স্টেশনটার নাম শিমুল ঘাটা। ছোট্ট স্টেশন। দিনে চারবার লোকাল থামে, দু’বার এক্সপ্রেস শিস দিয়ে চলে যায়। প্ল্যাটফর্মে একটা চায়ের দোকান, একটা পানের ঠেলাগাড়ি, আর মাথার ওপর টিনের চাল। বর্ষায় সেই চালের ফুটো দিয়ে জল পড়ে। গরমে টিন প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে।
স্টেশন লাগোয়া বাজার। বাজারের একদিকে মাছ, একদিকে সবজি, আর মাঝখানে কাঁচা রাস্তা। রাস্তার ওপারে দর্জি নিতাইয়ের দোকান। তার পাশেই লোহার কাজ করে রফিক। দু’জনের দোকানের মাঝখানে একটা সরু নর্দমা। সেই নর্দমা বরাবর একটা ইটের সাঁকো। যে-ই আসুক, ওই সাঁকো দিয়েই এই দোকান থেকে ওই দোকানে যায়।
বছরের পর বছর এভাবেই চলছিল।
নিতাই পুজোর আগে রফিককে বলল, “শোন, ওই দা-টা একটু ধার দিয়ে দিস। কুমড়ো কাটতে হবে।”
রফিক হেসে বলে, “দা দেব, কিন্তু কুমড়োর ছক্কা খাওয়াবি তো?”
ঈদের আগে নিতাই বলে, “কিরে, সেলাই মেশিনের বেল্ট ছিঁড়েছে? আমার ভায়রার দোকান থেকে এনে দেব?”
রফিক মাথা নেড়ে বলে, “আনবি। তবে দামটা পরে দেব।”
এই ‘পরে দেব’, ‘কাল দেব’, ‘তুই যা’, ‘এই নে খা’— এইসব দিয়েই এই এলাকার সংসার, বাজার, আর দেশ চলে। নেতাদের বড় বড় বক্তৃতায় নয়।
নিতাইয়ের মেয়ে ঝুমা আর রফিকের ছেলে সোহেল একই স্কুলে পড়ে। ঝুমার বাংলা ভালো, সোহেলের অঙ্ক। পরীক্ষার আগে ঝুমা সোহেলকে কবিতা শোনায়, সোহেল তাকে যোগ, গুণ, ভাগের হিসেব শেখায়। স্কুল থেকে ফেরার পথে দু’জনে একই আচার ওয়ালার কাছ থেকে দু’টাকা দিয়ে কাঁচা আমের আচার কিনে খায়।
এ পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল।
কিন্তু এর মধ্যে একদিন কে যেন এসে খবর দিল, বাজারে নাকি গোরুর মাংস ফেলা হয়েছে। আরেকজন বলল, মন্দিরের দেওয়ালে নাকি কালি লেপে দিয়েছে। তৃতীয় জন বলল, মসজিদের সামনে নাকি জুতো ছুড়ে রেখেছে কেউ। খবরের কোনো মাথা মুণ্ডু নেই, কিন্তু হাওয়া আছে। আর হাওয়া যখন নোংরা হয়, তখন শুকনো পাতা আগে জ্বলে ওঠে।
চায়ের দোকানে বসে সবাই বলতে লাগল।
“এটা সহ্য করা যায় না।”
“অনেক দিন চুপ ছিলাম।”
“ওরা ভেবেছে আমরা ভয় পাই!”
কথাগুলো কারা বলছিল, ঠিক বোঝা যায় না। তবে যাদের রোজ রোজ বাজারে দেখা যায় না, তারাই এই কথাগুলো বেশি বলছিল। তাদের বৈশিষ্ট্য— গায়ে নতুন গামছা, চোখে রাগের চেয়ে অভিনয় বেশি। একজনের গলায় আবার গাম্ভীর্য, যেন দেশের ভাগাভাগির চাবিকাঠি ওর পকেটে।
নিতাই সেদিন দোকান বন্ধ করতে গিয়ে দেখল রফিক চুপচাপ বসে আছে। হাতুড়ি নামিয়ে রেখেছে, আগুন নেভানো। মুখটা কেমন শক্ত।
নিতাই বলল, “কী রে?”
রফিক উত্তর দিল না।
“কী হয়েছে?”
রফিক একটু পরে বলল, “বউ বলছে দু’দিন দোকান না খুলতে। ছেলেপুলে আছে।”
নিতাই হেসে উড়িয়ে দিতে গিয়েও শেষমেশ পারল না। হাসিটা মুখেই শুকিয়ে গেল।
“তা খুলবি না?”
“না খুললে খাব কী?”
এই একটাই কথা। ধর্মের আগে, রাজনীতির আগে, স্লোগানের আগে — পেট। কিন্তু পেটের কথাই সবচেয়ে কম শোনা হয়। কারণ পেট ভোট দেয় না, পেট বক্তৃতা দেয় না। পেট শুধু খেতে চায়।
পরদিন সকালেই বাজারে পুলিশ এল। দু’জন সিভিক, একজন সাব-ইন্সপেক্টর। সবাইকে শান্ত থাকার কথা বলে চলে গেল। শান্তি যত বেশি উচ্চারণ করা হয়, বোঝা যায় তত কম আসে।
দুপুর গড়াতেই দুটো আলাদা আলাদা মিছিল বেরোল। কারা ডাকল, কেউ জানে না। কাঁধে লাঠি, মুখে কাপড়, গলায় স্লোগান। স্লোগানে ভগবানও ছিল, আল্লাহও ছিল, কিন্তু কোথাও মানুষ ছিল না।
নিতাই দোকানের ঝাঁপ আধখানা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল, মিছিলের মধ্যে তার চেনা বাজারের লোক প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু এই অচেনা বহিরাগত লোক
গুলোর গলার জোর সবচেয়ে বেশি। নিতাইয়ের মনে হল, এই এলাকায় যারা চেঁচাচ্ছে, তাদের কোনও দায় দায়িত্ব নেই, কোথাও কোনও সম্পর্ক নেই, এমনকি কোনও স্মৃতি পর্যন্ত নেই।
রফিক সেদিন দোকানই খোলেনি।
অন্যদিকে গ্রামের স্কুল হঠাৎ ছুটি দিয়ে দিল। ঝুমা আর সোহেলকে একসঙ্গে ফিরতে দেখে বাজারের মোড়ে কয়েকজন চোখ কুঁচকে তাকাল। তাদের কাছে শিশুরাও নাকি এখন সন্দেহের জিনিস। যে-দেশে শিশুর বন্ধুত্ব কে ধর্ম দিয়ে মাপা হয়, সে-দেশ আসলে অনেক দিন আগেই আত্মহত্যার জোগাড় করে রেখেছে।
নিতাই দৌড়ে গিয়ে ঝুমার হাত ধরল। সোহেল একটু পেছনে দাঁড়িয়ে। তার চোখে এমন এক ভয়, যা তার বয়সের নয়।
নিতাই বলল, “এই, তুই বাড়ি যা।”
সোহেল দাঁড়িয়েই রইল।
“শুনছিস না? বাড়ি যা।”
ছেলেটা খুব আস্তে বলল, “কাকু, ওরা যদি রাস্তায় আমাকে ধরে ?”
নিতাই বুকের ভেতর যেন একটা ধাক্কা খেল। নিতাইয়ের মনে হল, সোহেল এত সহজ ভাবে যে কথাটা বলছে কথাটা অতটা সহজ নয়।, কারণ সোহেল যেন বৃষ্টি আসার কথা বলছে। “ওরা যদি রাস্তায় দাঁড়ায়?” কথাটার গভীর মানে সোহেল বোঝেনি যেটা নিতাই বুঝতে পারল। আজকাল ‘ওরা’ শব্দটা খুব সহজেই জন্মায়। কাল পর্যন্ত যে ছিল পাশের দোকানদার, সতীর্থ, আজ সে ‘ওরা’। কাল যে বন্ধু, সহপাঠী ছ, আজ সে ‘ওরা’। এমনকি প্রতিবেশী ও আজ থেকে ‘ওরা’ হয়ে দাঁড়ায়। নিতাই অনুভব করতে শুরু করল, এই ‘ওরা’ শব্দটা আসলে একটা ছুরি।
নিতাই ঝুমার হাত ছেড়ে সোহেলের কাঁধে হাত রেখে বলল, “চল। আমি তোকে বাড়ি দিয়ে আসছি।”
সোহেলের বাড়ি বাজারের পেছনে মুসলিম পাড়ায়। এখানে নামটা এমনভাবেই চালু— হিন্দুপাড়া, মুসলিম পাড়া। যেন মানুষের আগে ঘর গুলোর ও ধর্ম আছে। রাস্তার মোড়ে দু’জন দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের একজন কটমট করে তাকিয়ে বলল, “কোথায় যাচ্ছ নিতাই দা?”
নিতাই উত্তর দিল, “সোহেলকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে যাচ্ছি।”
“এই ছেলেটাকে তো ওদের মধ্যেই কেউ একজন পৌঁছে দেবে। তুমি খামোখা ওদের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছ কেন?”
নিতাই পাল্টা ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওরা মানে কারা?”
লোকটা একটু থমকাল। তারপর আমতা আমতা করে বলল, “মানে… ওদের লোক।”
নিতাই এবার গলা শক্ত করে বলল, “ছেলে মানুষ। আমার মেয়ের সঙ্গে পড়ে। আমি পৌঁছে দেব। তোদের কিসের অসুবিধে?”
লোকটা হেসে বলল, “আপনি খুব দরদি দেখছি।”
নিতাই ঠান্ডা গলায় বলল, “ঠিকই বলেছিস। দরদ না থাকলে মানুষ দোকান খোলে না। কসাইখানা খোলে।”
এইটুকু বলেই সে হাঁটতে লাগল। পাশে সোহেল। পেছনে ঝুমা। তিনটে ছায়া লম্বা হয়ে মাটিতে পড়ছিল।
সন্ধের মুখে খবর এল, বাজারের দক্ষিণ দিকে একটা ঘরে আগুন লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে খবর পাল্টে গেল — আগুন লাগানো হয়েছে। তারপর আরও পাল্টে হয়ে গেল — ওরা লাগিয়েছে। কে ওরা, কেউ জানে না। কিন্তু রাত নেমে আসার আগে শিমুল ঘাটায় ততক্ষণে‘ওরা’ আর ‘আমরা’ — দুটোই পাকাপাকি শব্দের বন্দোবস্ত হয়ে গেছে।
সেই রাতেই ঘটল আসল কাণ্ডটা।
রফিকের বউ সালমা হঠাৎ ছুটে এসে নিতাইয়ের বাড়ির দরজায় ধাক্কা মারল। হাঁপাচ্ছে। কোলে ছোট মেয়ে। মুখে শুধু একটাই কথা — “দাদা, ওরা আসছে।”
নিতাই তখন ভাত খেতে বসেছে। তার বউ কমলা থালার পাশে ডাল দিচ্ছিল। ঝুমা পড়তে বসেছে। এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা থেমে গেল। বাইরে দূরে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। কারা যেন দৌড়চ্ছে। কোথাও কাচ ভাঙার শব্দ।
কমলা একবার স্বামীর দিকে তাকাল। এইসব মুহূর্তে সংসার অনেক কথা না বলেই বলে ফেলে। নিতাই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ভিতরে যা।”
সালমা ইতস্তত করছিল। “না দাদা… যদি—”
কমলা সালমা কে থামিয়ে দিয়ে বলল, “ভিতরে যা বলছি। মেয়েটাকে নিয়ে খাটের নিচে বস।”
নিতাই দরজার খিল টেনে দিল। ঘরের আলো নিভিয়ে দিল। তারপর রফিকের বড় ছেলে সোহেলকে আনতে যাবে কি না ভাবছিল, এমন সময় বাইরে থেকে ফিসফিস করে ডাক এল — “নিতাই!”
রফিক।
নিতাই দরজা আধখানা খুলতেই রফিক ঢুকে পড়ল। মুখে রক্ত। কপাল ফাটা। হাতে একটা পুরোনো বস্তা। বস্তার ভিতরে কী যেন।
“কোথায় ছিলি?”
“দোকানের পেছনে লুকিয়ে ছিলাম। ওরা ভাঙচুর করেছে।”
“কে?”
রফিক বোকা বোকা একটা ম্লান হাসি হেসে ফেলল। সেই হাসি কান্নার চেয়েও খারাপ। বলল, “মুখ ঢাকা ছিল। চিনব কী করে? তবে কি জানো গলা গুলো কিন্তু আমার খুব চেনা লাগছিল।”
এই কথাটাই সবচেয়ে ভয়ের। মুখের চেয়ে গলা বেশি পরিচিত হয়।
বাইরে তখন ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে গেছে। কেউ চেঁচিয়ে বলছে, “দরজা খোল! তল্লাশি হবে।”
নিতাই ফিসফিস করে রফিক কে বলল, “তুই ও ঘরে যা।”
রফিক থামল। “তোর বিপদ হবে।”
নিতাই বলল, “আজ যদি তোকে না লুকোই, কাল আমার মেয়ে কে কেউ লুকোবে না।”
ধাক্কা বাড়ছে।
কমলা এসে দাঁড়াল। তার চোখে ভয় আছে, কিন্তু ভয়ের চেয়ে বড় কিছু আছে। সে বলল, “ওই বস্তায় কী আছে?”
রফিক বস্তাটা খুলল। ভেতর থেকে বেরোল একটা কাপড়ে মোড়া মূর্তি — বাজারের শিবমন্দিরের ছোট শিবলিঙ্গ। সবাই চমকে গেল।
রফিক খুব আস্তে আস্তে বলল, “মন্দিরে ওরা আগুন দেবে শুনে আমি আগে গিয়ে এটা সরিয়ে ফেলেছি। যদি পুড়ে যায়…”
ঘরের অন্ধকারে কেউ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। বাইরে যারা ‘ধর্ম বাঁচাও, ধর্ম বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছে, তাদের থেকে বেশি ধর্ম তখন দাঁড়িয়ে আছে এই রক্তমাখা মানুষের হাতে, নিতাইদের সামনে।।
নিতাই মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর রফিকের দিকে। অনেক বছরের পরিচয় ছিল, কিন্তু এই প্রথম নিতাই রফিকের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে গেল।।
বাইরে আবার ধাক্কা। এবার আরও জোরে।
“খুলবি না? নাকি আমরা, দরজা ভাঙব? ভেতরে কাদের লুকিয়ে রেখেছিস? বার কর শালাদের!”
নিতাই দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল।
“কে?”
“আমরা! হিন্দুপাড়া থেকে এসেছি। তল্লাশি হবে।”
নিতাই বলল, “আমার ঘরে কেন তল্লাশি হবে? তোরা আবার কে আমার ঘরে তল্লাশি নেওয়ার?”
“খবর আছে।”
“খবর দিয়ে সংসার চলে না। প্রমাণ নিয়ে আয়।”
বাইরে কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর একটা কণ্ঠস্বর — “নিতাইদা, সরুন। নইলে ভালো হবে না।”
নিতাই এবার দরজা না খুলেই বলল, “ভালো তো অনেক দিন হল না রে। তোর ও হয়নি, আমর ও হয়নি। মাঝখানে শুধু আগুন আছে। কিন্তু মনে রাখিস, আমার ঘরে ঢুকলে আগে আমাকে টপকাতে হবে।”
কমলা পেছন থেকে এসে নিতাইয়ের পাশে দাঁড়াল।
এই একসঙ্গে দাঁড়ানোই সব থেকে বড় জবাব। ধর্ম দিয়ে যেটা ভাঙা যায়, সংসার সেটা জোড়া লাগায়। কারণ সংসার জানে মানুষকে। রাজনীতি চেনে সংখ্যা,।
বাইরে যারা ছিল, তারা হয়তো ভাবেনি ভেতর থেকে এই জবাব টা পাবে। বাইরে আরও কিছু ফিসফাস হল। কেউ বলল, “চল, চল, পরে দেখা যাবে।” পায়ের শব্দ দূরে সরে গেল। কিন্তু রাত তখনও ফুরোয়নি।
সেই রাতটা সবাই জেগে কাটাল। নিতাই, কমলা, রফিক, সালমা, ঝুমা, সোহেল। মাঝখানে পড়ে থাকলো কাপড়ে মোড়া শিবলিঙ্গ। পাশে সালমার কোলের ঘুমন্ত মেয়ে। যেন একটা ঘরে সমস্ত উপমহাদেশ গুটিসুটি মেরে বসে আছে— ভয়ে, ক্লান্তিতে, আশায়।
ভোরের দিকে বৃষ্টি নামল।
টিনের চাল বেয়ে জল পড়তে লাগল। উঠোন ভিজে গেল। দূরের আগুনের লালচে আভা ও আস্তে আস্তে নিভে যেতে লাগল। নিতাই দরজার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “দেখ, আগুনের চেয়ে জল সব সময় বড়।”
রফিক চুপচাপ বসেছিল। একটু পরে বলল, “কিন্তু নিতাই দা, মানুষ আগুন।কেই বেশি পছন্দ করে।”
নিতাই উত্তর দিল, “তা করে। কারণ আগুনকে দেখতে মজা লাগে। কিন্তু জল কে বয়ে নিয়ে যেতে হয়।”
সকাল হলে বাজারে দেখা গেল তিনটে দোকান পুড়েছে। দুটো হিন্দুর, একটা মুসলমানের। আগুন ধর্ম মানেনি। আগুন শুধু শুকনো কাঠ চেনে।
শিবমন্দিরের পুরোহিত এসে যখন শুনলেন, মূর্তিটা রফিক বাঁচিয়েছে, তখন কিছুক্ষণ তার মুখ দিয়ে কথা বেরোল না। শেষে তিনি শুধু বললেন, “ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।”
রফিক মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার মঙ্গল পরে করবেন। আগে বাজারটা বাঁচান।”
তারপর সেই ইটের সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে, বহু লোকের সামনে, নিতাই আর রফিক একসঙ্গে হাত লাগিয়ে দোকানের ভাঙা টিন তুলল। কেউ তখন আর জোরে কথা বলছিল না। যারা আগের দিন স্লোগান দিয়েছিল, আজ যেনো তাদের গলায় কাঁটা ঢুকেছে।
ঝুমা স্কুলে গিয়ে রচনায় লিখেছিল — আমার দেখা একটি রাত। সোহেল অঙ্কের খাতায় লাভ-ক্ষতির হিসেব করতে গিয়ে হঠাৎ লিখে ফেলেছিল — মানুষ বাঁচলে তবেই বাজার বাঁচে।
অনেক বছর পরে শিমুল ঘাটায় নতুন বাজার হয়েছে, স্টেশনে ইলেকট্রনিক বোর্ড বসেছে, টিনের চাল বদলে কংক্রিটের ছাউনি হয়েছে। কিন্তু বুড়ো লোকেরা এখনও বিকেলে চা খেতে খেতে সেই ভয়ংকর রাতের কথা বলে। কেউ বলে, “সেদিন যদি নিতাই দরজা না খুলত —” কেউ বলে, “সেদিন যদি রফিক মূর্তিটা না বাঁচাত —” কেউ আবার চুপ করে থাকে আর শুধু মাথা নাড়ে। কারণ তারা জানে, দাঙ্গা এক রাতের ঘটনা নয়। তার ছাই অনেক দিন উড়ে বেড়ায়।
কারণ শেষ পর্যন্ত গল্পটা নিতাই বা রফিকের নয়। গল্পটা একটা দরজার। গল্পটা একটা হাতের। গল্পটা একটা শব্দের। কারণ দরজাটা খুলবে কি না, না কি বন্ধ হবে। হাত টেনে নেবে, না কি ঠেলে দেবে। মুখ থেকে কোন শব্দ বেরোবে ‘মানুষ’, না ‘ওরা’ সেটাই আসল প্রশ্ন। সুতরাং সেদিনের শিমুল ঘাটা বুঝেছিল সাম্প্রদায়িকতা আসলে আগুন নিয়ে আসে না; তারও আগে সে ভাষা কে নষ্ট করে, স্মৃতি কে ধ্বংস করে, প্রতিবেশীকে সন্দেহে করে।
তাই দেশে দেশে, কালে কালে, নাম পাল্টে পাল্টে, মিছিল পাল্টে পাল্টে, পতাকা পাল্টে পাল্টে পরীক্ষা একটাই — আগুন আগে পৌঁছবে, না জল আগে পৌঁছবে? ঘৃণা আগে ছড়াবে, না মানুষ মানুষকে ভালবাসবে? শিমুল ঘাটার সেই রাত আজও শেষ হয়নি। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর এখনও আমাদের কেই দিয়ে যেতে হচ্ছে।
বাহ, অপূর্ব। একদম সময়োপযোগী।
ধন্যবাদ
নিতাই ও রফিক খুব সুন্দরভাবে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু তারা একটু বেশি “আইডিয়ার বাহক” হয়ে গেছে।
নিতাই = মানবতা
রফিক = সহাবস্থান
এটা কার্যকর, কিন্তু বাস্তব মানুষ হিসেবে তাদের ছোট দুর্বলতা, দ্বিধা, বা ভুল খুব কম দেখা যায়।
যেমন:
নিতাই প্রায় সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—এটা একটু “idealized” লাগতে পারে।
একটা ছোট দ্বিধা, ভয়, বা ভুল সিদ্ধান্ত যোগ করলে চরিত্রগুলো আরও মানবিক হতো।