আধুনিকতার আগ্রাসনে শীতের উদযাপনের মোহে হারিয়ে যাচ্ছে বঙ্গের অনেক লোকসংস্কৃতি। প্রকৃতির নিয়মে হেমন্তের ব্যাপ্তিও কমতে কমতে ন্যূনতম মাত্রায় এসে ঠেকেছে। তবুও হারাতে হারাতে এখনও হারায়নি অনেক কিছু। যেমন টিকে রয়েছে হেমন্ত ঋতুর দ্বিতীয় মাস অগ্রহায়ণ মাসের নানা পুজো-উপচার।
আজ পয়লা অগ্রহায়ণ। কৃষ্ণ পক্ষের ত্রয়োদশী তিথি। জ্যোতিষীয় দৃষ্টিতে ত্রয়োদশী তিথি ৭ বেজে ১৩ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড পর্যন্ত থাকবে। এই তিথি শুভ কারণ এটি ভগবান শিবকে উত্সর্গীকৃত।
সনাতন ধর্মে অগ্রহায়ণ বা মার্গশীর্ষ মাস অত্যন্ত পবিত্র এবং শুভ বলে মানা হয়। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ গীতায় এই মাসকে নিজের স্বরূপ বলে বর্ণনা করেছেন: “মাসানাং মার্গশীর্ষোঽহম্”। এই মাসের অমাবস্যা তিথিকে মার্গশীর্ষ অমাবস্যা বা অঘহন অমাবস্যা বলা হয়।
২০২৫ সালের বৈদিক পঞ্জিকা অনুযায়ী মার্গশীর্ষ অমাবস্যা তিথি শুরু ১৯ নভেম্বর (বুধবার) সকাল ৯টা ৪৩ মিনিটে এবং তিথি সমাপ্তি ২০ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) দুপুর ১২টা ১৬ মিনিটে।যেহেতু ২০ নভেম্বর সূর্যোদয়ের সময় অমাবস্যা তিথি বিদ্যমান থাকবে, তাই এই বছরের মার্গশীর্ষ অমাবস্যা ২০ নভেম্বর অর্থাৎ বুধবার পালন করা হবে। এই অমাবস্যা তিথিটি ভগবান বিষ্ণু, চন্দ্রদেব এবং পূর্বপুরুষদের (পিতৃগণ) উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত।
‘হে শীতের সূর্য! হে শীতের সূর্য!/হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়’…(সুকান্ত ভট্টাচার্য)

এই তিথিতে সূর্যোদয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূর্যোদয়ের আগে ব্রহ্ম মুহূর্তে কোনো পবিত্র নদী, হ্রদ বা পুকুরে স্নান করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। যদি তা সম্ভব না হয়, ঘরে বসেও পবিত্র স্নান করা যায়। আপনার স্নানের জলে গঙ্গাজল মিশিয়ে নিতে পারেন বা স্নানের সময় : “ওঁ গঙ্গে চ যমুনেচৈব গোদাবরী সরস্বতী/ নর্মদা সিন্ধু কাবেরী জলেহস্মিন্ সন্নিধিন্ কুরু।”এই মন্ত্রটি পাঠ করুন।
বেদে দানের গুরুত্ব অপরিসীম। এই তিথিতে দরিদ্র ও ব্রাহ্মণদের অন্ন, বস্ত্র, তিল ও অর্থ দান করা উচিত। কারণ দান করলে কর্ম শুদ্ধ হয়। দান মনকে বিশুদ্ধ করে, সহানুভূতি বাড়ায় এবং ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করে, যা সমাজে শান্তি ও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে।
পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণ, পিণ্ডদান এবং শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা মার্গশীর্ষ অমাবস্যার অন্যতম প্রধান কাজ। এই দিনে পিতৃপুরুষের পুজো করলে তাঁদের আশীর্বাদ লাভ হয় এবং সমস্ত দুঃখ দূর হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। পিতৃপুজোর শুভ মুহূর্ত সাধারণত বেলা ১১টা ৩০ মিনিট থেকে ১২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত থাকবে।
