আমরা থাকি ২৪ চৌরঙ্গীতে, আমাদের পাশেই ২৩ নং হচ্ছে বাইবেল হাউস। সাহেব কর্তা বাইবেল হাউসের। একদিন সকালে সাহেব ও মেম এসে হাজির। হাতে একটি বাইবেল। একটা পুরু কাগজে যীশুখৃষ্টের অপূর্ব স্কেচ। তলায় ইংরেজীতে লেখা-ওরে পাষণ্ড তোদের যে নরকেও স্থান হবে না, তোদের পাশেই রয়েছে যীশুপুত্র আনন্দগোপাল, আর তোরা তাকে একটা বাইবেলও দিসনি। তাঁরা ক্ষমা চেয়ে বাইবেলটি আমাকে দিলেন। পরিচয় হয়ে গেল। তাঁদের দুটি শিশুপুত্র, ৬ বছরের মাইকেল, আর ৪ বছরের জন। জন এমন নাদুস নুদস ছিল যে আমার খুব ভালো লাগতো। খুব আদর করতাম। সারাদিনে আয়ার সংগে বারে বারে আসতো। এমন কি সন্ধ্যাবেলায় এলে, আয়া মুসকিলে পড়ে যেতো, তাকে বাড়ী নিয়ে যেতে। এঁদেরকে বলেছিলাম, অন্নদা মুন্সী একজন গ্রেট আটিষ্ট, কোনো শিল্পীকে দিয়ে ওই লেখাগুলো কায়দা করে পেন্ট করিয়ে নিয়ে যীশুখৃষ্টের ছবিটা বাঁধিয়ে নাও।
অন্নদা মুন্সীর খেয়াল ছিলো, নামী দামী লোকদের ছবি এঁকে, অপূর্ব ক্যালিগ্রাফিতে কিছু লিখে পাঠানো। আমি দুটি ঘটনার কথা বলবো এখানে। প্রথমটি হচ্ছে, পদ্মজা নাইডু যখন রাজ্যপালিকা। একদিন পাবলিসিটি ফোরামে গেছি, মিশন রো-তে। মুন্সীদা তখন ওখানে আর্ট ডাইরেক্টার। অফিসে ঢুকে দেখি, সব পুলিশ রয়েছে। ম্যানেজিং ডাইরেক্টর অসিত গুপ্তর ঘরে ঢুকতেই, অসিতদা আমাকে দেখে যেন চাঁদ পেলেন। -আরে আনন্দ এসো, এসো, দেখো কি মুস্কিলে পড়েছি। পুলিশ অফিসার এসেছেন, তোমার মুন্সীদাকে লালবাজারে নিয়ে যেতে। তোমার মুন্সীদার কি সব কাণ্ড। আরে বাবা সকলেরই কী সমান রসবোধ থাকে? যে তুমি যাকে হোক তোমার আর্ট আর ক্যালিগ্রাফির কেরদানি দেখাবে। নাও ঠ্যালা। ম্যাডামকে পাঠিয়েছে এই ছবি, আর ইনি এসেছেন, মুন্সীকে লালবাজারে নিয়ে যেতে। ওকে বসিয়ে রেখে, মাথুর সাহেবকে আসতে বলেছি। এলেন বলে। মাথুর মানে পি.এস. মাথুর ছিলেন ইনফরমেশন ও পাবলিসিটির অধিকর্তা। বিধান রায়ের পেটোয়া লোক। এলেন মাথুর সাহেব। ছবিটাকে দেখলেন। পোষ্টার সাইজের ছবি। মাডামের এলো চুল। হাতদুটি দুদিকে ছড়ানো। হেঁটে আসছেন। তলায় লেখা — ‘নেচে নেচে আয় মা শ্যামা।’ পোর্ট্রেট হিসেবে, এককথায় অপূর্ব। মাথুর পুলিশ অফিসারকে বল্লেন — আর বলবেন না মশায়, গতবছর আমি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। একদিন বিকেলে দেখছি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে বারে বারেই চোখ মুছছে। তখন কিছু জিজ্ঞেস করার ক্ষমতা ছিলো না। পরে ভালো হয়ে, কথাটা একদিন মনে পড়ায় স্ত্রীকে বল্লাম — একদিন মনে হয়েছিলো, তোমরা কাঁদছো, বারে বারেই চোখ মুছছিলে। কী ব্যাপার হয়েছিল। স্ত্রী উঠে গিয়ে মেয়ের পড়ার ঘর থেকে, একটা পোষ্টার সাইজের ছবি নিয়ে এলো।