
৩১২. এই সমস্ত ক্ষেত্রে — তা জেলার মোট জমা (gross jumma) বা সদর জমার সারসংক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে বন্দোবস্তটি সম্পন্ন করা হোক না কেন — আমাদের অবশ্যই এর বিস্তারিত বিবরণ নথিবদ্ধ করার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এগুলোর উৎস বা তথ্য খুঁজে পেতে কোনো অসুবিধার সৃষ্টি না হয়। এ বিষয়ে উপযুক্ত তথ্যের অভাবের ফলে ইতিমধ্যেই বড় ধরনের অসুবিধা দেখা দিয়েছে। উপযুক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব প্রদানের সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে; এর ফলে বর্তমানে আমাদের যে ঘনঘন বিভিন্ন নথিপত্র বা তথ্যের শরণাপন্ন হতে হয়, তার প্রয়োজনীয়তা যেমন কমবে, তেমনি বন্দোবস্তের শর্তাবলি নিয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাও দূর হবে। পাশাপাশি, জমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমাদের গৃহীত পদক্ষেপের ভিত্তি ও কারণসমূহ ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
৩১৩. হস্তান্তরকরা বা বিশেষ সুবিধাপাওয়া ভূমি (Alienated Lands) সংক্রান্ত বিষয়ে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়নি। এগুলোর বিষয়ে তদন্তের ফলে রাজস্বের যে সংযোজনই ঘটুক না কেন — তা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে (যেমনটি পরবর্তীতে নির্ধারিত হবে) — সরকারের রাজস্বের সাথে যুক্ত হবে। এগুলোর ওপর আমাদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে; তবে জমিদারদের সহযোগিতায় এগুলো শনাক্ত করার লক্ষ্যে, কিংবা কুসংস্কার বা স্বার্থপরতার বশবর্তী হয়ে তাদের পক্ষ থেকে কোনো বিরোধিতা বা তথ্য গোপন রোধ করার উদ্দেশ্যে যদি এর কোনো অংশ তাদের জন্য রেখে দেওয়া হয়, তবে তা কেবল একটা বিশেষ অনুগ্রহ বা ছাড় হিসেবেই গণ্য করতে হবে। অবশ্য এই ভূমি পুনরুদ্ধারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট চুক্তিনামায় একটা নির্দিষ্ট শর্ত বা ধারার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৩১৪. তদন্তের জন্য পরবর্তী যে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছিল, তা হলো — কার সাথে এই বন্দোবস্ত বা রাজস্ব চুক্তি সম্পন্ন করা হবে।
৩১৫. এই বিষয়টি উত্থাপনের সময় উল্লেখ করা হয়েছিল যে, কোর্ট অফ ডিরেক্টরসের নির্দেশ অনুযায়ী — যেখানে সম্ভব, সেখানেই জমিদারদের সাথে বন্দোবস্ত সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু অনেক জমিদারই — লিঙ্গ, নাবালকতা বা অন্য কোনো কারণে অক্ষমতার দরুন — রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত হস্তক্ষেপ বা তদারকি করার অযোগ্য। তাই সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল — রাজস্বের নিরাপত্তা, রায়তদের সুরক্ষা এবং এমনকি খোদ জমিদারদের সুরক্ষার জন্যও; কারণ অক্ষমতার কারণে তারা প্রায়শই তাদের নিজস্ব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কারসাজি ও প্রতারণার শিকার হন।
৩১৬. এই অসুবিধা দূর করার লক্ষ্যে একটা সাধারণ নিয়ম প্রস্তাব করা হয়েছিল: যে জমিদারের অক্ষমতার কারণে তিনি নিজের কাজকর্ম পরিচালনায় অযোগ্য, তাঁর প্রধান কর্মকর্তাকে সরকারের সাথে সম্পাদিত চুক্তির অন্যতম পক্ষ হতে হবে; এবং তাঁর ব্যক্তি ও সম্পত্তি — উভয়ের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার শর্ত আরোপের মাধ্যমে তাঁকে নিজ কর্তব্য বিশ্বস্ততার সাথে পালনে বাধ্য করতে হবে।
৩১৭. তদনুসারে কালেক্টরদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তাঁরা জমিদারি কর্মচারীদের মধ্য থেকে এই দায়িত্ব পালনের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেন। যাঁরা আগে থেকেই কর্মরত ছিলেন এবং অর্পিত দায়িত্ব বিশ্বস্ততা ও দক্ষতার সাথে পালন করেছেন, স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। যেসব ক্ষেত্রে জমিদার নিজে কাউকে নির্বাচন করতে সক্ষম ছিলেন, সেসব ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হতো।
৩১৮. মিস্টার ফ্রান্সিস যখন জমিদারদের সাথে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রস্তাব করেছিলেন, তখন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে অসুবিধাগুলো ছিল সে সম্পর্কে তিনি অসচেতন ছিলেন না; বর্তমানে সেই অসুবিধাগুলো আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। জমিদারদের অযোগ্যতার ফলে সৃষ্ট সমস্যা সংশোধনের জন্য তাঁর প্রস্তাব সেই একই পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, যা পূর্বে উল্লিখিত নির্দেশাবলি প্রণয়নের মূল ভিত্তি ছিল।
৩১৯. কোর্ট অফ ডিরেক্টরস (পরিচালক পর্ষদ) যেখানেই সম্ভব জমিদারদের সাথে বন্দোবস্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এই নিয়মের ব্যতিক্রমগুলোকে নির্দিষ্ট করেছেন — যেমন বয়সজনিত অক্ষমতা, লিঙ্গ (নারী হওয়া), মানসিক ভারসাম্যহীনতা, অবাধ্যতা বা কুখ্যাত অসচ্চরিত্রতা। তাঁরা কোনো অস্থায়ী ইজারাদার বা সরকারি কর্মচারীর পরিবর্তে অভিভাবক বা দেওয়ান হিসেবে কোনো নিকটাত্মীয় ও সম্মানভাজন ব্যক্তিকে নিয়োগের সুপারিশ করেছেন।
৩২০. যদি জমিদারদের প্রকৃত সক্ষমতাকে তাঁদের নিয়োগের মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, তবে স্পষ্টতই তাঁদের অধিকাংশকেই বাদ দিতে হবে। অবশ্য বর্তমানে সেই প্রশ্নটি মুখ্য নয়; জমিদারদের অনুকূলে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পরিকল্পনার তুলনামূলক ও সতর্ক পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর, আমাদের এখন এই পদ্ধতির অসুবিধাগুলোর মুখোমুখি হতে হবে এবং সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে।
৩২১. কোর্ট অফ ডিরেক্টরস যেসব সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর বিষয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। নারী জমিদারদের বিষয়ে আমি কিছু মন্তব্য করব, যা তাঁদের দায়িত্ব পালনের বিরুদ্ধে যুক্তিগুলোকে আরও জোরালো করবে এবং সম্ভবত এমন একটা নিয়ম প্রবর্তনের যৌক্তিকতা তুলে ধরবে যার মাধ্যমে তাঁদের রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনে অক্ষম ঘোষণা করা যেতে পারে।
৩২২. এটা সর্বজনবিদিত যে, বাংলার নারীরা তাঁদের ধর্মীয় আইন ও প্রথা অনুযায়ী জনজীবন বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন এবং সরকারি কাজকর্ম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো শিক্ষাও তাঁরা পান না। তাঁদের সংশ্লিষ্ট যেকোনো মামলা বা আইনি প্রক্রিয়ায়, তাঁদের নামে দাখিল করা বক্তব্য বা নথিপত্রের সাথে তাঁরা আদৌ সম্পৃক্ত কি না, তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব; তাঁদের সরকারি আদালতে হাজির করা যায় না এবং বিচার বিভাগের কর্মকর্তারাও তাঁদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন না। স্বাভাবিকভাবেই, তাঁরা নিজেদের স্বার্থের বিষয়ে উপযুক্ত বিচার-বিবেচনা করতে বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জটিল বিষয়গুলো সম্পর্কে কোনো মতামত গঠনে সক্ষম হতে পারেন না। তাঁরা কেবল তাঁদের কর্মচারীদের হাতের পুতুল বা নিষ্ক্রিয় মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন; এবং প্রায়শই হয়তো তারা সেইসব লেনদেন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, যাতে তাদের মূল পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যেহেতু এসব বিষয় যাচাই বা শনাক্ত করার কোনো উপায় তাদের থাকে না, তাই তারা সব ধরনের ভুল উপস্থাপনা ও প্রতারণার শিকার হতে পারে; তাদের নিযুক্ত প্রতিনিধিদের চরিত্র, সক্ষমতা ও আচরণ সম্পর্কে তারা কখনোই জানতে পারে না, কারণ এ বিষয়ে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ করার সুযোগই তাদের থাকে না। সরকারও খুব কমই নিশ্চিত হতে পারে যে, তাদের নির্দেশাবলী আদৌ সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছেছে কি না; ফলে, আনুগত্যের অভাব না থাকা সত্ত্বেও তাদের অবাধ্যতার দায়ে শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়; এবং তাদের কর্মকর্তারা নিজেদের অসদাচরণ আড়াল করতে তাদের নাম ব্যবহার করে থাকে।
৩২৩. সাধারণত দেখা যায় যে, নারী জমিদাররা তাদের পারিবারিক ব্রাহ্মণের নির্দেশাধীনে থাকেন, যিনি তাদের বিবেক ও চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণ করেন; সেই ব্রাহ্মণের নিজস্ব স্বার্থ থাকে এবং তিনি প্রকাশ্যে সামনে না এসেই সরকারি কাজকর্ম পরিচালনার ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। ব্যবস্থাপক বা এজেন্টকে এমন এক গোপন ক্ষমতার বশবর্তী হয়ে চলতে হয় যাকে তিনি সন্তুষ্ট রাখতে বাধ্য থাকেন; আর রাষ্ট্র ও জমিদার — উভয়ের স্বার্থই সেই ক্ষমতার কাছে নতিস্বীকার করে।
৩২৪. এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। সরকার এবং তার প্রজাদের — যাদের সম্পত্তি ও নিরাপত্তা এই দায়িত্বের বিশ্বস্ত পালনের ওপর নির্ভরশীল — জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের ভার এমন একজন এজেন্টের ওপর ন্যস্ত করা অত্যন্ত অযৌক্তিক, যিনি সেই কাজের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এবং তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতাও রাখেন না; সংক্ষেপে বলতে গেলে, রাষ্ট্র ও প্রজাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ এমন একজন ব্যক্তির দ্বারা সম্পন্ন করার আশা করা, যিনি নিজে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে অক্ষম।
৩২৫. রানীর নামমাত্র কর্তৃত্বে পরিচালিত রাজশাহীর ব্যবস্থাপনা, সেই জমিদারিতে রাজস্বের ক্রমাবনতি এবং দীর্ঘকাল ধরে সেখানে বিরাজমান বিশৃঙ্খলা — এসবই আমার উল্লিখিত অসুবিধাগুলোর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ও প্রমাণ; এ ছাড়াও এমন আরও অনেক দৃষ্টান্ত তুলে ধরা সম্ভব।
৩২৬. মিস্টার হ্যালহেড অনূদিত আইনের সংকলনের ২০তম অধ্যায়ে বর্ণিত হিন্দু আইন অনুযায়ী এটা স্পষ্ট যে, নারীদের এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য অনুপযুক্ত মনে করা হয়, কারণ তাদের নিজেদের বিষয়াদি পরিচালনার ক্ষেত্রে সক্ষম বলে গণ্য করা হয় না। বিবাহিত, অবিবাহিত বা বিধবা — যেকোনো অবস্থাতেই এবং বয়সে তরুণী বা বৃদ্ধা — যেভাবেই হোন না কেন, তাদের পিতা, স্বামী বা কোনো আত্মীয়ের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়; আর কোনো আত্মীয় না থাকলে সেই দায়িত্ব ম্যাজিস্ট্রেট বা শাসনকর্তার ওপর বর্তায়। এই নিয়মকানুনগুলো জনগণের বিশেষ প্রথা বা রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে; এবং সাধারণ বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী, ভূমি-বন্দোবস্ত ও রাজস্ব আদায়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও এই নিয়মগুলোর প্রয়োগ যুক্তিযুক্ত। [২০০]
৩২৭. যদি এই নীতিটি ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেওয়া হয় যে, নারী জমিদাররা রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনা বা তদারকিতে অংশগ্রহণের অযোগ্য এবং তাঁদের এ ধরনের কোনো কাজে হস্তক্ষেপের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই সিদ্ধান্ত আসে যে, তাঁদের ওপর কোনো দায়িত্ব অর্পণ করা উচিত নয় এবং রাজস্ব বন্দোবস্তের বিষয়টি — এমনকি কেবল আনুষ্ঠানিকতার খাতিরেও — তাঁদের সাথে করা উচিত নয়।
৩২৮. আমি অবগত আছি যে, এই সিদ্ধান্তের ফলে মূল জামানত বা নিরাপত্তার উৎস — অর্থাৎ জমিটি — হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু জমিদাররা ব্যবস্থাপনার কাজে অক্ষম — এমন ঘোষণার পর কোন যুক্তিতে সেই জমিটিকে জামানত হিসেবে ধরে রাখা যেতে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়।
৩২৯. জমিটি কোনো ইজারাদারের (ফার্মার) হাতে ন্যস্ত করা হোক কিংবা জমিদারের নিজস্ব কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হোক — এমন ঘোষণার প্রেক্ষাপটে তাঁদের কারো কার্যকলাপের দায়ভার যেন নারী জমিদারের সম্পত্তির ওপর না পড়ে; কারণ ব্যবস্থাপকের ওপর যতই কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হোক এবং সরকার কর্তৃক ব্যবস্থাপক নির্বাচনের প্রক্রিয়া জমিদারের নির্বাচনের চেয়ে যতই বিচক্ষণতাপূর্ণ হোক না কেন, ব্যবস্থাপকের ব্যর্থতার জন্য জমিদারের সম্পত্তিকে দায়ী করা অযৌক্তিক।
টিকা
শোরের মিনিটসের ৩২১ থেকে ৩২৯ স্তবকে আবার মহিলা জমিদারদের জমিদারি কেন কেড়ে নেওয়া হবে, সেই বিষয়ে যুক্তি সাজিয়েছেন। ৩২৫-এ যে রাণী ভবানীর রাজশাহী জমিদারির অব্যবস্থা নিয়ে মহিলা জমিদারি কেড়ে নেওয়ার যুক্তি সাজিয়েছেন, সেটা শোরের স্রেফ মিথ্যাচার। কারন তিনি হেস্টিংসের আমলে কোম্পানির কর্মচারী ছিলেন — তিনি জানেন কি ঘটেছিল — ঘটেছিল হেস্টিংসের অনুগামী কোলাবটরদের জমিদারি দখল নেওয়ার তাগিদে — বাংলায় কোনও মহিলা জমিদারের অব্যবস্থাপনায় জমিদারি ধ্বংস হয়েছে, এমন নিদর্শন নেই। পাঠককে বলব রজতকান্ত রায়ের পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ বইএর পঞ্চম পর্বে দেখুন কিভাবে মহীয়সী রাণী ভবানীর ওপর পরিকল্পিত ধ্বংসক্রিয়া নামিয়ে এনেছে কোম্পানির আমলারা। মাথায় রাখবেন ‘পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ’ বই ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার অনুগামী মহাজন-জমিদারদের রাণী ভবানীর জমিদারি দখলের ষড়যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। পঞ্চম পর্বে দেখিয়েছেন কীভাবে ওয়ারেন হেস্টিংস-এর আমলে কোম্পানির কর্মকর্তা ও তাদের দালালচক্র (রাজা রাজবল্লভ, দেবী সিংহ প্রমুখ) রাণী ভবানীর বিরুদ্ধে ‘অব্যবস্থাপনা’ আর ‘স্ত্রীলোক হওয়ায় জমিদারি চালাতে অক্ষম’ — এই দুটি অজুহাত তুলে তাঁর রাজশাহী জমিদারি দখলের চক্রান্ত করেছিল।
অনুবাদকের মূল যুক্তির সাথে বইয়ের মিল
১. ‘শোরের মিনিটস’-এর ৩২১-৩২৯ স্তবক — আমি যে অংশের কথা বলছি, সেখানে কোম্পানির প্রতিনিধিরা রাণী ভবানীর জমিদারি বাজেয়াপ্ত করার ‘আইনি’ যুক্তি তৈরি করে রজতকান্ত রায় দেখিয়েছেন, এই যুক্তিগুলো ছিল সম্পূর্ণ বানোয়াট ও সুপরিকল্পিত।
২. মহিলা জমিদারের জমিদারির অব্যবস্থাপনায় জমিদারি ধ্বংসের নজির নেই — বাংলার ইতিহাসে কোনো মহিলা জমিদারের অব্যবস্থাপনার কারণে জমিদারি ধ্বংস হয়েছিল — এর কোনো প্রমাণ নেই। বরং রজতকান্ত রায় দেখিয়েছেন, রাণী ভবানী ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও জনপ্রিয় শাসয়িতা, যিনি বারবার মারাঠা আক্রমণ ও নবাবি অত্যাচার সত্ত্বেও নিজের রাজ্য অটুট রেখেছিলেন।
৩. হেস্টিংস-এর অনুগামী কলাবতদের তাগিদ — বইয়ের শেষ পর্বে স্পষ্ট করা হয়েছে, কোম্পানি বাংলার জমিদারিগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় কোলাবট (সহযোগী) জমিদারদের ব্যবহার করত। রাণী ভবানীর বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার ও আইনি ফাঁদ তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে ছিল হেস্টিংস-এর অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দেবী সিংহ-রাজা রাজবল্লভের ব্যক্তিগত লোভ।
রজতকান্ত রায় প্রমাণ করেছেন যে — রাণী ভবানীর জমিদারি দখলের ঘটনা পলাশীর পরবর্তী সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের অংশ; ‘স্ত্রীজাতি শাসনে অক্ষম’ — এই ব্রিটিশ তৈরি প্রচার ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন; রাণী ভবানীকে অপদস্থ করার পরও তাঁর প্রজারা তাঁকে মনে রেখেছিলেন; তাঁর দান-খয়রাত ও উন্নয়নকাজের স্মৃতি আজও বাঙালি মানসে জীবন্ত।
আমি যে দলিল উল্লেখ করেছি — শোরের মিনিটসের ৩২১-৩২৯ স্তবক — সেটা আদতে ইংরেজ আমলাদের ‘আইনের আড়ালে জমিদারি লুঠের’ জ্বলজ্যান্ত নিদর্শন। রজতকান্ত রায় ইতিহাসকে সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন, যাতে আমরা বুঝতে পারি — পলাশী শুধু একটি যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল বাংলার অর্থনীতি, সমাজ ও নারীশাসনের প্রতি ব্রিটিশ অবজ্ঞার সূচনা।
রজতকান্ত রায়, পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
https://www.ebanglalibrary.com/books/%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%B7%E0%A6%A1%E0%A6%BC%E0%A6%AF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0-%E0%A6%93-%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B2/
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