রক্তকরবী নাটকটি প্রযোজনার ইচ্ছা রবীন্দ্রনাথের মনে দীর্ঘ দিন লালিত হয়েছে। রানু অধিকারীকে (পরবর্তীকালে লেডি রানু) চিঠিতে কবি বলছেন— ‘আমার ইচ্ছে সেই যক্ষপুরীর অভিনয়টা করে অভিনয়ের আরেক রকম ধারা দেখিয়ে দিই’। আবার ১৯২৭ সালের ৮ নভেম্বর, রেবা রায়কে লেখা চিঠিতে বলছেন— ‘তুমি যদি এই দায় (নন্দিনীর ভূমিকায় অভিনয়) নিতে রাজি হও তাহলে অভিনয় সম্ভব হবে, নইলে হয় কি না সন্দেহ। আমাকে রাজা ও দিনুকে (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর) বিশু সাজতে হবে’। রামকিঙ্কর একবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কবি মহলা দেখতে এসে বললেন- ‘আমি তো এটা পড়ার জন্য লিখেছি হে। এটা কি অভিনয় করা যাবে?’
নাট্যাচার্য শিশির কুমারও ভেবেছিলেন রক্তকরবীর কথা, কিন্তু এগোননি। তিনি যখন ‘তপতী’ প্রযোজনা করলেন, একদিন তাঁর ভ্রাতৃবধূ তথা সে সময়ের বিখ্যাত অভিনেত্রী প্রভা দেবী বলেছিলেন— ‘বাবা, খালি চেয়ারের দিকে তাকিয়ে কতক্ষণ অভিনয় করা যায়?’ শিশির কুমার বলেন— দাঁত চেপে করে যাবি।
বহুরূপী যখন (১৯৫৪) রক্তকরবী প্রযোজনা করার উদ্যোগ নেয়, সে সময় শিশির কুমার বলেন— ‘ওই হাফ-ফিলজফির মধ্যে যেও না। নাটক করো, নাটক’। এর আগে ১৯৫১ সালে লেখা ‘আন্দোলনের প্রয়োজন’ প্রবন্ধে শম্ভুবাবু প্রথম ব্যবহার করলেন ‘নবনাট্য’ শব্দটি। একই সঙ্গে বললেন, রবীন্দ্রনাথ এই বাংলাদেশের মানসতা আবিষ্কার করতে চেষ্টা করেছেন তাঁর নাটকের মধ্যে দিয়ে…। আগামী দিনের নতুন, সম্পূর্ণ, সুন্দর ও প্রচণ্ড নাটকে পৌঁছতে হলে রবীন্দ্রনাথকে আত্মসাৎ করে তবেই এগোতে হবে। তাঁকে বাদ দিয়ে কিছুই হয়নি, হবেও না। ইতিমধ্যেই বড়ো দেরি হয়ে গিয়েছে। শম্ভুবাবু মনে করতেন, রবীন্দ্রনাথেই সবচেয়ে ব্যপক ভাবে আছে আমাদের দেশের নিজস্ব নাটক। তাই বাংলা নাটকের মুক্তিস্থল রবীন্দ্রনাথ। তিনিই প্রধান আশ্রয়।
এর আগে ১৯৪৩-৪৪ সালে গণনাট্যের প্রযোজনা ‘নবান্ন’ ইতিহাস গড়েছে। বিজন ভট্টাচার্য এবং শম্ভু মিত্র যৌথভাবে এই নাটকটি পরিচালনা করেন। এর পর ‘কাঞ্চনরঙ্গ’, ‘উলুখাগড়া’, ‘বিভাব’, ‘ছেঁড়া তার’ প্রভৃতি নাটকের পর্ব।
কিন্তু ‘রক্তকরবী’ প্রযোজনা বোধহয় বাংলা নাটককে একেবারে ভিন্নতর মঞ্চভাষার সন্ধান দিলো। সে সময় গোটা বাংলা থিয়েটারে নানা আকারপ্রকারে ইওরোপের রিয়ালিজম উঁকি দিয়েছে। মনে রাখার বিষয়, ইবসেনীয় বাস্তবতা নিয়েও ‘পুতুল খেলা’র মতো অসামান্য প্রযোজনা দেখিয়েছেন শম্ভু মিত্র। কিন্তু রক্তকরবী সর্ব অর্থেই মঞ্চ-বিপ্লব। এবং সে ঘটনা ঘটলো শম্ভুবাবুর হাত ধরেই। এর কাছাকাছি সময় (১৯৫২ সালে) বহুরূপী নাট্যদলেও প্রথম ভাঙন। সবিতাব্রত দত্ত, তুলসী লাহীড়ী, কালী সরকার, মোহাম্মাদ ইজরাইল, শিবু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ দল ত্যাগ করলেন। ১৯৪৮ সালে যে দলের যাত্রা আরম্ভ, চার বছরের মাথায় ভাঙন ধরলো। এই কঠিন পরিস্থিতিতেই অভূতপূর্ব উদ্যোগ-গ্রহণের লড়াইয়ে নামলেন শম্ভুবাবু। এ তো সত্যি কথা, এ ধরণের নাটকের তেমন কোনও ধারা বাংলায় ছিল না। তৃপ্তি মিত্র অভিনীত নন্দিনী, এলা, ইয়োকাস্তে প্রভৃতি এক একটি ইতিহাসের অধ্যায়। পরবর্তীকালে ১৯৫৬ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ প্রযোজিত হলো। ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাস অবলম্বনে যে প্রযোজনাটি ইতিপূর্বেই বহুরূপী করেছিল, শম্ভুবাবু ফের তাকে মঞ্চে ফিরিয়ে আনলেন। এর পর ৬৪ সালে অন্ধকারের নাটক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ এবং সফোক্লেসের ‘রাজা অয়দিপাউস’ মঞ্চস্থ হলো। এই নাটকগুলির কোনও তুলনা হয়না, কারণ যে নাট্যভাষা শম্ভু মিত্র মঞ্চে উপস্থিত করলেন, তার কোনও অনুষঙ্গ বাঙালি মানসে ইতোমধ্যে জ্ঞাত ছিল না। তাছাড়া এই নব প্রয়াসে ফের কেন্দ্রে এলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর কবিতা, গান, গদ্য, এমনকি চিত্রকলাও দেশ-বিদেশে সমাদৃত হচ্ছিলো, অথচ তাঁর নাটকের উদ্যোগ কবিকে নিজেকেই নিতে হতো। রবীন্দ্রনাথ যে অভিনেয়, সেটা দেখিয়ে দিলেন শম্ভু মিত্র অভিনয় এবং তাঁর পরিচালনার গুণে। শুধু কলকাতা নয়, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, দক্ষিণ ভারত, পশ্চিম ভারত- প্রায় সব রাজ্যের নাট্যজনেরা তাঁকেই অবিসংবাদী প্রধানের আসনে গ্রহণ করলেন।
শম্ভু মিত্রের জন্ম ১৯১৫ সালের ২২ আগস্ট। বাবা শরৎ কুমার মিত্র। মা শতদলবাসিনী দেবী। পড়াশোনা বালিগঞ্জ গভ স্কুল ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। তবে মূলত নিজেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। নাট্যকলা ছাড়াও সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, মনস্তত্ব, নৃতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ও বিপুল পড়াশোনা। বহু গ্রন্থের রচয়িতা, বিখ্যাত নাটক ‘চাঁদ বণিকের পালা’। তিনি ও তৃপ্তি মিত্র ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে বহুরূপী ত্যাগ করেন। ফ্রিৎস বেনেভিৎসের পরিচালনায় জার্মান নাট্যকার ব্রেখটের ‘গ্যালিলেওর জীবন’ নাটকে অভিনয় করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তাঁর প্রয়াণ ১৯৯৭ সালে। তাঁদের কন্যা শাঁওলী মিত্র একজন বিখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক এবং প্রাবন্ধিক।