| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘সাঁজালের আগুন’ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘রঙিন ছাতার রহস্য’ বর্ণ বিদ্বেষ, হেনস্থা, উত্তর-পূর্বে ক্ষোভ : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জয়ন্ত দে-র ছোটগল্প ‘সংসারযাত্রা’ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে কার্যকরী উদ্যোগ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৭/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পাষাণকন্যার পুনরুত্থান — পৌরাণিক অহল্যা ও বর্তমান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি : রিঙ্কি সামন্ত শিল্পী সোমনাথ হোর : যোগেন চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৭/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলের সন্ধানে দুই বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিস্মৃতপ্রায় শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ফ্রানস বালথাজার সলভিনস ও উত্তর কলকাতার ঘোড়ার সহিস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার জনসংযোগের বিপণনে দুর্গোৎসব : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আকাশ প্রদীপ — পুরাণ, ভক্তি ও বিশ্বাস : যশোবন্ত রায় ৮১ বছরে জাতিসংঘ: সবার প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম? : নিকোলাস বিশ্বাস বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়-এর ছোটগল্প ‘স্যার’ কুমারটুলির সহিসমহল্লা ও দেবী দুর্গার বাহন ঘোটকমুখী সিংহ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিজয়াদশমীর ভাঙ-সিদ্ধি : অসিত দাস কলকাতায় এমন দুর্গাপুজো দেখিনি তো আগে : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

শাহজাদা দারাশুকো (৫২নং কিস্তি) : কালিকারঞ্জন কানুনগো

Reporter
কালিকারঞ্জন কানুনগো / ৩০১ Views জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০২৩

ষোড়শ অধ্যায়

গৃহযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়

সামুগঢ়ের যুদ্ধ (২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ)

ছয়

যাত্রার দিন সমুপস্থিত। ওইদিন অস্ত্রশস্ত্র ও বাহনসমূহ যথারীতি পূজিত হইল, যোদ্ধৃগণ পুরস্কৃত হইয়া সৎকার লাভ করিল। প্রথমেই তোপখানার প্রত্যেকটি কামানের সম্মুখে ছাগ বলি দিয়া ও তোপের মুখে শরাব ঢালিয়া [বংশভাস্কর, খণ্ড ৩, পৃ. ২৬৭৯, সেকালের বিশ্বাস এইরূপ না হইলে কামানের স্তব্ধতাজনিত ক্ষোভ দূর হয় না, কামানের গাড়ি রাস্তায় অচল হইয়া পড়ে।] সুরা মাংস বলিপ্রিয়া চণ্ডিকারূপিণী কালানলবর্ষী নালিকাস্ত্রের বিশ্রামজনিত ক্রোধ শান্ত করা হইল। পতাকাসজ্জিত কামানের গাড়ির বলদ এবং হাতির কপালে ও গায়ে তেলসিঁদুরে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছাপ, গলায় মাল্যঘণ্টা। তোপখানার পশ্চাতে ছোট কামান (সোতর নাল) বাহী কাতারে কাতারে উটের সারি। ইহাদের পশ্চাদভাগে তোপখানারক্ষী বন্দুকধারী যোদ্ধা ও পদাতিক সেনারক্ষিত তাঁবু ও যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম। বাহিনীর মধ্যভাগে চলমান পর্বতসদৃশ বিবিধ সজ্জায় সুসজ্জিত বর্মাবৃত রণহস্তী; ইহাদের সর্বাঙ্গ তৈলচিক্কণ, মাথায় সিঁদুর, গলায় লাল শালুর সাজ ও বীরঘণ্টা, পৃষ্ঠে ঝালরদার আস্তরণের উপর মনোরম হাওদা; কোনও কোনও হাওদার মধ্যে রণদামামা ও বিবিধ বাদ্যভাণ্ড, সমস্তগুলিতে যোদ্ধার আসন ও ঝোলা।

