টুং! ফেসবুকের সাহিত্য গ্রুপগুলোয় ঢুকে যে শান্তিমতো অন্যের লেখা পড়ব কিংবা বন্ধুদের পোস্ট করা ছবিগুলো দেখে বেশ মজাদার মন্তব্য করব তা নয়, কেবল টুংটাং নোটিফিকেশনের জ্বালা, মিতা ভীষণই রেগে গেল। তারপরই ভাবলো, দুচ্ছাই, এত ভাবনা চিন্তা করে লাভ নেই; বরং যেসব সাহিত্য গ্রুপের মাথারা এত আদর করে বারবার ডাকছে, তাদের সাহিত্য গ্রুপ থেকে নানান ধরনের নোটিফিকেশন পাঠাচ্ছে তাদের সাথে হাত মেলাই। আর কিছু না হোক ভালোয়-মন্দয় কিছু লেখা তো পড়া যাবে।
পাশে বসা প্রাণের বন্ধু বনিকে জিজ্ঞাসা করে মিতা, “দ্যাখ উচ্ছিষ্ট গ্রুপের এ্যাডমিন চিকি দে বারবার ডাকছে। আমাকে গ্রুপ মডারেটর করবে বলছে, এত লোভনীয় অফার ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হবে? ওদের গ্রুপে জয়েন করেই ফেলি, কি বল!”
বনি একটু রাগী টাইপের মেয়ে। বন্ধুর কথায় ওর মাথা গরম হয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে মিতার গলা জড়িয়ে ধরে। কিছুটা শ্লেষ মিশিয়ে বলে, “তোর কথায় প্রাণ জুড়িয়ে গেল রে; যার লেখায় তাল-তেঁতুল একাকার, তার তৈরী করা সাহিত্য গ্রুপে যোগ দিতে তোর লজ্জা করবে না? মাথা থেকে এসব খেয়াল ছেড়ে নিজের লেখায় মন দে।”
ভোলেভালা মিতা বনিকে জড়িয়ে ধরে বলে, “চিকি খুব ভালো মানুষ রে, কতবার আমাকে ডাকছে, তোকে না হয় ডাকেনি, তাই বলে রাগ করিস না!”
মিতার গা জ্বালানো কথায় বনি এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল। বলল, “নিজের কবর নিজে খুঁড়ছিস এই আমি বলে দিলুম। যে ‘ড়’, ‘র’-এর তারতম্য জানে না; ণত্ব ষত্ব জ্ঞান নেই তার তৈরী সাহিত্য গ্রুপ হল এদিক ওদিক থেকে জড়ো হওয়া কাগজ-কালির সম্মান না রাখা কলমচিদের দল। গ্রুপের নামটা দেখেছিস? উচ্ছিষ্ট। এবার তোর লেখার মানও জলের ধারার মতোই বয়ে চলবে, নীচের দিকে। বুঝেছিস? আমি চললাম।”
বনি চলে যায়।
বনির রাগকে পাত্তা না দিয়ে মিতা নতুন ভালো বন্ধু পাওয়ার আশায় চিকির ডাকে সাড়া দিয়ে উচ্ছিষ্টতে যোগদান করে।
পরেরদিন সকালেই ইনবক্সে এ্যাডমিন চিকি, “মিতা, দ্যাখো গ্রুপে ভুতের নিত্য পালা ইভেন্ট শুরু হয়েছে, লেখা দাও।”
মিতার চোখ তো ছানাবড়া। ও মানেই বুঝতে পারছে না মেসেজটার। অগত্যা গ্রুপে ঢোকে। দ্যাখে সেখানে দু-চারজন ছড়া লিখেছে। বিষয় হল ভূতের নৃত্য।
মাথা ঝিমঝিম করে মিতার। ইনবক্সে চিকিকে লেখে বানানগুলো ঠিক করো। ভুত নয় ভূত, নিত্য নয় নৃত্য।
সঙ্গে সঙ্গেই স্মাইলি ইমোজী। চিকি উত্তর দেয়, “শব্দগুলো ফোনে অটোকারেক্ট হয়ে এমনটা হয়েছে। এগুলো নিয়ে মাথা ঘামিও না।”
মিতা তাজ্জব হয়ে যায় চিকির কথায়।
ওদিকে চিকি ভাবে, যার আমার মতো ফ্যান ফলোয়ার নেই সে আবার আমার ভুল ধরায়! দয়া করে আমার গ্রুপে ডেকে এনে বসিয়েছি; বেশী ভুল ধরতে এলে কাদার কাপড় পরিয়ে বের করে দেব। তবে মনে হয় মেয়েটার কিছুটা বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। তাই ইনবক্সে সতর্ক করার চেষ্টা করল।
ঘেঁটে ঘ মিতা কি করবে ভেবে পায় না। এখন মনে হচ্ছে বনির কথা শুনলেই ভালো হতো। এমন একটা গ্রুপে লেখা দেবে কি দেবে না চিন্তা করতে করতে ও বনিকে ফোন করেই ফেলল।
— জানি এসব কথা শুনলে বনি প্রাণখুলে গালাগালি দেবে তবুও ওর সাথে কথা না বলে উচ্ছিষ্ট গ্রুপে লেখা দেব না।, মিতা মনেমনে ভাবে।
ওদিকে ফোন ধরেই বনি উত্তেজিত, “কি রে উচ্ছিষ্টের এঁটোপাত, সকালবেলাই ডাকাডাকি করছিস কেন?”
