫, সিলেটে (শ্রীহট্ট, বর্তমান বাংলাদেশ)। পিতার নাম রামশরণ ভট্টাচার্য, মাতার নাম সুপ্রবাসিনী দেবী। কমলারা ছিলেন তিনভাই, চারবোন। চারবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ছোটবেলাতেই তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। বাবা মারা যাওয়ার পর আর্থিক অনটনের ভেতর দিয়ে চলতে হয় পরিবারকে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের সময় এক বিতর্কিত গণভোটের মাধ্যমে অসমের শ্রীহট্ট (সিলেট) জেলা পূর্বপাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। কমলারা পাকিস্তানেই থেকে যান। কিন্তু ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরম্ভ হলে তার রেশ সিলেটেও এসে পড়ে। কমলার পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে আসামের শিলচর শহরে এসে আশ্রয় নেন। শিলচর শহরের পাবলিক স্কুল রোডের পেয়াদা পট্টিতে (বর্তমান কমলা রোড) এক ভাড়াবাড়িতে এসে উঠেন। এখান থেকেই শিলচর ছোটেলাল শেঠ ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা শুরু হয় কমলার। নিদারুণ আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে চলছিল তাঁদের পরিবার। এক দিদি প্রতিভা কোনও স্কুলে শিক্ষকতা করতেন বলে জানা যায়। মূলত তাঁর আয়েই তাঁদের সংসার চলত। আরেক দিদি বেণুবালা নার্সিং প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। বই কেনার সামর্থ্য ছিল না কমলার। সহপাঠীদের কাছ থেকে বই ধার করে এনে পড়তেন। স্বপ্ন দেখতেন মেট্রিক পরীক্ষা পাশ করে টাইপিং শিখে চাকুরি খুঁজে নেবেন, বোনকে সংসার চালাতে সাহায্য করবেন, এই স্বপ্নের কথা তিনি মা-কে বলতেন। ১৯৬১ র ১৯মে, রক্তস্নাত সেই দিনটির আগের দিন তাঁর মেট্রিক পরীক্ষা শেষ হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

১৯শে মে, ১৯৬১, বরাক উপত্যকার শহরগুলোতে তখন তীব্র উন্মাদনা। শুরু হয়েছে তারাপুর রেলস্টেশনে রেল অবরোধ। সত্যাগ্রহীরা ধীরে ধীরে এসে জমা হতে শুরু করেছেন। কমলা আরও বাইশজন তরুণীর সঙ্গে রওয়ানা হলেন রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে। ছোটবোন মঙ্গলাও ছিলেন সাথে। কমলার মা যেতে বারণ করলেন। কমলা মাকে আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে যে, কিছু হবে না মা,একটু পরেই আমরা ফিরে আসছি। মা বাধা দিলেন না আর। শোনা যায় কমলার মা-ও রেলস্টেশনে গিয়েছিলেন। যাঁরা দেশভাগের বলি তাঁরা জানেন অস্তিত্বসংকটের যন্ত্রণা, ছিন্নমূল হওয়ার নিদারুণ অভিঘাত। তাই হয়ত কমলা মঙ্গলা সুপ্রবাসিনী দেবী সত্যাগ্রহীদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে জোরদার করতে চাইছিলেন, রুখে দিতে চাইছিলেন আগ্রাসনবাদীদের।

সারা শহর জুড়ে সেদিন জনজোয়ার চলছে। ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ‘জান দেব তবু জবান দেব না’ …। বেলা ২টা বেজে ৩৫ মিনিটে পুলিশের গুলিতে আরও দশজন সহযোদ্ধাসহ কমলা শহিদ হলেন — হলেন বিশ্বের প্রথম ভাষাশহিদ। পুলিশের বন্দুকের বাঁটের আঘাতে আহত হলেন কমলার ছোটবোন মঙ্গলা।

বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষাশহিদ কমলা ভট্টাচার্যকে নিয়ে বিখ্যাত কবি ও কথাকার মণীশ ঘটকের একটি বিখ্যাত কবিতা আছে, সেই কবিতাটি উল্লেখ করছি। কমলার প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন ও স্মৃতিচারণের সে এক অনবদ্য ভাষ্য। অতঃপর নীরবতা ছাড়া আর কিছুই বাকি থাকে না—

“সে যে বলে গেল জান দেব তবু জবান কখনও দেব না

ভাত বেড়ে রেখো ফিরে এসে খাবো না এলেও মাগো ভেবো না।

যেতে দিই নাই ছোট মঙ্গলীকে যদিও নাছোড়বান্দা

দিদিগত প্রাণ ছিল ছুঁড়িটার তিলে তিলে দেয় প্রাণটা।

বড় অনটন অভাব দৈন্যে ভরা এই ছোট সংসার,

মেজ বেণুবালা স্বামী কি জিনিস পায়নি সুযোগ জানবার।

অল্পবয়সে হয়েছে বিধবা শুকোয়নি আজো আঁখিজল,

কমলিকে খুন করেছে স্টেশনে দুঃসংবাদে সে পাগল।

আমরা তো কেউ জহরলালের কোন অনিষ্ট করিনি,

কল্পনাতেও অশুভ চিন্তা মনে কেউ কভু ধরিনি।

তবে কেন তিনি গৌহাটি বসে এসব কান্ড করালেন,

ঘাতক পাঠিয়ে শিলচরে কেন মরণ নিশাণ ওড়ালেন?

দু’চোখের মণি কমলি আমায় বলেছিল, “মাগো,

এবার মেট্রিক দিয়ে টাইপ শিখব, করব প্রচুর রোজগার।

আসবে সুদিন দেখে নিও তুমি দুঃখ তোমার ঘোচাব,

যতটুকু পারি দিদি, মঙ্গলির চোখের জল মোছাব।

ভাষাবিদ্রোহে যোগ দিতে মেয়ে চলে গেল রেলস্টেশনে,

জেদি মঙ্গলি সাথে সাথে গেল বারণ তখন কে শোনে!

ফিরে এল নাকো শুধু একজন, আরেকজনও যায় যায়,

ওদেরই মা, মোছলাম চোখ আমার কি সাজে হায় হায়…

যে ভাষায় মাকে প্রথম জেনেছি সে ভাষা আমার দেবতা,

কথা কইবার অধিকার তাতে নেবই আমরা নেব তা।

নেহরু ফারুক চালিহার দল বলে-বুলেট না বাংলা?

জান দেব তবু জবান দেব না করুক না যত হামলা।

—‘শিলচরে কমলা ভট্টাচার্যের মায়ের কান্না’ — মনীশ ঘটক।

তথ্যসূত্র : ( ইন্টারনেট থেকে আহৃত)

১। ভাষা আন্দোলনের চলমান প্রক্রিয়া ও ভাষা আগ্রাসন — দিলীপ কান্তি লস্কর।

২। বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন — তরুন চক্রবর্তী।

৩। আসামে ভাষা আন্দোলন — এম গোলাম মুস্তাফা ভুঁইয়া।

৪। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি আন্দোলনের শহিদ সুদেষ্ণা সিনহা — উত্তম মন্ডল।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev