অজয় নদের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে সংসারের প্রয়োজনীয় সবকিছু,আকাশে মেঘ ভেসে চলার মত। যেমন জমির ধান, চালাঘর, মাটির বড় জালা ও মাটির কলসি, ছাগল, গরু, ভেড়া, হাঁস আর একজন কন্যা। কালোদার কাঁধে একটা বন্যার জলে পাওয়া, ভীত কালো ছাগল। তার হাত দুটো ফাঁকা থাকলেও জল কেটে এগিয়ে চলেছে হাতের জোরে।
এক গলা জলে দাঁড়িয়ে কালোদা স্রোতের বিপরীত দিকে এগিয়ে এসে ভেসে চলা, কিশোরীর চুল ধরে টেনে ধরে রাখল কোনরকমে। চুলের মুঠি ধরে, টানতে টানতে নিয়ে এল নিজের গ্রামে। তারপর নতুন পুকুরের উঁচু পাড়ে তেঁতুলগাছে বাঁধলো বাঁশ আর ত্রিপল। বাঁশ আর ত্রিপল সহযোগে তৈরি করল গাছের উপর ঘর। কালোদা একা মানুষ এখন।গতবার বন্যার স্রোতে ভেসে গেছে তার সোনার তরী।বউ,মেয়ের মায়া ভোলার জন্য সে এখন পরোপকারী মানুষ। কিশোরীকে জিজ্ঞাসা করল, কি রে তোর নাম কি? কোথায় তোর বাড়ি।
— আমি কিশোরী। আমার বাড়ি কোপা গ্রামে।
— তোর মা বাবা কোথায়?
— মা, বাবা রান্নাঘরের চালায় বসে ছিল। তারপর বন্যার জলে কাগজের নৌকার মত ভাসতে ভাসতে চলে গেল বহুদূরে।
— বলিস কি। আহা রে। বেশ আমি আছি তোর বাপের মতন। ভয় করিস না। আমি তোকে দেখব।
— কিশোরীর সাহস বাড়ল। কান্না থামিয়ে বলল, আমার খিদে পেয়েছে, বাবা।
বাবা ডাকে কালোদার মনে পড়ে গেল তার হারানো মেয়ের নূপুরের শব্দ আর সাদা কাশের আড়ালে ওড়নার রঙিন ডানার কথা।
কালোদা গামছায় বাঁধা মুড়ি আর গুড় দিল খাওয়ার জন্য তার মেয়েটিকে। কিশোরী খেয়ে শান্ত হয়ে বসল। আবার তার চোখে জল। তার মনে পড়ছে বাড়ির কথা। মা, বাবার কথা।তার মনে পড়ছে মায়ের লাল পলা,বাবার রঙীন বাক্স আর খড়ের চালের নিরাপদ আশ্রয়ের কথা।সে হঠাৎ করে অনেক অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। বন্যার জলে নাকানি চোবানি খেয়ে বাস্তব সংসার বুঝতে শিখছে।
সে ভাবে, এই বাবার মত লোকটা আমাকে না বাঁচালে আমি তো বাঁচতাম না। তাহলে এখন থেকে এই লোকটিই আমার বাবা মা সবকিছু।
কালোদা কিশোরীকে গাছের উপরে তৈরি করা ঘরে রেখে চলে গেল বামুন পাড়ায়, এক কোমর জলে হেঁটে।
এবার একটা পানসি নৌকা জোগাড় করেছে কালোদা। ভাদু জেলের নৌকো। ভাদু জেলে কালোদার বন্ধু। তাই তাকে বিশ্বাস করে। কালোদা নৌকো নিয়ে ভেসে যাওয়া ছাগল আর হাঁসগুলো ধরে নৌকায় রাখছে। মালিক পেলে দিয়ে দেবে। তা না হলে নিজের কাজে লাগবে। বন্যায় মাটির বাড়ি সব ভেঙ্গে পড়েছে। একটাও চালাঘর অবশিষ্ট নাই। বাবুদের দালানে বা স্কুলবাড়িতে সবাই আশ্রয় নিয়েছে। খিচুড়ি আর পেঁপের তরকারি রান্না হয়েছে। সকলেই খাচ্ছে। কালোদা খেয়ে নিল। কিশোরীর জন্য বাটিতে নিয়ে রাখল। মেয়েটা এখন থেকে তার নিজের মেয়ে। কালোদার মনটা কন্যাপ্রাপ্তির আনন্দে নেচে উঠল বর্ষার ময়ূরের মত। সে আবার ভাবে, বাড়ি গিয়ে জলে পাওয়া মেয়েকে খিচুড়ি খাওয়াবে। মাটির বাড়ি আর নেই। শূণ্যের উপর তেঁতুলগাছে ঘর বেঁধেছে অস্থায়ী ভাবে। সেইখানেই রাতে ঘুমোবে বাপ, বেটি কোমরে দড়ি বেঁধে। তা না হলে ঘুমের ঘোরে পড়ে গেলে বিপদ হবে। জলে হেসে যাবে নতুন স্বপ্ন।