বাহিনীর প্রধান অংশ অশ্বারোহী সেনা লইয়া গঠিত, জীবনে-মরণে প্রিয়তমা অপেক্ষাও প্রিয়তর রাজপুত যোদ্ধার যুদ্ধাশ্ব— যাহার সেবায় তাহার অপমান নাই, ক্লান্তি নাই, সজ্জায় কার্পণ্য নাই। পদস্থ যোদ্ধৃবৃন্দের অশ্ব ও অশ্বারোহী উভয়ই লৌহ কবচাবৃত, ঘোড়ার পায়ে ঘুঙুর, কোমরে কিঙ্কিণী, গায়ে ঝালরদার বিচিত্রবর্ণের সাজ, সোনালী-মীনার জিন-রেকাব, মুখে রেশমী লাগাম। শাপভ্রষ্টা অপ্সরাগণ অশ্বিনী-রূপ পরিগ্রহ করিয়া চঞ্চল পদক্ষেপে যেন স্বর্গের পথে চলিয়াছেন। বিভিন্ন কুলের অশ্বারোহী যোদ্ধৃগণ নিজ নিজ বংশের পতাকার নীচে কুলপতিকে মধ্যে রাখিয়া যাত্রার জন্য ব্যূহবদ্ধ হইল; চারণগণের যশোগান, স্বস্তিবাচন ও জয়ধ্বনিতে চলমান রঙ্গভূমি মুখরিত হইয়া উঠিল; স্বয়ম্বরাভিলাষিণী মোগল রাজলক্ষ্মীর চরণসঞ্চার সহসা অর্ধপথে স্তব্ধ হইয়া গেল।

যাত্রার প্রাথমিক কৃত্যস্বরূপ রাও ছত্রশাল চৌহানের কুলদেবী আশাপূর্ণা এবং নারায়ণের পূজা করিয়া উভয় দেবতার প্রসাদ গ্রহণ করিলেন। বিদায়ের বাজনা বাজিয়া উঠিতেই বয়োবৃদ্ধগণকে প্রণাম করিয়া বুন্দীপতি রেকাবে পা রাখিলেন, তরঙ্গায়িত চতুরঙ্গবাহিনী নগরীর উপকণ্ঠ প্লাবিত করিয়া আগ্রার পথে অগ্রসর হইল। তিন দিন পরে বুন্দীর সীমান্ত হইতে রাও ছত্রশাল যুবরাজ ভাওসিংহকে বিদায় দিলেন; কনিষ্ঠ অপ্রাপ্তবয়স্ক ভারুসিংহ কিছুতেই পিতার সঙ্গ ত্যাগ করিল না। পথিমধ্যে উদয়পুরের চারণ হরিদাস এবং ছত্রশালের প্রিয় চারণ কবি দোলা বুন্দীশিবিরে উপস্থিত হইয়া যোদ্ধৃগণের মনে বিপুল উদ্দীপনা সৃষ্টি করিলেন। এই মহাযাত্রায় শেষ গীত গাহিতে গাহিতে চারণদ্বয় ইন্দ্রলোক-প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। রাও ছত্রশাল মথুরার পথে আগ্রার দিকে অগ্রসর হইলেন। মথুরায় তিনি মুণ্ডন, স্নান, তুলাদান ও শ্রাদ্ধাদি যথাবিধি সম্পন্ন করিলেন এবং অষ্টোত্তর শতসংখ্যক গাভীর শৃঙ্গদ্বয় সুবর্ণে এবং ক্ষুরচতুষ্টয় রৌপ্যে ভূষিত করিয়া দ্বিজ-শ্রেষ্ঠগণকে দক্ষিণা প্রদান করিলেন।

রাও ছত্রশালের আগমনে দারা ধর্মাতের যুদ্ধে যশোবত্তের পরাজয় -গ্লানি ভুলিয়া গেলেন, দিল্লীশ্বর নিরাশার আঁধারের কোলে কুহকিনী আশার মুহূর্তরাগ দেখিয়া আশ্বস্ত হইলেন; আওরঙ্গজেব আশঙ্কামুক্ত হইয়া মালবে সম্রাটের শেষ অধিকার গোয়ালিয়র দুর্গের দিকে দ্রুত অগ্রসর হইলেন।

সাত

শুধু মালব-বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়, শত্রুর হস্তে পতিত বিপুল রণসম্ভার বাদশাহী-ক্ষতির তোপখানা এবং সিন্দুকভরা টাকা ও আশরফির দ্বারা ধর্মাতের যুদ্ধে দারার ক্ষয়- সম্যক পরিমাপ হয় না। এই পরাজয়ের সামরিক অপেক্ষা নৈতিক প্রতিক্রিয়া দিল্লি সাম্রাজ্যে দারা ও আওরঙ্গজেবের স্থান সম্পূর্ণ অদল-বদল করিয়া দিয়াছিল। আওরঙ্গজেব আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতে সংশয়াকুল বিদ্রোহী নহেন। বাহাদুরপুরে সুলেমান শুকোর জয়লাভ ব্যর্থতায় পর্যবসিত; ভারতের ভাগ্যাকাশে আওরঙ্গজেবের তেজোদ্ভাসিত সৌভাগ্যসূর্যের অরুণোদয়ে লোকচক্ষে ব্যসনগ্রস্ত দারা পূর্ণিমা-প্রভাতে অস্তমান ওষধিপতি।

শাহজাদা আওরঙ্গজেব ও মোরাদ বিজিত যুদ্ধক্ষেত্রে উল্লাসমুখর নিশাযাপন করিয়া পরের দিন (১৬ই এপ্রিল ১৬৫৮) মালবের রাজধানী উজ্জয়িনী নগরী বিনা বাধায় অধিকার করিলেন। এইখানে তাঁহার রণক্লান্ত সেনা তিন দিন পূর্ণ বিশ্রাম করিল। বুদ্ধি ও বাহুবলে অর্ধসাম্রাজ্য অধিকার করিয়া নীতিপ্রয়োগে অপরার্ধ জয় করিবার উদ্যোগপর্ব এইখানেই আওরঙ্গজেব সুসম্পন্ন করিলেন। এই বিরাট রাষ্ট্র বিপ্লবের আনুষঙ্গিক অরাজকতা ও অত্যাচার আওরঙ্গজেবের দৃঢ়তায় মালব-সুবার কোথায়ও মাথা তুলিতে পারে নাই, শাসনব্যবস্থা পূর্বের শৈথিল্যমুক্ত হইয়া বরং অধিকতর সুষ্ঠুভাবে চলিতে লাগিল, সর্বশ্রেণীর প্রজাগণ ভয়মুক্ত হইয়া তাঁহাকে অভিনন্দিত করিল। তিনি কাহারও অধিকার হরণ করিয়া নিজের অনুচরবর্গকে পুরস্কৃত করিলেন না, যাহারা দারার পক্ষ হইয়া যুদ্ধ করিয়াছিল তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া দানের দ্বারা বশীভূত করিলেন এবং ধর্মাতের যুদ্ধে দারার প্রতি বিশ্বাসঘাতক সেনা ও সেনাধ্যক্ষগণকে পুরস্কার ও পদোন্নতি দ্বারা বিনা দ্বিধায় নিজ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইলেন। তাঁহার ক্ষমায় দুর্বলতা, অনুগ্রহ বিতরণে পক্ষপাতিত্ব ও দানে অহমিকার ছায়া পড়ে নাই; বস্তুতপক্ষে এই ক্ষেত্রে রাজোচিত গুণের উচ্চতম প্রশংসা সর্বাংশে আওরঙ্গজেবের প্রাপ্য––ইতিহাসের এই অধ্যায়ে আওরঙ্গজেব চরিত্রকে কবি ভারবির বনেচর বর্ণিত সুযোধনের প্রতিচ্ছায়া বলিলে অত্যুক্তি হয় না; দুই জনই কপটাচারী “জিহ্ম”; কিন্তু যে সমস্ত গুণ [আওরঙ্গজেব সম্বন্ধে কিরাতাৰ্জ্জুনীয়ম্ কাব্যের নিম্নলিখিত শ্লোকগুলির ঐতিহাসিক সার্থকতা আছে; দারা কিন্তু “যুধিষ্ঠির” ছিলেন না, কোন “চক্রধারী ও তাঁহাকে চালিত করেন নাই; সুতরাং আওরঙ্গজেবের গুণের কাছেই দারাকে দুনিয়াদারির মামলায় হার মানিতেও হইয়াছিল।

১। “উপায়-কৌশল”

“নিরত্ময়ং সাম ন দানবর্জিতং, ন ভূরি দানং বিরহষ্য সৎক্রিয়াম্।

প্রবর্ততে তস্য বিশেষশালিনী গুণানুরোধেন বিনা ন সৎক্রিয়া।”

২। “মিত্রবল”

“মহৌজসো মানধন্য ধনার্চিতা ধনুর্ভূতঃ সংয়তি লব্ধকীৰ্তয়ঃ।

ন সংহতাস্তস্য নভিন্নবৃত্তয়ঃ প্রিয়াণি বাঞ্চণ্ড্যসুভিঃ সমীহিতুম্।।”

৩। “স্বপক্ষ-পরপক্ষ বৃত্তান্ত জ্ঞান”

“মহীভূতাং যচ্চরিতৈশ্চরৈঃ ক্রিয়া স বেদ নিঃশেষমশেষিত ক্রিয়ঃ।

মহোদয়ৈস্তস্য হিতানুবুদ্ধিতিঃ প্রতীয়তে ধাতুরিবেহিতং কলৈঃ।।”] না থাকিলে দুর্যোধন কুরুক্ষেত্রে ন্যায় এবং ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য একাদশ অক্ষৌহিণী সেনা একত্র করিতে পারিতেন না, সেই সমস্ত গুণ ব্যতীত দেড় মাসের মধ্যে ধর্মাতের যুদ্ধে নিজ বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা পূরণ করিয়া আওরঙ্গজেবও তাঁহার সৈন্যসংখ্যা দ্বিগুণিত করিতে পারিতেন না।

চর নিয়োগ, মন্ত্রগুপ্তি, প্রয়োজনানুসারে দান সৎকার ও আচরণে অমায়িকতার মুখোশধারণে আওরঙ্গজেব নীতিশাস্ত্রকারগণের আদর্শ রাজপুত ছিলেন; ভ্রাতা মোরাদের নিকটও তিনি একটা হেঁয়ালি, তাঁর কার্যের আদি-অন্ত কাহারও অনুমান করিবার সাধ্য ছিল না। গোপনে দুই জনের কাছে এক কথা তিনি কদাচিৎ বলিতেন, অধীন হিন্দুসামন্তগণের নিকট এই সময়ে দারা অপেক্ষাও তিনি অধিক উদার ন্যায়নিষ্ঠ এবং অনুগ্রহ বিতরণে মুক্ত- হস্ত, অথচ মুসলমানের নিকট আদর্শ মুসলমান, কেবল ইসলামের স্বার্থে কিছুদিন কাফেরের খাতির তোয়াজ, আখেরে তাহাদের কি গতি হইবে সে বিষয়ে মোল্লাদল নিশ্চিন্ত; সুতরাং তাঁহার সজাগ দৃষ্টির নীচে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে মনোমালিন্য ও রেষারেষির অবকাশ ছিল না। আওরঙ্গজেবের নীতিপ্রয়োগ এবং হিন্দুসমাজে রাজনৈতিক চেতনার অভাবে সঙ্কটের সময়ে রাজপুতশক্তি দারার পক্ষে সংহত ও কেন্দ্রীভূত হইতে পারে নাই। রাজপুত চরিত্রের দুর্বলতাসমূহ এবং অর্থনৈতিক অসহায় অবস্থার সুযোগ আওরঙ্গজেব পূর্ণভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন।

সুবা মালব বৃহত্তর রাজপুতানার অংশবিশেষ; উহার অভিজাত সম্প্রদায় রাজপুত, অধিকাংশ খিচী চৌহান; রাজপুতানার শিশোদীয়, রাঠোর ও হাড়া বংশের কনিষ্ঠ রাজপুতগণও মোগল সরকারে চাকরি করিয়া এইখানে নূতন জায়গীর লাভ করিয়াছিল। যুদ্ধই রাজপুতের উপজীবিকা; হয় সৈনিকবৃত্তি, না-হয় ডাকাতি ছাড়া সেকালে রাজপুতের ধাতে কিছুই সহ্য হইত না, দোয়াত-কলম লাঙল দাঁড়িপাল্লা কায়স্থ বৈশ্য শূদ্রাদির হীনবৃত্তি অবলম্বন তাহার পক্ষে নিন্দনীয় সামাজিক মৃত্যু। এই অর্থনৈতিক অবস্থার সংঘাতে রাজপুতের কুলাভিমান, দেশাত্মবোধ ও স্বধর্মপ্রীতি সপ্তদশ শতাব্দীতে নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিল। এই কারণে “পেটকে ওয়াস্তে” তাহারা সাম্রাজ্যবাদের ভেদনীতির উত্তম শিকার হইয়া শাহাজাহানের রাজত্বে হিন্দুবিদ্রোহ দমনে, হিন্দুমন্দিরবিগ্রহ ধ্বংসে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অংশগ্রহণ করিতে ইতস্তত করে নাই। কুলক্রমাগত বৈর ও স্পর্ধা রাজপুতানার ঐক্যের পথে ছিল এক দুর্লঙ্ঘ্য বাধা; রাঠোর চৌহান শিশোদিয়া গৌর কচ্ছবাহের মধ্যে আপোস নাই, কেবল বিবাহ ব্যাপারে কোলাকুলি, অন্য সময় সুযোগ পাইলেই গলা কাটাকাটি। বিবেকবুদ্ধিবর্জিত, জীবিকার জন্য পরাশ্রয়ী, রাজনৈতিক মহানিদ্রায় অভিভূত ভূতিভুক ক্ষাত্রশক্তি দেশ ও জাতির পক্ষে বিপজ্জনক, পরাধীনতার লৌহনিগড়; শাস্ত্রজীবীর “স্বামিধর্ম” বা নিমকহালালি এইরূপ অধর্মের সেবায় পর্যবসিত হয়। মালবের রাজপুতগণের মধ্যে কেহ কেহ স্বার্থ বিপন্ন হইবার ভয়ে এবং অধিকাংশই মোটা জায়গীরের লোভে আওরঙ্গজেবের সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিয়াছিল, মোরাদের সৈন্যদলেও রাজপুত ছিল। এইভাবে বিভিন্ন কুলের রাজপুতগণ যুধ্যমান পক্ষদ্বয়ে বিভক্ত হইয়া পিতার বিরুদ্ধে পুত্র—(যথা রাও ছত্রশাল ও তৎপুত্র ভগবন্ত সিংহ), জ্ঞাতির বিরুদ্ধে জ্ঞাতি যুদ্ধার্থ সজ্জিত হইল। বিজয়ী আওরঙ্গজেব বেতোয়া তীর পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া এক দল সৈন্যসহ বাহাদুর খাঁকে বুন্দেলখণ্ডের দিকে প্রেরণ করিয়াছিলেন; ইহা সামরিক অভিযান নহে, কূটনৈতিক পরিক্রমা। কে সর্বাগ্রে আওরঙ্গজেবের বশ্যতা স্বীকার করিয়া প্রতিবেশীর উপর টেক্কা দিবে—ইহা লইয়া বুন্দেলখণ্ডের সামন্ত রাজাদের মধ্যে হুড়াহুড়ি পড়িয়া গেল; বিদ্রোহী চম্পরায় বুন্দেলাকে হাত করিবার জন্য বাহাদুর খাঁ বন্ধুভাবে তাঁহার নিকট উপস্থিত হইলেন। দারা চম্পায়ের দাবি মিটাইতে পারেন নাই, সুতরাং তিনি এককালে তাঁহাকে সম্রাটের কোপ হইতে রক্ষা করিলেও এখন শত্রু এই বিবেচনায় চম্পরায় কয়েক হাজার সেনা লইয়া আওরঙ্গজেবের দরবারে কুর্নিশ করিতে চলিলেন। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev