উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোনোর আধঘন্টা আগে স্কুলের গেটের সামনে একটা লোক লাল শাড়ির প্যাকেটটা হতে ধরে বলল, “দিদিমণি, আজ নাম না উঠলে সন্ধের পর মেয়েকে বিয়ে দিয়ে বৌ করে অন্যের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হবে। ভাত জোগাতে পারি না। বই জোগাব কী করে?”
অপর্ণা বসু প্রথমে লোকটার দিকে তাকালেন না। তিনি তাকালেন মেয়েটার দিকে। মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নাম নাহার খাতুন। উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। রোল নম্বরের শেষ অঙ্কটা সাত। কিন্তু অপর্ণাদির মনে হল, মেয়েটার নিজের জীবনেই যেন শেষ অঙ্কটা কেউ আগেভাগে বসিয়ে দিতে এসেছে।
“আপনি ভিতরে আসুন,” অপর্ণাদি শান্ত গলায় বললেন।
লোকটা বলল, “ভিতরে এসে কী হবে? ফল তো মোবাইলে বেরোবে। নাম থাকলে পড়বে। না থাকলে ঘর করবে।”
নাহার মুখ তুলল না। শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার পায়ের নখে কাদা লেগে আছে। সকালে বাসন মেজে এসেছে। তার পর বাড়ির ছাগলকে ঘাস দিয়েছে। তার পর মাকে হাঁড়িতে ভাত চাপিয়ে দিয়ে স্কুলে এসেছে।
এই স্কুলে এমন মেয়ে একা নাহার নয়। কারও বাবা টোটো চালান। কারও বাবা গ্যারাজে কাজ করেন। কারও মা পাঁচ বাড়িতে রান্না করেন। কেউ ভোরে বাজার থেকে সবজি তুলে এনে দোকানে বসে, তার পর স্কুলে আসে। অনেকের খাতায় অঙ্কের চেয়ে চাল-ডালের হিসেবটা বেশি স্পষ্ট।
তবু এ বছর সাধুমতী স্কুলে অন্য রকম লড়াই হয়েছে।
সেমিস্টার পদ্ধতি এসেছে। সিলেবাস বদলেছে। প্রথম প্রথম মেয়েরা ভয় পেয়েছিল। শিক্ষিকারাও ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভয়কে কেউ বাইরে দেখাননি।
ইতিহাসের শিক্ষিকা রাকা সেন প্রতিদিন শেষ পিরিয়ডের পরে বলতেন, “যারা বাড়ি গিয়ে পড়তে পারিস না, তারা এখানেই বস। বাড়ির কাজ বাড়িতে করবি। পড়ার কাজ স্কুলে করবি।”
মেয়েরা হাসত। কেউ বলত, “দিদি, বাড়িতে আবার পড়ার টেবিল আছে নাকি?”
রাকা বলতেন, “টেবিল না থাকলে বেঞ্চ আছে। বেঞ্চ না থাকলে মেঝে আছে। মেঝে না থাকলে আমার কাঁধ আছে। কিন্তু পড়া বন্ধ হবে না।”
নাহার প্রথম প্রথম বসত না। স্কুল ছুটি হলেই পালিয়ে যেত। একদিন রাকা তার ব্যাগ টেনে ধরেছিলেন।
“কোথায় যাচ্ছিস?”
“বাড়ি।”
“বাড়ি গিয়ে কী করবি?”
“মুরগির খাবার দিতে হবে।”
“তার পর?”
“মাকে রান্নায় সাহায্য করতে হবে।”
“তার পর?”
“ঘুম পাবে।”
রাকা খাতা খুলে বলেছিলেন, “তা হলে এখনই পড়। ঘুমকে বল, একটু অপেক্ষা করুক।”
সেদিন নাহার প্রথমবার স্কুলের লাইব্রেরির পুরনো টেবিলে বসে ছিল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। এরই মধ্যে বৃষ্টির শব্দের মাঝে রাকা দিদিমণি তাকে ইতিহাসের প্রশ্ন মুখস্থ করাচ্ছিলেন।
“বাংলার নবজাগরণ কী?”
নাহার বলেছিল, “দিদি, আগে বলুন, নবজাগরণ মানে কি ঘুম ভাঙা?”
রাকা একটু থেমে গিয়েছিলেন।
“হ্যাঁ। খুব সহজ করে বললে তাই।”
“তা হলে আমাদের বাড়িতে নবজাগরণ হয় না দিদি। মা ভোর চারটেয় ওঠে। তার আর ঘুম ভাঙবে কী!”