কালোদা স্রোতে ভেসে যাওয়া অনেক মানুষকেও উদ্ধার করেছে। গ্রামের নয়নের মণি এই কালোদা। সকলের বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই মানুষটি।
তারপর তিনদিন পরে মানুষকে নিঃস্ব করে বন্যার জল কমে গেল। ডি ভি সি জল ছাড়ে যখন ঠিক তখনই বন্যার জল নিচু গ্রামগুলির ফসল নষ্ট করে বছর বছর। হত দরিদ্র এলাকায় এই গ্রামগুলি অবস্থিত। ফলে এখানকার লোক কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যায়। কেউ কেরালায় সোনার দোকানে কাজ করে আবার কেউ মুম্বাই হোটেলে বাসন ধোওয়ার কাজ করে। গ্রামের জমিগুলো বাঁজা হয়ে পড়ে থাকে সারাবছর। তবু এখানে পৌষমাসে পৌষলক্ষ্মীর পুজো হয়। যদি কোনোদিন লক্ষীর দয়া হয় তাহলে হয়ত ফসল ফলবে, বাঁজা জমি গর্ভবতী হবে।
কিশোরী এখন বড় হয়েছে। প্রতিবেশিরা বলে এবার মেয়েটার বিয়ে দাও। ওর তো ভবিষ্যৎ জীবন আছে। কালোদা সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। সে বলে, বিয়েতে তো অনেক টাকা লাগবে। কোথায় পাব গো? জানি না।
সকলে বললো, আমরা যতটা পারব সাহায্য করব। কালোদা খুশি হয়ে বলে, তাই হবে। মুচকি হাসি কালোদার মুখে। তার অন্তর কিন্তু অন্য কথা বলে। সে বাল্যবিবাহ সমর্থন করে না। নিজে সে নাম সই করতে পারে। নিজের বেশিদূর লেখাপড়া না হলেও সে তার পালিত মেয়ে কিশোরীকে পড়াতে চায়। কিশোরী পড়াশুনায় খুব ভাল। সে বলে, বাবা, বাবুরা আমাদের মূর্খ বানিয়ে রাখতে চায়। তাহলে তাদের শোষণের সুবিধা হয়। বোকা মানুষের রক্ত খেয়ে ওরা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কালোদা অবাক হয়ে শোনে কিশোরীর কথা। একটু একটু কথার মানেও বুঝতে পারে। সে বলে, কিশোরী, আমি তোকে লেখাপড়া শেখাব। তুই বি ডি ও হবি, বড় অপিসার হবি। কালোদা বলে, আমি বিডি ও দেখেছি। বাবুরা ওদের পায়ে তেল মাখায়।
আজ মহালয়া। কালোদা সকালে ধুতি পড়ে বাবুদের বাড়ি চলে গেল। রেডিও, টি ভিতে মহালয়া শুনবে। বাবুদের বাড়ি গিয়ে সকলকে ডেকে তুলল। তারপর সিঁড়িতে বসে শুনতে লাগল মহালয়া। বাবুরা উঁচু জাতের লোক। কালোদা তাই জুতো খুলে বাইরে রাখে। দূরে সিঁড়িতে বসে। ধানের গোলার তলায় কাপ রাখা থাকে। সেই কাপ কলে ধুয়ে বাবুদের বাড়ির চা খায়। বাবুগিন্নি খুব ভাল। কালোদাকে খুব ভালবাসেন তিনি। চা দেন তার সঙ্গে ধুতির খুঁটে মুড়ি ঢেলে দেন দূর থেকে।
বাড়িতে, বাবুদের আজকে কেউ নেই। কালোদাকে বাড়ির গিন্নির দেখাশোনার জন্য রেখে গেছেন। খুব বিশ্বাসী লোক কালোদা। তিনি বললেন, বোস খাটে বোস। আজ তো আমি একাই আছি। বোসো খাটে বোসো।
