| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়-এর বড়োগল্প ‘ইজ্জত’

Reporter
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় / ৪৪৭ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৪

সমুদ্র অনেক দূরে। সেখানে ঝড়, সেখানে সাইক্লোন, আর এখানে এই এক টুকরো গ্রাম যেন প্রবালদ্বীপ। এর চারদিকে সহজ অশিক্ষা আর অজ্ঞতার শান্তি একটা স্তব্ধ লেগুনের মতো প্রবাল-বলয় দিয়ে ঘেরা।

উপমাটা দিয়েছিল গ্রামের ডাক্তার এবং আশপাশের চারখানা গ্রামের মধ্যে একমাত্র এলএমএফ ডাক্তার জয়নুদ্দিন মিয়ার ছেলে মইনুদ্দিন। সে তখন কলকাতার কলেজে বিএ পড়ত। তারপর সাত-আট বছর পার হয়ে গেছে। সে এখন দূরের মফস্বল শহরের উঠতি উকিল, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মেম্বার, একজন নামজাদা নেতা। শান্ত স্তব্ধ লেগুনের চাইতে মাতাল সমুদ্রের গর্জনই তার ভালো লাগে বেশি।

দূরের সমুদ্রে ঝড়। কলকাতা, নোয়াখালি, বিহার, বোম্বাই, পাঞ্জাব আত্মঘাত আর অপঘাতের রক্তে লাল হয়ে গেল নীল সমুদ্রের জল। প্রবাল-বলয় ভেঙে পড়ল, লেগুনের নিস্তরঙ্গ জলে দেখা দিল মত্ততার আক্রোশ।

ব্রাহ্মণত্বের বিজয়গর্বে প্রায় আধ হাত খানেক একটা টিকি মাথার ওপরে গজিয়ে তুলেছে। জগন্নাথ সরকার। সেইটেই দুলিয়ে সে বললে, নাঃ, এর প্রতিবিধেন করতেই হবে। এমনভাবে চললে দু-দিন বাদে সব বাছাধনকেই যে কলমা পড়তে হবে সেটা খেয়াল রেখো।

তরণি মন্ডল বললে, তা লাঠি ধরতে হয়।

তাই ধরতে হবে। নিজের মান নিজে না রাখলে কে রাখবে তাই শুনি? গায়ে যতক্ষণ এক ফোঁটা রক্ত আছে, ততক্ষণ এ ঘটতে দেব না, পরিষ্কার বলে রাখলাম।

কুকুরের ছানার বেঁড়ে একটা ল্যাজের মতো জগন্নাথ সরকারের মাথার ওপরে টিকিটা নড়তে লাগল।

ব্রাহ্মণের অধিকার সম্বন্ধে একটু বেশি মাত্রাতেই সচেতন জগন্নাথ সরকার। খাঁটি ব্রাহ্মণদের কাছে স্বীকৃতিটা নেই বলেই নিজেকে আরও বেশি করে প্রমাণ করতে চায় সে, প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সমুদ্রের ওপারে একটা বিস্তীর্ণ মহাদেশ জুড়ে যেখানে ব্রাহ্মণত্বের বিজয়পতাকা উড়ছে, অস্পৃশ্য নমঃশূদ্রদের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য গর্বিত জগন্নাথ সরকারের কোনো পার্থক্য নেই সেখানে। তাই নিজের ছোটো গন্ডিটির ভেতরে নিজেকে সে বশিষ্ঠ-যাজ্ঞবন্ধ্যের মহিমায় স্থাপিত করে রাখতে চায়। ক্ষার দিয়ে পরিষ্কার করে কাচা লালচে রঙের মোটা পৈতের গুচ্ছটা বাগিয়ে ধরে বলে, হেঁ হেঁ বাবা–খাঁটি কাশ্যপ গোত্র, রামকিষ্ট ঠাকুরের সন্তান। একটু তপ তপিস্যে বজায় রাখলে যাকে-তাকে ভস্ম করে ফেলতে পারতুম।

কিন্তু তপ-তপস্যাটা এখন আর হয়ে ওঠে না বলেই কাউকে আর ভস্ম করাটাও সম্ভব নয় রামকিষ্ট ঠাকুরের সন্তানের পক্ষে। আর মনু-পরাশরের সঙ্গে যতই আত্মীয়তা সে দাবি করুক না কেন, আসলে সে এখন অন্ত্যজ, সে নমঃশূদ্রের ব্রাহ্মণ।

কোন সাত না দশ পুরুষ আগে অক্ষত কৌলীন্য স্বনামধন্য রামকিষ্ট ঠাকুরের কোনো বৃদ্ধ প্রপৌত্র লোভ বা অভাবের তাড়নায় নমঃশূদ্রের যাজনা করেছিল। সেই থেকে তারা পতিত। হিন্দুত্বের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য সে-পতনকে ক্ষমার চোখে দেখেনি, বিচারও করেনি। একটু একটু করে দিনের পর দিন ঠেলে দিয়েছে পিচ্ছিল পথে, এখন তারা নমঃ-র বামুন।

পৈতে আছে, উপনয়নের ব্যবস্থা আছে, ব্রাহ্মণ্য সংস্কারের ভাঙাচুরো অর্থহীন অসঙ্গতিগুলোও জড়িয়ে আছে জীবনের সঙ্গে। শিক্ষাদীক্ষা নামেমাত্র; জগন্নাথ সরকার নামটা কাঁচা হাতে সই করতে পারে, তাতে মাত্রা দিতে জানে না, লেখাটা দেখলে নাগরী বলে মনে হয়। চেহারায় ব্রাহ্মণের আর্যত্বের দীপ্তি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। রোদে-পোড়া কালো রং, লাঙল ঠেলে চওড়া চওড়া হাত দুটো লোহার মতো শক্ত আর কড়া পড়া, পিঠে খড়ি, তামাটে রঙের খাড়া খাড়া চুল, অনেকক্ষণ ধরে স্নান করলে যেমন হয় তেমনি লালচে আর ঘোলাটে বর্ণের চোখ। বড়ো বড়ো অসমান দাঁত, তার দুটো আবার হিন্দুস্থানিদের অনুকরণে রুপো-বাঁধানো। শুধু কুকুরের বেঁড়ে ল্যাজের মতো মাথার টিকিতে ব্রাহ্মণত্বের জয়গৌরব ঘোষিত হচ্ছে।

নমঃশূদ্রদের বিয়েতে, ক্ষেত্ৰপালের পুজোয় সে-ই মন্ত্র পাঠ করে। সে-মন্ত্র বিচিত্র। খাঁটি প্রাদেশিক বাংলার ঘাড়ে কতগুলো অনুস্বার-বিসর্গ চাপিয়ে সেগুলোতে দেবমহিমা আরোপ করা হয়। পিতৃপুরুষের কাছ থেকে যেটুকু পাওয়া গেছে প্রয়োজনমতো তার সঙ্গে নতুন মন্ত্রও জুড়ে নেয় জগন্নাথ সরকার। মোটের ওপর পসার আছে এবং সেজন্যে আত্মমর্যাদা সম্পর্কেও সে পুরোপুরি সজাগ।

আজ সেই আত্মমর্যাদায় ঘা লেগেছে।

বাইরের সমুদ্রে ঝড়। কলকাতা, নোয়াখালি, বিহার—সমস্ত দেশজোড়া একটা অতিকায় ছোরার ঝলক এখানকার আকাশেও বিদ্যুৎচমকের মতো খেলা করে গেল।

অনেক দিন আগে এখানে এক ফকিরের আবির্ভাব হয়েছিল। ফকির নাকি ছিলেন অদ্ভুতকর্মা; সমস্ত হুরি-পরি-জিন ছিল তাঁর আজ্ঞাবহ। হাতে একমুঠো ধুলো নিয়ে তিনি ফু দিতেন, সঙ্গে সঙ্গে সে-ধুলো হয়ে যেত খাসা কিশমিশ মনক্কা, কখনো কখনো একেবারে সেরা মোগলাই পোলাও। কতগুলো ঘাসপাতা একসঙ্গে জড়ো করে নিয়ে মন্ত্রপাঠ করতেন ফকির, দেখতে দেখতে সেগুলো হয়ে যেত চুনি-পান্না-হিরে-জহরত। সেসব হিরে-জহরতের শেষপর্যন্ত কী গতি হয়েছে ইতিহাসে তা লেখা নেই, তবে ফকিরের মহিমা লোকের স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে আছে। আর সবচাইতে যেটা উল্লেখযোগ্য সেটা এই যে, এহেন করিতকর্মা মহাপুরুষ কী মনে করে এই অজগর বিজেবনেই তাঁর দেহরক্ষা করলেন।

বেশ আড়ম্বরের সঙ্গেই গ্রামের লোক তাঁর শেষকৃত্য করলে। তাঁর সমাধির ওপর রচনা করলে ছোটো একটি গম্বুজ। এখন সে-গম্বুজ আর নেই, কয়েকখানা শ্যাওলাধরা ভাঙা ইট ছড়িয়ে আছে এদিকে-ওদিকে। কিন্তু তাই বলে ফকিরের মহিমার হ্রাস হয়নি বিন্দুমাত্রও। পুরোনো মদের মতো যতই দিন যাচ্ছে সে-মহিমা ততই অলৌকিক হয়ে উঠছে।

ফাঁকা মাঠের ভেতরে টিলার মতো একটুখানি উঁচু জমির ওপরে ফকিরের সমাধি। তা থেকে একটুখানি এদিকে সরে এলে একটা জংলা বট গাছ এলোমেলোভাবে জটা নামিয়েছে চারপাশে। বহুদিনের পুরোনো গাছ, হয়তো ফকিরের সমসাময়িক, হয়তো তার চাইতেও প্রবীণ। মোটা মোটা ডাল থেকে শিকড় নেমে ঢুকেছে মাটির নীচে, রচনা করেছে কতগুলো স্তম্ভের মতো। সব মিলিয়ে গম্ভীর থমথমে একটা আবহাওয়া। নিবিড় নীলাভ ছায়ার আচ্ছন্নতা, ভিজে ভিজে মাটি, কোটরে কোটরে প্যাঁচার আস্তানা। এইখানে ডাকাতে-কালীর থান।

ফকিরের ইতিহাসের সঙ্গে ডাকাতে-কালীর ইতিহাস একই প্রাচীনতার ঐতিহ্যে গাঁথা। কোনো এক নামজাদা ডাকাত এখানে অমাবস্যার রাত্রে নরবলি দিয়ে বেরুত ডাকাতি করতে। এইখানে পঞ্চমুন্ডি আসন করে সাধনা করতেন রক্তচক্ষু এক মহাকায় তান্ত্রিক। অনেক নরবলির রক্ত এখানকার মাটিতে মিশে আছে, অনেক নরমুন্ড লুকিয়ে আছে এর মাটির তলায়। সুতরাং, এখানকার হিন্দুদের কাছে ডাকাতে-কালীর একটা নিশ্চিত ভয়ংকর মর্যাদা আছে। এই গ্রাম তাঁরই রক্ষণাধীনে এবং তাঁর কোপদৃষ্টি পড়লে দেখতে দেখতে সব কিছু উজাড় হয়ে যাবে।