-আমি শুয়ে আছি। একহাত ধরেছে যমদূত আর একহাত ধরেছে দেবদূত। তলায় অপূর্ব কারিকুরিতে লেখা, যমদূত বলছে — এ ব্যাটা, বাইরের থেকে এসে আমাদের ঘাড়ের ওপর নৈবেদ্যের মণ্ডার মতন বসে আছে। ব্যাটা ভয়ানক বজ্জাত, একে আমি নিয়ে যাবো। আর দেবদূত বলছে-বল কী, এ খুবই এফিসিয়েন্ট, বিধানরায়ের নেকনজরে আছে, পেটোয়া লোক, এ হলো খোদার খাসি। একে আমি নিয়ে যাবো। হেসে স্ত্রীকে বলেছিলাম-লেখাগুলো বাদ দিয়ে, ছবিটা দেখ, কী অসাধারণ আঁকা। এর আগে অফিসে আমি গোটা চারেক ছবি পেয়েছি। আটিষ্টকে দিয়ে লেখাগুলো পেন্ট করিয়ে, অফিসে রেখে দিয়েছি।
পুলিশ অফিসার বল্লেন-অসিতবাবুতো বলেছেন আপনিও বল্লেন, শুনলাম কিন্তু আমি কী করতে পারি? মাথুর সাহেব বল্লেন — না আপনি কী করবেন, আমি চীফ্ সেক্রেটারীকে ফোন করছি। চীফ্ সেক্রেটারীকে অল্পসল্প বলে, মাথুর বল্লেন-স্যর পুলিশ অফিসারকে বলুন, আমাদের সঙ্গে আপনার কাছে যেতে। পরে শুনেছিলাম, চীফ্ সেক্রেটারী নিজে গিয়ে বলেন- ম্যাডাম মুন্সীজী গ্রেট আটিষ্ট, কিন্তু বদ্ধ পাগল এবং তার কীর্তি-কাহিনী শুনিয়ে মাডামকে শান্ত করেন।
অন্নদা মুন্সীর বাবা ছিলেন, বগুড়ার এক বড় জমিদারের (রাজা টাইপের) দেওয়ান। মহম্মদ আলীর বাবা ছিলেন উচ্চপদস্থ অফিসার। দুজনের কাছাকাছি বাড়ী। দুই বাড়ীর ছেলে অন্নদা ও মহম্মদ আলী, ছোট থেকেই অন্তরঙ্গ বন্ধু। একেবারে হরিহর আত্মা। মহম্মদ আলী তখন পাকিস্তানের প্রাইম মিনিষ্টার। ‘নেচে নেচে আয় মা শ্যামা’ ঘটনার বেশ কয়েক বছর পরে। একদিন পাবলিসিটি ফোরামে গেছি। একটা লম্বা খাম বের করে, তার থেকে একটি চিঠি দেখালেন আমাকে মুন্সীদা। বল্লেন এটা পাঠাচ্ছি আজকে। চিঠি পড়েই আমার চক্ষু চড়ক গাছ। স্কেচ ও ক্যালিগ্রাফিতে অপূর্ব সুষমা মণ্ডিত চিঠি। চিঠিতে সম্বোধন-বেটা মহম্মদ আলী। আর চিঠিটার মোদ্দা বয়ান হচ্ছে-তুমি বেটা, পাকিস্তানের পিএম হয়ে তোমার বাপকে গুরুকে ভুলে গেছ? শাস্ত্রে আছে-গুরুকে যে ভুলে যায়, তার স্থান হয় জাহান্নামে। তোমার অনন্ত নরকবাস কেউ আটকাতে পারবে না। আমি এখান থেকেই বুঝতে পারছি।
দিন কুড়ি পরে গেছি একদিন মুন্সীদার কাছে। একটা লম্বা খাম বের করে দিলেন আমার হাতে। পাকিস্তান সরকারের ছাপ মারা। খুলে দেখি, অভাবনীয় ব্যাপার। পাকিস্তানের পিএম- এর প্রাইভেট্ সেক্রেটারীর চিঠি, বয়ানটি হচ্ছে-ডিয়ার মুন্সীজী, পিএম আপনার চিঠি পেয়ে খুব খুশী। কোলকাতায় পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার, আপনার সঙ্গে দেখা করবেন। কখনও বিদেশ সফরে কিছুক্ষণের জন্য পিএম-কে যদি দমদম বিমানবন্দরে থাকতে হয়, তখন ডেপুটি হাইকমিশনার আপনাকে দমদম বিমান বন্দরে নিয়ে আসবেন, আপনাদের দুজনের সাক্ষাৎ হবে। মহান আল্লা আপনাকে ভালো রাখুন।
মুন্সীদার কত গল্প জানি। লিখতে গেলে, কয়েকটা খাতা ভরে যাবে। এরকম প্রাণখোলা, দিলখোলা, জাতশিল্পী আমি আর দেখিনি। আমাকে দেওয়া ছোট-বড় কয়েকটা ছবি, এখনো আঁকড়ে ধরে আছি।
বিজ্ঞাপনের বিলিতী কোম্পানী ডি.জে. কিমার নাম পালটে হয়ে গেল ক্ল্যারিয়ন। আমার বন্ধু সুভাষ সেন সেখানে একজন কর্মকর্তা। সত্যজিৎ রায়ের অকৃত্রিম বন্ধু। সমকালীন-এর বয়স তখন ছয় বছর। সুভাষ সেনকে সমকালীন দিতাম মাসে মাসে। সুভাষ পড়ে নিয়ে সেটা সত্যজিৎ-কে দিতেন। বিজ্ঞাপনের জন্য প্রায়ই যেতে হতো ক্ল্যারিয়নে। একদিন গেছি, সুভাষ বল্লেন-জানো আনন্দ, মানিক কাল তোমার সমকালীনের খুব প্রশংসা করছিল। আবার মাস তিনেক পর।-জানো, কাল মানিক বল্লো-যাই বলো, ছেলেটার বাহাদুরী আছে। এইরকম নীট কাগজ, সময়মতো ঠিক বের করা, এবং উচ্চশ্রেণীর লেখা, একলাই তো চালিয়ে যাচ্ছে। কমলদাও (কমল মজুমদার) মানিকের কথাটা খুব সাপোর্ট করলো। আমি বসে ছিলাম সুভাষের সামনে। উঠে তার পিছনে গিয়ে ওর পিঠ চাপড়ে বলতে লাগলাম-সত্যিই কৃতী ছেলে, বাহাদুর ছেলে, আহা কী ছবিই না করেছে- ‘পথের পাঁচালি’। মন ভরে যায়, চিরজীবী হোক ছেলেটা। সুভাষ ঘাড় বেকিয়ে আমার দিকে ফিরে বললে এটা কী হলো? বল্লাম- কিছু না, তোমার পেয়ারের মানিকের পিঠ চাপড়ে, এই কথাগুলি বোলো। একদিন সুভাষ সত্যিসত্যিই সত্যজিৎ-এর পিঠ চাপড়ে ঠিক ওই ভাবেই বলে। সত্যজিৎ-ও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন কী ব্যাপার? সুভাষ বলেন-আমার কথা নয়, ওগুলো আনন্দগোপালের কোটেশন। আর যাঁরা ছিলেন সবাই হেসে ওঠেন। সত্যজিৎ বলেন- এতেই আনন্দ বুঝিয়ে দিল যে পিঠ চাপড়াতে সবাই আছে, সাহায্য করতে কেউ নেই। সতিই তো আমরা তো সব প্রায় একই বয়সী, ও একলা একটা প্রবন্ধের কাগজ বের করেছে। আমরা তো কেউ কিছু সাহায্য করিনি। ঠিক আছে, আমি সমকালীনের কভার করে দেব। (চলবে)