কালোদা বলেন, কি বলছেন গিন্নিমা। আমরা হলাম ছোট জাত। আপনাদের খাটে আমরা বসতে পারি না। গিন্নিমা বলেন, জানো তোমার বাবু আমাকে মারধোর, অপমান করে। তুমি আমার কাছে এলে, একটু শান্তি পাই। আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু ভয়ে বলতে পারি না।
কালোদা বলেন, আজও আমাদের নারী সমাজ স্বাধীনতা পায় নি।কবে উদয় হবে নারীদের স্বাধীনতার সূর্য। তারা নিজেদের উন্নত করবে, স্বাধীন ভাবে রাস্তা ঘাটে চলা ফেরা করবে। কবে আসবে সেই দিন।
গিন্নিমা বলেন, তোমার বাবুদের মত লোক থাকতে নারীদের স্বাধীন হতে দেবে না।
কালোদা বলেন, আমি আমার মেয়ে কিশোরীকে লেখাপড়া শিখিয়ে অনেক বড় করে তুলব। আমার মেয়ে নিশ্চয় নারীদের রক্ষা করবে।
তারপর দুদিন পরে বাবু তার নিজের বাড়িতে এলেন তার কাজ সেরে। কালোদা বাবুকে বললেন, আমাকে পাঁচশো টাকা দেবেন। কোনোদিন আমি টাকা চাই নি। খুব দরকার বলে চাইছি।
বাবু রাশভারি লোক। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, হুঁ, কি বলছিস।
— আজ্ঞে, পাঁচশোটা টাকা যদি দেন দয়া করে।
বাবু বললেন, অত টাকা কি করবি রে কালো।
— আজ্ঞে, বাইরে শহরে যাব। মেয়েটার বিয়ে দোব।
— গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাবি। তা কি করে হয়?
— হ্যাঁ এখানে থাকলে আমি মেয়েটার বিয়ে দিতে পারব না। আমি আপনার টাকা শোধ করে দোব।
— আমার বাড়িতে মেয়েটাকে কাজে পাঠাস। বিয়ের ব্যবস্থা আমি করে দেব। দেখি না কেমন মেয়েটা। ও তো তোর নিজের মেয়ে নয়। তোর আপত্তি থাকার কথা নয়।
— না বাবু। আমি ওকে স্কুলে পাঠাব। ওর খুব বুদ্ধি। মাষ্টারমশাই বলেছেন, ওর লেখাপড়া হবে। ওকে অনেকবড় করবো। দশজনের একজন হবে।
— বেশি পাকনামি করিস না কালো। যা বলছি শোন। কাল থেকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিবি। তা না হলে লেঠেল দীনু আর কিনু গিয়ে নিয়ে আসবে তোর মেয়েকে। আর নাচ, গান যদি শেখে তাহলেও সুনাম হবে। আমার সামনে নাচবে। আমি সমস্ত দায়ভার নোব। কিন্তু কোনেদিন বিয়ে করতে পারবে না, তোর মেয়ে। সংসারও হবে না। এটাই তো ভাল। কোনো ঝুট ঝামেলা নেই। এই দীনু ওকে এখন দুশো টাকা দে তো।
— না বাবু। ও টাকা আমি নিতে পারব না। ও আমার মেয়ের মত। আমার প্রাণ থাকতে ওকে ছাড়তে পারব না।
— তাই নাকি। আমার মুখের উপর কথা। তুই তো দেখছি মাথায় উঠে নাচছিস। আজ রাতেই ওকে আমার ঘরে আনবি দীনু।
দীনু বলে, যে আজ্ঞে হুজুর।
কালোদা কিছু না বলে বাড়ি চলে গেল। ঠিক সেদিন রাতে কিশোরীকে বলল, বুঝলি আমরা শহরে পালিয়ে যাব। বাবুর বাড়িতে মেয়েদের সম্মান নাই। এ গ্রামে থাকলে ওরা আমাদের বাঁচতে দেবে না। আমি আর মেয়েকে হারাতে চাই না। আমি তোকে শিক্ষিত করে তুলব। গ্রামের সুদখোর মহাজন তারা ধনী, ওরা মানুষ নয় রে পশু। চল আমরা পালাই। কালোদা জানে দীনু আর কিনু বাবুদের পোষা লাঠিয়াল। ওরা নির্দয়, গুন্ডা, ওরা তাদের বিষাক্ত নখ দিয়ে ছিঁড়ে খায় ভবিষ্যতের আশা।
রাতের বেলায় যখন পাড়ার লোকজন ঘুমিয়ে থাকবে তখন কিশোরীকে ধরে নিয়ে গিয়ে বাবুর বিছানায় ফেলবে। এতদিন কালোদা সহ্য ক’রে ছিল একমাত্র গিন্নিমার জন্য। অই বাড়িতে যেত ভালবাসার টানে। বাবুকে কালোদা ঘেন্না করে কিন্তু মনে মনে কালোদা গিন্নিমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্ন দেখতে দেখতে বয়সটাও চলে গেছে বন্যার জলের মত ভেসে।
গভীর রাতে বাবুর লাঠিয়াল আসার আগেই কালোদা আর তার মেয়ে কিশোরী, ভালোবাসার গ্রাম ছেড়ে চলে গেল চাঁপা পুকুরের পাড় দিয়ে গড়গড়ে মাঠে। সেখান থেকে কাঁদর পেরিয়ে ছোট লাইন স্টেশনে।
কালোদা কিশোরীকে বলে, এই ঈশানী নদীকে আমরা কাঁদর বলে থাকি। এই ছোটনদীর পাড়ে আমরা ছোটবেলায় বনভোজন করতাম। ছেলেবেলার বনভোজনের আনন্দে মেতে উঠত সোহাগী সকাল। আমার মা বাবা সঙ্গে থাকতেন।
কালোদা বলছেন হাঁটতে হাঁটতে, নটকনের মাল আনতে যেতাম শহরে।
কিশোরী বলে, হ্যাঁ আমার মা বলতেন, মুদি দোকানের জিনিসপত্রকে গ্রামের লোকে নটকনের মাল বলে। এই নটকনের দোকানে লজেন্স, চানাচুর আর পাঁপড়গাজার সোহাগে মেতে উঠত ছেলেবেলার সোহাগি সকাল।
কালোদা বলেন, তখন মোবাইল ছিল না, ফেসবুক, রিলস, টিকটক কিছুই ছিল না। কিন্তু কতরকমের খেলা ছিল, চু কিতকিত, লুকোচুরি, সাতগুটি খেলা, ড্যাংগুলি খেলা। সেসব এখন ডুব দিয়েছে স্মৃতির অতল জলে। তাছাড়া আমি দেখতাম পাড়ায় পাড়ায় সকাল সন্ধ্যা সরব পাঠের প্রতিযোগিতা চলত বছর জুড়ে। জোরে জোরে পড়লে ভুল উচ্চারণ ঠিক করে দিতেন ছাত্র ছাত্রীদের বাবা, কাকারা।
কালোদা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে আবার বলে ওঠেন, কিশোরী তোমাকে লেখাপড়া করতে হবে। অনেক বড় হয়ে নারীদের দুঃখ দূর করতে হবে। তুমি হবে আলো হাতে আর এক নারীর প্রতিচ্ছবি।
কিশোরী বলে, আমি লেখাপড়া শিখে অনেক বড় মানুষ হওয়ার চেষ্টা করব বাবা। আমি তোমার কথা মনে রাখব।
কালোদা দেখেন, অন্ধকারে সাদা কাশফুল ফুটে আছে, ভোরের আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে। পিছনে কয়েকজন লোকের পায়ের শব্দে সচকিত হয়ে বাপ, বেটি কাশফুলের বনে লুকিয়ে পড়ে। ওরা লুকিয়ে দেখে, পাঁচ, ছয়জন লোক লাঠি হাতে চারপাশে তাকিয়ে অন্যপথে হাঁটা শুরু করল।
ওরা বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যাওয়ার পরে উঠে পড়ল দুজনে, বড় রাস্তার উপরে। সেখানে একটা টোটো রিক্সায় চেপে তারা নিশ্চিন্ত হল।
সকাল হলেই দশদিক আলোকিত হবে। কালোদা বলে, বুঝলি মা, তোকে এই কাশফুলের মত আলো হয়ে ফুটে উঠতে হবে। দশজনের বুকে আলোর রোশনাই ফোটাবি। তুই ইস্কুলের শিক্ষিকা হয়ে ভালো মানুষ তৈরি করবি, লেখাপড়া শিখিয়ে।
কিশোরী কাশফুলের শিকল ছিঁড়ে এগিয়ে যাচ্ছে আলোর টানে। তাকে যে, বড় হতেই হবে।
কালোদা ও তার মেয়ে এখন নিরাশ্রয়। তাদের ভবিষ্যতের আশা এখন ফাঁকা হাওয়ার দোলনায় দুলছে।