মিতা আজ সকাল থেকে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার বিবরণ দেয় বনিকে। ওর কথা শুনে বনি তো হেসে গড়িয়ে পড়ে।
বলে, “ওরে যে নিজে (আপন) কে দোকান (আপণ) বানায়, হাসতে গিয়ে হেঁসে ফেলে, ফুল ফোটার কোমল সময়ে ফোঁটার তীব্রতা অনুভব করে; সে যখন দল তৈরী করে তার অবস্থা তো এমনই হবে, এ আর বেশী কথা কি?
— “কিন্তু ওর সব লেখাতেই তো তিন-চারশো লাইক পড়ে; সেটাও তো ভেবে দেখার বিষয়।” মিতা বলে।
এবার বনি রেগে যায়, “বোকার মতোন কথা বলিস না মিতা। তুই চালুনি দিয়ে ছেঁকে বন্ধুত্ব পাতাস। ফলে তো বন্ধুসংখ্যা শ-দুয়েক।
অন্যদিকে দ্যাখ চিকি সবাইকেই বন্ধুত্বের আসন পেতে দিয়ে পাঁচ হাজার বন্ধু জোগাড় করে ফেলেছে।
এবার তুই-ই বল্ তোর লেখায় চল্লিশটা লাইক আর অন্যদিকে চিকির লেখায় যদি চারশোটা লাইক থাকে তাহলে পার্সেন্টেজে কে এগিয়ে?
ওসব বাদ দে, এবার আর ইনবক্সে কাউকে ভুল ধরানোর চেষ্টা করিস না। যেটা ভুল সেটা ভুলই। সবার সামনে ভুল করে ছড়ি ঘোরাবে, এটা হতে পারে না। ভুল ধরতে হলে যেখানে ভুল করবে সেখানেই ভুলটা শোধরানোর চেষ্টা করিস। আপাততঃ টা টা।” ফোন কেটে দেয় বনি।
ফোন রেখে হতভম্ব হয়ে বসে থাকে মিতা। ভাবে, “থাক্। এখন এই গ্রুপে লেখা দিয়ে কাজ নেই, বরং কটাদিন দেখা যাক এই দলের গতিপ্রকৃতি।”
পরের তিনচারদিন গ্রুপের নানা ইভেন্টে যোগ দেওয়ার জন্য চিকির তরফ থেকে ইনবক্সে ডাক আসতেই থাকে। মিতা ইগনোর করে।
আজ সকালবেলায় মিতা ফোনে ফেসবুক খুলতেই উচ্ছিষ্ট গ্রুপ সামনে চলে আসে। ও দ্যাখে গ্রুপের এ্যাডমিন চিকি দে’র ঘোষণা, “আজ কথাশীল্পি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিনে সুনীলের নীরার সম্বন্ধে দু-চার লাইন লিখুন।”
দেখেই মাথা গরম হয়ে যায় মিতার। নিজেকে আর সংযত রাখতে পারে না ও। সঙ্গে সঙ্গেই কমেন্ট বক্সে লেখে — ‘বানান এবং বিশেষণের যোগ্য সম্মান দিন। শিল্পীকে অযথা শীল্পি করলে চোখের কষ্ট হয়। আর কথাশিল্পী বলা হয় সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে।’
কমেন্ট বক্সে মিতার বক্তব্যে চোখ পড়তেই চিকির অহংবোধে ঘা লাগে। ‘এই রে, এ যে দেখছি আমার সাধের গড়ে তোলা প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন ছড়াচ্ছে। ব্যবস্থা তো নিতেই হয়’, চিকি ভাবে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উচ্ছিষ্টের দেওয়াল জুড়ে ভেসে ওঠে চিকি দে’র ঘোষণা —
“গ্রুপের সদস্য হয়ে এ্যাডমিনকে অকারণ সর্বসমক্ষ্যে হেনস্থা করার জন্য মিতাকে দল থেকে বহিস্কার করা হচ্ছে। অন্যান্য সদস্যদের জানানো হচ্ছে যে দলের ভুলভ্রান্তি সর্বসমক্ষ্যে না এনে ইনবক্সে বলবেন, তাহলেই আপনারা দলের সম্পদ বলে বিবেচিত হবেন।”
এহেন সাঙ্ঘাতিক বানানে নিজের বহিষ্কারের ছাড়পত্র পেয়ে মুক্তির আনন্দে একপাক নেচে নিল মিতা।
অহঙ্কারী চিকি থাকুক ওর চাটুকার, স্তাবকের দল নিয়ে, অযোগ্য মানুষের বোধহয় এমনই অহং হয়। নিজের ভুল মেনে নেওয়ার মতো মনের প্রসারতা থাকে না।
মুক্তির আনন্দটুকু ভাগ করে নেওয়ার জন্যে বনিকে ফোন করে মিতা। সব শুনে আনন্দে আটখানা হয়ে বনি বলে, “ডিয়ার, আজকের সন্ধ্যেটা আমি তোকে উৎসর্গ করলাম। আজ তোর পকেট কেটে জমিয়ে ফুচকা পার্টি হবে তোর মুক্তির আনন্দে। বা-ই-ই”।
ফোন কেটে দেয় বনি।
ভেবলু মিতা ভাবতে বসে কার অহঙ্কার কার পকেট কাটে।
বেশ লাগল।
অনেক ♥️♥️