সব চাইতে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এত বড়ো মাঠের ভেতরে এঁরা দুজন পরস্পরের প্রতিবেশী। ফকির আর ডাকাতে-কালী এতকাল পরম নিশ্চিন্তে এবং নীরবে পাশাপাশি বসবাস করে আসছিলেন। এক কম্বলে দশ জন ফকিরের জায়গা হয়–এই প্রবন্ধটির জন্যেই বোধ হয় এতকাল ফকির কিছুমাত্র আপত্তি করেননি এবং এত কাছাকাছি যবনের আস্তানা থাকাতেও কালী জাত যাওয়ার আশঙ্কা রাখতেন না।

বেশ ছিল, কিন্তু সমুদ্রে ঝড় এল; প্রবাল-বলয় ভেঙে দোলা জাগিয়ে দিলে নিদ্রিত প্রবালদ্বীপে। মাইল-দেড়েক দূরে মাঝারি গোছের একটা মাদ্রাসা। মাঝখানে একদিন এক মৌলবি সেখানে এসে ওয়াজ করলেন। কী বক্তৃতা দিলেন তিনিই জানেন, কিন্তু পরের দিন থেকেই আবহাওয়াটা বদলে গেল একেবারে। তারও দু-দিন পরে মুসলমান পাড়ার ধলা মন্তাই এসে জগন্নাথ ঠাকুরকে জানিয়ে গেল, এবার ডাকাতে-কালীর থানে পুজো করা চলবে না।

কারণ?

কারণ ওখানে ঢাক-ঢোল বাজে, ওখানে ভূত পুজো হয়। তাতে সুখনিদ্রায় ব্যাঘাত হয় ফকিরসাহেবের। জগন্নাথ ঠাকুর বোঝাতে চেষ্টা করলে–বরাবর ওখানে পুজো হয়ে আসছে। এতকাল ফকিরসাহেবের যদি কোনো অসুবিধে না-হয়ে থাকে, এবারেই-বা হতে যাবে কেন?

ধলা মন্তাই হাসল, বললে, তা হোক, অত বুঝি না। তবে এইটে বলতে পারি যে, এবারে ওখানে আর পুজো হতে দেওয়া যাবে না। এতে আমাদের ধর্মের অপমান।

কিন্তু আমাদের ধর্মেরও তো অপমান হচ্ছে।

ভূত পুজো আবার কীসের ধর্ম? ধলা মাইয়ের চোখে হিংসা চকচক করে উঠল, একটা কথা বলে যাই ঠাকুর। এ এখন আমাদের রাজত্ব। আমরা যা বলব তাই করতে হবে। এখন বেশি চালাকি করতে যেয়ো না, বিপদ হতে পারে।

গ্রামে দুজন মন্তাই। একজন রোগা আর কালো, নিরীহ নির্জীব লোক, সে শুধুই মন্তাই। ধলা মন্তাইয়ের রং ওরই ভেতরে একটু ফর্সা, লম্বা তাগড়া চেহারা, চিতানো বুক। মুসলমান পাড়ার সে সবচাইতে দুর্ধর্ষ ব্যক্তি, নামকরা দাগি। তাই ধলা মন্তাইয়ের শাসানো শুধু কথার কথাই নয়।

যা বললুম ভুলো না ঠাকুর। পরে গোলমাল হতে পারে। আর এক বার সাবধান করে দিয়ে দলবল নিয়ে ধলা মন্তাই চলে গেল।

তখনকার মতো জগন্নাথ ঠাকুর চুপ করে রইল। কিন্তু চুপ করে থাকা মানেই চেপে যাওয়া নয়। ঘা লাগল ব্রাহ্মণের আত্মমর্যাদায়, কুকুরের ল্যাজের মতো বেঁড়ে টিকিটা উত্তেজনায় খাড়া হয়ে উঠল শজারুর কাঁটার মতো।

নমঃশূদ্রদের গ্রাম। এমনিতেই জাতটা একটু সামরিক, চট করে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার মতো নয়। সমাজের সবচাইতে নীচের তলায় পড়ে থাকে বলেই ধর্মের ওপরে আস্থাটা বেশি। শূদ্রশক্তির বলিষ্ঠ সহজ সংস্কারে একবার যাকে মেনে নিয়েছে তার কাছ থেকে চূড়ান্ত অপমানের আঘাত পেয়েও তাকে ছাড়তে জানে না। যুগ-প্রবাহিত রক্তধারায় শম্বুকের নিষ্ঠা, একলব্যের দৃঢ়তা। সমাজের ওপরতলার মানুষদের মতো ধর্মটা ওদের অলংকার মাত্র নয়, একেবারে নীচের তলায় থেকেও ধর্মকে ওরা অহংকার বলে আঁকড়ে রেখেছে।

সুতরাং, নমঃ-র বামুন জগন্নাথ সরকার খেপে উঠেছে।

পুজো আমরা করবই। তার পরে যা হওয়ার হোক।

একজন বললে, তাহলে সড়কি-টাঙ্গিতে শান দিতে হয়।

জগন্নাথ সরকার হাঁটু চাপড়ে বললে, আলবাত। খুনখারাপি দুটো-একটা হয় তো হোক। কিন্তু পিছিয়ে যাওয়া চলবে না। বেশি বাড়াবাড়ি করে তো ফকিরটকির সবসুদ্ধ উড়িয়ে দেব।

শ্রোতাদের মধ্যে উৎসাহী একজন উঠে দাঁড়াল। রক্তের ভেতরে চনচন করে উঠেছে নেশা —খুনখারাপির নেশা। হিংস্র জন্তুর চৈতন্যের ভেতরে যেন সাড়া দিয়ে উঠেছে আদিম অরণ্যের আহ্বান। সোজা দাঁড়িয়ে উঠে সে বিকট গলায় একটা হাঁক পাড়ল, জয় কালী মাইকি জয়।

সমবেত জয়ধ্বনি উঠল, কালী মাইকি জয়।

আর সঙ্গে সঙ্গে যেন দূরের মুসলমান পাড়া তার জবাব পাঠিয়ে দিলে, আল্লা-হো আকবর।

জগন্নাথ সরকারের নেতৃত্বে শেষ হল ওদের সভা, ধলা মন্তাইয়ের সভাপতিত্বে শেষ হল মুসলমান পাড়ার ওয়াজ। সমস্ত মুসলমান পাড়া আল্লার নামে কসম নিয়েছে, জান দেবে তবু এবার পুজো করতে দেবে না। ইসলামের ইজ্জত বাঁচাতে হলে যে করে হোক ওই ভূত পুজো বন্ধ করতে হবে।

আসন্ন ঝড়ের সংকেতে আকাশ থমথম করতে লাগল! মুসলমান পাড়ার যিনি আদত মাথা, তিনি হাবিব মিয়া। নধর গোলগাল চেহারা, টুকটুকে রং। শৌখিন মেজাজের মানুষ। দিল্লি থেকে প্রতি সপ্তাহে সুর্মা আসে তাঁর নিজের এবং তাঁর আদরের লালবিবির জন্যে। কানে থাকে আতরভরা তুলো এবং মুখ থেকে বেরোয় মশলা-দেওয়া পানের গন্ধ। পঞ্চাশ বছর বয়েস হয়েছে হাবিব মিয়ার, কিন্তু মনের তারুণ্য এতটুকু ফিকে মারেনি আজ পর্যন্ত। এ অবধি বারোটি বিবি তাঁর হাত ঘুরে গেছে। এখন যে-চারটি আছে তার প্রথমটি হচ্ছে আদি ও অকৃত্রিম, বাকি তিনটি আনকোরা নতুন। পুরোনো জিনিস বেশিদিন বরদাস্ত করতে পারেন না হাবিব মিয়া, কিন্তু বড়োবিবিকে তালাক দেবার কল্পনাও তিনি করতে পারেননি কখনো। আজ বত্রিশ বছর ঘর করে কেমন একটা মায়া বসে গেছে, তা ছাড়া ধান-পান গোরু-গোয়ালের নিপুণ তদারক করতে এমন আর একটি প্রাণী দুর্লভ।

বড়োবিবি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, মাঝখানের দুটি ছায়ামূর্তির মতো অবান্তর। মহিষীর মর্যাদা যে সগৌরবে ভোগ করে থাকে সে হল ছোটোবিবি বা লালবিবি। বছর সতেরো আঠারো বয়েস, ছিমছাম চেহারা, মাজা শ্যামলা রং। আদরে-আবদারে-অভিমানে হাবিব মিয়ার সমস্ত মন-প্রাণকে একেবারে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। এক মুহূর্তের জন্যে লালবিবিকে চোখের আড়াল করতে পারেন না তিনি। তাই কানের গোলাপি আতর আজকাল আরও বেশি করে গন্ধ ছড়ায়, শহর থেকে জর্দা কিমাম আনানোর খরচটা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে, চোখের কোলে কোলে গাঢ় হয়ে পড়ছে সুর্মার রেখা। আগের চাইতে আজকাল আরও বেশি করে হাসেন হাবিব মিয়া, ভুড়িটা আগের চাইতে আরও বেশি দোল খায়, গালের গোলাপি রঙে আরও বেশি করে যেন যৌবনের আমেজ।

তা সুখী হওয়ার আইনসঙ্গত অধিকার আছে বই কী হাবিব মিয়ার। মস্ত জোত, খেতির সময় বারোখানা লাঙল নামে। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার, ফুড কমিটির সভাপতি। যা যা দরকার কোনোটার অভাব নেই।

সব ভালো, তবে সন্ধের দিকে একটু আফিং খান। হজমের গোলমালের জন্যে ধরেছিলেন গোড়াতে, এখন পাকাঁপাকি নেশা হয়ে গেছে। ঘণ্টা দু-তিন চোখ বুজে নিশ্চিন্তে ঝিমুতে মন্দ লাগে না একেবারে। নেশার আমেজের সঙ্গে নবযৌবনা লালবিবির ধ্যানটা একটা মধুর আরামে আচ্ছন্ন করে রাখে।

বলা বাহুল্য, এই সময় বেরসিকের মতো কেউ ডাকাডাকি করলে ভালো লাগবার কথা নয়। হাবিব মিয়ার মেজাজটা যতই ভালো হোক-না কেন, ইচ্ছে করে রসভঙ্গকারী বেয়াদবকে পায়ের চটিটা খুলে ঘা-কতক পটাপট বসিয়ে দিতে। খাঁটি সৈয়দের বংশধর হিসেবে গর্জন করে উঠতে ইচ্ছে হয়, চুপ রহো গোলামকা বাচ্ছা।

আপাতত মগজের ভেতরে সেই সৈয়দের মেজাজটা পাক খাচ্ছিল। হাবিব মিয়া গাল দিয়ে উঠলেন না বটে, কিন্তু চোখ না মেলেই দুরন্ত জবানিতে আমিরি ভাষায় প্রশ্ন করলেন, আবে কৌন চিল্লাতা?

আমি ধলা মন্তাই, জনাব!

এ এমন একটা লোক যাকে হুংকার দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া চলে না, দেখানো চলে না আমিরি মেজাজের উত্তাপ। অত্যন্ত বদরাগি গোঁয়ার লোক, খেপে গেলে সৈয়দ-মৌলবি কোনোটাই মানবে না। সুতরাং অত্যন্ত অনিচ্ছায় এবং গভীর বিরক্তির সঙ্গে চোখ মেলতে হল। লালবিবির রঙিন স্বপ্নটা আপাতত মিলিয়ে গেল বাতাসে।

জোর করে মুখে হাসি টেনে আনলেন হাবিব মিয়া, তারপর কী খবর?

দাওয়ার সামনে চাটাইটার ওপরে বসল মন্তাই, আজ্ঞে বারণ করে দিলাম।

তারপর?

গন্ডগোল পাকাবে। বিকেলে দেখেছি দল বেঁধে জটলা করছিল।

তোমরা কী করবে? ভয় পেয়ে সব পিছিয়ে যাবে নাকি ছাগীর বাচ্ছার মতো?

আল্লার কসম! পিঁজরার পোষ-না-মানা বাঘের মতো একটা চাপা গর্জন করলে ধলা মন্তাই, আমি জাত পাঠান জনাব। ধরে ধরে এক-একটাকে কোতল করে দেব তা হলে।

হাবিব মিয়ার কন্ঠস্বর বিশ্বস্ত শোনাল। সব ওই ব্যাটা ঠাকুরের জন্যে। ও-ই হচ্ছে ওদের মাথা।

মাথার মাথাটা কেটে নিতে আমার এক লহমা সময় লাগবে না জনাব। তারপরে লাশ গুম করে দেব মধুমতীর জলে। কাকে অবধি টের পাবে না।

শাবাশ!

হাবিব মিয়া চুপ করে গেলেন। মুখে আবার এক টুকরো হাসি দেখা দিল, কিন্তু এ হাসি জোর-করা নয়, সহজ প্রসন্নতার। এতদিনে কাজ হাসিল হবে মনে হচ্ছে। ষাঁড়ের শক্ত বাঘে মারবে। নিজে থেকে কিছু করতে গেলে অনর্থক দাঙ্গা-ফৌজদারির ঝামেলা বাঁধত, কিন্তু এ যা হচ্ছে তা যেমন নিরাপদ তেমনি মোক্ষম। জগন্নাথ ঠাকুরকে ভালো করেই জানেন হাবিব মিয়া, সহজে তার ন্যায্য দাবি থেকে বাঁধের দেড় বিঘে ধানিজমি ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না। কিন্তু যে-মন্ত্র দেওয়া হয়েছে তাতে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে জগন্নাথ ঠাকুরের মাথাটা উড়ে যাবে ধড় থেকে এবং তারপরে…

একেই বলে সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। ভাগ্যিস মৌলবিসাহেব এসে সেদিন ওইরকম গরম গরম বুলি শুনিয়ে গেলেন, নইলে কি এমন সুযোগ মিলত কোনোদিন! মনে মনে নিজের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন হাবিব মিয়া, তারিফ করলেন নিজেকে। সকলকে লেলিয়ে দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করার চাইতে বুদ্ধিমানের কাজ সংসারে আর কী আছে।

ধলা মন্তাই বললে, মামলা-মোকদ্দমা যদি বাঁধে তাহলে আপনি তো আমাদের পিছে। আছেন জনাব?

আলবাত। হাবিব মিয়া সোৎসাহে বললেন, সেকথা কি আর বলতে হবে?

আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই, বক্তব্যও নেই। তবু দ্বিধা করতে লাগল ধলা মন্তাই, আঙুল দিয়ে চাটাইটাকে খুটতে লাগল। আরও কী-একটা তার বলবার আছে কিন্তু সাহস সঞ্চয় করতে পারছে না, বলতে পারছে না সহজ ভাষাতে। বাধা আছে, সংকোচ আছে।

জনাব!

কী বলছিলে?

বলছিলাম… মন্তাই আবার চুপ করে গেল।

এতক্ষণে অস্বস্তি বোধ হতে লাগল হাবিব মিয়ার। লক্ষণটা খারাপ। সাধারণত এইসব নীরবতার ভূমিকার পরেই আসে প্রার্থীর দরবার— দু-কাঠা ধান চাই, দু-কুড়ি টাকা ধার চাই। এত বড়ো জোয়ান মানুষটা এমন সংকুচিত হয়ে গেলেই সন্দেহ দেখা দেয়।

কী বলবে, বলেই ফ্যালো-না মিয়া।

জি… চোয়াড়, রুক্ষদর্শন লোকটার মুখ-চোখ লজ্জিত আর করুণ হয়ে উঠল।

জি, ঘরের জরু-বিটির যে ইজ্জত রইল না।

ইজ্জত রইল না! বল কী হে? তোমার ঘরের ইজ্জতে হাত দেবে এমন বুকের পাটা কার আছে?

আজ্ঞে সেকথা নয়। কারও হাত দিবার ব্যাপার নয়, দু-একখানা কাপড়…

কাপড়! হাবিব মিয়া প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, কাপড়!

জি, যদি ব্যবস্থা করতে পারেন…

তুমি খেপে গেলে মন্তাই? হাবিব মিয়ার বিস্ময় আর বাধা মানল না। সরকারি চালান যা এসেছিল সে তো ছ-মাস আগে লোপাট, একফালি কানি অবধি তার পড়ে নেই। আশমানের চাঁদ যদি চাও তাও টেনে নামিয়ে দিতে পারি, কিন্তু কাপড় নয়।

কিছুতেই কি উপায় হয় না, জনাব?

না, কোনো উপায় হয় না। হাবিব মিয়া মুখ বিকৃত করে বললেন, শালার কন্ট্রোল হয়ে সব সর্বনাশ করে দিয়েছে রে। সব গুনাহ আর সব না-পাক, দেশটা জাহান্নামে যাবে, বুঝলি?

কিন্তু দেশ জাহান্নামে যাক বা না যাক সেজন্যে মন্তাইকে খুব উৎকণ্ঠিত দেখা গেল না। একটা মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে উঠে দাঁড়াল, তারপর আদাব জানিয়ে নেমে গেল অন্ধকারে।

হাবিব মিয়া আবার ঘুমোবার জন্যে চোখ বুজলেন। কিন্তু আর আমেজ এল না, নেশাটা বিলকুল চটিয়ে দিয়েছে লোকটা। তা হোক, তা হোক। ষাঁড়ের শত্রু বাঘে মারবে এইটেই লাভ। দোষের মধ্যে কাপড়ের জন্য বড় ঘ্যানঘ্যান করে। কাপড়। হাবিব মিয়া মৃদু হাসলেন, কাপড় আছে বই কী, কিন্তু জোড়া বত্রিশ টাকা, মন্তাইয়ের পক্ষে তা আকাশের চাঁদের চেয়েও দুরধিগম্য।

অন্ধকার ধানখেতের আল বেয়ে বেয়ে এগিয়ে চলেছে মন্তাই। সদর রাস্তা দিয়ে গেলে ঘুরতে হয় খানিকটা, এইটেই সোজা পথ। দু-পাশে ফলন্ত পাকা ধান পায়ের ওপরে পড়ছে লুটিয়ে লুটিয়ে। বাতাসে ধানের গন্ধ। ওই গন্ধে বুকটা ভরে যায়, কেমন শিরশির করে ওঠে রক্ত। আছে, সব আছে। এই ধান, খেতভরা এত মধুগন্ধী ধান একদিন ওদের সব দিত। দিত কাপড়, দিত মুখের ভাত, বউ-ঝিকে গড়িয়ে দিত রুপোর পৈঁছে। সে-ধান আছে, তেমনি মাতাল-করা গন্ধ আছে তার। আশ্চর্য, তবু কিছু নেই! বউ-বেটির পরনে কাপড় জোটে না, পেট ভরে না ভাত খেয়ে, কন্দ আর কচু খুঁড়ে বেড়াতে হয় শুয়োরের মতো। আল্লা…!

অন্ধকারে ধাক্কা লাগল একটা। আল থেকে হড়কে ধানখেতের ভেতরে নেমে পড়ল মন্তাই।

কে? চোখে দেখতে পাও না, রাতকানা নাকি?

অন্যদিক থেকে যে আসছিল সেও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

রাগ কোরো না ভাই, আঁধারে মালুম হয়নি।

আরে, জগন্নাথ ঠাকুর যে!

জগন্নাথ ঠাকুর চমকে উঠল। আঁতকে পিছিয়ে গেল তিন-পা। ঝড়ের সংকেতে থমথম করছে আকাশ, স্তব্ধ অন্ধকারের নির্জনতায় মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। মন্তাইয়ের আক্রমণের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলে জগন্নাথ সরকার।

বুঝতে পেরে এত দুঃখের ভেতরেও হেসে উঠল মন্তাই।

ভয় পাচ্ছ কেন ঠাকুর? এখানে তোমার সঙ্গে মারামারি করব না। যা কিছু লড়াই কাজিয়া তা হবে তোমাদেরই ওই কালীর থানে, তখন দেখা যাবে কার কলিজার জোর কত! তা এত রাত্রে চলেছ কোথায়?

জগন্নাথ ঠাকুরের গলায় স্বস্তির আভাস পাওয়া গেল, হাবিব মিয়ার কাছে।

হাবিব মিয়ার কাছে! আশ্চর্য হয়ে মন্তাই বললে, সেখানে কেন? মিটমাটের জন্যে?

মিটমাট? কীসের মিটমাট? জগন্নাথের গলার আওয়াজ উগ্র হয়ে উঠল, তোমরাও মরদ, আমরাও মরদ, লাঠিতেই মিটমাট হবে। সেজন্যে নয়, যাচ্ছি দু-খানা কাপড়ের জন্যে।

কাপড়?

হ্যাঁ, কাপড়! মানসম্মান আর রইল না মিয়া। বউ দু-দিন ঘর থেকে বেরুচ্ছে না। বলছে কাপড়ের জোগাড় না করলে গলায় দড়ি দেবে।

মন্তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কাপড় পাবে না ভাই, তার চেয়ে বউকে গলায় দড়ি দিতে বলো। আমাকেও তাই করতে হবে।

মন্তাই আর দাঁড়াল না, হেঁটে চলে গেল হনহনিয়ে। ধানখেতের ভেতরে চুপ করে খানিকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল জগন্নাথ, কিছু-একটা বুঝতে চেষ্টা করছে যেন।

দিনের আলোয় দেখা গেল সমান উৎসাহে দু-দলই পাঁয়তারা কষছে।

কালী মাইকি জয়। আল্লা-হো-আকবর! রক্তপাত আসছে আসন্ন হয়ে। কোনো বার এ সময় ডাকাতে-কালীর থানে পুজো হয় না, কিন্তু এবার কী মানত আছে জগন্নাথ ঠাকুরের, তাই আগামী অমাবস্যায় পুজো তার না করলেই নয়। মূর্তি তৈরি হচ্ছে কুমোর পাড়াতে, সঙ্গে সঙ্গে শান পড়ছে টাঙ্গি-সড়কি-ল্যাজাতে। এবারে এসপার-ওসপার যাহোক কিছু হয়ে যাবে একটা।

এরা দাঁড়ায় ডাকাতে-কালীর থানের পাশে ঝুরি-নামা বট গাছের শান্ত স্যাঁতসেঁতে রহস্যঘন ছায়ায়। অন্ধকার কোটরে আগুনের ভাঁটার মতো ধকধক করে প্যাঁচার চোখ। এই নীলাভ বিচিত্র ছায়ায়, এই গা-ছমছম-করা অস্বস্তিভরা পরিবেশের ভেতরে দাঁড়িয়ে ওদের রক্তের আদিমতার সাড়া আসে। মনে পড়ে যায় অমাবস্যায় নরবলি হত এখানে, থকথকে রক্ত চাপ বেঁধে থাকত মাটিতে! এখনই আধ হাত জমি খুঁড়লে বেরিয়ে আসবে নরমুন্ডু, দেখা দেবে কবন্ধ-কঙ্কাল। ডাকাতে-কালী আজ আবার নতুন করে নরবলি চাইছেন।

ওপারে ফকিরের দরগার সামনে দাঁড়ায় ধলা মন্তাইয়ের দলবল। সমানে শানানো চলছে। ল্যাজা-সড়কিতে, বাঁশঝাড় উজাড় করে লাঠি কাটা হচ্ছে, তবে আপাতত শুধু ওদের লক্ষ করে যাওয়া। যত খুশি ঘরে বসে মূর্তি তৈরি করো, যত খুশি দল পাকাতে থাকো। কিন্তু থানে মূর্তি বসিয়ে ঢাকে একটা কাঠি দিলেই হয়, রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। সব তৈরি আছে। ভেতরে ভেতরে।

চোখ শানিত করে দেখে ধলা মন্তাই, অন্যমনস্কভাবে থুতনির নীচে ছোটো দাড়িটা আঁচড়াতে থাকে। ওদিকে কুকুরছানার বেঁড়ে ল্যাজের মতো টিকিটা সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে ওঠে নমঃশূদ্রের ব্রাহ্মণ জগন্নাথ ঠাকুরের মাথায়।

আচমকা চিৎকার ওঠে, কালী মাইকি জয়।

ওদিক থেকে সমান উৎসাহে আসে তার প্রতিধ্বনি, আল্লা-হো-আকবর।

মনে হয় এখনই দাঙ্গা শুরু হল বুঝি। কিন্তু দু-দলই জানে এখনও সময় হয়নি। এ শুধু পরস্পরকে জানিয়ে দেওয়া চালাকি চলবে না, আমরাও সতর্ক আছি, আমরাও আছি প্রস্তুত হয়ে। শুধু দেখে যাচ্ছি, শুধু হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছি, যথাসময়ে দেখা যাবে কে কত বড়ো মরদ।

মুখোমুখি দু-দল–সমান সামরিক, সমান উৎসাহী। দু-চারটে খুনজখমে কোনো পক্ষেরই আপত্তি নেই। জমি নিয়ে, মেয়েমানুষ নিয়ে যা হামেশাই ঘটে থাকে, ধর্মের জন্যে তার চাইতে আরও কিছু বেশি মূল্য দিতেই রাজি আছে ওরা।

অমাবস্যা যত বেশি এগিয়ে আসছে, চিৎকারের মাত্রা বেড়ে উঠছে তত বেশি। দিনের বেলা পাঁয়তারা কষে সন্ধ্যা বেলায় ঘরে ফিরে যায় জগন্নাথ আর মন্তাই। দিনের দুই বীরপুরুষ নেতা সন্ধ্যা বেলায় আশ্চর্যভাবে অসহায়। এ এক প্রতিদ্বন্দ্বী, যার বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড়াবার সামর্থ্য নেই। শুধু পরাজয়কে মেনে নিতে হচ্ছে, স্বীকার করে নিতে হচ্ছে পৌরুষের মর্মান্তিক অপমানকে। মন্তাইয়ের বউ শাসায়, একদিন সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবে। ঘরের ভেতরে বিনিয়ে বিনিয়ে শোনা যায় জগন্নাথের বউয়ের কান্না, এবারে তার গলায় দড়ি না দিয়ে আর উপায় নেই।

গুম হয়ে দুজনেই বসে থাকে। দুজনের অবচেতন মনেই হিংস্র সাপের মতো একটা প্রচ্ছন্ন ইচ্ছা পাক খেয়ে ওঠে–কেমন হয় হাবিব মিয়াকে খুন করলে? কিন্তু শত্রুকে আঘাত করতে এখনও ওরা শেখেনি, যা শিখেছে তা শুধু আত্মঘাত।

সকাল বেলায় দলবল নিয়ে মন্তাই সবে হাবিব মিয়ার বাড়ির দিকে এগিয়েছে, এমন সময় বিশ্রী একটা কান্নার শব্দে পা আটকে গেল সকলের। কান্নাটা আসছে হাবিব মিয়ার বাড়ি থেকেই।

ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল সকলে!

সর্বনাশ ঘটে গেছে। কাল রাত্রে একটু ভালোরকম খানাপিনার ব্যবস্থা হয়েছিল, তৈরি হয়েছিল মাংস-পোলাও। কিন্তু সৈয়দি আমিরি খানার ঝাঁঝ হেলেচাষার মেয়ে লালবিবি বরদাস্ত করতে পারেনি। শেষরাত্রে বার কয়েক ভেদবমি করে তার হয়ে গেছে।

পাগলের মতো বুক চাপড়াচ্ছেন হাবিব মিয়া, তিন বিবি নাকিসুরে কাঁদবার পাল্লা দিচ্ছে। সমস্বরে। এই সুযোগ, এই কান্নার উৎকর্ষের ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে লালবিবির সৌভাগ্যটা জুটবে কার কপালে।

সমস্ত মুসলমান পাড়া বিমূঢ় আর আচ্ছন্ন হয়ে রইল। শোকটা প্রকাশ করতে না পারলে ভবিষ্যতে অসুবিধের সম্ভাবনা আছে। ঘন ঘন চোখ মুছতে লাগল, দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল সবাই। গত মন্বন্তরেও বুঝি দেশের এত বড়ো সর্বনাশ হয়নি।

মহাসমারোহে কবর খোঁড়া হল আল্লাতলিতে। তিন বিবি এসে মুর্দাগোসল করাল, পড়া হল জানাজার নামাজ। চমৎকার রঙিন শাড়ি আর ধবধবে চাদরে কাফন করা হল, হাবিব মিয়ার বড়ো আদরের লালবিবি ঘুমিয়ে রইল মাটির তলায়।

দূরে দাঁড়িয়ে হিন্দুরা বিমর্ষ মুখে এই শোকানুষ্ঠান দেখতে লাগল। মনে হল হাবিব মিয়ার শোকে তারাও অভিভূত হয়ে পড়েছে। তাদের গলায় একটি বারও কালীমায়ের জয়ধ্বনি শুনতে পাওয়া গেল না। হাজার হোক, ফুড কমিটির সেক্রেটারি হাবিব মিয়াকে চটানো চলে না।

কেলেঙ্কারিটা হল সেই রাত্রেই।

কে একজন বেশি রাত্রে বেরিয়েছিল ছাগল খুঁজতে। সে এসে চুপি চুপি খবর দিলে হাবিব মিয়াকে। বাঁধের ওপর থেকে দশমীর চাঁদের মেটে মেটে আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কারা যেন আল্লাতলিতে কবর খুঁড়ছে লালবিবির।

জিন? না, জিন নয়। নিশ্চয় মানুষ। জ্যোৎস্নায় তাদের ছায়া দেখতে পাওয়া গেছে, জিন হলে ছায়া পড়ত না।

এক হাতে দোনলা বন্দুক আর এক হাতে টর্চ নিলেন হাবিব মিয়া। ডেকে নিলেন দলবলকে। আমবাগানের ভেতর দিয়ে সতর্ক পায়ে এগিয়ে চলল দলটা।

সংবাদটা নির্ভুল। দুজন লোক। একজন শাবল মারছে আর একজন মাটি তুলছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার–কাফনের কাপড় চুরি করবে।

ধর, ধর শালাদের।

লোক দুটো পালাতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। কবরখানার উঁচু-নীচু মাটির ঢিবি আর গর্তে পা পড়ে দুজনেই ধরা পড়ে গেল। তখন দশমীর চাঁদের মেটে মেটে আলোটা এক টুকরো মেঘে ঢাকা পড়েছে, কাফন-চোরদের চিনতে পারা গেল না।

কোন শালা হারামির বাচ্চা মুর্দাকে বেপর্দা করতে চায়?

জোরালো টর্চের আলো ফেললেন হাবিব মিয়া।

শুধু লোক দুটো নয়, দলসুদ্ধ সবাই পাথর হয়ে গেছে। টর্চটা খসে গেল হাবিব মিয়ার হাত থেকে। একজন সাচ্চা মুসলমানের বেটা ধলা মন্তাই, আর একজন বামুনঠাকুর জগন্নাথ মুসলমানের মুর্দা ছুঁলে যাকে গঙ্গাস্নান করতে হয়। ধলা মাইয়ের হাতে শাবল, জগন্নাথের কনুই পর্যন্ত গোরের মাটি।

কয়েক মুহূর্ত পরে নিজেকে সামলে নিলেন হাবিব মিয়া। বিকৃত বিকট গলায় হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, মার মার, মেরে শালাদের তক্তা করে দে। দু-শালাই কাফের, ইবলিশের বাচ্চা!

কিন্তু লোকগুলো সব যেন পাথর হয়ে গেছে। মারবার জন্যে কারও হাত উঠল না, এমনকী আঙুলগুলো এতটুকু নড়ল না পর্যন্ত। শুধু সকলের বিস্মিত বিমূঢ় মনে একটা প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—ফকির আর কালীর ভেতরে এত সহজে মিটমাট হয়ে গেল কেমন করে?

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev