রাতের আকাশটা আজ ধোঁয়াটে। আধ ফালি চাঁদটাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কেউ কামড়ে খাওয়া তালের বড়া কে আকাশে ঝুলিয়ে রেখেছে। কালী তলার দিকে একটা কুকুর ডাকছে একটানা — কান্নার মতো সেই সুর। গ্রামের ক্লাবের সামনের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে ছিল সদানন্দকাকা। পাশে বসে খ্যাপা হরেণ নিজের মনে বিড়বিড় করছে। ঠিক এই সময় পুব পাড়ার পিচ রাস্তা দিয়ে একটা লোক কে আসতে দেখা গেল। লোকটার কাঁধে একটা ঝোলা, পরনে আধময়লা প্যান্ট আর গায়ে তালি দেওয়া ফতুয়া। লোকটার চলন বড় বিচিত্র, যেন মাটির ওপর দিয়ে হাঁটছে না, বরং মাটির সঙ্গে কুস্তি করতে করতে এগোচ্ছে।
ক্লাবের বারান্দায় তখন টিউব লাইটের মিটিমিটি আলোয় বসে সিগারেট খাচ্ছিল সদানন্দকাকা। পাশে বসে বংশী বাঁড়ুজ্যে মোবাইলের ক্যালকুলেটরে সুদের হিসাব মেলাচ্ছেন। লোকটাকে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে সদানন্দকাকা খুক খুক করে কেশে বললেন, কে রে? এই অসময়ে কার বাপের শ্রাদ্ধে আসা হলো? লোকটা উত্তর দিল না, ধপ করে ক্লাবের সিঁড়িতে বসে পড়ে বলল, আমি সময় ঠিক করি গো কর্তা। সময় বিগড়ে গেলে এই জীবনটাই তো লটকে যাবে। বংশী বাঁড়ুজ্যে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, ঘড়ি সারাই করিস বুঝি? তা আমাদের এই গাঁয়ে সময় তো থমকে আছে বছর কুড়ি আগে। তুই সারাবি কী?
লোকটা দাঁত বের করে হাসল। ফোকলা দাঁতের ফাঁক দিয়ে অদ্ভুত এক শিস বেরোল। সময়ের ঘড়ি নয় গো বাবু, আমি মানুষের ভেতরের ঘড়ি দেখি। কারুর নাড়ি টিপে বলি আয়ু আর কতটুকু, আবার কারুর চোখের মণি দেখে বলি — “ওরে বাবা, তোর ভেতরের চাকা তো জং ধরেছে” ! সদানন্দকাকা বিরক্ত হলেন। রাখ তোর তত্ত্বকথা। নাম কী তোর? কোথা থেকে আসছিস? লোকটা ঝোলা থেকে একটা পুরনো পকেট ঘড়ি বের করল। ঘড়িটার কাঁচ নেই, কাঁটা দুটো স্থির। নাম আমার পঞ্চানন। আসি তো ছাতিম তলা থেকে। কিন্তু যাব কোথায়, সেটাই তো গোলমাল।
হরেণ খ্যাপা এতক্ষণ চুপচাপ নিজের ছেঁড়া হাওয়াই চটি দিয়ে মাটিতে দাগ কাটছিল। হুট করে বলে উঠল, পঞ্চাননরে, তুই কি কালা জ্বরের খবর রাখিস? ওই যে বুড়ো গাছটার তলায় একজন শুয়ে আছে, ওর ঘড়িটা তো আর টিকটিক করছে না। ক্লাবের বারান্দার গুমোট বাতাস হঠাৎ যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। সদানন্দকাকা আর বংশী বাঁড়ুজ্যে একে অপরের মুখের দিকে তাকালেন। গত কয়েক মাসে গ্রামে তিনটে লোক মারা গেছে ওই অজানা জ্বরে। গায়ের চামড়া কালো হয়ে যায়, চোখ কোটরে ঢুকে যায় — গ্রামের লোক বলে কালাজ্বর।
পঞ্চানন ঘড়িটার চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, জানি। এই গ্রামটায় সময়ের একটা বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। যারা মরছে, তারা মরছে না গো কর্তা, তারা গর্তে ঢুকে যাচ্ছে। আপনাদের এই যে বংশী বাবু, ওনার পকেটেও তো একটা সময় লুকানো আছে। বের করুন তো দেখি! বংশী বাঁড়ুজ্যে চমকে উঠলেন। তাঁর পকেটে একটা দামী স্মার্ট ওয়াচ আছে, যেটা তিনি গত সপ্তাহে এক দেনাদারের থেকে ঋণের দায়ে কেড়ে নিয়েছেন। কেউ জানে না সেটা। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, কী… কী বলছিস পাগলের মতো।
পঞ্চানন উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এক অদ্ভুত চাউনি। সে বলল, সময় বড় নিষ্ঠুর বাবু। তাকে যে জাপটে ধরে রাখতে চায়, সময় তাকেই গিলে খায়। গ্রামে জ্বর আসেনি, এসেছে ভয়। আপনারা ভয় পাচ্ছেন বলেই সময় থমকে গেছে। এই বলে পঞ্চানন সিঁড়ি থেকে নেমে অন্ধকারের দিকে হাঁটা দিল। সদানন্দকাকা পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, আরে ও পঞ্চানন! রাতে থাকবি কোথায়? খেয়ে যা। পঞ্চানন ফিরে না তাকিয়েই বলল, খাবার তো আপনারা তৈরি করে রাখেননি কর্তা। আপনারা শুধু মরণ গুছিয়ে রাখছেন। কাল সকালে দেখবেন, ওই দিঘির পাড়ে কার ঘড়ি বন্ধ হয়ে পড়ে থাকে।
পরদিন ভোরে দেখা গেল এক আশ্চর্য কাণ্ড। গ্রামের দিঘির পাড়ে পঞ্চানন নেই। কিন্তু সেখানে পড়ে আছে তার সেই ভাঙা পকেট ঘড়িটা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘড়িটার বন্ধ কাঁটা দুটো সচল হয়েছে। টিক-টিক করে শব্দ শোনা যাচ্ছে পরিষ্কার। আর বংশী বাঁড়ুজ্যে? তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। তাঁর গায়ের রঙ কেমন যেন কালচে মেরে গেছে। পাশে পড়ে আছে সেই কেড়ে নেওয়া স্মার্ট ওয়াচটা, যার স্ক্রিনটা ফেটে চৌচির। হরেণ খ্যাপা দিঘির পাড়ে বসে পঞ্চাননের ফেলে যাওয়া ঘড়িটা কানে দিয়ে শুনছিল। সদানন্দকাকা ভয়ে ভয়ে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী শুনছিস রে হরেণ? হরেণ হাসল। বলল, সময়ের কথা বলছে কাকা। পঞ্চানন বলে গেছে, ঘড়ি চললে মানুষ বাঁচে, আর মানুষ চললে ঘড়ি বাঁচে। আমরা তো কেউ হাঁটছি না, তাই আমাদের ঘড়ি গুলো সব যমালয়ের টিকিট কাটছে। সদানন্দকাকা সেদিন প্রথম বুঝতে পারলেন, এই পৃথিবী শুধু মাত্র মাটি, মানুষ, গাছ, প্রকৃতি, আর না-মানুষের নয়, এ এক আদিম রহস্যের জায়গা।
খুব ভাল হয়েছে, আরো লেখো, তোমার লেখার হাত খুব ভাল
অসংখ্য ধন্যবাদ