রাকা সেদিন কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তার পর বলেছিলেন, “তোর ঘুম ভাঙবে, নাহার। তুই পড়।”
ফল বেরোনোর দিন সেই কথাগুলো অপর্ণাদির মনে পড়ছিল।
কম্পিউটার রুমে কেয়া দিদিমণি ল্যাপটপ খুলে বসেছেন। ইন্টারনেট বারবার কেটে যাচ্ছে। বারান্দায় মেয়েদের ভিড়। কেউ ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ প্রার্থনা করছে। কেউ ফলের আগে ফলাফল নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট কী দেবে ভাবছে। কিন্তু নাহার চুপ।
তার বাবা আজিজুল মিস্ত্রি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। হাতে লাল শাড়ির প্যাকেট। মুখে কড়া কথা। চোখে ঘুম নেই।
অপর্ণাদি এগিয়ে গিয়ে বললেন, “আপনি এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?”
আজিজুল বলল, “তাড়াহুড়ো আমি করছি না, দিদিমণি। আমার পেট এটা করাচ্ছে। মেয়ের বয়স হয়েছে। পড়াশুনো যদি না হয়, বিয়ে হোক একটা খুব ভালো পাত্র পেয়েছি বিয়ে করেই বোম্বে চলে যাবে।”
“আর পড়াশুনো যদি হয়?”
লোকটা চুপ করে রইল।
ভিতর থেকে হঠাৎ চিৎকার এল, “দিদি! লিস্ট খুলেছে!”
সবাই দৌড়ে গেল।
কেয়া দিদিমণি নাম পড়তে শুরু করলেন।
“পায়েল বাগ—পাস।”
“মৌসুমী দে—পাস।”
“রুবিনা খাতুন—পাস।”
“তিথি পাল—পাস।”
“ঋতুপর্ণা হালদার—পাস।”
বারান্দায় হাততালি উঠতে লাগল। কেউ কাঁদছে। কেউ ফোন করছে। কেউ বলছে, “মা, আমি পেরেছি!”
এগারো জন বিজ্ঞান বিভাগের মেয়েও পাস করেছে। অপর্ণাদি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর বুকের ভেতর আটকে থাকা ভারী পাথরটা যেন একটু নড়ে উঠলো।
কিন্তু কেয়া দিদিমণির মুখ হঠাৎ শুকিয়ে গেল।
রাকা জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল?”
কেয়া বললেন, “নাহারের নাম দেখাচ্ছে না।”
শব্দটা যেন বারান্দার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে গেটের বাইরে গিয়ে পড়ল।
আজিজুল শুনে ফেলেছে।
সে মেয়ের হাত ধরল। “চল।”
নাহার একবারও প্রতিবাদ করল না।
রাকা ছুটে এলেন। “কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
“যেখানে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয়।”
“এখনও ফল পুরো দেখা হয়নি।”
“নাম নেই মানে নাম নেই। আপনারা অনেক করেছেন। এবার আমায় করতে দিন।”
রাকা সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। “না। আপনি এক পা-ও নড়বেন না এই স্কুলের বাইরেও যাবেন না। এখানেই অপেক্ষা করুন”
আজিজুল রেগে উঠল। “আপনি আমার মেয়ের কে হন?”
রাকা বললেন, “আজকের দিনে আমি ওর রোল নম্বরের পাহারাদার।”
লোকটা বুঝল না। কিন্তু থেমে গেল।
কেয়া দিদিমণি ততক্ষণে আবার লিস্ট খুলছেন। স্কুল কোড দিয়ে সার্চ। রোল নম্বর দিয়ে সার্চ। নাম দিয়ে সার্চ। কিছুতেই নাহার এর নাম নেই।
নাহারের মুখ ফ্যাকাশে। সে ফিসফিস করে বলল, “দিদি, আমি কি সত্যিই ফেল করেছি?”
রাকা বললেন, “তুই চুপ কর। তুই যদি ফেল করিস তাহলে জানবি তার আগে আমি ফেল করেছি।”
“আপনি কেন?”
“কারণ আমি তোকে পড়িয়েছি।”
এই সময় সংস্কৃতের মঞ্জরী দিদিমণি হঠাৎ বললেন, “নাহারের অ্যাডমিট কার্ডটা কোথায়?”
নাহার ব্যাগ থেকে কুঁচকানো অ্যাডমিট কার্ডটা বের করল। মঞ্জরী দিদিমণি কার্ডটা হাতে নিয়ে চোখটা ছোট করলেন ভালো করে ফুটিয়ে খুঁটিয়ে রোল নম্বরটা দেখলেন তারপর বললেন, “রোল নম্বরের শেষ অঙ্ক সাত নয়। এটা এক।”
কেয়া চমকে উঠলেন। “কী বলছেন!”
“দেখুন না। প্রিন্টটা ঘেঁটে গেছে। এত দিন আমরা সাত পড়েছি। কিন্তু এটা এক।”
রাকা বললেন, “তাহলে নতুন করে সার্চ করুন।”
কম্পিউটার রুমে তখন নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে।
কেয়া নম্বর টাইপ করলেন। এন্টার চাপলেন।
স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ড সাদা আলো। তারপর নাম উঠল।
Nahar Khatun — Passed.
প্রথমে কেউ কিছু বলল না।
তারপর যেন স্কুলের পুরনো দেওয়াল থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে এল।
“পাস করেছে!”
নাহার নিজের নামটা পড়তে পারছিল না। চোখে জল। কেয়া দিদিমণি স্ক্রিনটা তার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন।
“পড়।”
নাহার কাঁপা গলায় পড়ল, “নাহার খাতুন—পাসড।”
রাকা বললেন, “বাংলায় বল।”
নাহার এবার মাথা তুলে বলল, “আমি পাশ করেছি।”
আজিজুল মিস্ত্রি লাল শাড়ির প্যাকেটটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখে আর আগের কঠোরতা নেই। সে যেন হঠাৎ খুব বুড়ো হয়ে গেছে।
অপর্ণাদি বললেন, “এবার বলুন, মেয়েকে কোথায় নিয়ে যাবেন?”
আজিজুল মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “দিদিমণি, আমি খারাপ মানুষ নই।”
“তা তো কেউ বলেনি।”
“আমি ভয় পাই। গ্যারাজে কাজ করি। হাত কেটে যায় কাজ বন্ধ থাকে। পয়সা থাকে না। মেয়ের বই কিনতে পারি না। ও কলেজে পড়বে কী করে?”
রাকা বললেন, “যেভাবে উচ্চ মাধ্যমিকে আপনি পড়িয়েছেন। একটু আপনি, একটু আমরা, আর বেশিটা ও নিজে।”
নাহার বাবার দিকে তাকাল। “আব্বা, আমি চাকরি করব। কিন্তু এখনই না। আগে পড়ব।”
আজিজুল মুখ ঘুরিয়ে বলল, “বড় বড় কথা বলিস না।”
নাহার বলল, “বড় কথা নয়। নিজের কথা বলছি।”
এই প্রথম মেয়েটার গলায় নিজের নামের মতো দৃঢ়তা শোনা গেল।
সেদিন স্কুলে মিষ্টি আসেনি। বড় ব্যানারও আসেনি। কোনও বড় নেতা নেত্রীরা কেউ ফোন করেননি। শুধু পঞ্চাশটা মেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেদের নাম নিজেরাই পড়ল।
অপর্ণা দি ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় করে লিখলেন —
৫০/৫০
সবাই পাস।
নিচে রাকা লিখলেন —
পড়া মানে শুধু নম্বর নয়। পড়া মানে নিজের মনের দরজাটাকে খোলা।
নাহার কিছুক্ষণ বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর চক হাতে নিয়ে আরও এক লাইন লিখল—
দিদিমণিরা আমাদের শুধু পড়াননি। আমাদের ভয়টা কে কিভাবে জয় করতে হয় সেটাও শিখিয়ে দিয়েছেন।
সবাই চুপ করে গেল।
আজিজুল এগিয়ে এসে লাল শাড়ির প্যাকেটটা অপর্ণাদির টেবিলে রাখল।
অপর্ণাদি বললেন, “এটা এখানে কেন?”
লোকটা ধীরে ধীরে বলল, “বিয়ের শাড়ি ছিল। কাল দোকানে ফেরত দেব। যদি পুরো দাম না দেয়, তবু যা পাব, তাতেই ওর কলেজের ফর্ম কিনা ভর্তির টাকাটা হয়ে যাবে।”
নাহার আর থাকতে পারল না। বাবার হাতটা ধরে কেঁদে ফেলল।
রাকা দিদিমণি জানলার বাইরে তাকালেন। গুডশেড রোডে তখন দুপুরের রোদ পড়েছে। রিকশা যাচ্ছে। টোটো যাচ্ছে। গ্যারাজের হাতুড়ির শব্দ আসছে। শহরটা নিজের মতোই চলছে। কিন্তু এই পুরনো স্কুলবাড়ির ভেতরে একটু আগে নিয়তির বিরুদ্ধে ছোট্ট একটা বিপ্লব ঘটে এগেছে।
ফলাফলের কাগজে লেখা থাকে — পাস বা ফেল।
কিন্তু জীবনের কাগজে লেখা থাকে—থামবে না এগোবে।
সেদিন সাধুমতী স্কুলের পঞ্চাশটি মেয়ে শুধু পাশ করেনি।
সেদিন পঞ্চাশটি পরিবারের পুরনো নিয়তি ফেল করেছে।