এই দিন ভগবান বিষ্ণু, দেবী লক্ষ্মী, দেবাদিদেব মহাদেব শিব এবং চন্দ্রদেবের পুজো করা হয়।অগ্রহায়ণ অমাবস্যার দিনে অশ্বত্থ গাছের পুজো করা হয়।
“অগ্রহায়ণ” শব্দের অভিধানিক অর্থ বছরের যে সময় শ্রেষ্ঠ ব্রীহি (ধান) উৎপন্ন হয়।অগ্র’ শব্দের অর্থ ‘আগে’ আর ‘হায়ণ’ শব্দের অর্থ ‘ধান’। যেহেতু ধানের মৌসুমের অগ্রে এই মাসটি শুরু হতো, তাই এই মাসের নাম ‘অগ্রহায়ণ’। এখন মাঠ জুড়ে হলুদে-সবুজে একাকার। সোনালি ধানের প্রাচুর্য। আনন্দধারায় ভাসে কৃষকের মনপ্রাণ।
প্রাচীনকালে পহেলা অগ্রহায়ণ নববর্ষ পালিত হত। সেই সময় অগ্রহায়ণ মাসকেই বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হত। এটি ছিল মূলত কৃষকের উৎসব। সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ‘বৈশাখ’ মাসকে বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে প্রচলন করা হয়।
অগ্রহায়ন মাস সমৃদ্ধির মাস।তাই গ্রামের বধুরা ছড়া কেটে বলেন, —
“সবু মাস মাসং করে মার্গশীর্ষ সার।
তাঁহিরে পড়ই যেউ যেউ গুরবার।।”
অগ্রহায়নে গ্রাম বাংলার আঙিনা পরিপূর্ণ থাকে নবজাত শস্যের আঘ্রাণে। ধীরে ধীরে শীতকালে এসেছে। কুয়াশায় আচ্ছাদিত সন্ধ্যা আর সকলের নতুন গুড়ের গন্ধ। চলে নবান্নের আয়োজন। অগ্রহায়ণ মাসের নবান্ন উৎসবে নতুন অন্ন প্রথমে দেবতা, পিতৃপুরুষ ও অন্যান্য প্রাণীকে উৎসর্গ করা হয়, তারপর আত্মীয়স্বজনদের পরিবেশন করা হয় এবং অবশেষে গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড় সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন। এই উৎসবটিকে “নতুন অন্ন” এবং “নতুন” শব্দের সমন্বয়ে ‘নবান্ন’ বলা হয়।
নতুন আতপ চালের গুঁড়োর সাথে দুধ, চিনি, কলা, ফল, নারকেল, আদা, মূলা ইত্যাদি মিশিয়ে নবান্নের আয়োজন করা হয়। সংসারে সমৃদ্ধির কামনায় নবান্নের আয়োজন করা হয়। মূলত সম্পদের দেবী লক্ষীর আহ্বানে এই উৎসব উৎসর্গীকৃত। এছাড়াও এই মাসের প্রতি বৃহস্পতিবারে লক্ষী ব্রত পালন করা হয়। ঘরে অঘ্রাণকা (আঁকা) হয় দেবীর পদচিহ্ন। নতুন ধানের মধ্যে যাতে পোকা না লেগে যায় এই কামনা নিয়েও লক্ষীপূজো করা হয়।
তামিলনাড়ুতে এই মার্গশীর্ষ বা “মার্গাই” মাসে মহিলারা খুব ভোরে “কোলাম” বা “রঙ্গোলি” তৈরি করে। ভক্তরা সাধারণত খুব ভোরে মন্দিরে যান এবং অন্ডালের থিরুপ্পাভাই এবং মানিককাভাকারের থিরুভেম্পভাই পাঠ করেন।
অগ্রহায়ণ মাসে বিভিন্ন মনস্কামনা পূর্তি উপলক্ষে পালন করা হয় সেঁজুতি ব্রত। ১লা অগ্রহায়ন থেকে শুরু করে সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যায় পিটুলি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ছবি আঁকতে হয়। এরপর প্রদীপ জেলে এই ব্রত পালন করতে হয়। এই ব্রতে আলপনার আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। অন্তত ৫২ রকমের ছবি আঁকতে হয়। আলপনার মধ্যে শিবের মূর্তি থেকে শুরু করে শিব মন্দির নাট মন্দির পালকি ঢেঁকি বটি বেগুন পাতা পান খাট গোয়াল ঘর আকাশ চন্দ্র সূর্য ইত্যাদি ছবি আঁকতে হয়।
এই ব্রতের আল্পনায় চিত্রিত ছবিগুলো যেন একেকটি বিশিষ্ট প্রতীক। প্রতীকগুলিকে অবলম্বন করে নারী জীবনের সুখ দুঃখের এক অকপট অভিব্যক্তি ব্রতের ছড়ার ছন্দে ছন্দে ফুটে ওঠে। আলপনার মাঝখানে ঘট বসিয়ে প্রদীপ জেলে আলপনার প্রত্যেকটি প্রতীকে তিন কিংবা ৬ গাছি করে দুর্বা ধরে ব্রতের ছড়া বলতে হয় —
সাঁজ পুজন সেঁজুতি,
ষোল ঘরে ষোল বর্তি
তার এক ঘরে আমি বর্তি,
বর্তি হয়ে মাগি বর
ধনে পুত্রে বাড়ুক বাপ মার ঘর।।
সূর্য দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে এই ব্রত সাঙ্গ করা হয়। ব্রতিনী শেষ দিনে ক্ষীরের নাড়ু দুধে ফুটিয়ে খায়। এই ব্রত চার বছর উদযাপন করতে হয়। পরিবারের সকলের ও নিজের সুখ সমৃদ্ধি মঙ্গল কামনায় এই ব্রতের মূল উদ্দেশ্য।
সন্ধ্যার সময় অনুষ্ঠিত হয় বলে এই ব্রতের নাম সাঁজপূজনী। অঞ্চলভেদে আবার এই ব্রতের নিয়ম-কানুনের ও তারতম্য লক্ষ্য করা যায়।
এই মাসে রয়েছে ইতু পূজো। কার্তিক মাসের সংক্রান্তি থেকে শুরু করে অঘ্রাণের সংক্রান্তির দিন পুকুর বা নদীতে ইতু বিসর্জন দিতে হয়। ইতুকে যদিও আমরা লক্ষ্মী বলে মানি, ইতুলক্ষ্মী বলি, এটি আসলে সূর্যদেবের পূজা।

অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী ‘মোক্ষদা’ নামে পরিচিত। মোক্ষদা একাদশী একটি শুভ দিন যা পাপ থেকে মুক্তির জন্য এবং মৃত্যুর পরে মোক্ষ লাভের জন্য বিষ্ণুর উপাসনার জন্য নিবেদিত। এই একাদশীর দিন গীতা জয়ন্তী পালিত হয়। এই দিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ভগবদ্গীতার পবিত্র উপদেশ দিয়েছিলেন।
সারা অগ্রহায়ণ মাস জুড়ে সুখ সমৃদ্ধি কামনার জন্য পালন করা হয় থুয়াব্রত। পর পর চার বছর ধরে এই ব্রত পালন করা হয়। ব্রতের দিন ব্রতী উপবাসী থেকে ভোরবেলা মাটির মধ্যে একটি গোলাকার গর্ত খুঁড়ে তার চারপাশে এবং মধ্যিখানে একটি থুয়া (মাটির স্তূপ) বসিয়ে ছড়া বলে —
থুয়া পূজে থুয়ানী
আগুন মাসের বৌয়ানী
হাতে ঝাড়ি কাঁখে কলসী।
থুয়া পূজা করার পর ব্রতী ঘরে গিয়ে মাকে প্রণাম করে ব্রতের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
আধুনিকতার অগ্রাসনে লোকসংস্কৃতি ক্রমশ হারিয়ে চলছে। অথচ লোকসংস্কৃতিতে লুকিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, এবং বিনোদন।লোকায়ত সংস্কৃতি হলো একটি জাতির প্রকৃত পরিচয়ের প্রতিচ্ছবি, যা যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসছে। সমাজের প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে চাইলে লোকায়ত উৎসবকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।